রুকস্যাক গোছানোর আগে…

‘রোমাঞ্চকর পর্যটন’ (Adventure Tourism) বিগত দশক থেকেই জনপ্রিয় হচ্ছে বাঙালিদের মধ্যে। আগে একটি ছোটো পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকা রোমাঞ্চের এই নেশা বর্তমান সময়ে যথেষ্ট বেড়েছে। গাড়ি-রাস্তার নাগাল থেকে দূরে নিবিড় অরণ্য, নদী, পাহাড়ে রোমাঞ্চের খোঁজ বাড়ছে হুহু করে। বাঙালিদের ‘রোমাঞ্চকর পর্যটন’ বলতেই সবার আগে আসবে ‘ট্রেকিং’। পাহাড় ছাড়াও জঙ্গল, সমুদ্র সৈকত ধরে লম্বা দূরত্বে পদযাত্রাই হল ‘ট্রেক’। বাঙালিদের মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় অবশ্যই হিমালয়ের বিভিন্ন গহীন পথ। যে পথ ধরে হেঁটে চলা বরফে ঢাকা শৃঙ্গগুলির আরেকটু কাছে। ভাগ্য সদয় হলে দেখা মেলে বিবিধ সুন্দর পাখি, বিরল জন্তুর।

তবে, বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ‘রোমান্টিক’ নয়। ইনস্টাগ্রামে দেখা একাধিক সুদৃশ্য ট্রেকের রিল কিংবা ছবি দেখে আপনি পরের ছুটি প্ল্যান করলেন। ভাবলেন, ঘুরে আসবেন রিলে দেখা সেই ‘ছবির মতো’ গন্তব্যে। কিন্তু সেই গন্তব্যে পৌঁছাতে ইনফ্লুয়েন্সার ব্যক্তি কী কী সহ্য করেছেন খোঁজ নিতে ভুলে গেলেন। কোনও এক ট্রেকিং কোম্পানির বুকিং নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রুকস্যাকটা কোনও মতে গুছিয়ে। ফল? প্রচণ্ড রাগে, দুঃখে, কষ্টে ফিরে আসা অর্ধেক রাস্তা থেকে। বেকায়দা পড়ে গিয়ে ডান পা খানা মচকেছে। বৃষ্টিতে ভিজে আপনার যাবতীয় পোশাক ও অন্যান্য জিনিসসহ রুকস্যাক ভিজে ঢোল। আপনি জানতেনই না যে প্রাতঃকর্ম সারতে আপনি জল পাবেন না, টিস্যু দিয়ে কাজ সারতে হবে। হাঁটার সময় রাস্তার ধারে কোনও এক বিশেষ গাছের পাতায় লেগে হাত জ্বলতে শুরু করেছে দাউদাউ করে। তারমধ্যে, বদ্ধ কোনও জলাশয়ের জল খেয়ে পাঁচ মিনিট অন্তর আপনাকে আশ্রয় নিতে হচ্ছে কোনও বোল্ডার কিংবা গাছের গুড়ির পেছনে। বাড়ি থেকে আনা পোশাকে বাধা মানছে না ঠাণ্ডা। ঘুমাতে পারছেন না কনকনে শীতে। তালিকা আরও বড় করা যায়। এরকম হাজারও সমস্যা এবং প্রতিকূলতা আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে প্রত্যেকটা রাস্তায়। কিন্তু তারপরেও দেখবেন আপনার জনৈক বন্ধু ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়ছেন কোনও ট্রেকে। জিজ্ঞেস করুন, তার কোনও সমস্যা হয় না? জানবেন, হয়। সকলেরই হয়, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে উৎরে যাওয়া যায় সব সমস্যা।

কোনও ট্রেকে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নির্বিঘ্নে উপভোগ করতে হলে চাই সঠিক প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতিকে আমরা মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। প্রথম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হল শারীরিক প্রস্তুতি। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ জীবিকায় শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। অনেকেরই অধিকাংশ সময় কাটে চার দেওয়ালের ভেতরে, আরামকেদারায় বসে। কতিপয় মানুষ নিজেদের রুটিনে নিয়মিত শরীরচর্চাকে ধরে রেখেছেন; ট্রেকের পরিশ্রম সহ্য করতে তাদের সুবিধা বেশি। যদি কোনও ট্রেকের পরিকল্পনা করে থাকেন, নিয়মিত কার্ডিওভাস্কুলার এক্সারসাইজ শুরু করা বাঞ্চনীয়। নিজের সময় ও সুবিধা মতো হাঁটতে পারেন অথবা জগিং করতে পারেন। অফিস এবং বাড়িতে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন রোজ। মাংসপেশির জোর বাড়াতে হলে স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করতে পারেন সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন। সেক্ষেত্রে, জিমে গিয়ে অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করবেন। হৃদপিণ্ড কিংবা ফুসফুসজনিত কোনও সমস্যা থাকলে ট্রেকের পরিকল্পনা করার আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

অফিস এবং বাড়িতে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন রোজ। মাংসপেশির জোর বাড়াতে হলে স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করতে পারেন সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন। সেক্ষেত্রে, জিমে গিয়ে অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করবেন।

দ্বিতীয়ত, ট্রেকে কী কী নিয়ে যাবেন সেই পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রথমবারের জন্য যাওয়ার পরিকল্পনা হয়, কয়েকটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। সেই তালিকায় প্রথমেই থাকবে, একটি ভাল রুকস্যাক এবং ট্রেকিং এর জুতো। সঠিক ব্যাক-সাপোর্টওয়ালা রুকস্যাক না হলে তা পিঠে বইতে খুবই অসুবিধা হয়। বৃষ্টি থেকে স্যাক বাঁচাতে একটি রেইন কভার অবশ্যই কাছে রাখবেন। জুতো সংগ্রহ করবেন নিজে পরীক্ষা করে। আপনার পায়ের জন্য আরামদায়ক হলে তবেই সেটি নির্বাচন করবেন। পাহাড়ি পথে হাঁটার সময় যাতে পা না মচকায়, জুতোটি ‘হাই আঙ্কল’ হওয়াই শ্রেয়। এখনকার অধিকাংশ ট্রেকিং বুট ‘ওয়াটার রেসিস্ট্যান্ট’ হয়। অল্পবিস্তর বৃষ্টি সহ্য করে নিতে পারে অনায়াসে। জুতো নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখবেন, সেটি যেন আপনার সাধারণভাবে ব্যবহৃত সাইজের থেকে সামান্য বড় হয়। পোশাকের মোট চারটি স্তর আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। সব থেকে ভেতরের স্তর, হাল্কা ‘কুইক-ড্ৰাই’ ফ্যাব্রিকে তৈরি ফুল-স্লিভ টিশার্ট। চাইলে সুতি ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু বৃষ্টি কিংবা ঘামে ভেজা টিশার্ট শুকোতে সময় লাগে অনেক বেশি ।

এর পরের স্তর ‘ফ্লিস’। এই স্তরটিই মূলত আমাদের গরম রাখে। এটিকে সোয়েটার এবং থার্মাল ইনারের আধুনিক সংস্করণ বলা যায়। তার উপরে থাকবে ডাউন জ্যাকেট এবং উইন্ড প্রুফ জ্যাকেট। ট্রেকে চলার সময় এই চারটে স্তর আপনার প্রয়োজন হবে না। হাঁটার সময় ফুল-স্লিভ টিশার্ট যথেষ্ট। ঠান্ডা হাওয়া বইলে চাপিয়ে নিতে পারেন উইন্ড প্রুফ জ্যাকেট। রাত্রের আস্তানায় পৌঁছে মূলত প্রয়োজন হয় ফ্লিসের। ঠান্ডা আরও গুরুতর হলে ছাড়তে স্তরের প্রয়োজন হয়। শরীরের নিম্নাংশের জন্য একজোড়া ভাল ‘ট্রেক প্যান্ট’ অবশ্যই সংগ্রহ করবেন। মোটা জিন্স এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। এসবের সঙ্গে, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে রেইনকোট – পঞ্চো অথবা ছাতা অবশ্যই রাখবেন সঙ্গে। রোদের জন্য সানগ্লাস, সানক্যাপ, রাত্রে পথ হাঁটার জন্য ‘হেডটর্চ’ সঙ্গে রাখতে হবে। ঠান্ডা থেকে মাথা বাঁচাতে কাজে দেয় ‘বালাক্লাভা’ বা হনুমান টুপি। এসব ছাড়াও, ভ্রমণে যা যা সামগ্রী প্রয়োজন সবই সংগ্রহ করতে হবে। তবে মনে রাখবেন, যা স্যাকে ভরবেন – সবটা কিন্তু আপনাকেই বইতে হবে, যদি না সেই স্যাক পোর্টারের জিম্মায় দিয়ে দেন।

প্রস্তুতির পর, এবার পথে হাঁটার পালা। এক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, নিজেকে সঠিকভাবে ‘হাইড্রেটেড’ রাখা। রোজ হাঁটতে হাঁটতে প্রয়োজন মতো জলপান করতেই হবে। তৃষ্ণা বেশি সময় থাকলেই তা ‘ডিহাইড্রেশন’-এর রূপ নেয় এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে। হাঁটার সময় জল ভরবেন একমাত্র গাইডের দেখানো স্থান থেকে। দিনের শুরুতেই শরীরের যাবতীয় শক্তি ক্ষয় করে ফেলবেন না। চড়াই-এর সময় আপনি যে গতিতে হাঁটায় স্বচ্ছন্দ, সেই গতি থেকে একটু আস্তেই হাঁটুন। মনে রাখবেন, ট্রেক ‘ফার্স্ট’ হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়। উৎরাই’-এর সময় খেয়াল করুন, হাঁটুতে যতটা সম্ভব কম চাপ লাগে। সব সময় মাথায় রাখবেন, হাঁটা একদিন মাত্র নয়। প্রথমদিনেই যাবতীয় শক্তি খরচ করে ফেললে পরেরদিনগুলি অত্যন্ত কষ্টে কাটবে। শরীর সুস্থ রাখতে সঠিক সময়ে খাবার এবং ঘুম সমতলের মতো পাহাড়ি রাস্তায়ও প্রয়োজনীয়। হাঁটার সময় মিষ্টি ক্যান্ডি, চকোলেট, বাদাম পকেটে রাখবেন। কোনও প্রকার সমস্যায়, স্থানীয় গাইডের পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করবেন সবসময়। তাঁদের অভিজ্ঞতায় অধিকাংশ সমস্যার সমাধান আগে থেকেই মজুত থাকে।

শেষে বলতে হয়, ট্রেকে কী কী করবেন না। অধিকাংশ ট্রেক হয় জাতীয় উদ্যান কিংবা অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে। সেই কারণেই “স্মৃতি ও ফটোগ্রাফ ছাড়া কিছুই নিয়ে আসবেন না এবং পায়ের চিহ্ন ছাড়া কিছুই ফেলে আসবেন না।” যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলবেন না। চকোলেট, লজেন্সের মোড়ক নিজের কাছেই রাখবেন। উপযুক্ত জায়গায় সেগুলি ফেলবেন। একই পথে হাঁটতে আসেন দেশ-বিদেশের বহু মানুষ। এমন কোনও কাজ করবেন না, যাতে আপনার কারণে অন্য কাউকে অসুবিধায় পড়তে হয়। স্থানীয় মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা বাঞ্ছনীয়।

ট্রেকে কী কী নিয়ে যাবেন সেই পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রথমবারের জন্য যাওয়ার পরিকল্পনা হয়, কয়েকটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সামগ্রী আপনাকে সংগ্রহ করতে হবে। সেই তালিকায় প্রথমেই থাকবে, একটি ভালো রুকস্যাক এবং ট্রেকিং-এর জুতো।

যাবতীয় প্রস্তুতির পরে আপনি একটুও সমস্যায় পড়বেন না বা কষ্ট সহ্য করতে হবে না, এমনটা মোটেই নয়। প্রকৃতি যেমন সুন্দর, তেমনই নির্দয়। সেই প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়েই তবু এগিয়ে যাওয়া গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। প্রতিকূলতা নির্বিঘ্নে পেরোনোর প্রস্তুতি শুরু হয় ঘরে বসেই। স্বপ্নের গন্তব্য বলে যে স্থানকে বেছে নিচ্ছেন, তার প্রকৃতি তথা আবহাওয়া সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধান দিয়েই প্রস্তুতি শুরু হয়। কতটা উচ্চতায় আপনাকে যেতে হবে, কেমন পথ অতিক্রম করতে হবে তা জানতে শুরু করলেই মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় আপনার অজান্তেই। নিজের সামর্থ এবং সহ্যশক্তি অনুযায়ী বেছে নেবেন পথ। অপেক্ষাকৃত ‘সহজ’ এবং ছোটো পথে শুরু করাই ভাল। কিন্তু সত্যি বলতে ‘সহজ পথ’ কোনও ট্রেকেই নেই। তাছাড়া, সমস্যা এবং প্রতিকূলতা থাকবেই প্রত্যেকবার। নইলে ‘রোমাঞ্চ’ অনুভব করবেন কী করে!

Written by
Developed by DXDasia