ব্রাজিলীয় ফুটবলের আকাশচুম্বী গোল্ডেন পিরিয়ডের শুরুটা ১৯৫০ সালে
কলকাতার গলিপথ সেজে উঠেছে ব্রাজিলের রঙে
‘সমু দেখল ঘাড়ের চুল সাদা হয়ে গেছে বাবার। তার মানে বুড়ো। এই বয়সে খেলা নিয়ে কেউ এমন ক্ষেপে ওঠে কিনা জানা নেই। বাড়িতে টিভি নেই বলে খেলা দেখছে পরিমল বোসের বাড়িতে। মুখে সারাক্ষণ ব্রাজিল, ব্রাজিল। সেদিন জোসিমারের শটটা গোলে ঢোকার মুখে উত্তেজনায় ‘গোল—’ বলে চেঁচিয়ে ওঠার সঙ্গে পা ছুড়েছিল আচমকা। লাথির ধাক্কায় পরিমল বোসের সোফার সামনে রাখা টেবিলের কাচ সরে যায়। সেটা জায়গায় আনতে আনতে পরিমল জিজ্ঞেস করে, ‘নিজেও খেলতেন নাকি?’ কিঙ্কর জবাব দিতে পারেনি। নিজের ব্যবহারে নিজেই অপ্রতিভ, টিভির আলোয় বাবাকে অসম্ভব হেরে যাওয়া লাগছিল তখন। এখনও লাগছে…’
মুখে সারাক্ষণ ব্রাজিল, ব্রাজিল। কলকাতার বাঙালি, টাউনশিপের বাঙালি, কাদা মাঠে রবারের বলে পা ছোঁয়ানোর জন্য উসখুশ করা বাঙালির আমৃত্যু ব্রাজিল প্রেম। ঠিক কজন ক্লাব ফুটবল দেখে? আজকের প্রজন্মের একটা বিরাট অংশ বাদ দিয়ে যে প্রজন্মটাকে আমরা ওই ঘাড়ে সাদা হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে এক এক করে হারাচ্ছি আজ, কাল – তাঁরা? খুব সামান্যই। এবং এই অংশের অবিসংবাদিত ব্রাজিল প্রেমের বেশ কিছুটা লেগ্যাসি ধরেই আজকের প্রজন্মের বিরাট একটা অংশও সাম্বা ম্যাজিকে আচ্ছন্ন। এবং সেই লেগ্যাসি চলছেই। উত্তাল সত্তরের ফুটবল কলকাতার সিগনেচার। আর ঠিক তখনই পেলের শেষ বিশ্বকাপ। দলটা কেমন? গোলে ফেলিক্স। লেফট ব্যাকে এভারেল্ডো, রাইট ব্যাকে কার্লোস আলবার্তো। দুজনের মাঝে ব্রিটো, পিয়াজা। রাইট ও লেফট হাফে যথাক্রমে ক্লদোয়াল্ডো ও গার্সন। আউটসাইড রাইটে জরজিননো, রিভেলিনো লেফটে। আর দুই সেন্ট্রাল ফরওয়ার্ড? অবশ্যই টোস্টাও এবং পেলে। মোটামুটি এই প্রথম দল। এঁদের সামনে রেখে নীরবে থাকা টগবগে মারিও জাগালো। কালো রঙের মানুষ। এরা জেতার জন্য খেলে না, অথচ আনন্দ, তীব্র আনন্দই জিতিয়ে দেয়। জোগো বোনিতো। হারলে গোটা দেশ হারছে। পেলেকে মার্কিং করার দায়িত্বে থাকা ইতালীয় বুর্গনিচ বলেছিলেন – “উই জাম্পড টুগেদার, বাট হোয়েন আই ল্যান্ডেড, আই কুড সি পেলে ওয়াজ স্টিল ফ্লোটিং ইন দ্য এয়ার।” বাংলাও লাফাল। পার্সোনফিকেশন করল। ভাসল। সত্তরের মেক্সিকো থেকে বিশ্বায়ন, হিংস্র আধুনিকতার দু-হাজার বাইশ। অ্যান্ড দে আর স্টিল ফ্লোটিং ইন দ্য এয়ার…
উত্তাল সত্তরের ফুটবল কলকাতার সিগনেচার। আর ঠিক তখনই পেলের শেষ বিশ্বকাপ। দলটা কেমন? গোলে ফেলিক্স। লেফট ব্যাকে এভারেল্ডো, রাইট ব্যাকে কার্লোস আলবার্তো। দুজনের মাঝে ব্রিটো, পিয়াজা। রাইট ও লেফট হাফে যথাক্রমে ক্লদোয়াল্ডো ও গার্সন। আউটসাইড রাইটে জরজিননো, রিভেলিনো লেফটে।
ব্রাজিলীয় ফুটবলের আকাশচুম্বী গোল্ডেন পিরিয়ডের শুরুটা ১৯৫০। সেই ১৯৫০, যখন ফিলিপিন্স নাম তুলে নেওয়ার পর অপ্রত্যাশিতভাবে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ চলে আসে ভারতবর্ষের। এবং সেখানেই স্টিগমা অফ ইন্ডিয়ান ফুটবল। এআইএফএফ থেকে জানানো হল ভারত যাচ্ছে না ব্রাজিল। দেখছে না মারাকানা। কেন? ‘Disagreement over team selection and insufficient practice time…’। আসলে সংস্থার নিজের গাফিলতি, উদাসীনতা এবং ১৯৪৯-এর জানুয়ারি থেকে পরের ১৬ মাসের একগাদা টিম মিটিং-এ অশ্বডিম্ব প্রসব, যার পরিণতি এক ঐতিহাসিক ভুল। খালি পায়ে খেলতে হবে বলে দল না পাঠানোর কমন মিথ দাগিয়ে দেওয়া হল তার সঙ্গে। লোকে জানলই ১৯৫৩ সালের আগে বুট পরে খেলা বাধ্যতামূলক করেনি ফিফা। তাছাড়া ১৯৫২ হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে অধিকাংশ ভারতীয় খেলোয়াড়ের বুট ছিল না। যাই হোক, খেদ, খেদ এবং খেদ – এবং সেই খেদ এমন এক বিশ্বকাপে যেখানে ট্রফি না এলেও মনে থেকে যাবে আদেমিরের বিশ্বকাপ বলে। মনে থেকে যাবে, একটা কালো রঙের দলের ক্রমশ ফুটবল বিশ্ব শাসন করার বিশ্বকাপ হিসেবে। বাঙালির ইমেজ-মেকিংয়ে ব্রাজিল, ওরফে মিডলক্লাস ঠোঁটে ‘ব্রেজিল’-এর এই রাজ্যের লেক্সিকনে ঢুকে পড়ার সেই শুরু।

কলকাতার রাস্তায় ব্রাজিলের পতাকা
‘গালের কাটা জায়গায় ফিটকিরি ঘষতে ঘষতে কিঙ্কর দেখল, সামনে ফ্রান্সের গোল, উৎকণ্ঠায় ছটফট করছে ওদের গোলকিপার জোয়েল বাতস, আর গোটা এরিয়া জুড়ে নিপুণ ছন্দে ঘোরাফেরা করছে কয়েকটা সবুজ শর্টস, হলুদ জার্সি। ডানদিক থেকে লব করা বলটা কোনাকুনি ছুটে যাচ্ছে পেনাল্টি বক্সের দিকে। ওখানে সক্রেটিস, অ্যালমাও, এডিনহো, কারেকা। সম্ভবত মাথা ছোঁয়াবে। গোল হবেই। ভাবতে ভাবতে জ্বরে-জাগা অনুভূতি নিয়ে কাঁপতে লাগল সে।’
সাতাত্তরের কসমস। একদিন প্র্যাকটিস শেষে তাঁবুতে ঢোকার মুখে কোচ পিকের কাছে এসে কী যেন বললেন ধীরেন দে। একটু পরেই কোচের কণ্ঠস্বর – ‘শোনো, পেলে কলকাতায় আসছেন’। আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলা প্রথম বাঙালি গোলরক্ষক সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ছেলেকে খেলার আগে বললেন, ‘দেখো, কসমস যদি ফ্রি-কিক পায়, তাহলে কিন্তু পেলেই মারবে। আর গোটা মাঠও কিন্তু পেলেকেই সাপোর্ট করবে। কারণ সবাই পেলের গোল দেখতে চায়।’ সেই রাতের গ্র্যান্ড ডিনারে শিবাজীর দিকে তাকিয়ে ধীরেন দে-কে বলছিলেন পেলে, ‘দিজ ইজ গর্ডন ব্যাঙ্কস, হি সেভড হিজ টিম টুডে।’ একজন, শুধু একজনকে দেখে একটা গোটা টিমের চেগে যাওয়া, টনি ফিল্ডকে সুধীর কর্মকার একটা স্পষ্ট স্লাইডিং ট্যাকল করেও দুর্বোধ্য পেনাল্টি, ২-১ থেকে গোল শোধ – সবমিলিয়ে এই ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ ঐতিহাসিক মোহনবাগান-নিউ ইয়র্ক কসমস ম্যাচ পেলেকে ভেতরে ভেতরে গেঁথে দেয়। আর পুরোটা জুড়েই ব্যাকগ্রাউন্ডে কোচ পিকের ভোকাল টনিক, ‘পেলেকে জায়গা দিও না, জায়গা দিও না। মাঠ ছোটো করে দাও।’ পেলেকে আসলে মাঠে নয়, অন্য একটা জায়গা দিয়ে ফেলল বাঙালি। বুকের ভেতরে।
সেই সাতাত্তরের পর বিরাশির নেহেরু কাপ। যেন ব্রাজিল-সুলভ আর একটা দল। উরুগুয়ে। ক্রমশ লাতিন আমেরিকায় ঢুকে পড়া কলকাতার পাড়ার রোয়াক। ফ্রিকিক-মাস্টার র্যামোস। ম্যাজিকাল ফ্রান্সিসকোলি। যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের ২-১ গোলে জয়।
সেই সাতাত্তরের পর বিরাশির নেহেরু কাপ। যেন ব্রাজিল-সুলভ আর একটা দল। উরুগুয়ে। ক্রমশ লাতিন আমেরিকায় ঢুকে পড়া কলকাতার পাড়ার রোয়াক। ফ্রিকিক-মাস্টার র্যামোস। ম্যাজিকাল ফ্রান্সিসকোলি। যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের ২-১ গোলে জয়। চুরাশির নেহেরু কাপে বুরুচাগা-পম্পেদু। সেই বুরুচাগা, যে ছিয়াশির রাজপুত্রের ডানহাত, স্বপ্নসঙ্গী। এই ছিয়াশি থেকেই লাতিন আমেরিকা প্রেমের লেক্সিকনে ঢুকে যাওয়া অন্য একটা দেশ। এবং তা সিঙ্গল হ্যান্ডেডলি, একজন মানুষকে কেন্দ্র করেই। ঠিক এইখানেই ব্রাজিলের সঙ্গে ফারাক। শুধুমাত্র পেলেই কিন্তু ভালোবাসাটা তৈরি করেননি। সন্দেহ নেই, দ্য লাস্ট ম্যান অন দ্য ফ্রন্টইয়ার্ড তিনিই। তবু, লড়াইয়ে, ভালোবাসায় আরও অনেকে ছিল। অনেকে আছে…

কলকাতার বাড়ির ছাদে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার লড়াই
“- ‘ব্রাজিল কোথায়?’
– ‘দক্ষিণ আমেরিকায়’। সে এক আশ্চর্য দেশ!’ কিঙ্করের চোখদুটো আরও বড়ো হয়ে দেয়াল পর্যন্ত ছুটে গেল। টিভি রাখার জন্য এখন থেকেই ওখানে জায়গা করে রাখছে সমু। পর্দায় হলুদ জার্সি ভেসে উঠল পরপর। ওরা মাঠে নামছে। এরপর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। দৃঢ়বদ্ধ মুখের সঙ্গে একে একে ফুটে উঠবে নামগুলো। সেদিকে তাকিয়ে কিঙ্কর বলল, ‘পেলে, গ্যারিঞ্চা, টোস্টাও, জোয়ারজিনহোর দেশ – ওরা হারতে জানে না –‘”
____
ক্রমশ…
(পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে ২৮ নভেম্বর, সোমবার)
কৃতজ্ঞতা – দিব্যেন্দু পালিত