নটিংহ্যামশায়ারের শেরউড ফরেস্টে রবিনহুডের আড্ডায়

রবিনহুডের স্মৃতি মাখা ইংল্যান্ডের এক রবিবাসরীয় ভ্রমণকাহিনি

বারই একটা সময় আসে যখন জীবনটা রমরমিয়ে চলে। বাংলার ডাকাতদেরও তেমন দিন ছিল। যখন বাঁশি ডাকাতিয়া ছিল, উতল হাওয়া এসে অঞ্চলে ডাকাতি করতো, ডাকাত সর্দারদের মধ্যেও একটা হিরো হিরো ভাব ছিল। চিঠি পাঠিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তবে আসতো, লুট করতে এসেও মহিলাদের মা জননী বলে সম্বোধন করতো, চাঁদা না তুলে কালীপুজো করতো আরও কত কী! এসব মনে রেখে, রঘু ডাকাতকে একটুও লঘু না করে বলছি, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে শেরউড বনের দস্যু রবিনহুড-এর গ্ল্যামারটাই আলাদা।

উত্তর আয়ারল্যান্ড থেকে ফেরার সময় গাড়ি নিয়ে জাহাজের ডেকে রেখে সমুদ্র পার হয়ে অন্য পাড়ে পৌঁছাতে দুপুর দেড়টা বেজে গেল। যদিও জাহাজে বসে লাঞ্চ সেরে নেওয়া হয়েছে, তবুও ফেরি ঘাট থেকে লন্ডনের বাড়ি পৌঁছাতে লাগবে আরও প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা। তাই ঠিক হলো কিছুটা পথ গিয়ে সেই রাতটা আমরা ইয়র্ক শহরে থাকবো আর শেরউড বনের রবিনহুডের আড্ডায় ঢুঁ মারবো।

নটিংহ্যামশায়ার

আগের থেকে একটা রাতের জন্য একটা বি অ্যান্ড বি-তে থাকার ব্যবস্থা হলো। নাম ওয়াটারগেট ইনন, ইয়র্ক সিটি সেন্টার থেকে আধ কিলোমিটার দূরে। এক রাতের জন্য ভারতীয় টাকায় সাড়ে আট হাজার টাকা দিতে হলো। বি অ্যান্ড বি মানে যদিও বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট, তবে চা কফি দুধ আর পাউরুটি রাখা থাকে প্রাতরাশটি নিজেদের বানাতে হয়। নিজেরা রান্না করে খেলে সস্তায় পুষ্টিকর। বাকিটা ফুল ফার্নিশড টুবিএইচকে ফ্ল্যাটের মতো। গাড়ি রাখার জায়গা ছিল। একটা বাক্সে চাবি রাখা ছিল। কোড মেল করে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বের হওয়ার সময় যেমনটা পেয়েছিলাম। তেমনটা রেখে বের হলাম।

শেরউডের জঙ্গল ইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় পৌনে দু-ঘণ্টার পথ, বরং নটিংহ্যামশায়ারের উত্তরে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটারের দূরত্বে। বনটা এখনও হাজার একর জুড়ে আছে। তবে শেরউড বন মধ্যযুগে প্রায় এক লক্ষ একর এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। নটিংহ্যামশায়ারের বেশ বড়ো অংশ জুড়ে ছিল এই বন। সে সময়ে ‘বন’ কথাটার একটা আইনগত সঙ্ঘা ছিল। বন কেবল রাজার গাছ কাটা আর শিকার করার জন্য। এখানে তখন লাল হরিণ, বন্য শুকর জাতীয় পশুরা ঘুরে বেড়াত। বনের পড়ে থাকা কাঠ ডালপালা দিয়ে সাধারণ মানুষ ঘর তৈরি করত, আগুন জ্বালাত আর প্রাণীদের খাবার জোগাড় করত। এছাড়া, এই এলাকায় চার্চের প্রচুর জমি ছিল। শেরউডের আইন ভাঙলে শাস্তিও খুব কঠিন, ক্ষেত্র বিশেষে ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারত। রবিনহুডের মতো মানুষেরা এই নিষ্ঠুর আইন আর রাজার অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাধারণ মানুষের চোখে নায়ক হয়ে উঠেছিলেন।

শেরউডের জঙ্গল ইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় পৌনে দু-ঘণ্টার পথ, বরং নটিংহ্যামশায়ারের উত্তরে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটারের দূরত্বে। বনটা এখনও হাজার একর জুড়ে আছে। তবে শেরউড বন মধ্যযুগে প্রায় এক লক্ষ একর এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। নটিংহ্যামশায়ারের বেশ বড়ো অংশ জুড়ে ছিল এই বন।

শেরউড বনের ওক গাছ

ছোটোবেলা থেকে রবিনহুডের বীরত্বের গল্প শুনে আমরাও সেই দস্যুকে হিরো জেনে এসেছি। আজ সেই রবিনহুডের আড্ডা শেরউড ফরেস্টে এসে যেন কৈশোরে ফিরে গেলাম। কিন্তু রবিনহুড কি সত্যিই ছিলেন? আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলেও সিদ্ধান্ত আপনাদের! রবিনহুডের পরিচয় নিয়ে দাবি অনেক, তবু সঠিক প্রমাণ আজও অধরা। রবিনহুড কি সত্যিই মধ্যযুগের একজন দস্যু ছিলেন, নাকি শুধুই গল্পের নায়ক? ১২৬১ সালে উইলিয়াম ডেফেভার নামে একজন ব্যক্তিকে অপরাধী বলে ঘোষণা করা হয়, আর এর বছর খানেক পর তাঁর নাম সরকারি খাতায় ‘উইলিয়াম রোবহুড’ বা ‘রবিনহুড’ বলে নথিভুক্ত হয়। এই ঘটনার তাৎপর্য হলো, তেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে রবিনহুড এতটাই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন যে অন্য অপরাধীদেরও তাঁর নামে ডাকা শুরু হয়। ওখানকার ভিজিটার সেন্টারটি যথেষ্ট ভালো। ইউকে-র প্রায় সব দর্শনীয় জায়গায় ভিজিটার সেন্টার থাকে। ভিজিটর সেন্টার  বলতে বোঝায় এমন এক তথ্যকেন্দ্র যেখানে ট্যুরিস্টরা খোঁজখবর নেওয়া আর গিফট কেনার সঙ্গে বিশ্রাম ও জলখাবার সেরে নিতে পারেন।

শেরউডের সবচেয়ে বিখ্যাত গাছ মেজর ওক, প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো বলে মনে করা হয়। শেরউড বনের সবচেয়ে পুরোনো গাছগুলো আজ সময়ের প্রকোপে ক্ষয়িষ্ণু। অনেকে বলেন, মেজর ওক ছিল রবিনহুডের আড্ডা। রবিন ও তার দল এখানে খেলাধুলা করত, তীরন্দাজির অনুশীলন করত এবং এর ছায়ার তলে ভোজ উৎসব করত।

ভিজিটার সেন্টার থেকে জঙ্গলের পথে তিন ভাবে সেই মেজর ওক গাছের কাছে যাওয়া যায়। আমরা সবচেয়ে সোজা পথটা বাছলাম। এর নাম মেজর ওক ট্রেইল, দূরত্ব দেড় মাইল, সময় লাগে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এই রাস্তা নানান মূর্তি আর গল্পে সাজানো।

শেরউডের জঙ্গল

কল্পনা করুন, আপনি সময়ের সরণি বেয়ে সাতশো বছর পিছিয়ে পড়েছেন। বসন্তকাল, আপনি একজন পয়সাওয়ালা ভদ্রলোক, ঘোড়ায় চেপে গ্রেট নর্থ রোড ধরে শেরউড বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ শুনলেন শিকারি শিঙার আওয়াজ। কোথা থেকে যেন একদল টুপি পরা লোক আপনাকে ঘিরে ধরলো। গায়ে তাদের বাদামি আর সবুজ পোশাক।

ওরা আপনাকে ওদের ভোজে নিমন্ত্রণ করলো। ওদের হাতে তলোয়ার, লাঠি, তীর-ধনুক। না বলার প্রশ্নই নেই। পরিবেশন করা হলো আগুনে সেঁকা খরগোশ বা হরিণের মাংস, যা অবশ্যই বন থেকে চুরি করা। রুটি, যেটা কোনো ময়দা মিলের দোস্ত এই গোপন আস্তানায় রেখে গেছে। কিন্তু খাওয়া শেষ হলে তারা বলে এবার খাবারের দাম চুকাতে হবে। আপনার যা আছে দিয়ে দিন দরিদ্র নারায়ণের সেবায় লাগবে। আপনাকে পুরো ভারমুক্ত করে ওরা বিদায় জানাবে, আর আপনাকে একটু কষ্ট করে নিজের পথ নিজেই খুঁজে বনের বাইরে বের হতে হবে। 

এখন সেই মেজর ওক গাছটিকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা হচ্ছে। এককালে এই বনে নাকি এক হাজার ওক গাছ ছিল। সে সব অতীত। কিছু পুরোনো ওক গাছ এখনও আছে। তাদের যত্নও চলছে।

নের্সবরো ভায়াডাক্ট, ইংল্যান্ডের নর্থ ইয়র্কশায়ারের একটি ল্যান্ডমার্ক সেতু

রবিনহুডের সঙ্গে শেরউড বনে থাকতেন তাঁর কিছু অদ্ভুত সাহসী বন্ধু, যাদেরকে বলা হতো মেরি ব্যান্ড। তাদের মধ্যে ছিলেন লিটল জন। নাম লিটল হলেও শক্তিশালী, বুদ্ধিমান, প্রায় সাত ফুট লম্বা। উইল স্কারলেট বা মাস্টার উইল স্কারলেট ছিলেন চতুর এবং সবসময় সাহায্যের জন্য প্রস্তুত, তিনি লাল পোশাক পরতেন। মাচ দ্য মিলারস সন আকারে ছোটো কিন্তু চতুর আর শক্তিশালী। অ্যালান-এ-ডেল একটু অন্য রকম। সাহসী, শখের গায়ক। প্রায়শই গুপ্তচর হয়ে শত্রুদের ঠকাতেন। ফ্রায়ার টাক ছিলেন হাসিখুশি কিন্তু চতুর। খানা পিনার আসরে সবসময় আগে। মেইড মেরিয়ান ছিলেন ব্যান্ডের সাহসী নারী চরিত্র। তাঁর সঙ্গে রবিনের প্রথাগত ভাবে বিয়ে হয়েছিল। মেরি ব্যান্ডের প্রতিটি সদস্যই রবিনের আদর্শের সহযোদ্ধা ছিলেন। সেই আদর্শই তো এক দস্যুকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

নটিংহ্যামশায়ারের শেরিফ রবিনহুডের সবচেয়ে প্রবল শত্রু। বাস্তবে, তাঁর চরিত্র নটিংহ্যামশায়ার, ডার্বিশায়ার আর সরকারি অরণ্যের প্রধান শেরিফদের মিলিয়ে বানানো। অনেকে কিন্তু ফিলিপ মার্ককেই শেরিফ বলে মানেন। কারণ উনি রাজা জনের শাসনকালে (১১৯৯-১২১৬) শেরিফ ছিলেন। শেরিফ সবসময়ই রবিনের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করতেন আর ধনী অত্যাচারীদের পক্ষ নিতেন। রবিনের আরেক শত্রু ছিলেন প্রিন্স জন, সম্ভবত তিনি ইংল্যান্ডের রাজা জন। যুদ্ধ, বিদ্রোহ ও নিয়ন্ত্রণহীন সময়ে তার নিষ্ঠুরতা ও স্বার্থপরতার জন্য তিনি কুখ্যাত ছিলেন।

ভিজিটার সেন্টার থেকে জঙ্গলের পথে তিন ভাবে সেই মেজর ওক গাছের কাছে যাওয়া যায়। আমরা সবচেয়ে সোজা পথটা বাছলাম। এর নাম মেজর ওক ট্রেইল, দূরত্ব দেড় মাইল, সময় লাগে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

হাজার বছরের পুরোনো পাব

সার গাই অফ গিসবর্ন ছিলেন একজন হত্যাকারী আর রবিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। স্থানীয় লোকগাথা বলে তিনি মেইড মেরিয়ানের পানিপ্রার্থী ছিলেন। রবিনের শত্রুদের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। লেডি গিসবর্ন, কির্কলিস প্রায়োরেস এমন অনেকে। এই শত্রুরা কিন্তু শেষে মেরি ব্যান্ডের কাছে হার মেনে ছিল।

শেরউড বনে তখন আলো কমে এসেছে, এবার লন্ডনে ফেরার কথা। কিন্তু সিদ্ধান্ত হলো হিরোকে তো দেখলাম এবার ভিলেনের বাসাও দেখে আসি। নটিংহ্যামশায়ার কাসেলের সামনেও রবিনহুডের কাহিনি অনুযায়ী কিছু দৃশ্য  মূর্ত আছে। রবিনহুডের মূর্তির সামনে গাড়ি রেখে আমরা সিটি সেন্টারটা ঘুরে নিলাম। এই কেল্লা একসময় উইলিয়াম দ্য কনকারার বানিয়ে ছিলেন। এই কেল্লার পাথর চার লক্ষ বছরেরও বেশি পুরোনো। পাথরের নাম  নটিংহ্যাম স্যান্ডস্টোন, পাথর নরম বলে গুহা এবং টানেল খোঁড়ার জন্য উপযুক্ত। নটিংহ্যামের গুহাগুলো ঘোড়াশালা, চামড়া ট্যানিং, বিয়ার সংরক্ষণ, এমনকী থাকার জন্য ব্যবহার হয়েছে।

শেরউডের জঙ্গলে লেখক

এই গুহার একদম গায়ে লাগানো ‘ইয়ে ওলডে ট্রিপ টু জেরুজালেম’, এক আশ্চর্য সরাইখানা। সরাইটি ১১৮৯ সালে তৈরি, ইংল্যান্ডের প্রাচীনতম চালু সরাইখানা। রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের (আগেকার দিনের রাজাদের নামের সঙ্গে এমন বিশেষণ যুক্ত হতো) ক্রুসেডাররা নাকি জেরুজালেমের ক্রুসেডে যাওয়ার আগে এখানে মিলিত হয়েছিলেন। ভূতুড়ে গল্পের ভাণ্ডার হয়ে পাবটি কাসল রকের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতর দিয়ে বেশ কিছু গুহার সঙ্গে এর যোগ আছে, যা এখন সেলার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রবিবারের রাতে জমজমাট ভিড়। আমরা এক প্রায় গুহায় বসলাম। এখানকার খাওয়ার গ্রিন কিং-এর সুনাম রেখেছে। আমাদের এবারের ট্রিপটা দিব্য মধুরেন হলো।

________ 
ছবি: লেখক

Developed by DXDasia