ওয়ার্কিং ক্লাস, হেরেও হেরে না যাওয়া বাঙালি মধ্যবিত্ত ব্রাজিলকেই নিজের বলে বাছল
কলকাতার গলিপথ সেজে উঠেছে ব্রাজিলের রঙে
“– ‘ব্রাজিল কোথায়?’
-‘দক্ষিণ আমেরিকায়’। সে এক আশ্চর্য দেশ!’ কিঙ্করের চোখদুটো আরও বড়ো হয়ে দেয়াল পর্যন্ত ছুটে গেল। টিভি রাখার জন্য এখন থেকেই ওখানে জায়গা করে রাখছে সমু। পর্দায় হলুদ জার্সি ভেসে উঠল পরপর। ওরা মাঠে নামছে। এরপর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। দৃঢ়বদ্ধ মুখের সঙ্গে একে একে ফুটে উঠবে নামগুলো। সেদিকে তাকিয়ে কিঙ্কর বলল, ‘পেলে, গ্যারিঞ্চা, টোস্টাও, জোয়ারজিনহোর দেশ – ওরা হারতে জানে না –‘”
গ্যারিঞ্চা। ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো ডস স্যান্টোস। ডান পা বাঁ পায়ের চেয়ে ৬ সেন্টিমিটার ছোটো। দুই পায়ের পাতার কারভেচার অদ্ভুত। সমসাময়িক এক সাংবাদিকের বক্তব্য ছিল – ‘With those bowlegs, both curving in the same direction, legs that were nearly crippled, it should not have been possible for him even to walk properly. His entire body was unbalanced. …. On the contrary, it was he who unbalanced other players. How to explain this phenomenon?’ এই হার্ড টু এক্সপ্লেইন এক একটা রহস্য। ফেনোমেনন। ডিডি। পায়ে ইনফেকশন হয়ে প্রায় বাদ দেওয়ার পর্যায় থেকে ম্যাজিকাল এক মানুষ হওয়ার মাঝের সময়টুকু অসম্ভব লড়াইয়ের ছিল ডিডির। পেলে বলেছিলেন – ‘আই অ্যাম নাথিং, কমপেয়ারড টু হিম’। ড্রাই লিফ, ডেড লিফ শট – বাঁকানো ফ্রিকিকে শেষমুহূর্তে গোঁত্তা খাইয়ে গোল এবং তা থেকেই পরে শিরদাঁড়ায় অসুখ। সেই ডিডি। ওরফে মা-বাবার দেওয়া ওয়াল্ডির পেরেরা। এডওয়ার্ড গ্যালিয়ানোর বইয়ের সেই আফ্রিকান মানুষ, যে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক একটা বিষ তীর বের করতেন। অথবা একমাথা চুলের ‘হ্যারিকেন’ জোয়ারজিনহো। বা ফর্সা মিষ্টি হাসির টোস্টাও। সত্তরের ফাইনালের আট মাস আগে রেটিনা শেষ হয়ে যেতে যেতেও ফিরে আসা এক জাদুবাস্তবের মানুষ। পেলের সঙ্গে যাঁর টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ, টোস্টাও নিজে যাকে বলতেন, ‘অ্যানালগ কমিউনিকেশন’। পেলের ছোট্ট পাসে ফাইনালে কার্লোস আলবার্তোর ওই গোলার মতো শট। বালির মাঠে ফুটবল খেলে বড়ো হওয়া ১১ নম্বরের ‘অ্যাটমিক কিক’ নেওয়া করিন্থিয়ান্স রিভেলিনো। আর এই জুয়েল টিমের সঙ্গেই বড়ো হওয়া কলকাতার দুই ক্লাব। কলকাতার ফুটবল, উত্তাল সত্তরের সঙ্গে সমাপতন পৃথিবীর সর্বকালের সম্ভবত সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল টিমের। বাঙালি তুলনা করল। ট্রেনে বাদাম বিক্রি করে রবারের বল কিনে প্র্যাকটিস করা পেলের লড়াইকে নিজের লড়াই বলে ভাবল। যুবভারতীর ডার্বিকে মনে করল মারাকানার ফ্ল্যামেঙ্গো-ফ্লুমিনেন্স রাইভ্যালরি। ওয়ার্কিং ক্লাস, হেরেও হেরে না যাওয়া বাঙালি মধ্যবিত্ত এই দলটাকেই নিজের বলে বাছল। কারণ এই খেলাটাই তাদের নিজের। এরিক হবসবমের কথায় – ‘সেকুলার রিলিজিয়ন অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস…
ট্রেনে বাদাম বিক্রি করে রবারের বল কিনে প্র্যাকটিস করা পেলের লড়াইকে বাঙালি নিজের লড়াই বলে ভাবল। যুবভারতীর ডার্বিকে মনে করল মারাকানার ফ্ল্যামেঙ্গো-ফ্লুমিনেন্স রাইভ্যালরি। ওয়ার্কিং ক্লাস, হেরেও হেরে না যাওয়া বাঙালি মধ্যবিত্ত এই দলটাকেই নিজের বলে বাছল। কারণ এই খেলাটাই তাদের নিজের। এরিক হবসবমের কথায় – ‘সেকুলার রিলিজিয়ন অফ দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস…

কলকাতার রাস্তায় ব্রাজিলের পতাকা
“দিলীপ উঠল না। খানিক অপলক কিঙ্করের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আপনি অদ্ভুত লোক! ব্রাজিলকে এমন ফ্যানাটিকালি সাপোর্ট করার কারণ কী?’
‘কারণ —?’ আর এগোতে না পেরে কিঙ্করের মুখে সেই ছায়া ফুটল যা তাকে প্রায়ই দিশেহারা করে দেয়। সময় নিয়ে বলল, ‘কেন বলো তো! কেন মনে হয় ব্রাজিল আমারই দল, যারা আমাদের মতো —‘”
বিরাশি থেকে ছিয়াশি। আগের দুবার ট্রফির কাছাকাছিও না যাওয়া একটা খিদে, জ্বালা। ইন দ্য মিনটাইম কলকাতা ফুটবল আরও সাম্প্রতিক হচ্ছে, ছোঁয়া পাচ্ছে বিদেশি নামগুলোর। এবং টিভি আসছে। আর ওই যে বললাম, হারা, হারা, হারার জ্বালা। ওই জ্বালাই আরও কাছে করে দিচ্ছে দেশটাকে। এখন আর রং না। বাঙালি দেশটাকেই ভালোবাসছে। আর তাই আর্থার আন্তুনুয়েস কোয়েমব্রা থেকে জিকো হতে সময় লাগছে না বিশেষ। কারণ পেলে যে বলে গেছেন – ‘জিকো ইজ দ্য অনলি ওয়ান হু রিসেম্বলস মাই প্লেয়িং মেথড …’ বা সাওপাওলোর মিডল ক্লাস পরিবার থেকে উঠে আসা ‘ডক্টর’ সক্রেটিস – সেলিব্রেশনের সময় একহাতে সিগারেট, অন্য হাতে বিয়ার। শরীর সম্পর্কে প্রায় সবকিছু জানা পাগল ডাক্তার সক্রেটিস জানতেন খেলাটা শরীর দিয়ে খেলতে হয় না, ব্রেন দিয়ে খেলতে হয়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইকুয়ালাইজার। সক্রেটিস বললেন – ‘ইট ওয়াজ নট আ গোল, বাট অ্যান এন্ডলেস অরগ্যাজম’। গ্যালারিতে করিথিয়ান্স টিফো – ‘উইন ওর লুজ, বাট অলওয়েজ উইথ ডেমোক্রেসি …’
বিরাশি থেকে ছিয়াশি। আগের দুবার ট্রফির কাছাকাছিও না যাওয়া একটা খিদে, জ্বালা। ইন দ্য মিনটাইম কলকাতা ফুটবল আরও সাম্প্রতিক হচ্ছে, ছোঁয়া পাচ্ছে বিদেশি নামগুলোর। এবং টিভি আসছে। আর ওই যে বললাম, হারা, হারা, হারার জ্বালা। ওই জ্বালাই আরও কাছে করে দিচ্ছে দেশটাকে।
“সেদিন গভীর রাতে টাইব্রেকারের শেষ গোলটিতে ব্রাজিল হেরে যাবার পর পরিমল বোসের দেওয়া টিভির সামনে বসে কিঙ্কর দত্তের পরিবারের হতচকিত তিনটি মানুষ দেখল, নিশ্বাস নেবার জন্য হাঁ করেছে কিঙ্কর, কিছু বলার জন্যেও হয়তো, অস্পষ্ট গোঙানির মতো একটা শব্দ ভেঙেচুরে দিচ্ছে ওর সাতান্ন বছরের মুখের রেখাগুলো। মাঠে তখন শুধুই ফ্রান্স, জয়োল্লাসে দৃপ্ত তাদের হাঁটাচলা ও আলিঙ্গন পর্দায় কাঁপন তুলে আলো ফেলছে কিঙ্করের মুখে। কিঙ্কর দত্তের ছেলে ব্যস্তভাবে এগিয়ে গিয়ে স্যুইচটা অফ করে দিতেই সেখানে একই সঙ্গে নেমে এলো অন্ধকার ও স্তব্ধতা।”

কলকাতার বাড়ির ছাদে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার লড়াই
চুরানব্বই বা তার পরবর্তী সময় বিশ্বায়নের রমরমা এবং টেলিভিশন আধিপত্য। জাকারিজিনহো – রিওর এই বস্তি বা ফ্ল্যাভেলো থেকে উঠে আসা রোমারিও। অথবা পোর্তো আলেগ্রোর ভয়ঙ্কর বস্তি থেকে উঠে এসে ইংল্যান্ডের ডেভিড সিমনকে দাঁড় করিয়ে রেখে রোনাল্ডিনহোর ওই মিস্টিক ফ্রি-কিক, ওই হাসি – ‘আজকাল’ পত্রিকা সেদিন প্রথম পাতা জুড়ে লিখেছিল – ‘ওগো নদী আপন বেগে পাগল-পারা’। গ্রেটেস্ট নম্বর নাইনের আটানব্বইয়ে নার্ভাস ব্রেকডাউনে শোকে ডুবে গেছিল কসবার বালক সংঘ, দমদমের বন্ধুবান্ধব ক্লাবের মতো অসংখ্য ক্লাব, পাড়ার পর পাড়া – চার বছর বাদে কানের হাত থেকে বল বেরিয়ে গিয়ে যার শাপমুক্তি। এই গল্প চলছে। ভয়েড তৈরি হচ্ছে, ঢাকছেও। আসছেন, বড়ো হচ্ছেন, পড়ছেন, কাঁদছেন আবার মাতাচ্ছেন নেইমার ডি সিলভা। প্রায় সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়ে পড়া কলকাতার ফুটবলে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে আদুরে বিদেশি নাম হিসেবে বেঁচে থাকছেন এক ব্রাজিলীয় – রোনাল্ডিনহোর গ্রেমিও থেকে আসা জোস ব্যারেটো। এবং শহরের নিষিদ্ধপল্লীর ওয়াল গ্রাফিত্তিতে উঠে আসছে সাও পাওলো, রিও, আস্ত এক একটা সেলেকাও।
১৯৯৮ সালে আর্থার ফন্টেস ও জোয়াও মোরেইরা স্যাল্লেস পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘Futebol’। ফ্যাব্রিজিও নামের প্রতিভাবান, অসম্ভব দরিদ্র তরুণ এক ব্রাজিলীয় ফুটবলারের জীবন নিয়ে গল্প। তথ্যচিত্রটির এক জায়গায় রিওর এক অন্ধকার ফ্ল্যাভেলো ‘মরো ডো অ্যালেমাও’-এর সামনে দাঁড়িয়ে ফ্যাব্রিজিওর বাবা বলছেন – ‘With the job I have it’s not possible, it’s not possible to get out of this morro. So I depend only on him. With the football I think he can play …Every father sees this in his son, right? And I hope that he will spend the money getting us out of this morro, out of this area where we live.’
কোথাও মিল পাওয়া যাচ্ছে? কেমন যেন রিক্সাচালকের, টোটোওলার ছেলেমেয়েরা মেরিটলিস্টের ওপরে চলে আসার পর ওদের বাবামায়েদের গলার মতো শোনাচ্ছে না? যেন ডেইলি মিডিওক্রিটি, ভয়ের খাঁচায় বসে থাকা নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত বাঙালি তার ব্রেজিলকে ধরে বাঁচতে চাইছে। যেন পুলের ওপর দিয়ে প্যারালালি হাঁটতে থাকা এক লক্ষ খিদ্দা তাদের নিজস্ব কোনিদের সঙ্গে সাঁতরে পার হতে চাইছে জীবন। বলছে ‘ফাইট, কোনি ফাইট’।
বলছে, ‘গেট আস আউট অফ দিস মরো, আউট অফ দিস এরিয়া, হোয়্যার উই লিভ …’
____
শেষ
কৃতজ্ঞতা – দিব্যেন্দু পালিত