
ফুটবলে মানুষ খুঁজে বেড়ায় বেঁচে থাকার অজুহাত
মাথার ভেতর একটা খোঁজ চলতে থাকে। খুঁজে পাওয়ার তাড়নায় বেঁচে যায় মানুষ, বারবার। প্রেমে, যুদ্ধে বা গানে। দেশপ্রেমে বা দেশভাগে। মানুষ নিজের জন্য একটা রুট খুঁজে ফেরে – শিকড় অর্থে হোক বা পথ – উদ্দেশ্য একটাই; নিজের অবস্থান কিছুটা দৃঢ় করা, নিজেদের আরও একবার চিনতে পারার চেষ্টা। কিন্তু শিকড়ে তো ফেরা হয় না কিছুতেই – শিকড় থাকে না, হারিয়ে যায় সীমান্তের অন্য দিকে, হারিয়ে যায় অভিবাসনের আখ্যানে – কারও রাষ্ট্রের সীমান্ত, কারও নিজের শরীরে। তবু মানুষ বেঁচে থাকার অজুহাত খুঁজে বেড়ায় – পাহাড়ে, পতাকায়, প্রতীকে। ক্লাবে, গানে অথবা ফুটবলে। (ফুটবল বিশ্বকাপ)
সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এবং চোখের জল দেখে বিশ্বাস হয় এই ট্রফি জয় শুধুমাত্র একটা ক্লাবের সাফল্য নয়। এ এক স্মৃতির প্রত্যাবর্তন। সমর্থকদের সমবেত একটা ঠিকানায় ফিরে যাওয়া, একটা সমবেত উচ্চারণ। স্মৃতি এবং ভালবাসার উত্তরাধিকার।
ক্রমশ ফুটবল অজুহাত থেকে ভরসা হয়ে ওঠে বহসংখ্যার মানুষের কাছে। এতটা এবং এতদূর অবধি সেই ভরসা, বিশ্বকাপের সময়ের বাঙালি ভুলে যায় পরের দিন অফিস আছে। যেমন ব্রাজিলের পরবর্তী ম্যাচের ফরমেশন চিন্তায় সারারাত ঘুমোতে পারে না ডন কার্লো এবং বাঙালি ফ্যানবেস, তেমনই পাড়ায় পাড়ায় একসঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চেয়ার, টেবিল, টিভি, পাখা, ফ্ল্যাগ, স্যান্ড এবং স্ট্যান্ডির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঈর্ষা – ওরা যেন আজ হেরে যায় ইশ্বর! মুখে অবশ্য খুব কেউ কিছু বলে না। কবেকার এক হাতে বলে হ্যান্ডবল থেকে রুপকথা- সেই প্রসঙ্গে কেউ আজও নির্দ্বিধায় ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের কলারে। কেন এত আবেগ? না জানা আছে তার দেশের ভাষা, না জানা আছে তার মানচিত্র – তাহলে সেই জার্সির ভেতর কীসের এত খোঁজাখুঁজি? আসলে দল নয়, মানুষ সমর্থন করে একটা স্বপ্ন, তা সে যতই বিরল হোক না কেন, হোক অবান্তর। প্রতি চার বছর পর পর বিশ্বকাপের হাত ধরে আসে অন্তর্গত হয়ে ওঠার এক অনুভূতি – হোক না সে প্রতিদিনের ব্যাক পাস, স্কোয়ার পাস জীবনের বাস্তবতার বাইরের কিছু। (ফুটবল বিশ্বকাপ)
তাই পাশের প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে যখন ফুটবল বিতর্ক ক্রমশ রাজনৈতিক বিতর্কের আকার নেয়, বন্ধ হয় কথা, মুখ দেখাদেখি, অবাক হওয়ার কিছু থাকে না তাতে। বিশ্বকাপ মরসুমে নিজের ভেতর গড়ে ওঠা ফ্যানাটিক বাধ্য করায় অমুককে আনফ্রেন্ড করতে। ফুটবল, রাজনীতি, প্রেম, যুদ্ধ সমস্ত এক হয়ে যায় তখন। তাই রাতের পর রাত জাগা, কুসংস্কারে চুল না আঁচড়ানো, আন্ডার গারমেন্ট না বদলানো ফ্যানের কাছে “খেলার আলোচনায় রাজনীতি কেন ঢুকছে?” প্রশ্নের সত্যই কোনও মানে থাকে না। বাইশ বছর পর যখন তাই আর্সেনাল লীগ জিতলে বুড়ো জেরেমি করবিন পথে নেমে উদযাপন করে। ইস্ট বেঙ্গল লিগ জিতলে কলোনি পাড়ায় সব দোকান থেকে ফুরিয়ে যায় দরবেশ, তখন অবাক লাগে না। ওই রাতে অলিগলিতে লাল হলুদ জামায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এবং চোখের জল দেখে বিশ্বাস হয় এই ট্রফি জয় শুধুমাত্র একটা ক্লাবের সাফল্য নয়। এ এক স্মৃতির প্রত্যাবর্তন। সমর্থকদের সমবেত একটা ঠিকানায় ফিরে যাওয়া, একটা সমবেত উচ্চারণ। স্মৃতি এবং ভালবাসার উত্তরাধিকার। (ফুটবল বিশ্বকাপ)
আমরা কেন অন্য দেশের জন্য হাসি, অন্য দেশের জন্য কাঁদি, তার কোনও ব্যখা হয় না। শুধু আবেগ আর অবস্থান। বিশ্বকাপে খেলতে আসা দেশ শুধু তাদের স্কোয়াড পাঠায় না। সঙ্গে থাকে তার ইতিহাস, উপনবেশ, যুদ্ধ, অভিবাসন, ক্ষত, অহংকার এবং অসমাপ্ত স্বপ্ন । এমনকি আপাত চোখে দেখতে না পাওয়া সেই সমস্ত দেশের মেয়েদেরও স্বপ্ন, লড়াই, বেঁচে থাকার ইচ্ছা, শিশুদেরও অধিকার। সরাসরি ফুটবলের সঙ্গে মেয়েদের অবস্থানের কী সম্পর্ক? হয়ত নেই, হয়ত আছে, হয়ত তৈরি হয় যখন চোকার হয়ে যাওয়া ক্লাবের মেয়েদের উপেক্ষিত দল প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতে আনলে সমর্থকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখে, মেয়দের দল ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে গেলে হয়ত সম্ভব হয় সমর্থকদের কাছে আর্জি জানানোর, ‘চলুন না, আমরা মেয়েদেরও খেলাও দেখতে যাই’ । হয়ত সম্ভব হবে না, হয়ত অনেক কাজ থেকে যাবে, হয়ত ছেলদের খেলার মত উত্তেজনা নেই, তাও আর্জিটুকু রাখা যায়। বিশ্বকাপে খেলতে আসা দলগুলো তাই তাদের মাঠের লড়াই এর পাশে নিয়ে আসে তাদের উদ্বাস্তু, এবরিজিন, নারী, শিশু, ট্রান্স, কুইয়ার সবার লড়াইয়ের অংশ, সবার স্বপ্নের গল্প। তাই, সমস্ত কিছুর মতই ফুটবলকে রাজনীতিমুক্ত রাখা যায় না। বর্তমান সময়ে কিছুটা স্টাইকার ওয়রশিপ, হিরো ওয়রশিপ, ম্যান দেখে দলবদলের বা তোমার হিরোকে ছোট করে আমার হিরোকে হিরোইজম এর শিখরে পৌঁছে দেওয়া ট্রেন্ডিং হলেও, মাঠে কান পাতলে ঠিক শোনা যায় যুদ্ধ বিমানের শব্দ, মানুষের আর্তনাদ, মানুষেরই হাহাকার। মাঠে চোখ রাখলে দেখা যায় যুদ্ধফেরত, গৃহহীন মানুষের স্বপ্ন।
বিশ্বকাপে খেলতে আসা দেশ শুধু তাদের স্কোয়াড পাঠায় না। সঙ্গে থাকে তার ইতিহাস, উপনবেশ, যুদ্ধ, অভিবাসন, ক্ষত, অহংকার এবং অসমাপ্ত স্বপ্ন। এমনকি আপাত চোখে দেখতে না পাওয়া সেই সমস্ত দেশের মেয়েদেরও স্বপ্ন, লড়াই, বেঁচে থাকার ইচ্ছা, শিশুদেরও অধিকার।
মাঠ চিনিয়ে দেয় মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গাকে। তাকে পৃথিবী চেনে ‘স্ট্যাচু ম্যান’ নামে—বছরের পর বছর মাঠে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক পাত্রিস লুমুম্বার ভঙ্গিতে। কোনও অভিনয় নয়; যতক্ষন খেলা চলে, উনি হয়ে ওঠেন এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ, এক প্রতিবাদ, ইতিহাসের পাতা । লুমুম্বা কেবল একজন নেতা হয়ে থেকে যান না, হয়ে ওঠেন আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের এক অসমাপ্ত বাক্য। তারপর কঙ্গো জিতলে বিশ্বকাপ যখন মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় পৌঁছয়, ফুটবল অনায়াসে পার করে সীমান্ত, কিন্তু লুমুম্বা ভিয়া থমকে যান, স্বপ্নের মতো আমেরিকায় পা দেওয়ার ভিসা তিনি পান না, ফলত সীমান্তের ওপারে প্রহরী হয়ে থেমে থাকেন তিনি। বিশ্বকাপ তো নিঃসন্দেহে বিশ্বজনীন; কিন্তু প্রশ্ন করতে হয়, বিশ্ব কতটা?
এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, আফ্রিকার দলগুলোকে আর রূপকথার ‘ডার্ক হর্স’ বলে অবহেলা করা যায় না। তারা প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা শুধু ইউরোপের ক্লাবে খেলতে যাওয়া প্রতিভার উৎস নয়; তারা নিজেদেরই ইতিহাস। বহু আফ্রিকান দেশের নক-আউটে উঠে আসা যেন ফুটবলের ভৌগোলিক ক্ষমতার মানচিত্র বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত। আরও বড়ো ইতিহাস বিশ্বকাপ জয়ী দলগুলোকে বিপাকে ফেলা। সবথেকে বড়ো ম্যাজিক লেখা হয় যখন গোল করার পর লোপেস কাব্রাল মাঠ থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে স্ট্যান্ডে থাকা বউকে। ম্যাজিক আবার হয় যখন ফ্রান্সের জন্য একের পর এক গোল করে রক্তে সেনেগাল, মালি, ক্যামেরুন বা আলজিরিয়ার ইতিহাস বহন করা খেলোয়াড়রা। ইয়ামালের বুটে পিতৃভূমি এবং মাতৃভূমির প্রতীক মনে করিয়ে দেয় ফুটবল একরৈখিক নয়। অভিবাসন, মিশ্র সংস্কৃতি, উপনিবেশ ও তার পরবর্তী অধ্যায় সমস্ত মিলে তৈরি হয় ফুটবলের ভূগোল। লাতিন আমেরিকার সমর্থকদের কাছে ফুটবল শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়, একটি সামাজিক ভাষাও। বস্তি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা থেকে সংসদ—সব জায়গায় ফুটবল একই আবেগে কথা বলে ওঠে। হয়তো সেই কারণেই কলকাতার মানুষও নিজেদের এত সহজে তাদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারেন।
কিন্তু বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক প্রশ্নটি অন্য।
প্রায়শই শুনছি – “ফুটবলের মধ্যে আবার রাজনীতি কেন?”
কোন রাজনীতি?
জাতীয় পতাকা আছে, জাতীয় সংগীত আছে, সামরিক বিমানের প্রদর্শনী আছে, বহুজাতিক সংস্থার কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন আছে- এর মধ্যে কীসের রাজনীতি! ফুটবলে মেয়েদের সমান অধিকার নেই, একজন মানুষের কুইয়ার পরিচয় নিয়ে উদ্বাস্তু পরিচয় বহন করে বুক চিতিয়ে গ্যলারিতে দাঁড়ানোর স্বাধীনতা নেই, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারার অধিকারও প্রায় নেই। প্রশ্নটা আসলে ফুটবলে রাজনীতি আছে কি নেই, সে নয়। প্রশ্নটা হল—কার রাজনীতিকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, আর কার রাজনীতিকে অস্বস্তিকর বলে চুপ করিয়ে দিতে চাই।
প্রশ্নটা আসলে ফুটবলে রাজনীতি আছে কি নেই, সে নয়। প্রশ্নটা হল—কার রাজনীতিকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, আর কার রাজনীতিকে অস্বস্তিকর বলে চুপ করিয়ে দিতে চাই।
ফুটবল পারে না সমাজ বদল করতে। সে দায়ও নেই তার। কিন্তু সমাজের অসাম্যকে প্রকট করতে পারে। মহিলাদের ফুটবলে এখনও নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। কুইয়ার সমর্থকদের অনেক দেশেই নিরাপত্তার প্রশ্নে ওঠে। একজন অভিবাসী গোল পেয়ে যত তাড়াতাড়ি হিরো হয়ে ওঠে; তার আগেই গোল না পেলে হয়ে যায় বহিরাগত।
হয়তো এই কারণেই কলকাতা পৃথিবীর অন্য অনেক শহরের চেয়ে ফুটবলকে অন্যভাবে বোঝে। কারণ এই শহরে ফুটবল কোনও দিন শুধুমাত্র অফসাইডের অঙ্ক ছিল না। এ এক দেশভাগের ইতিহাস, উদ্বাস্তু মানুষের আত্মপরিচয়, শ্রমজীবী মানুষের গর্ব, পাড়ার ক্লাব, চায়ের দোকানের তর্ক, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা বিশ্বাসের নাম।
বিশ্বকাপ এখানে শুধু টেলিভিশনের পর্দায় খেলা হয় না। খেলা হয় বারান্দায়, পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে, রাতজাগা আড্ডায়। খেলা হয় স্মৃতিতে। অচেনা দেশের জন্য কাঁদি, মানচিত্র না চেনা খেলোয়াড়ের জন্য লড়াই করি ঘোর আত্মীয়ের সঙ্গে। কাদের পতাকা গায়ে জড়িয়ে বেঁচে থাকি একাত্ম হওয়ার ইচ্ছা । প্রতিবার বাঁচিয়ে দেয় ফুটবল।
হয়তো সেই কারণেই ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে রাজনৈতিক খেলা। কারণ এটি ক্ষমতার রাজনীতি শেখায় না; এটি শেখায় স্মৃতির রাজনীতি, ভালোবাসার রাজনীতি, ফিরে পাওয়ার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি। ট্রফি একদিন জাদুঘরে চলে যায়, ফলাফল ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যায়। কিন্তু কোনও দেশ, তার পতাকা, কোনও ক্লাব, বিশ্বকাপ—মানুষকে এক অন্তর্গত করে।
এর থেকে বড়ো জিতে আসা আর কীই বা হতে পারে!
________________
মতামত লেখকের নিজস্ব
