মহম্মদ হাবিব : বড়ো মনের বড়ে মিয়াঁকে ভুলবে না কলকাতা ময়দান

সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তি মহম্মদ হাবিবের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

খুব বড়ো মন ছিল লোকটার। তাঁকে ভালবেসে ‘বড়ে মিয়াঁ’ বলে ডাকত আপামর কলকাতা ময়দান। লোকটার পোষাকি নামও ছিল একটা, মহম্মদ হাবিব (Mohammed Habib)। এই মহম্মদ হাবিব নামটাই কলকাতার তিনটে বড়ো টিমের টিমলিস্টের মাঝমাঠে অথবা স্ট্রাইকার পজিশনে শোভা পেত ১৯৬৬-১৯৮২, এই দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে।

এই সতেরো বছরে ১০ বার করে কলকাতা লিগ ও আইএফএ শিল্ড, ৫ বার ডুরান্ড কাপ, ৮ বার রোভার্স কাপ, ৪ বার বরদলুই ট্রফি, ৩ বার ফেডারেশন কাপ, ২ বার করে ডিসিএম ট্রফি, নাগজি ট্রফি ও দার্জিলিং গোল্ড কাপ এবং একবার অমৃতবাজার শতবার্ষিকী ট্রফি, মোট এই ৪৭টি বড়ো ট্রফি জিতেছিলেন মহম্মদ হাবিব। কলকাতা লিগ ও আইএফএ শিল্ড তাঁর মতো মোট ২০ বার আর কেউ জেতেননি। আর কেউ করেননি তাঁর মতো ৮ বার কলকাতা লিগ-শিল্ড ডাবল (১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৭৬, ১৯৭৮)।

সতেরো বছরের কলকাতা কেরিয়ারের ৯ বছর তিনি খেলেছেন ইস্টবেঙ্গল-এ (১৯৬৬, ১৯৬৭, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৮০, ১৯৮২)। এই ৯ বছরে ইস্টবেঙ্গলকে তাঁর উপহার ছিল ২৬টি ট্রফি। যার মধ্যে ছিল-

৭ বার কলকাতা লিগ (১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭১, ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৮২),
৫ বার আইএফএ শিল্ড (১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৭৪),
৪ বার ডুরান্ড কাপ (১৯৬৭, ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৮২),
৪ বার রোভার্স কাপ (১৯৬৭, ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৮০),
১ বার ফেডারেশন কাপ (১৯৮০),
২ বার ডিসিএম ট্রফি (১৯৭৩, ১৯৭৪),
২ বার বরদলুই ট্রফি (১৯৭২, ১৯৭৩) এবং
১ বার দার্জিলিং গোল্ড কাপ (১৯৮২)।

 তাঁর ৬ বছর মোহনবাগানে থাকাকালীন (১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৮১) মোহনবাগান পেয়েছিল ২১টি ট্রফি। সেই ২১টি ট্রফির হিসাবকিতাব ছিল এইরকম-

৩ বার কলকাতা লিগ (১৯৬৯, ১৯৭৬, ১৯৭৮),
৫ বার আইএফএ শিল্ড (১৯৬৯, ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৮১),
১ বার ডুরান্ড কাপ (১৯৭৭),
৪ বার রোভার্স কাপ (১৯৬৮, ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৮১),
২ বার ফেডারেশন কাপ (১৯৭৮, ১৯৮১),
২ বার বরদলুই ট্রফি (১৯৭৬, ১৯৭৭),
২ বার নাগজি ট্রফি (১৯৭৮, ১৯৮১),
১ বার দার্জিলিং গোল্ড কাপ (১৯৭৬) এবং
১ বার অমৃতবাজার শতবার্ষিকী ট্রফি (১৯৬৮)।

এছাড়া ২ বছর মহমেডান স্পোর্টিং-এ (১৯৭৫, ১৯৭৯) খেলেছেন তিনি। মহমেডান স্পোর্টিংয়ে খেলার সময়ে অবশ্য তিনি ক্লাবকে কোনও ট্রফি দিতে পারেননি।

ইতিহাস হয়ে গেছে বিদেশি দলের বিরুদ্ধে তাঁর খেলা। ইরানের পাস ক্লাব (১৯৭০), দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়াং ইয়াং সিটি ক্লাব (১৯৭৩), উত্তর কোরিয়ার ডক রো গ্যাং ক্লাব (১৯৭৩), ইংল্যান্ডের ক্রুকটাউন ক্লাব (১৯৭৬), নিউ ইয়র্কের কসমস সিটি ক্লাব (১৯৭৭), সোভিয়েত ইউনিয়নের আরারাত ক্লাব (১৯৭৮) দেশে ফিরে জানার আগে জেনে গেছে, বিদেশি দলের বিরুদ্ধে খেলায় কতটা ভয়ঙ্কর ছিলেন অকুতোভয় মহম্মদ হাবিব। ১৯৭৭ সালে পেলের বিরুদ্ধে (কসমস) ম্যাচের আগে মোহনবাগানে তাঁর সতীর্থরা যখন হামলে পড়েছেন পেলের সঙ্গে ছবি তুলতে, তিনি বলেছিলেন “অ্যায়সা কিঁউ? ও ভি প্লেয়ার, হাম ভি প্লেয়ার।” খুব কম উচ্চতার কিন্তু সাধারণের তুলনায় বিরাট মাপের কলজের মালিক মহম্মদ হাবিবকে নিয়ে লোকগাথার মতো এসব সত্যি এখনো উড়ে বেড়ায় ময়দানের হাওয়ায় হাওয়ায়।

ভারতীয় ফুটবলে ২বার (১৯৭২, ১৯৭৭) ত্রিমুকুট পাওয়া (আইএফএ শিল্ড, ডুরান্ড কাপ ও রোভার্স কাপ একই বছরে জিতলে ত্রিমুকুট জেতা ধরা হত) মহম্মদ হাবিব যখন যে ক্লাবের হয়ে খেলেছেন, তাদের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন কলকাতা ময়দানের চিরকালীন দশ নম্বর জার্সিধারী ফাইটার, চিরন্তন লড়াই ছিল যাঁর শেষ পারানির কড়ি। আমার মতন গড়পড়তা ফুটবলপ্রেমীর কাছে ‘লড়াইয়ের প্রতিশব্দ’ ছিলেন মহম্মদ হাবিব।

মাঠে বিপক্ষের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে হাবিব(ডানদিকে)

তাঁর লড়াই নিয়ে আমার সেরা স্মৃতি ১৯৬৯-৭০-এর সন্তোষ ট্রফি। নওগাঁতে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে সন্তোষ ট্রফি সেমিফাইনাল খেলছিল বাংলা। একটি এরিয়াল বলের দখলের লড়াইতে গুরুতর আহত হলেন বাংলার মহম্মদ হাবিব। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করতে হল হাসপাতালে, যেখানে স্যালাইন চলেছিল সারারাত। হাসপাতালে রাত জাগলেন তাঁর দু’একজন সতীর্থ। ম্যাচটা ড্র হল। পরদিন সেমিফাইনাল রিপ্লে। রিপ্লের দিন সবার আপত্তি অগ্রাহ্য করেই ব্যক্তিগত বন্ডে হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়েছিলেন মহম্মদ হাবিব। রিলিজ নিয়ে সোজা মাঠে গিয়েছিলেন, বসেছিলেন রিজার্ভ বেঞ্চে। এতেই তেতে যাওয়া বাংলা রিপ্লেটা জিতল। আর দু’দিন পরের ফাইনালে ৬-১ গোলে সার্ভিসেসকে হারিয়ে সেবার সন্তোষ ট্রফি জিতে নিয়েছিল বাংলা। আর গল্পের মত শোনালেও এটাই সত্যি যে, সেই ফাইনালে বাংলার দেওয়া ৬টি গোলের ৫টিই করেছিলেন মহম্মদ হাবিব। সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে কারোর দেওয়া ৫ গোলের এই রেকর্ড আজও অটুট।

মহম্মদ হাবিবকে পিকে ব্যানার্জি বলতেন, তাঁর দেখা সেরা খেলোয়াড়। সুধীর কর্মকার তাঁর খেলা টাফেস্ট ফরোয়ার্ড বলে চিহ্নিত করতেন। গৌতম সরকারের মতে, বর্ন ফাইটার ছিলেন তাঁর হাবিবদা। সুভাষ ভৌমিকের ফিরে দেখায়, তাঁর জীবনে পি কে ব্যানার্জির চেয়েও বড়ো ফুটবল গুরু ছিলেন মহম্মদ হাবিব। সমরেশ চৌধুরীর মাঠে নেমে “হারকে ঘৃণা করার শিক্ষক” ছিলেন মহম্মদ হাবিব। সুরজিৎ সেনগুপ্ত তাঁর যাবতীয় লড়াইয়ের প্রেরণা বলে মানতেন মহম্মদ হাবিবকে। সুব্রত ভট্টাচার্য তাঁর সদ্যপ্রকাশিত আত্মজীবনী “ষোলো আনা বাবলু” উৎসর্গ করেছেন দুজনকে, একজন তাঁর মা পুতুল ভট্টাচার্য আর একজন তাঁর ফুটবল জীবনের কড়া অভিভাবক মহম্মদ হাবিব। রয়েড স্ট্রিটের মেসে সুব্রত ভট্টাচার্য, ভাই আকবর-সহ জুনিয়রদের আগলে রাখাটাও ইতিহাসে ঢুকে গেছে।

১৯৬৬-তে যখন ফুটবলার হিসেবে কলকাতায় এসেছিলেন, নিজের টিমে তিনকাঠির নিচে পেয়েছিলেন পিটার থঙ্গরাজকে। রক্ষণভাগে ছিলেন শান্ত মিত্র। হাফব্যাকে পেয়েছিলেন প্রশান্ত সিনহাকে। আক্রমণভাগে সঙ্গে ছিলেন সুকুমার সমাজপতি। শুরু করেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলে। ১৯৮২-তে যখন ফুটবলার হিসেবে কলকাতা ছেড়েছিলেন, নিজের টিমে তিনকাঠির নিচে তখন তাপস চক্রবর্তী। রক্ষণভাগে তরুণ দে, হাফব্যাকে স্বপন রাউথ, আর আক্রমণভাগে, অরূপ দাস। বিদায় নিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গলে খেলেই। মাঝখানে ছিল সতেরো বছর, তিনটি বড়ো ক্লাব, শ’চারেক সহখেলোয়াড়, প্রায় সাতশো ম্যাচ, দুশোর উপর গোল, ৪৭টি ট্রফি জয়, অনন্ত লড়াই আর হাজারো স্মৃতির কুচকাওয়াজ।

১৯৭৩-এ কলকাতা লিগ, আইএফএ শিল্ড-এ, লোকটার ভার্চুয়াল লিডারশিপে আর লড়াইয়ে ইস্টবেঙ্গল পর্যুদস্ত করেছিলেন সুরজিৎ সেনগুপ্ত-সুব্রত চ্যাটার্জি-সৈয়দ নইমুদ্দিন-তরুণ বসু-বিনয় পাঁজা-বরুণ মিশ্র সমৃদ্ধ আমার সমর্থিত ক্লাব মোহনবাগানকে। তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়তাম। তার আগেও আট বছর ময়দান কাঁপিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু তাঁকে চোখের সামনে প্রথম দেখা ১৯৭৩-এই। ১৯৭৪-এর মার্চে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করে স্কুল ছাড়ি। সেই ময়দানের লোকটা কিন্তু আর ছেড়ে গেল না আমাকে।

সেই থেকেই বিস্ময়, শ্রদ্ধা, প্রেম, ইজ্জত, ভালোলাগা তৈরির শুরু লোকটাকে ঘিরে। তারপরে আরও এক বছর ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলে ১৯৭৫-এ মহমেডানে যাওয়া মহম্মদ হাবিব, ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮, এই তিন বছর সবুজ মেরুন জার্সিও পড়লেন। ১৯৭৯-এ আবার মহমেডানে গেলেন, তারপর তিন বছরে তিনবার দল পাল্টালেন। ১৯৮০-তে ইস্টবেঙ্গলে, ১৯৮১-তে মোহনবাগানে, ১৯৮২-তে আবার ইস্টবেঙ্গলে। আর তারপরে ফুটবলটাই ছেড়ে দিলেন। হাবিবের প্রতি আমার সেই বিস্ময়, শ্রদ্ধা, প্রেম, ইজ্জত, ভালোলাগা কিন্তু আর কখনও, কোনওদিন দল পাল্টায়নি।

১৯৭৬-১৯৭৮, নিজের চোখে বহুবার অকুতোভয় মহম্মদ হাবিবকে দেখেছি বল কাড়ার জন্য প্রতিপক্ষের বুটের সামনে মাথা পেতে দিতে। ভয় না পেয়েই প্রতিপক্ষকে ভয় পাওয়াতেন তিনি। যেখানে লড়াইয়ের আলো পড়ার কোন সুদূরতম সম্ভাবনাও ছিল না, সেখানেও লড়াইয়ের এলইডি আলো জ্বালিয়ে দিতেন তিনি, মহম্মদ হাবিব। এখনও জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রে যে কোনও লড়াই দেখলে আমি “মহম্মদ হাবিব” নামটাই পড়ি। ভারতের হয়ে ৩৩ ম্যাচে ১১ গোল, ১৯৭০-এ ব্যাঙ্কক এশিয়ান গেমসে ও কুয়ালালামপুরে মারডেকা ট্রফিতে ব্রোঞ্জ জেতা, ১৯৭১-এ সিঙ্গাপুরে পেস্তা সুকান টুর্নামেন্টে যুগ্ম বিজয়ী হওয়া, সন্তোষ ট্রফিতে অন্ধ্রপ্রদেশের হয়ে ১ বার (১৯৬৫) আর বাংলার হয়ে ৪ বার (১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭২ ও ১৯৭৫) চ্যাম্পিয়ন হওয়া, অন্ধ্রপ্রদেশের হয়ে ১ গোল আর বাংলার হয়ে ৩৩ গোল দেওয়ার সঙ্গে এই লড়াই ছিল অঙ্গাঙ্গীরূপে জড়িত।

১৯৮০-র অর্জুন পুরস্কার, ২০১৫-র ইস্টবেঙ্গলের ভারতগৌরব পুরস্কার আর ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার ছিল সেই লড়াইয়েরই সামান্য স্বীকৃতি, যার মধ্যে পদ্মশ্রী পুরস্কার অবশ্যই থাকা উচিৎ ছিল।

২০১৬ থেকে শুরু হওয়া পার্কিনসন আর গভীর অ্যালঝাইমার্সে ময়দানের সোনার স্মৃতিটুকুও মনে করতে পারতেন না আর শেষদিকে। অসুস্থতার বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই দিয়েও ক্রমশ আরও অসুস্থ হতে হতে ২০২৩-এর স্বাধীনতা দিবসে ‘অন্য মাঠে’ চলে গেলেন মহম্মদ হাবিব। কিন্তু তাঁর মাঠের লড়াই-সহ রয়ে গেলেন কলকাতার ফুটবল মননে। আর কে না জানে, মন বড় না হলে লড়াই করা যায় না, যায় না ফাইটার হওয়াও। যতদিন কলকাতায় ফুটবল থাকবে, ততদিন মাঠের যে কোনও লড়াই মনে পড়িয়ে দেবে এক ফাইটারকে, ফুটবলের জন্য জান কবুল করে যিনি কোনদিন ফুটবল ছাড়া, অন্য কোনও পেশা বেছে নেননি।

বড়ে মিয়াঁ আর হবে না। মহম্মদ হাবিব একজনই হন। ভালো থাকবেন, কলকাতা ময়দানের বড়ো মনের বড়ে মিয়াঁ।

Post Tags
Developed by DXDasia