ভারতীয় ফুটবল এগোবে কী করে?
সাম্প্রতিক কালে যে ব্যাপারে সারা ভারতবর্ষ নিশ্চিতভাবে এক সুরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কথা বলবে, তা হল – ভারতীয় ফুটবল আজ ঠিক কতটা অন্ধকারে ও তার নানান কারণ। ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান ও সুদূর ভবিষ্যৎ যে শুধুই অন্ধকারময় তা নিয়ে সম্ভবত কারও কোনও দ্বিমত বা দ্বিধা নেই। অবধারিতভাবে, ভারতীয় ফুটবলের আজকের এই পরিণতির জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অসংখ্য কারণ তুলে ধরবেন।
কিন্তু এমনটাতো হওয়ার কথা ছিল না। ভারতীয় ফুটবল এক সময় পৃথিবী তথা এশিয়ার শ্রেষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে প্রায় সমানে সমানে পাল্লা দিয়েছে। অলিম্পিক, এশিয়ান গেমসের মত প্রতিযোগিতায় দাপটে জয় ছিনিয়ে এনেছে।
বিশ্ব ফুটবলের বাকি দেশগুলো যখন নিজেদের ভিশন ও মিশন ঠিক করে ক্রমাগত উন্নতি করে গেছে, সেখানে ভারতীয় ফুটবল সর্বাঙ্গীন ব্যর্থতায় জর্জরিত হয়ে বিভ্রান্তের মত ভেসে থেকেছে।
উল্টো দিকে তখন আজকের কুলীন ভারতীয় ক্রিকেট বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেও সব দলের শেষে প্রতিযোগিতা শেষ করছে। তারপর, ভারতবর্ষের ক্রিকেট মানচিত্রে যে বিপ্লব ঘটেছিল তা আমরা প্রায় সকলেই জানি। সাকুল্যে ৭-৮টা দল খেলে এমন এক খেলার নিচের সারির এক দেশ; এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেল, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও জনপ্রিয় প্রতিযোগিতাগুলোর (বিভিন্ন খেলা মিলিয়ে) সঙ্গে প্রায় এক আসনে বসে পড়েছে ভারতীয় ক্রিকেট।
অন্য দিকে এ দেশের ফুটবল একটু একটু করে শুধুই পিছিয়ে যেতে যেতে আজ প্রায় বিলুপ্তির খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের বাকি দেশগুলো যখন নিজেদের ভিশন ও মিশন ঠিক করে ক্রমাগত উন্নতি করে গেছে, সেখানে ভারতীয় ফুটবল সর্বাঙ্গীন ব্যর্থতায় জর্জরিত হয়ে বিভ্রান্তের মত ভেসে থেকেছে।
আজ যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে তা হল – ফুটবলের ক্ষেত্রে এই পরিণতির আসল কারণগুলো কেউই অনুধাবন করতে পারলেন না। কোনো প্রাক্তন খেলোয়াড় বা প্রশাসক কেউই ভারতীয় ফুটবলের এই রোগের উৎসে পৌঁছতে পারেননি। তাই আজ এক অতি সাধারণ ফুটবল প্রেমী আর্তনাদ করে বোঝাতে চায় আমাদের সঠিক পথ ঠিক কী হওয়া উচিত ও কীভাবে হওয়া উচিত, সমালোচনার ভিড় তো থিকথিক করছে।
জাতীয় দলের সাফল্যকেই প্রধান লক্ষ্য স্থির করতে হবে। ম্যাচ প্রতি পারিশ্রমিক অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে হবে। প্রয়োজন হলে ক্রিকেটের মত বার্ষিক চুক্তি বা গ্রেডেশন প্রথাও চালু করা যেতে পারে। জাতীয় দলের ফুটবলারদের জন্য বিমা ও আরও নানান সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা। যাতে জাতীয় দলের হয়ে খেলা ও নিজেকে নিংড়ে দেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে। অনূর্ধ্ব ২১, ১৯, ১৭ এসব বয়স ভিত্তিক জাতীয় দলকেও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের আবহে তৈরি করতে হবে। ঘন ঘন জাতীয় দলের খেলার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজেরা উদ্যোগী হয়ে অন্তত ৩ থেকে ৪টি দেশের ভালো মানের জাতীয় দল নিয়ে ক্রমাগত প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে হবে।
কিছু বেসিক টেকনিক রপ্ত করতেও পারদর্শী হতে হবে। যেমন নিখুঁত পাসিং, রিসিভিং ও সর্বোপরি পজিশনিং। শুধু গায়ে গতরে খাটলে হবে না, বুদ্ধি দিয়ে খেলাটা রপ্ত করতে হবে। বিশ্বের তাবড় দেশগুলোর খেলা দেখার সময় ওই পজিশনিং ব্যপারটা ভারতীয় ফুটবলাররা আয়ত্ত করতে পারেনি, তাই এ দেশের ফুটবল এখনও বাকি বিশ্বের মত দৃষ্টি নন্দন হয়ে উঠতে পারেনি। আজ পর্যন্ত কোনো বিদেশি বা দেশি কোচকে এই দিকগুলোতে মনোনিবেশ করতে দেখিনি বা খেলায় তার প্রতিফলন ঘটেনি। একমাত্র অমল দত্ত’র ডায়মন্ড সিস্টেমের সময় সেই বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনিং ফুটবলের ঝলক কিছুটা দেখতে পাওয়া গেছিল। যাঁরা ওই ম্যাচগুলো দেখেছিলেন তাঁরা জানেন সেসময় ওই দলকে কতোটা অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছিল।
ক্রিকেটের সফল IPL-কে অন্ধের মত অনুকরণ করে রাতারাতি ISL করে দিয়ে কোনো লাভ হবে না বা হয়নি। তার কারণ হল – এদেশের জাতীয় দল চূড়ান্ত সফল ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছানোর পর IPL চালু হয়েছে, উল্টোটা নয়। জাতীয় দল সফল হলে তবেই তারকা তৈরি হবে, তারপর সেটার বাণিজ্যকরণ ভাবা যেতে পারে। ঠিক যে কারণে ১০ বছর পেরিয়েও ISL কোনো তারকা বা মহাতারকার জন্ম দিতে পারেনি।
আজ যেটা সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে তা হল – ফুটবলের ক্ষেত্রে এই পরিণতির আসল কারণগুলো কেউই অনুধাবন করতে পারলেন না। কোনো প্রাক্তন খেলোয়াড় বা প্রশাসক কেউই ভারতীয় ফুটবলের এই রোগের উৎসে পৌঁছতে পারেননি।
ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির ধাঁচে সমস্ত আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন জাতীয় ফুটবল অ্যাকাডেমি গড়ে তুলতে হবে। যেখানে খেলোয়াড়েরা রিহ্যাব থেকে শুরু করে নিজেদের উৎকর্ষে আরও শান দিতে পারে।
এ দেশের ফুটবলের মক্কা হল কলকাতা। সেই কলকাতার তৃণমূল স্তরের ফুটবল প্রশিক্ষণের পরিকাঠামো দেখলে সহজেই বোঝা যায় ভারত কেন ফুটবলে এত পিছিয়ে পড়ছে। আজও সেখানে শুধুই এক হাঁটু কাদার মাঠ, এবড়ো খেবড়ো মাঠ, বালি কাঁকড়ের মাঠ। আর প্রশিক্ষণের পদ্ধতি? কমপক্ষে ৫০ বছর পুরোনো। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন এই ধরনের মাঠে খেলেই এবং এরকম প্রশিক্ষণ নিয়েই তো একসময় ভারত বাকি দেশের সঙ্গে মাঠে লড়াই করতো। একদম ঠিক, কিন্তু, সেই সময়ের পর থেকে বাকিরা নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর আমরা সেই তিমিরেই পড়ে থেকে আজ বিলুপ্তির পথে। যদি ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে চান তবে সবার আগে ভালো মাঠ তৈরি করুন। অনুশীলনের জন্য উন্নত মানের সরঞ্জাম রাখুন। খুদে শিক্ষার্থীদের ভালো মানের কিট তুলে দিন। ফুটবল কীভাবে বুদ্ধি দিয়ে খেলতে হয় শেখান। লড়াকু ও নাছোড় মানসিকতা তৈরি করুন। ফুটবলে প্রথম সারির দেশগুলোর অ্যাকাডেমি বা ছোটোদের কোচিং ক্যাম্পগুলো কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের গড়ে তুলছ্ সেগুলো খেয়াল করুন ও ঠিক সেই পদ্ধতি অনুসরণ করুন। এই প্রযুক্তির যুগে সেসব তথ্য জোগাড় করা মোটেও কঠিন কাজ নয়। নয়তো, সেই বস্তা পচা মান্ধাতার আমলের ফুটবল কোচিং সেন্টারের ভিড় ভারতকে ফিফা ক্রম পর্যায়ে ১০০-র ওপরেই রেখে দেবে নিশ্চিত।
পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাকে যদি এ পোড়া দেশ সঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে না পারে, তবে সেটা কেবলমাত্র আমাদেরই ব্যর্থতা। ভারতের ফুটবলে নানা সময়ে নানান সংস্থা অজস্র টাকা ঢেলেছেন কিন্তু সেগুলোর সবটাই দিশাহীনভাবে ভস্মে ঘি ঢালা-র মত পরিণতি পেয়েছে। কাউকে একটুও অসন্মান না করেই বলছি, আজ পর্যন্ত কোনো ফুটবল প্রশাসক এ দেশের ফুটবলের অগ্রগতির জন্য যে পথটা সঠিক, সেটার সন্ধান করে উঠতে পারেননি। তাই এ দেশের ফুটবলে ভিশন-এর বয়স ক্রমশ ২০১০, ২০২৫, ২০৩৫, ২০৪৭ হয়ে বাড়তেই থাকে।
সর্বশেষ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা মাথায় রাখতে হবে – দেশের ফুটবল এগোলে তবেই ক্লাব ফুটবলের জৌলুশ বাড়বে, উল্টোটায় অস্তিত্ব সংকট।
আমার দেশের ফুটবলের চৈতন্য হোক।