পায়ে হেঁটে চিনুন পাহাড়ের রানিকে

দার্জিলিংয়ের অপরূপ শোভা কখনই পুরোনো হবে না

‘পাহাড়ের রানি’-র সৌন্দর্য বর্ণনা করা সহজ নয়। ঠিক কোনখান থেকে শুরু করব, তা নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। যতবারই আপনি দার্জিলিং ঘুরতে যান, তার অপরূপ শোভা কখনই পুরোনো হবে না। একদিকে প্রকৃতি নিজেকে মোহময় করে মেলে ধরেছে। ঔপনিবেশিক যুগের ঐতিহ্য তার সঙ্গে যোগ করেছে অন্য এক জাদু। পর্যটকদের কাছে দার্জিলিংয়ের আকর্ষণ তাই চিরকালীন। 

দার্জিলিং 

দার্জিলিংয়ের মায়াবী সৌন্দর্য নতুন করে আবিষ্কার করার দারুণ সুযোগ পাবেন হেরিটেজ ওয়াকে। শরীর-মনের সামর্থ্য অনুযায়ী সারা দিন কিংবা অর্ধেক দিন ধরে হাঁটুন শহরের রাস্তায়। গাইড আপনার সামনে তুলে ধরবেন রোমাঞ্চকর ইতিহাস। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দার্জিলিংয়ের একটি প্রধান রাস্তা গান্ধি রোড। আপনি কি জানেন, এটি এক সময় পরিচিত ছিল ‘টাঙ্গা রোড’ নামে?  এই রাস্তায় চলাচল করত ঘোড়ায় টানা টাঙ্গাগাড়ি। স্থানীয় মানুষরাও অনেকে জানেন না আজ। এক বন্ধুর সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম হেরিটেজ ওয়াকে। গাইড হিসেবেও তিনি দারুণ। তখনই এই তথ্য জানতে পারি।   

ম্যাল 

অর্ধেক দিনের সফরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বেশ কিছু আকর্ষণ:

১৮৬৪ সালে গড়ে ওঠে প্ল্যান্টার্স ক্লাব। ব্রিটিশ চা বাগান মালিক এবং তাঁদের গৃহিণীরা সন্ধেবেলা জমায়েত হতেন আমোদ-প্রমোদ করতে। বহু নামজাদা ব্যবসায়ী এবং বিশিষ্ট মানুষেরা এখানে পা রেখেছেন, রাত্রিযাপন করেছেন। ১৯২৪ সালে এখান থেকেই এভারেস্টের দিকে যাত্রা শুরু করেন আর্ভিন এবং  ম্যালোরি। তাঁরা আর ফিরে আসেননি।

প্ল্যান্টার্স ক্লাব 

সামনে পড়বে ল্যাডেন-লা রোড। সেখানে রয়েছে দার্জিলিং পুরসভা ভবন। সামনের অংশে বিশাল ঘড়িমিনার। প্রত্যেক ঘণ্টায় সুরেলা বাদ্যযন্ত্র এবং তারপর ডিংডং আওয়াজ মুগ্ধ করে সবাইকে। ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন দার্জিলিং হেড পোস্ট অফিস, স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া ভবন এবং আরও অনেক কিছু। 

কেভেন্টার’স 

নেহরু রোডে চোখে পড়বে দু’টি শতাব্দী প্রাচীন রেস্তরাঁ। দু’টিরই যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। ঘুমে এডোয়ার্ড কেভেন্টার প্রতিষ্ঠিত ডেয়ারি ফার্মের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে কেভেন্টার’স রেস্তরাঁ। গরুর দুধ এবং শূকরজাত নানা সামগ্রীর জন্য বিখ্যাত ছিল ফার্মটি। রেস্তরাঁয় চেখে দেখতে পারেন লোভনীয় বেকন, সসেজ এবং মিটলোফ। যেতে পারেন গ্লেনারি’স -এ।  এটি গড়ে তোলেন প্লিভা নামের এক অস্ট্রিয়ান। এক তলায় ঐতিহ্যবাহী বেকারি এবং চা পানের ঘর। ওপরে মাল্টি-ক্যুইজিন রেস্তরাঁ। সম্প্রতি বেসমেন্টে চালু হয়েছে ‘দ্য বাজ’ নামের বার এবং ডিস্কো।

গ্লেনারি’স 

দার্জিলিংয়ের সবথেকে পুরোনো স্টুডিওগুলোর একটি দাস স্টুডিও। দেখতে পাবেন ম্যালে যাওয়ার পথে। ম্যালে রয়েছে বেশ কিছু পুরোনো দোকান। যেমন আলাদা রকমের কিউরিও এবং গয়নার জন্য প্রসিদ্ধ হাবিব মল্লিক অ্যান্ড সন্স।

দাস স্টুডিও 

তারপর এগিয়ে যাবেন অবজার্ভেটরি হিল এবং মহাকাল মন্দিরের দিকে। পাহাড়ের ওপর থেকে দেখবেন, দূরে হাতছানি দিচ্ছে একের পর এক পর্বতশৃঙ্গ এবং উপত্যকা। গোটা অঞ্চলের সবথেকে পুরোনো শিবের মন্দির রয়েছে এখানে। লোকে বলে, মহাদেব নিজেই মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছিলেন ১৮ শতক নাগাদ। পাশেই একটি বৌদ্ধ মঠ ছিল। যা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর নিচের ভুটিয়া বস্তিতে আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে।

মহাকাল মন্দির 

ম্যাল রোড দিয়ে যেতে যেতে পৌঁছবেন সেন্ট অ্যান্ড্রু’স গির্জায়। পুরোনো এই অ্যাংলিকান চার্চ গড়ে উঠেছিল ১৮৪৩ সালে। এই রাস্তার আরেক আকর্ষণ ১৯০৯ সালে তৈরি হওয়া দার্জিলিং জিমখানা ক্লাব। একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় মানুষদের স্বাস্থ্যগঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে। খেলার নানা সরঞ্জাম ছাড়াও এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ এক লাইব্রেরি। আর রয়েছে ভ্রমণার্থীদের জন্য থাকার বন্দোবস্ত। গভর্নর’স হাউজের আঁকাবাঁকা পথে হাঁটতে পারেন। গ্রীষ্মকালে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল এখানেই থাকেন। 

সেন্ট অ্যান্ড্রু’স গির্জা 

নিচের দিকে হাঁটলেই চলে যাবেন লোয়ার বাজার অঞ্চলে। পাশেই জামা মসজিদ। গড়ে উঠেছিল ১৮৫০ সালে। ১৯১০ সালে আবার পুনর্নিমাণ করা হয়। পাশাপাশি রয়েছে ওল্ড সুপারমার্কেট এবং প্রাচীন সুপারমার্কেট। এরপর যাবেন জাজ বাজার, সেন্ট কলম্বাস গির্জা এবং দার্জিলিং রেলওয়ে স্টেশন। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের শেষ টয় ট্রেন স্টেশন সেটি।    

দার্জিলিং রেলওয়ে স্টেশন 

সারাদিনের হেরিটেজ ওয়াক 

সারাদিনের হেরিটেজ ওয়াকে অংশ নিলে অর্ধেক দিনের ডেস্টিনেশনগুলি যেমন দেখবেন, সঙ্গে থাকবে আরও গন্তব্য: 

এসপির বাংলো এক পুরোনো হেরিটেজ ভবন। দার্জিলিংয়ের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট এখানে থাকেন। জাকির হোসেন রোড দিয়ে ওপরে উঠলে দেখা যাবে। পাহাড়ের দারুণ ভিউ পাওয়া যায় এখান থেকে। 

হুকার রোডের নামকরণ হয়েছে বিখ্যাত ইংরেজ উদ্ভিদবিদ, জীবনীকার এবং পর্যটক স্যার জোসেফ ডালটন হুকারের নামে। লেবং রোডের কাছে দার্জিলিংয়ের এই অংশে তিনি বসবাস করতেন। তাঁর লেখা এক গবেষণাধর্মী বইয়ের নাম ‘ফ্লোরা অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’। 

হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং  ইনস্টিটিউট এবং দার্জিলিং চিড়িয়াখানা

একই কমপ্লেক্সে রয়েছে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (এইচএমআই) এবং দার্জিলিং চিড়িয়াখানা। তেনজিং নোরগে এভারেস্ট জয় করার পর তাঁর সম্মানে এইচএমআই গড়ে ওঠে। পর্বতারোহণ শেখার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান এটি। সারা বিশ্ব থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসেন। চিড়িয়াখানায় দেখতে পাবেন হিমালয়ের নানা জীবজন্তু।

নর্থ পয়েন্ট স্কুল 

লেবং কার্ট রোডে ১৮৯০ সালে নর্থ পয়েন্ট স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। দেশবিদেশ থেকে পড়ুয়ারা এখানে পড়তে আসেন। 

ইংরেজ সাহেবরা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন লেবং রোডের পুরোনো কবরখানায়। এখানেই শায়িত দার্জিলিংয়ের আবিষ্কর্তা হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জর্জ ডাব্লিউ অ্যালমার লয়েড।    
 

Developed by DXDasia