
ফুটবলের পাশাপাশি তবলার তালেও জাদু দেখিয়েছিলেন ‘শিল্পী’ ফুটবলার
লাল-হলুদ জার্সিতে একের পর এক জয় এনেছিলেন যিনি, সেই সুরজিৎ সেনগুপ্ত আজ আর নেই। গত ২৩ জানুয়ারি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইএম বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। আজ দুপুরে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বছর সত্তরের বর্ষীয়ান ফুটবলার। বাংলা ফুটবলের ইতিহাসে আমাদের ‘মাঠের ছেলে’ ছিলেন সুরজিৎ সেনগুপ্ত (Surajit Sengupta)।
জন্ম হুগলি (Hooghly) জেলার চুঁচুড়ায়। জেলার ফুটবল দিয়েই শুরু হয়েছিল সুরজিতের পথ চলা। অশ্বিনী বরাট ছিলেন তাঁর কোচ। তিনিই প্রথম কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন সুরজিৎকে। সাতের দশকের শুরুতে খিদিরপুর ক্লাবের জার্সি গায়ে প্রথম পা রেখেছিলেন কলকাতা (Kolkata) ময়দানে। মোহনবাগান ক্লাব দিয়ে শুরু করলেও ১৯৭৪ সালে যোগ দেন লাল হলুদ বাহিনীতে। এরপর টানা ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন লাল-হলুদ বাহিনীর নায়ক। ১৯৭৮ সালে তাঁর অধিনায়কত্বে ইস্টবেঙ্গল (East Bengal Captain) যুগ্মভাবে ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন(Federation Cup) হয়েছিল। এছাড়াও সেই বছর ডুরান্ড কাপ (Durand Cup) এবং বরদলুই ট্রফিও পায় তাঁর নেতৃত্বে।
ইস্টবেঙ্গল ক্লাব থেকেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলেন সুরজিৎ। সাতের দশকের ময়দানে একদিকে রাইট উইং অন্যদিকে লেফট উইং -দুইয়েই তিনি পায়ের অসাধারণ জাদু দেখিয়েছিলেন। তাঁর একের পর অসাধারণ পাস সাক্ষী থেকেছে কত সব অবিস্মরণীয় গোলের। তাঁর দু’পায়ে ছিল জোরাল শট ছিল। দেখার মতো গোলের আবহ নির্মাণ করে মাতিয়ে রাখতেন মাঠের পরিবেশ। এমনকি কর্ণার থেকে গোল করেও অসাধারণ সব মুহূর্ত উপহার দিয়েছিলেন তিনি। এই সবকিছু নিয়েই তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন মাঠের নায়ক।
সময়টা ১৯৭৫ সাল। লাল-হলুদ বনাম সবুজ-মেরুন খেলায় তাঁর গোলেই প্রথম জয়ের মুখ দেখেছিল ইস্টবেঙ্গল। শুধু তাই নয়, জাতিয় ফুটবলের আঙিনায় তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নাম, সন্তোষ ট্রফিতে বাংলাকে বেশ কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এমনকি ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে এশিয়ান গেমসেও প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন সুরজিৎ।
একদিকে পায়ের জাদু, অন্যদিকে হাতের জাদু – সব মিলিয়ে সুরজিৎ সেনগুপ্ত হয়ে উঠেছিলেন শিল্পী ফুটবলার। সুরজিতের সুরের জগতও ছিল বেশ প্রশস্ত। তবলা বাদক হিসেবেও যথেষ্ট নাম করেছিলেন তিনি। বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করেছেন বেশ কয়েকবার। পরবর্তী জীবনে একটি বাংলা দৈনিকের ক্রীড়া বিভাগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
সারা জীবন বাংলা ফুটবলের সাধনা করেও সর্ব ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন থেকে স্বীকৃতি পাননি তিনি । পাননি পদ্মশ্রী কিংবা অর্জুন পুরস্কারও। এমনকি ২০১৭ সালে তাঁর পৈতৃক বাড়ি থেকে খেলোয়াড় জীবনের সব পদক, স্মারক ও সম্মানিকও চুরি হয়ে যায়, এ নিয়েও জীবনভোর আফসোসের সীমা ছিল না সুরজিৎ সেনগুপ্তের। কিন্তু তাতে সুরজিৎ সেনগুপ্তের কদর কমে না এক রত্তিও। সাতের দশক থেকে আজকের বাংলা ফুটবলের জার্নিতে সুরজিৎ থেকেছেন নায়কের ভুমিকায়। তাঁর খেলা আপামর খেলাপ্রেমী আপামর বাঙালির জন্য শিহরণ হয়ে থেকে যাবে আজীবন।
