মানেভঞ্জন, সান্দাকফু, ফালুট হয়ে গোর্খে—একদিনে, একদৌড়ে, একা

দু’পাশে ঘন জঙ্গল, পাহাড়ি ভাল্লুকের ভয়, আশেপাশে সাহায্য করারও কেউ নেই…

হাফ ম্যারাথন, ফুল ম্যারাথন, আল্ট্রা ম্যারাথন, ট্রেল রান… দৌড়ের ধাপগুলো যখন ধীরে ধীরে পেরিয়ে চলেছি, দেখতে দেখতে পাহাড়ে চড়ার সময় এগিয়ে এল। তাই যে উদ্দেশ্য নিয়ে দৌড়নো শুরু করেছিলাম, অর্থাৎ হিমালয়ের উঁচু শৃঙ্গগুলোতে দ্রুত আরোহণ, তার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় চলে এল। কিন্তু যেভাবে হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো ক্লাইম্ব হয়, এক্সপিডিশন পদ্ধতিতে, তাতে সময় অনেকটাই বেশি লাগে। তাই আল্পাইন পদ্ধতিতে ক্লাইম্বিং-এর প্রস্তুতি শুরু করলাম। আল্পাইন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা পরের কোনো লেখায় করা যাবে, তবে সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যায়, এটি পাহাড়ে চড়ার দ্রুত ও হালকা পদ্ধতি, যেখানে ঝুঁকি একটু বেশিই থাকে। তাই ক্লাইম্বারদের নিজেদের চেনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে চেনা ও জানা।

এই সীমাবদ্ধতা বা লিমিটেশন খোঁজার প্রক্রিয়া তাই শুরু করলাম নানাভাবে, প্রথমে ঠিক করলাম মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু ফালুট হয়ে গোর্খে অবধি দৌড়াবো একাই।

এর আগে এই রুটে ফালুট অবধি দৌড়েছি, তবে তখন বন্ধুবান্ধবরা ছিল, গাইড ছিল, জল খাওয়ারের সরবরাহ ছিল, উদ্ধারের জন্য গাড়িও ছিল। এবারে দৌড়াবো একাই। তাই সবকিছুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে, জল খাওয়ার ওষুধ, সবই নিজের পিঠে ছিল।

যেহেতু একাই ছিলাম, তাই নিজের ছন্দে চলতে পারছিলাম, সান্দাকফু সকাল ১১টার দিকে পৌঁছে গেলাম, মাত্র সাড়ে ছয় ঘন্টাতেই। তারপর রওনা দিলাম ফালুটের দিকে, এবারে রাস্তা প্রায় নির্জন।

প্রায় ৫০ কিমি পেরিয়ে ফালুট ট্রেকার্স হাটে পৌঁছে টেকাজীর কাছে এককাপ চা খেয়ে যখন গোর্খের উদ্দেশ্যে বেরোলাম, ততক্ষণে সাড়ে চারটে বেজে গেছে। আবহাওয়াও বিগড়েছে ভালোরকম । একে প্রচণ্ড তুষারপাত, মেঘ, তার উপর পড়ন্ত বেলার আলো, এরই মধ্যে কোনোক্রমে যতটা দ্রুত সম্ভব সিংগালিলা অভয়ারণ্যর ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, সরু কাঁচা রাস্তা ধরে একা সাবধানে নামছি।

৪-৫ কিমি নেমে একটি বাঁক পেরোতেই হঠাৎ শুনলাম, একটি পশু গরগর করতে করতে ঠিক আমার পাশের থেকেই প্রায় অন্ধকার ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে নিচের দিকে চলে গেল। কিছু দেখতেও পেলাম না। দৌড়ের আওয়াজে বুঝলাম জন্তুটি বেশ ভারী, আমার হঠাৎ আবির্ভাবে বিরক্তও। ভাবছিলাম কী হতে পারে?

রেড পান্ডা বা বুনো শূকর কি? তাহলে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু যদি কালোভাল্লুক হয়?

হকচকিয়ে আমিও জোরে দৌড়নো শুরু করলাম রাস্তা ধরে নীচের দিকে। ৪-৫ কিমি আগে বা পিছনে সাহায্য করার জন্যেও কেউ ছিল না সেই সন্ধেবেলা। শুনেছিলাম, ভাল্লুকের মুখোমুখি পড়লে বেঁচে ফেরার চান্স খুব কম, তাই মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে দেখেশুনে নিচ্ছিলাম কোনো পশু ফলো করছে কি না! এরকম পরিস্থিতিতে সত্যিই আগে পড়িনি। খানিক বাদেই দেখলাম আমার ট্রেকিং রুটটি ফের ঘুরে গিয়ে পশুটি সোজা যেদিকে নেমেছে, সেইদিকে চলে যাচ্ছে… আলো ততক্ষণে প্রায় চলে গিয়েছে, ঘন কুয়াশা আর গভীর জঙ্গলে আমি একা। টিপটিপ করে গাছের পাতা থেকে তখনো জল ঝরছে, অনেক দূরে কোনো পোকা ডেকে চলেছে। ধারেকাছে কোনো গ্রামের চিহ্নটুকু পাওয়া যাচ্ছে না, গাছের কাটা গুঁড়িকেও মাঝে মধ্যে ভ্রম হচ্ছে ভাল্লুক বলে।

প্রথমে দাঁড়িয়ে রেনকোটটা খুলে পিঠের ব্যাগটা বের করলাম। মাথা ঠাণ্ডা রেখে দ্রুত ভাবছিলাম, কী কী কাজে লাগতে পারে? প্রথমেই হেডটর্চটা বের করে পরে নিলাম, কোমরের জলের বোতলটা ভরে পিঠের ব্যাগটা হাল্কা করলাম। তারপরে ভাবলাম, সুইশ নাইফটা বের করে হাতে রাখব? কিন্তু আমার কাছে একটা থাকলে ভাল্লুকের চারপায়ে ২০টা সুইশ নাইফ আছে, আর ওসব ভাল্লুকের সাথে মারামারি করে অস্কার জেতা যায়, বেঁচে ফেরা যায় না। শেষে একটা রংচঙে গেঞ্জি হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলাম, ভেবেছিলাম যদি ভাল্লুকের মুখোমুখি পড়েই যাই, শেষ মুহূর্তে বসে পড়ে পাহাড়ের দিকে গেঞ্জিটি ছুড়ে দিয়ে ওই দিকেই হেডটর্চের আলো ফেলবো। যেটুকু সময় কনফিউজড করবো ভাল্লুককে, সেটাই আমার দৌড়ে বেরিয়ে আসার সময়…

না, সেই জন্তুর মুখোমুখি আমায় হতে হয়নি। গোর্খেতে পৌঁছে এই গল্প যখন বলছিলাম, ওরা বললো ইদানীং কিছু বন্য শূকর ওই অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করছে, তবে ভাল্লুকও আছে জঙ্গলে।

(ক্রমশ)

Post Tags
Developed by DXDasia