বাঙালির মাউন্টেনিয়ারিংয়ের অ-আ-ক-খ
চৌরিখাং-এর থেকে কিছুটা দূরে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের অস্থায়ী এডভ্যান্স বেসক্যাম্প। দূরে দেখা যাচ্ছে মাউন্ট ফ্রে
বাঙালির ট্রেকিং, হাইকিং, রক ক্লাইম্বিং, মাউন্টেনিয়ারিং – এসবের প্রসঙ্গ উঠলেই মনে পড়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস। পুরুলিয়ার পাখি পাহাড়ে প্রথম রক ক্লাইম্বিং কোর্সের স্মৃতি। সেই প্রথম অন্যরকম পাহাড় ভ্রমণ। আবার পাঠশালাও বটে। সকাল সকাল খান পাঁচেক কড়াইশুঁটির কচুরি খেয়ে তৃপ্তির আমেজ নিয়ে বসে ছাত্ররা। ঠিক সেই সময়েই ক্যাম্পের হেডস্যার ঘোষণা করলেন, পাহাড় চূড়োয় চড়তে হবে। চড়াইয়েই শেষ নয়। চড়ার পর সেখানেই হবে ছাত্রদের পরীক্ষা! ছাত্রদের বয়স চোদ্দ থেকে শুরু করে পঁয়তাল্লিশ বছর। কিশোর-কিশোরী থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকেই পাহাড়ে নবাগত। কেউ এসেছেন নতুন কিছু শিখতে, জানতে। কাউকে আনা হয়েছে ভুল বুঝিয়ে চারদিনের পিকনিক বলে। শেষমেষ, সব নবাগতই চড়লেন পাহাড়। তাদেরই মধ্যে কিছু মানুষ নিজের মনের ছোট্ট একটি অংশ রেখে এলেন পাহাড়ের উপর। যা তাদেরকে টেনে আনবে এই পাথরগুলির কাছে বারংবার। এই নবাগতদের মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আগামীদিনের খ্যাতনামা পর্বতারোহী, এক্সপ্লোরার। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে উঠে আমিও ভেবেছিলাম প্রথমবার। ধুর! কোনো মানে হয়! এর থেকে বাপু বাড়িতে ঢের সুখে ছিলাম। কিন্তু, তারপর চেয়ে দেখলাম সুদূর দিগন্তের দিকে। শীতের রোদে অযোধ্যা রেঞ্জের বিভিন্ন পাহাড় দেখতে দেখতে নিমেষে সব কষ্ট মিটে গেল। কোর্স শেষে নিঃশব্দে বললাম নিজেকেই, ফিরব… ফিরে আসতেই হবে আমায়। (বাঙালির ট্রেকিং)
পুরুলিয়ার অযোধ্যায় রক ক্লাইম্বিংয়ের হাতেখড়ি
ছাত্রদের বয়স চোদ্দ থেকে শুরু করে পঁয়তাল্লিশ বছর। কিশোর-কিশোরী থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকেই পাহাড়ে নবাগত। কেউ এসেছেন নতুন কিছু শিখতে, জানতে। কাউকে আনা হয়েছে ভুল বুঝিয়ে চারদিনের পিকনিক বলে। শেষমেষ, সব নবাগতই চড়লেন পাহাড়।
‘ইয়ে জওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’-র আগে, ভারতবর্ষে প্রথম ডিক্যাথলন খোলার আগে, আজকের দিনের ট্র্যাভেল ভ্লগিং-এর আগে থেকে বাঙালির পর্বত অভিযানের হাতেখড়ি হতো এভাবেই। সেই সময় ইনস্টাগ্রাম রিলের দৌলতে অন্যরকম পাহাড় বেড়ানো খুব বেশি পরিচিত নয়। বিভিন্ন খ্যাতনামা পাহাড়প্রেমী ও পর্বতারোহী প্রতিষ্ঠিত শতাধিক ক্লাব রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই ক্লাবগুলির শীতকালীন ক্যাম্পেই এক অন্যরকমের পাহাড় যাত্রার সঙ্গে পরিচয় অধিকাংশ বাঙালির। ক্লাবের সদস্যরা প্রত্যেকেই নানাবিধ জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ঠিক পুজোর পরে শুরু হয় প্রচার। কুনকে হাতি হয়ে, কেউ নিজের কর্মক্ষেত্র থেকে ধরে আনেন কয়েকজন সহকর্মী। শিক্ষকরা সঙ্গে করে আনেন একগুচ্ছ নতুন মুখ। আবার, কেউ নিজের প্রচেষ্টাতেই খুঁজে পান তাঁর বন্ধুর ছোটপিসেমশাই কিংবা মেজোমামার পরিচিত এক বন্ধুকে, যিনি ‘পাহাড়ে যান।’ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে অস্থায়ী তাঁবু লাগিয়ে চারদিনের ক্যাম্পগুলি অনুষ্ঠিত হয় ফিবছর। সেখানে গিয়েই পরিচয় হয় রক ক্লাইম্বিং, ট্রেকিং ও সর্বোপরি মাউন্টেনিয়ারিং বা পর্বতারোহণের সঙ্গে। তারপর পাহাড় চূড়ায় নিজের মনকে ফেলে আসা মানুষগুলি কোনও একটি শাখাকে অথবা সবগুলিকেই আপন করে নেন। (বাঙালির ট্রেকিং)
ক্যাসপার ডেভিড ফ্রিডারিখের 'ওয়ান্ডারার অ্যাবোভ দ্য সি অফ ফগ'
রক ক্লাইম্বিং বা শৈলারোহণ আজকের দিনে একটি জনপ্রিয় স্পোর্টস। ২০২০ সালে খেলাটি অলিম্পিকের অংশ হয়েছে। শহরের বুকেই ‘আর্টিফিসিয়াল ওয়াল’ তৈরি করে অভ্যাস চালিয়ে যান অনেকে। শীতের মরশুম এলেই সেফটি ইকুইপমেন্ট সম্বল করে পাড়ি দেওয়া বাঁকুড়া, পুরুলিয়া। কেউ রাজ্য অথবা জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। আবার কেউ এমনিই অবসর বিনোদনের অছিলায় ক্রিকেট ফুটবলের মতোই ক্লাইম্বিংকে বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে আছে হাইকিং, ট্রেকিং ও মাউন্টেনিয়ারিং। এগুলিকে স্পেক্ট্রামের মতো দেখাই ভাল। একদিনে হেঁটে পৌঁছানো কোনও পাহাড়ি গন্তব্য থেকে শুরু করে কোনও হিমবাহের দৈত্যাকৃতি আইসফলকে পাশ কাটিয়ে ৮০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার কোনও শৃঙ্গে আরোহণ সবই আছে একটি স্পেক্ট্রামে। রক ক্লাইম্বিং ও পর্বত অভিযানে সময়, অর্থ ও শারীরিক-মানসিক সামর্থ্য প্রয়োজন হয় অনেকটাই। সঙ্গে থাকে যমরাজের অহরহ হাতছানি। তাই, পাহাড়প্রেমী বাঙালির একটি অংশ শখের রক ক্লাইম্বিং ও ট্রেকিং নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। নিজের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী বাড়ির কাছে সান্দাকফু অথবা দুর্গম কোনও পাহাড়ি গিরিপথে ট্রেক করেন। কোনও ব্যক্তির অর্থ ও সময়ের ঘাটতি না থাকলে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও শেরপার কাঁধে ভর করে ‘জয়’ করে আসেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। আর হাতে গোনা কিছু বাঙালি ব্যক্তি আছেন। যাঁরা কোনও রকম বিপদের তোয়াক্কা করেন না। আজও পাড়ি দিচ্ছেন বিভিন্ন গিরিপথ ও শৃঙ্গের উদ্দেশ্যে, যেখানে তাঁর আগে কারও পায়ের ছাপ পড়েনি কোনোদিন। (বাঙালির ট্রেকিং)
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে অস্থায়ী তাঁবু লাগিয়ে চারদিনের ক্যাম্পগুলি অনুষ্ঠিত হয় ফিবছর। সেখানে গিয়েই পরিচয় হয় রক ক্লাইম্বিং, ট্রেকিং ও সর্বোপরি মাউন্টেনিয়ারিং বা পর্বতারোহণের সঙ্গে।
ফালুট থেকে নেমে আসার পথে। মাঝে কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফ ও ডান পাশে মাউন্ট পান্ডিম
বাঙালির পাহাড় এডভেঞ্চারের একটা ছোট্ট নকসা আপাতত তৈরি করা গেল। কিন্তু অর্থ ব্যয় করে শারীরিক পরিশ্রম করতে কেন যায় মানুষ? কেন নেয় জীবনের ঝুঁকি? আজ থেকে একশো বছর আগে ব্রিটিশ তরুণ জর্জ ম্যালোরি প্রশ্নটির উত্তর দিয়েছিলেন, ‘Because it’s there’। তাঁর লক্ষ্য তখন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া। সফল হয়েছিলেন কিনা জানা যাবে না কোনোদিন। ১৯৯৯ সালে তাঁর দেহ আবিষ্কৃত হয় এভারেস্টের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে সাতশো মিটার নিচে। এ কী এমন পাগল করা নেশা, যাতে জীবনের মায়াটুকু ত্যাগ করে ফেলে একজন মানুষ! প্রায় প্রত্যেক বছরেই কোনও না কোনও দুর্গম পাহাড়ি অভিযানে প্রাণ হারান কিছু এডভেঞ্চারপ্রেমী। ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত পথগুলির বাইরে অতিপরিচিত পথেও কখন কীভাবে বিপদ নেমে আসে বলা যায় না। একটি অস্থায়ী সাঁকোর উপর দিয়ে কয়েকশো মানুষ একদিনে পার হয়। একদিন জানা গেল, একজন পর্যটককে বাঁচাতে গিয়ে অভিজ্ঞ এক গাইড খরস্রোতা নদীর জলে ভেসে গিয়েছেন। অতিপরিচিত কোনও একটি পথে হঠাৎ এভল্যাঞ্চে চাপা পড়েছেন কিছু মনুষ। তারপর সেই বরফে চাপা পড়া পথকে এড়িয়ে নদীর অন্যপাড়ে নতুন পথ বানিয়ে মানুষের আনাগোনা চলতেই থাকে। শত বিপদেও পিছপা হয়না তারা। আসলে, শহুরে কোলাহল থেকে একটু শান্তি খোঁজে রোমান্টিক বাঙালি মন। এই শান্তি দার্জিলিঙের টাইগার হিলে মেটার নয়। ক্যাস্পারের ‘ওয়ান্ডারার অ্যাবোভ দ্য সি অফ ফগ’-এর মতো মেঘের উপর নিরালায় দাঁড়াতে চায় সে। দেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো তুষার শৃঙ্গের গায়ে সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্তের আভা। বসতে চায় কুলকুল শব্দে বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর ধারে। উপভোগ করতে চায় পিচরাস্তার দূষণ থেকে বহুদূরে এই নির্জন স্থানগুলি। আকাশকে প্রায় ঢেকে ফেলা সুবিশাল শৃঙ্গগুলির সামনে ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সত্যতা যাচাই করে নেয় অনেকে। দুই শতাব্দী আগের তীর্থযাত্রা হোক বা আধুনিক সময়ের ‘ট্রেকিং’, পাহাড় দর্শনের বিস্ময়বোধ এখনও একই আছে।
সত্সার ক্যাম্পসাইটে সন্ধ্যা নামছে। কাশ্মীর গ্রেট লেকস্ ট্রেক থেকে
আজকাল সারা ভারতজুড়েই বিকল্প পর্যটন সংস্থার বাড়বাড়ন্ত। সময় ও অর্থ থাকলেই কোনও এজেন্সির ঘাড়ে সমস্ত দায়িত্ব চাপিয়ে ঘুরে আসা যায়। এক্ষেত্রে বাঁকুড়া – পুরুলিয়ার শীতকালীন ক্যাম্পগুলিতে পাহাড় সংক্রান্ত প্রাথমিক শিক্ষা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সুরক্ষিত থাকার উপায় কিংবা ট্রেকের সিভিক সেন্স বিষয়ে যে পাঠ দেওয়া হতো, তা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে অনেক বাঙালি পর্যটকের ক্ষেত্রে। যাওয়ার আগে গন্তব্য সম্পর্কে বিশদে পড়াশোনা করার প্রবৃত্তিও কমে এসেছে। এবং সেই ফল ভোগ করতে হয় পর্যটকদের এবং পাহাড়কে। দলে এজেন্সির তরফ থেকে অভিজ্ঞ দলনেতা ও স্থানীয় গাইড থাকলেও ব্যক্তিগত সচেতনতার অভাবে বিভিন্ন কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন পর্যটকরা। সঠিক শারীরিক প্রস্তুতির অভাবে আহত হন অনেকেই। অন্যদিকে, দুর্গম স্থানগুলিতে মানুষের পদার্পণ বাড়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই স্থানের প্রকৃতি। নাগরিক বোধের চরম অভাবে জনপ্রিয় পাহাড়ি পথগুলি ছেয়ে যায় আবর্জনায়। বিভিন্ন রাজ্যের পাহাড়ি ট্রেইলগুলি থেকে প্রত্যেকে ট্রেক মরশুমের পরে কয়েক টন বর্জ্য প্লাস্টিক ও কাচ নামানো হয়।
রক ক্লাইম্বিং ও পর্বত অভিযানে সময়, অর্থ ও শারীরিক-মানসিক সামর্থ্য প্রয়োজন হয় অনেকটাই। সঙ্গে থাকে যমরাজের অহরহ হাতছানি। তাই, পাহাড়প্রেমী বাঙালির একটি অংশ শখের রক ক্লাইম্বিং ও ট্রেকিং নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন।
আনন্দের আলো
সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তে বাঙালির এই অন্যরকম পাহাড় বেড়ানো দিনে দিনে আরও বেড়েছে। গ্রীষ্মের পারদ প্রত্যেক বছর নতুন মাত্রা ছোঁয়ায় মূল ধারার পাহাড় পর্যটনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাইকিং ও ট্রেকিং। একটি ভালো দিক হিসেবে বলতেই হয়, এই অন্যধারার পর্যটন খুলে দিয়েছে নতুন একটি জীবিকার পথ। ভারতীয় সিভিলিয়ানদের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রক পঞ্চাশের দশক থেকেই পর্বতারোহণের কোর্স আয়োজন করে আসছে। এডভেঞ্চার পিপাসু কিছু যুবক-যুবতী সেই কোর্সগুলি করে ট্রেক ও এক্সপিডিশন আয়োজনকেই পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজন করেন। আবার অনেকে বড়ো কোনও সংস্থার হয়ে দলনেতার কাজ করেন। জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি মেটে পাহাড় দেখার তৃষ্ণা। গ্রীষ্ম, শরৎ ও কিছু ক্ষেত্রে শীত পাহাড়ে ট্রেকের মরশুম। জনপ্রিয় রুটগুলিতে জনসমাগম হয় চোখে পড়ার মতো। ট্রেক আয়োজনও হয় লাভজনক। কিন্তু, সেসব বাণিজ্যিক রুটগুলির বর্তমান অবস্থা প্রত্যক্ষ করার পর একজন পেশাদার দলনেতা স্বীকার করেই নেন, ‘রুটগুলোয় আনাড়ি লোকজন যত কম আসে ততই মঙ্গল।’ বাঙালির ভ্রমণ ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই বিকল্পধারার পাহাড় ভ্রমণ। এই ভ্রমণে মানুষের উৎসাহ বাড়ার ভালো-মন্দ দিক দুইই আছে। ভ্রমণের ঐতিহ্যকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বর্তমান প্রজন্মকে একটু বেশিই সচেতন হতে হবে। তবেই পাহাড় প্রকৃতি বাঁচবে। এবং বাঁচবে অন্যধারার পর্যটন।
_____________
ছবি: লেখক