বেতলা, পালামৌ, নেতারহাট : বাঙালির পশ্চিমে যাত্রার সেকাল-একাল

“অরণ্যের দিনরাত্রি” মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭০ সালে। আমার মত অনেকেই সেই ছবি দেখেছেন দূরদর্শনের ছোটো পর্দায়। সুতরাং গত বছরের মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যখন দেখানো হয়েছিল ছবিটির ঝকঝকে ডিজিটাল প্রিন্ট, তখন থেকেই বড়ো পর্দায় ছবিটি দেখবার বাসনা চাগিয়ে উঠেছিল। অগাস্ট মাসে, আমরা চার মক্কেল যখন পশ্চিমে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম নভেম্বরে – তখনও জানতাম না “অরণ্যের দিনরাত্রি”–র কলকাতায় রি-রিলিজের খবর এবং সেটা নভেম্বরেই। ব্যাপারটা নেহাতই কাকতালীয়! সুতরাং বেতলা, পালামৌ, নেতারহাট সফরের মৌতাতকে আরও খানিক বাড়িয়ে, “শেষ হইয়া হইল না শেষ”–র তকমা লাগানোর দায় যে একশ’ পনের মিনিটের সাদা-কালোয় “অরণ্যের দিনরাত্রি“–র, এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ!

সত্তরের দশকে চার শহুরে যুবক – সঞ্জয়, অসীম, শেখর আর হরি, পাড়ি জমিয়েছিল কলকাতা থেকে গাড়ি চেপে – শাল, সেগুন, মহুয়া, কেন্দুর জঙ্গুলে অবস্থিতির মাঝে। আমরা আজ চলেছি ঝাঁ চকচকে রাস্তা পেরিয়ে।

যাত্রা শুরু হয়েছিল ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেসে। পরের দিন ভোরে রাঁচি পৌঁছে, বেরিয়ে পড়া গেল বেতলার উদ্দেশ্যে। গত শতকের চারের দশকে সঞ্জীব চাটুজ্জে রানীগঞ্জ থেকে বরাকর নদী পেরিয়ে, হাজারিবাগ হয়ে পালামৌ পৌঁছেছিলেন এক দীর্ঘ যাত্রার শেষে। সত্তরের দশকে চার শহুরে যুবক – সঞ্জয়, অসীম, শেখর আর হরি, পাড়ি জমিয়েছিল কলকাতা থেকে গাড়ি চেপে – শাল, সেগুন, মহুয়া, কেন্দুর জঙ্গুলে অবস্থিতির মাঝে। আমরা আজ চলেছি ঝাঁ চকচকে রাস্তা পেরিয়ে। বেতলা ন্যাশানাল পার্কের তিনতলা সমান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম স্টেটসম্যান পত্রিকার পাতায় আগুন ধরিয়ে শেখর যে সভ্যতার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কের ইতি টেনেছিল সাড়ে পাঁচ দশক আগে, সেই সভ্যতাই আসলে সময়ের অতিবাহনে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধেছে পশ্চিমের সেই ছোটো জনপদকে। ছোটনাগপুর মালভূমির জঙ্গল, টিলা, ঝর্ণা, নদী আর রুক্ষ প্রান্তরের মাঝখানে উজ্জ্বল আলো অরণ্যের রাত্রিকে দিন বানিয়ে খুলে দিয়েছে তার ঘোমটার আড়ালে পড়ে থাকা রহস্যাবৃত চেহারাকে।

বেতলায় রাত্তিরের বাস ট্রি-হাউসে। না, গাছের টঙ্গে বাঁধা কোন টুঙ্গি বসত নয়। কংক্রিট গেঁথে তোলা বেরসিক সার সার বাড়ি, সোপান পেরিয়ে পৌঁছতে হয় সেখানে। পিছনে দোতালার বারান্দা থেকে দেখা যায় সবুজ প্রান্তর, যেখানে হরিণের দল মাঝে মধ্যেই এসে খানিক গেস্ট এপিয়ারেন্স দিয়ে হুট করে পালিয়ে যায়। বেতলায় আসবার পথে পেরিয়ে এসেছিলাম কেচকি সঙ্গমমুখী রাস্তাটা, যার শেষে দাঁড়িয়ে আছে সেই বন বাংলো –পিছনে উন্মুক্ত প্রান্তরে কোয়েল আর আউরাঙ্গা নদীর সঙ্গম। বাংলোর গেটের পাশেই একটা ইঁদারা আর তার পাশেই লম্বা গাছের গুঁড়ির ঘিরনী, যার গলায় বালতি বেঁধে জল তোলা যায় ইঁদারা থেকে। যেখানে খানিক আগেই কলকাতা থেকে এসে পৌঁছেছে ওরা চারজন। নিয়মের তোয়াক্কা না করে, চৌকিদারের হাতে টাকা গুঁজে, অনধিকার প্রবেশ ঘটেছে তাদের এই বাংলোয়। সেদিক থেকে আমরা সজ্জন! নিয়ম ভাঙার পথে না হেঁটে, সরকারি কাগজ ট্যাঁকে গুঁজে এসেছি। কেয়ারটেকার গোবিন্দরাম দেখি একখানা দেড় হাতি আখ বগলদাবা করে চলা ফেরা করছে। প্রথমে বুঝিনি পরে খোলসা করতে বোঝা গেল -“বান্দর বহুত তংগ করতা হ্যাঁয়, খানা ছিন লেতা হ্যাঁয়”! তাই বল, ঐ ইক্ষুদণ্ড আসলে বানরের হাত থেকে পরিত্রাণের অস্ত্র! চা আনতে বলায় সে বলল “বিশ টাকা জাদা লাগেগা, রুম সারভিস”! বোঝা গেল এই শাখামৃগ সম্বৃত পথ পেরুনোর পাড়ানি আলাদা করেই গুণে দিতে হবে।

দুপুরে এক পেট খিদে নিয়ে ক্যান্টিনে বসতেই রাম মাহাতো রসুই থেকে গরম ডাল, ভাত, আলু ভাজা আর ঘিয়ের কটোৱা নিয়ে উপস্থিত। প্রথম পাতের খাবার শেষ না হতেই ঢাকা দেওয়া একটা মাটির হাঁড়ি এল। ঢাকনা সরাতেই মন আকুলি বিকুলি করে ওঠে। অদ্ভুত গন্ধ আর স্বাদ নিয়ে কচি পাঁঠার ঝোলের আত্মপ্রকাশ! এ আমাদের কলকাত্তাইয়া রান্নার স্বাদ থেকে অনেক আলাদা। সঞ্জীব চাটুজ্জে-বর্ণিত “সঘৃত আতপান্ন আর দেবীদুর্লভ ছাগমাংস” না হলেও কলকাতায় আজকাল যে “চম্পারন মাটন”-এর মাতন লেগেছে, তার সঙ্গে খানিক মিল।

“এসব জায়গায় এলে আয়ু বেড়ে যায়” সঞ্জয়ের সংলাপ মনে পড়ল। পশ্চিমের জল হাওয়ায় স্বাস্থ্যদ্ধারের ব্যাপারে তো আজ থেকে নয়, বহু যুগ ধরে বাঙালি মেতে আছে। হাওয়াবদলের অন্যতম প্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছিল পালামৌ, নেতারহাট, হাজারিবাগ, মধুপুর, গিরিডি, ম্যাক্লাস্কিগঞ্জ। কিন্তু সভ্যতার জালে জড়িয়ে মাটির জল এখন মিনারেল ওয়াটারের বোতলে ঢুকে পড়েছে!! ওতেই শান্তি।

এবার জঙ্গল সফর। এ ধরনের সফর মাত্রই এক ধরনের উত্তেজনা, উন্মাদনা। ক্যামেরার দৃষ্টিপথ ধরেই তখন অদৃষ্ট পূর্বের খোঁজ। ড্রাইভার আনসারি ভালোই বাংলা বলে। কয়েকটা বন মুরগি, ময়ূর, বারকিং ডিয়ার দেখিয়ে যখন বুঝেছে আমাদের মন পাওয়া দায়, তখন সে জুড়েছে হাতি, বাইসনের কাহিনি। এর মধ্যেই আমাদের মধ্যে কে আবার ছুঁড়ে দিল এক লালমোহন গাঙ্গুলি মার্কা প্রশ্ন “ইয়ে জঙ্গল মে শের হ্যাঁয় ইয়া নেহি হ্যাঁয়”? যাত্রার উত্তেজনাকে ধরে রাখতে আনসারি বলল কয়েকমাস আগেই নাকি জঙ্গলে এক বাঘ বাবাজির দেখা পাওয়া গেছে, যদিও বনবিভাগের তথ্য বলে পঞ্চাশের দশকে পালামৌয়ের জঙ্গলে প্রচুর বাঘ থাকলেও আজ তারা নিশ্চিহ্ন। শোনা যায়, পালামৌয়ের বাঘ ছিটকে বেরিয়ে আসত কেচকি গ্রামের এলাকাতে। বাংলোর বারান্দায় শিকল দিয়ে কুকুর বাঁধা থাকত। বাঘ এসেছে বুঝলেই তারা পরিত্রাহি চিৎকার করত, লোকে সতর্ক হয়ে যেত। আজ সে সব ইতিহাস।

বিশাল বিশাল গাছের পিছনে সূর্য অস্তমিত। কমলা রঙে পুড়ে যাচ্ছে পশ্চিমের আকাশ, তার মাঝখানে লেপটে আছে চাঁদ – আজ পূর্ণিমা। আনসারি আধো অন্ধকারে কতগুলো গাছ দেখিয়ে বলে “স্যার বলেন তো কি গাছ এগুলো”? তারপরে নিজেই উত্তর দেয়, “মহুয়া, চেনেন না স্যার? গরমকালে মহুয়ার গন্ধে জঙ্গল ভরে যায়”।

আমাদের ফিরতে ছ’টা বেজে গেল। আকাশ জুড়ে তখন ফুটফুটে জ্যোৎস্না। বারান্দার এদিকে ইলেকট্রিক বাতি নেই, মিশকালো প্রান্তরের মাঝে দীপ্তমান জোড়া চোখের গতিময়তা বুঝিয়ে দেয় বন্য প্রাণীর উপস্থিতি। হাতের পানপাত্রে তখন সোনালি ঝলকানি, বুকের মাঝে আগুন – কে যেন কানের পাশে ফিস ফিস করে বলে “দে না বাবু, আধা পাউয়া”!

নিচে নেমেই জঙ্গল ভেঙে আমরা এগুলাম পিছনের ভাঙা গেটটার দিকে। কয়েক হপ্তা আগেও বৃষ্টি পড়েছে যার ফলে গাছের লম্বা ডাল, পাতা আর পায়ের নিচে ঘন ঘাস খানিক অস্বস্তির কারণ। কিন্তু বাঙালির অ্যাডভেঞ্চার এসব থোড়াই কেয়ার করে।

সনু বেতলায় নামা ইস্তক আমাদের পিছু নিয়েছিল, উদ্দেশ্য দু’পয়সা কামানো, যেরকম টুরিস্ট স্পটে দেখা যায়। জঙ্গলের অপরদিকে দু-একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। ফিরে দেখি সে তখনও দাঁড়িয়ে আমাদের অপেক্ষায়। ভারী মায়া হল। কিছু না হোক সকালের হাওয়ায় তো একটা মনোরম লং ড্রাইভ হবে। কিন্তু পরের দিন ভোর পৌনে ছ’টায়, কুয়াশামাখা হাইওয়ে পেরিয়ে যখন জঙ্গলের মাঝে মেঠো রাস্তায় আমাদের গাড়িটা ঢুকে খানিকক্ষণের মধ্যেই এসে দাঁড়াল এক বিশাল ঝিলের সামনে, মনে হল এখানে এসে বুঝি সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। মোলায়েম আলোয় কমলাদহের কালো জলের উপরে তখন কুয়াশার ঝালর নেমেছে। ঠাণ্ডা হাওয়ার কাছে এসে জলের উষ্ণতা কমে, বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। কত রকমের পাখির ডাক। জীরহুল, মনরঙ্গলী, ফুলদাওয়াই এরকম সব জঙ্গুলে ফুলেরমিষ্টি গন্ধ। জলের পাশেই সদ্য হেঁটে যাওয়া হাতির পায়ের ছাপ। ওয়াচ টাওয়ার থেকে সনু দেখাল দীঘির ওপারে আরেক ওয়াচ টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষ, দামাল হাতির কম্ম, ওদের চলার পথে বাঁধা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে।

পালামৌ দুর্গের অবস্থান আউরাঙ্গা নদীর তীরে। একটা সময় চের আদিবাসীদের শাসন ছিল পালামৌ এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে। চের বংশের রাজা মেদিনী এবং তাঁর ছেলে প্রতাপ রাই গড়ে তুলেছিলেন যথাক্রমে পুরনো ও নতুন দুর্গ। জঙ্গলের মাঝে প্রায় চারশো বছরের ইতিহাস বুকে করে দাঁড়িয়ে দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। চুন–সুড়কির প্রলেপে ইট আরপাথর জুড়ে তৈরি হয়েছে বিশাল ইমারত; চল্লিশ ফুট উঁচু আর পনের ফুট চওড়া কেল্লায় ঢোকার সদর গেটের উপরে আর্চের পাশ ঘিরে রঙিন পাথরের কাজ। কেল্লার ভিতরে নিজেদের পায়ের শব্দ আর পায়রা ওড়ার আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সরু, অন্ধকার  দেড়হাতি সিঁড়ি বেয়ে আমরা কেল্লার ওপরে উঠে এসেছি। চারদিকে ঘন অরণ্য। দেড় মিটার চওড়া কেল্লার প্রাচীরে এখনও আগাছার আড়ালে কামানের গোলার দাগ স্পষ্ট। নিচে নেমেই জঙ্গল ভেঙে আমরা এগুলাম পিছনের ভাঙা গেটটার দিকে। কয়েক হপ্তা আগেও বৃষ্টি পড়েছে যার ফলে গাছের লম্বা ডাল, পাতা আর পায়ের নিচে ঘন ঘাস খানিক অস্বস্তির কারণ। কিন্তু বাঙালির অ্যাডভেঞ্চার এসব থোড়াই কেয়ার করে। চার মক্কেল সার বেঁধে এগিয়ে পড়। এক প্রশস্ত উঠোনে এসে দাঁড়াই। এটা এক সময়ের মসজিদ। কাঁচা রোদ আস্তে আস্তে কেল্লার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে যায়। আমরা ফেরার পথ ধরি।

“অরণ্যের দিনরাত্রি” –র  শেষ দৃশ্যে এসে বুড়ো চৌকিদার বনবাংলোর বড়ো গেট আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেয়। শহুরে সভ্যতার হাত থেকে সে যেন সযত্নে বাঁচিয়ে রাখে তার জীবন যাপনের পরিচিত পরিমণ্ডলকে। আমাদের এসি গাড়ির কাঁচের ওপারে পড়ে থাকে পালামৌ। গত কয়েক ঘণ্টার পালামৌয়ের রাত্রি-দিনের স্মৃতি কোথায় যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায় সিনেমার সাদা-কালো দিন রাত্রির সঙ্গে।
______________

ছবি: সপ্তর্ষি রায় বর্ধন

Written by