মেসি, রোনাল্ডো, ভিনিয়াসদের ‘ভোকাল টনিক’ দিতে প্রস্তুত ট্রেনের কামরা থেকে পাড়ার ঠেক
২০২৬, জুন। সবে ভোটের ঝক্কি সামলে উঠছে বাংলা। এরই মধ্যে এক অদ্ভুত রোগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকেরা নাজেহাল। চার বছর পর রোগ ফিরে এসেছে! উপসর্গ একাধিক। কেতাদুরস্ত বাঙালি অ্যালার্ম ছাড়াই মাঝরাতে, ভোররাতে উঠে পড়ছে। কাক ভোরে কিংবা গভীর রাতে গোল গোল বলে চিৎকার করছে। ঢুলু ঢুলু চোখে সারাদিন অফিস করছে। অফিস-ট্রেন-মেট্রোতে লবি তৈরি করছে। পাড়ায় গড়ছে গোষ্ঠী। বন্ধু, পড়শি, সহ-কর্মীদের সঙ্গে হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ রাখছে। ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে করতে চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে, তার সলিল সমাধি ঘটাচ্ছে। শ্যামবাজারগামী মিনি বাসে উঠে বলছে সাও পাওলো যাবো। কেউ আবার বিধাননগরের অটোয় উঠে দাবি করছে, বুয়েনোস আইরেসে পৌঁছে দিতে হবে। মারাদোনা, পেলে, বেকেনবাওয়ার, রোনাল্ডো, মেসি, নেইমারদের ছবিতে ধূপধুনো দিচ্ছেন কেউ কেউ। প্রেমিকাদের সময় দিচ্ছেন না প্রেমিকরা। ডাক্তারবাবুরাও দিশেহারা, দাওয়াই নেই। তাঁরাও সংক্রমিত হয়েছেন। শিক্ষক, পড়ুয়া কারও মন নেই লেখাপড়ায়। বাজার করতে বেরিয়ে অনেকে বাড়ি ফিরতে ভুলে যাচ্ছেন। মজে থাকছেন ফুটবলের গালগল্পে। গিন্নিবান্নিরা মাছ কাটবেন বলে, অপেক্ষা করছেন বঁটি হাতে। জানা যাচ্ছে, রোগের নাম ‘ফুটবল বিশ্বকাপ জ্বর’। গোটা রাজ্য এই জ্বরে কাবু। জানা যাচ্ছে, জ্বরের জন্য দায়ী ফিফা (ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬)।
পানিহাটির পল্টু যেন পর্তুগিজদের প্রতিনিধি হয়ে রোনাল্ডোর উদ্দেশ্যে প্রতি ঘণ্টায় ভোকাল টনিক দেন। মনোজজেঠু নিজেকে ভাবেন মেসির কোচ, অজয়নগরে বসে ‘ভাইব’ নেন আর্জেন্টিনার। কেউ জার্মানি, কেউ ইতালি, কেউ ফ্রান্স। এই মাসখানেক বাঙালি বিশ্বনাগরিক।
সুদূর মার্কিন মুলুকে বসেছে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। বরাবরের মতো ফুটবল বিশ্বযুদ্ধের পারদ চড়ছে বাংলায়। বালি থেকে বেহালা, কাঁথি থেকে কলকাতা, ভাসছে ফুটবল আবেগে। এই সময়টায় বাঙালিদের দ্বৈত নাগরিকত্ব জেগে ওঠে। বাঁকুড়ার বিশুকাকু হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের ভোটার। পারলে দু’বেলা ভিনিয়াসকে মাঠে দৌড় করিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। পানিহাটির পল্টু যেন পর্তুগিজদের প্রতিনিধি হয়ে রোনাল্ডোর উদ্দেশ্যে প্রতি ঘণ্টায় ভোকাল টনিক দেন। মনোজজেঠু নিজেকে ভাবেন মেসির কোচ, অজয়নগরে বসে ‘ভাইব’ নেন আর্জেন্টিনার। কেউ জার্মানি, কেউ ইতালি, কেউ ফ্রান্স। এই মাসখানেক বাঙালি বিশ্বনাগরিক। (ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬)
চেনা পাড়া, চেনা গলি সেজে ওঠে নতুন মোড়কে। বাড়ির বারান্দা, ছাদ থেকে ঝুলতে থাকে হলদে-সবুজ বা নীল-সাদা পতাকা। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি দড়ি বেঁধে টাঙানো হয় বিভিন্ন দেশের ফ্ল্যাগ। রাস্তার দু’ধারে থাকে কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের ‘কাট আউট’। রং-চটা, পলেস্তারা খসে পড়া দেওয়ালগুলো পছন্দের টিমের রঙে রেঙে ওঠে। ভিড় জমে ফটোগ্রাফারদের। ছবি শিকারীদের কল্যাণে এক একটি পাড়ার সাজসজ্জা নেটপাড়ায় ভাইরাল হয়। উত্তর কলকাতার প্রাচীন কোনও গলির নাম হয়ে যায় ‘ফিফা গলি’। মুষলধারে রিল বানানো হয়। ‘জাগো বেনিতো’, ‘ওয়াকা ওয়াকা’, ‘গিভ মি ফ্রিডম’-এর তালে, মাদকতায় ভেসে যায় মহল্লা। বাঙালি শাকিরাকে ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আখ্যা দিয়ে ফেলেছে। মহালয়া ছাড়া এই একটা সময় বাঙালির কাকভোরে উঠতে সমস্যা নেই। বাহানা নেই। আছে উন্মাদনা। রাত জাগায় ক্লান্তি নেই। ফুটবল নিয়ে বকবকে বিরক্তি নেই। চায়ের দোকান থেকে ক্লাব ঘর, পাড়ার ঠেক থেকে ট্রেনের কামরা, সরগরম থাকে ফুটবলের আলোচনায়। তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক। চায়ের কাপে তুফান ওঠে। দোস্তি ভেঙে মাসখানেকের বৈরীতার জন্ম হয়। আড়াআড়ি ভাগ হয় বন্ধুত্ব। পরিবারের মধ্যেও ছাড়াছাড়ি হয়। বন্ধ থাকে বাক্যবিনিময়। মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়। বাংলায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার অনুরাগীর সংখ্যাই সর্বাধিক। প্রজন্মের পর প্রজন্মে ধরে দুই দলের সমর্থকেরা লড়ছেন। ক্রসেডকেও হার মানিয়েছে সে লড়াই। বাবা-জ্যাঠারা লড়ছেন পেলে বড়ো নাকি মারাদোনা বড়ো নিয়ে, সে তর্ক এসে দাঁড়িয়েছে মেসি না নেইমারে, তর্কের আসরে ঠাঁই পান খাঁটি পর্তুগিজ রোনাল্ডোও! এমবাপের নামও এসে পড়ে আজকাল। (ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬)
বাঙালি শাকিরাকে ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আখ্যা দিয়ে ফেলেছে। মহালয়া ছাড়া এই একটা সময় বাঙালির কাকভোরে উঠতে সমস্যা নেই। বাহানা নেই। আছে উন্মাদনা। রাত জাগায় ক্লান্তি নেই। ফুটবল নিয়ে বকবকে বিরক্তি নেই।
এক শিবিরের প্রিয় দল হারলে অন্য শিবিরের তরফে জোটে টিটকিরি। পাল্টা দেওয়ার সময়ও আসে। কোনও ছাড়াছাড়ি নেই। ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে হিসাব মিটিয়ে দেন ফুটবলপ্রেমীরা। আবার একটা ভালো গোল দেখলে বা চোখ ধাঁধানো শট হলেই যুযুধান দুই শিবিরের ফুটবল পাগলরা একে অন্যকে আলিঙ্গণ করেন। ফুটবল যেমন ঝগড়ার জন্ম দেয়, দূরে ঠেলে দেয় বন্ধুদের, আবার সেই ফুটবলই জড়িয়ে ধরতে শেখায় একে অপরকে। ভালোবাসায় বেঁধে রাখে।
আদতে বিশ্বকাপ বাঙালির স্মৃতির ঝাঁপি। নতুন টেলিভিশন সেট কিনে আনা, স্ক্রিন ঝিরঝির করলে ছাদে উঠে অ্যান্টেনা ঠিক করা, পড়শি-বন্ধু মিলে এক জোট হয়ে বসে খেলা দেখা, ক্লাবে ক্লাবে পর্দা টাঙিয়ে খেলা দেখানো, অফার, ডিসকাউন্ট, টিভি কেনার ধুম পড়ে যাওয়া, রাত জাগা, বাড়ির বাইরে রাত কাটানোর অনুমতি পাওয়া, ম্যাচ শুরুর আগে পিকনিক, বিশ্বকাপের জন্যেই এ সব পেয়েছে মধ্যবিত্ত বাঙালি। ঠিক যেন রূপকথার গপ্পের মতো… স্মার্টফোন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখা যায় ঠিকই কিন্তু নয়ের দশকের এ’ মাদকতা? পঞ্চাশ-ষাটজনে ঘর-গমগম করা হই-হুল্লোড়ের স্বাদ মেলে কি?
আদ্যন্ত ফুটবলপ্রেমী দম্পতি পান্নালাল চট্টোপাধ্যায় ও চৈতালি চট্টোপাধ্যায় চার বছর ধরে টাকা জমাতেন বিশ্বকাপ দেখবেন বলে। মুড়ি খেয়ে, আধপেটা খেয়ে, মাছ না-খেয়ে সঞ্চিত অর্থ নিয়ে চলে যেতেন বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে। ভাবা যায়!
বিশ্বকাপ বাঙালির স্পর্ধাও বটে। আদ্যন্ত ফুটবলপ্রেমী দম্পতি পান্নালাল চট্টোপাধ্যায় ও চৈতালি চট্টোপাধ্যায় চার বছর ধরে টাকা জমাতেন বিশ্বকাপ দেখবেন বলে। মুড়ি খেয়ে, আধপেটা খেয়ে, মাছ না-খেয়ে সঞ্চিত অর্থ নিয়ে চলে যেতেন বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে। ভাবা যায়! কলকাতা ময়দানের ‘পানুদা’, ১৯৮২ সালে স্পেনে প্রথমবার বিশ্বকাপ দেখতে গিয়েছিলেন স্ত্রীকে নিয়ে। সেই শুরু। ২০১৮ বিশ্বকাপেও রাশিয়ায় গিয়েছিলেন দু’জনে। খিদিরপুরের এই দম্পতি দশ দশটি বিশ্বকাপ মাঠে বসে দেখেছেন। এটা স্পর্ধা নয়? মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্নউড়ান নয়?
ফুটবল বাঙালিকে লড়তে শিখিয়েছে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেপুলেদের জুটিয়ে দিয়েছে চাকরি। নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী থেকে শিবদাস ভাদুড়ি, ফুটবল বারবার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মশালে বারুদ হয়ে জ্বলে উঠেছে। আজ ময়দানে বাঙালির দাপট নেই। কিন্তু প্রেমটা, ফুটবলকে ঘিরে থাকা রোম্যান্স এখনও রয়ে গিয়েছে। সেই ভালোবাসার স্বাদ চেটেপুটে নিতে আজও বিশ্বকাপ শুরু হলে বাঙালিকে ধরে রাখা যায় না। ময়দান মার্কেট থেকে সে প্রিয় দলের জার্সি, পতাকা কিনে আনবেই। অসুখবিসুখকে থোরাই কেয়ার করে রাত জাগবে, উত্তেজিত হবে। বন্ধু, পরিজনদের সঙ্গে জমিয়ে কাজিয়া করবে। অফিস ডুব দেবে। প্রিয় দল জিতলে কাঁদবে, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের ঠেস দেবে। হাসবে। মধ্যরাতে ইএমআইয়ের চিন্তা ভুলে নাচবে। ভারত না খেলুক! ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, পর্তুগাল, মেসি, রোনাল্ডোদের হয়ে গলা ফাটানোতেই তৃপ্তি খোঁজে বাঙালি। চার বছর অন্তর অন্তর এই মনের আরামটুকু বয়ে আনে ফুটবল বিশ্বকাপ।