সাদা নরক পেরোনোর সময়
প্রথম এভারেস্ট আরোহী জুটির অন্যতম স্যার এডমণ্ড হিলারি বলেছিলেন, “It’s not the mountain we conquer, but ourselves.” কিন্তু, মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণের প্রসঙ্গে একটা কথা এখন প্রায়শই শুনতে পাবেন, “আজ সকালে এক ব্যক্তি ‘জয়’ করলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ” ইত্যাদি। সত্যিই গর্বের বিষয়। একজন মানুষ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পা রেখেছেন! তবে একটু দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে যদি বলা হয়, “উক্ত ব্যক্তি আরও ৩৫৩ জনের সঙ্গে একই দিনে এভারেস্টের সামিটে পদার্পণ করেছেন।” – অবাক লাগার কথা নয় কি! কিন্তু বাস্তব এইটিই। ২০১৯-এর ২৩ মে ৩৫৪ জন আরোহণ করেছিলেন মাউন্ট এভারেস্ট। ‘ট্রাফিক জ্যাম’-এ প্রত্যেক মরশুমে নাজেহাল হয় এভারেস্ট অভিযানের সব থেকে জনপ্রিয় দুটি রাস্তা। নেপাল সরকারের বদান্যতায় এবং কয়েকশো অভিজ্ঞ শেরপার কল্যাণে দুর্ভেদ্য খুম্বু আইসফল ক্ষেত্র ধাতব মই দিয়ে মোড়া হয় ফিবছর। কারণটি একেবারেই ‘অর্থনৈতিক’। ডলারের বিনিময়ে, বহু অনভিজ্ঞ অভিযাত্রীদের মাতৃসুলভ যত্নে হাত ধরে শৃঙ্গ ‘জয়’ করিয়ে আনেন শেরপা বন্ধুরা। সঞ্চয়ে পর্যাপ্ত ধনরাশি এবং সাহস থাকলে পরের মরশুমে আপনিও ‘জয়’ করতে পারেন এভারেস্ট। গভীর সমুদ্রগর্ভ ভ্রমণ, ‘মহাকাশ ভ্রমণ’-এর পাশাপাশি ‘বাণিজ্যভিত্তিক সুউচ্চ শৃঙ্গ ভ্রমণ’ (‘High Altitude Tourism’)-এর বর্তমান অবস্থা এমনই। (এভারেস্ট অভিযান ১৯৯১)
বহু দশক আগে থেকেই মাউন্ট এভারেস্টে একের পর এক কীর্তি স্থাপন করে আসছে মানুষ। কেউ আরোহণ করেছেন একা এবং সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছাড়া। কেউ আরোহণ করেছেন বারো ঘণ্টার কম সময়ে।
গৌতম দত্ত, ১৯৯১ সালে
অন্যদিকে, বহু দশক আগে থেকেই মাউন্ট এভারেস্টে একের পর এক কীর্তি স্থাপন করে আসছে মানুষ। কেউ আরোহণ করেছেন একা এবং সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছাড়া। কেউ আরোহণ করেছেন বারো ঘণ্টার কম সময়ে। এক শেরপা একবার সামিটের উপরেই তাঁবু লাগিয়ে রাত কাটিয়ে ফেলেছিলেন। এই সব অভাবনীয় কীর্তির মাঝে একটি কীর্তি আছে বাঙালিরও। মুষ্টিমেয় পাহাড়প্রেমী সেই কীর্তির সন্ধান রাখেন। ১৯৯১ সালে একটি ছোটো বাঙালি দল এভারেস্ট আরোহণের উদ্দেশ্যে তিব্বত পাড়ি দেয়। সহজ প্রচলিত পথ নয়, মাউন্ট এভারেস্ট শৃঙ্গের উত্তরগাত্রে অবস্থিত অত্যন্ত দুরূহ গ্রেট কুলোয়া (Great Couloir) রুট ধরে। সেটি ছিল কোনও ভারতীয় দলের দ্বারা চীনের দিক থেকে এভারেস্ট আরোহণের প্রথম প্রচেষ্টা। অল্পের জন্য শৃঙ্গে পদার্পণ করতে না পারলেও সেই অভিযানটি ছিল তৎকালীন সময়ে বাঙালি পর্বতারোহণের সর্বোচ্চ সাফল্য। (এভারেস্ট অভিযান ১৯৯১)
১৯৯১ সালের সেই দলের অন্যতম আরোহী ছিলেন বিশিষ্ট পর্বতারোহী গৌতম দত্ত। পঁয়ত্রিশ বছর আগের সেই অভিযানের স্মৃতি তাঁর মনে এখনও টাটকা। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানাচ্ছেন, “অভিযানটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য চারটি কারণে। প্রথমত, অভিযানটি চীনের দিক থেকে প্রথম ভারতীয় অভিযান। দ্বিতীয়ত, ওই এভারেস্ট অভিযানটি ছিল সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি উদ্যোগে সংঘঠিত প্রথম এভারেস্ট অভিযান। তৃতীয়ত, অপেক্ষাকৃত সহজ ও প্রচলিত রুটের বিকল্প হিসেবে একটি অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক রুট বেছে নেওয়া হয়েছিল। চতুর্থত, পরিকল্পনামাফিক দলে ছিল না কোনও শেরপা অথবা হাই অলটিটিউড পোর্টার।” (এভারেস্ট অভিযান ১৯৯১)
লাল রঙে চিহ্নিত অভিযানের রুট
চতুর্থ কারণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেন এই গুরুত্ব? জানতে হলে আমাদের যেতে হবে, ১৯৮০ দশকের বাঙালি পর্বতারোহণের অধ্যায়ে। সময়টি ছিল বাংলা পর্বতারোহণের স্বর্ণযুগ। সমগ্র আশির দশক ও নব্বইয়ের শুরুর দিকে অসংখ্য নতুন পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করে বাঙালি পর্বতারোহীরা। গৌতম দত্তের মতে, “অভিযাত্রিক মনন সে সময়ে ভিন্ন ছিল। বাঙালিরা পর্বতারোহণ করতেন পর্বতকে ভালোবেসে।” পর্বতারোহণে দক্ষ শেরপাদের সাহায্য ছাড়া বাঙালিরা চেষ্টা করতেন স্বনির্ভর পর্বতারোহণের। ১৯৮১ সালে বাংলা পর্বতারোহণের কিংবদন্তি বিদ্যুৎ সরকারের নেতৃত্বে একটি তিনজনের দল একই সঙ্গে আরোহণ করেন মাইকতোলি ও দেবতোলি-সহ অধুনা উত্তরাখণ্ডের তিনটি ২২০০০ ফিটের পর্বতশৃঙ্গ। মাইকতোলি আরোহণে ইচ্ছাকৃতভাবেই বেছে নেওয়া হয়েছিল কঠিন রুট। মূল আরোহণের নেতৃত্বে ছিলেন গৌতম দত্ত। যিনি পরবর্তীকালে আরোহণ করেছেন একাধিক দুর্গম এবং ঘাতক শৃঙ্গ। ১৯৮২ সালে সিকিমের কাব্রুডোম শৃঙ্গ থেকে নেমে আসার সময়, একজন সহযাত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে পাহাড়ের খাড়া ঢালে প্রায় ৫০০ ফিট নিচে পড়ে যান। তবে, অভিযান থেকে সুস্থভাবে ফিরে এসেছিলেন নিশ্চিত মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে। তাঁর মতো একাধিক সক্ষম পর্বতারোহী তৈরি হয়েছিল বাংলায়। শেরপা কিংবা পোর্টারের সাহায্য ব্যতিরেকে নিজের বল-বুদ্ধি ও সামর্থের উপর ভরসা করেই শৃঙ্গের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতেন তাঁরা।
তৈরি করে নেওয়া বরফের গুহা
১৯৯১ সালের এভারেস্ট অভিযানটি হয়েছিল ভোরুকা মাউন্টেনিয়ারিং ট্রাস্ট এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড এডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন প্রাণেশ চক্রবর্তী। ক্লাইম্বিং লিডার ছিলেন গ্ৰুপ ক্যাপ্টেন অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য। দলের ম্যানেজার ছিলেন সমীর রায় এবং অভিযান কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন হিমাংশু হালদার। আরোহণের অন্যতম মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন গৌতম দত্ত। সঙ্গে ছিলেন শ্যামল সরকার, ড. নিলয় সিংহ রায় প্রমুখ। এই অভিযানের আগে, ওই রুটে সফল অভিযান হয়েছিল মাত্র একবার। ১৯৮৪ সালের ৩ অক্টোবর একটি অস্ট্রেলিয় দল এই পথে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করে। অস্ট্রেলিয় টিম বর্ণিত, রুটের সব থেকে কঠিন অংশ, তুষারাবৃত ‘হোয়াইট লিম্বো’ (সাদা নরক) পেরিয়ে যান গৌতম দত্ত সহ চার দুঃসাহসী অভিযাত্রী। কিন্তু তারপরেই অত্যন্ত খারাপ আবহাওয়া ও আলগা বরফের আস্তরণ পেরিয়ে এগোনো অসম্ভব হয়ে ওঠে। আরোহণের সময় একাধিক আভাল্যাঞ্চ প্রত্যক্ষ করেছিলেন অভিযাত্রী দল। গৌতম দত্ত স্মরণ করেন নিজের অভিজ্ঞতা, “দ্রুত গতির জেটস্ট্রিমে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না তখন। তুষার নদীর মতো বইছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।” পর্বতগাত্রের তুষার খুঁড়ে বানানো একটি আস্তানায় অভিযাত্রীরা চারদিন অপেক্ষা করেন। কিন্তু আবহাওয়ার অবস্থা এবং গ্রেট কুলোয়া দিয়ে দ্রুত বেগে বয়ে চলা তুষারস্রোতের কারণে প্রায় ৭৮০০ মিটার উচ্চতায় অভিযান পরিত্যক্ত হয়।
অত্যন্ত দুরূহ রাস্তায় আরোহণ করার চেষ্টাটিই ছিল সেসময়ের নিরিখে অত্যন্ত দুঃসাহসিক, আশাপ্রদ এবং বাঙালির গর্ব করার মতো বিষয়। বাঙালিরা দেখিয়েছিলেন, ইউরোপের নামজাদা পর্বতারোহী বা পার্বত্য অঞ্চলের শেরপা শুধু নয়, পর্বতগাত্রে তাঁরাও সমানভাবে সাবলীল।
ষড়ভুজে এক একজন অভিযাত্রী
এক বিখ্যাত মানুষ বলেছিলেন, “It’s not the Destination, it’s the journey.” ১৯৯১ -এর অভিযানটির ক্ষেত্রে এই কথাটিই সব থেকে বেশি প্রযোজ্য। অপেক্ষাকৃত সহজ রাস্তা ছেড়ে, অত্যন্ত দুরূহ রাস্তায় আরোহণ করার চেষ্টাটিই ছিল সেসময়ের নিরিখে তো বটেই, আজও অত্যন্ত দুঃসাহসিক, আশাপ্রদ এবং বাঙালির গর্ব করার মতো বিষয়। বাঙালিরা দেখিয়েছিলেন, ইউরোপের নামজাদা পর্বতারোহী বা পার্বত্য অঞ্চলের শেরপা শুধু নয়, পর্বতগাত্রে তাঁরাও সমানভাবে সাবলীল। অভিযানের ছবি দেখে এবং বিবরণী শুনে ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী কর্নেল প্রেমচাঁদ অভিযানটি সম্পর্কে লিখেছিলেন, “I think the route negotiated and height reached by this team on the great gully (Great Couloir) route was simply great. I think ‘NO’ Indian has done this type of climbing on the Everest earlier. … Though they did not make it to the top but their attempt and efforts and the fact that they had successfully gone past the difficult and dangerous part of their route, (it) was an ‘Everest scale’ achievement.”
অভিযাত্রীর চোখে এভারেস্টের নর্থ ফেস
আজ সফল বাঙালি এভারেস্ট আরোহীর সংখ্যা প্রায় তিরিশ। তবে, সব আরোহণই জনপ্রিয় দুটি রাস্তা ধরে। এভারেস্টের উত্তরগাত্রের ওই দুর্গম পথে আর বাঙালির পা পড়েনি আর কোনওদিন। প্রচলিত পথগুলির বিকল্প হিসেবে এই পথগুলি থাকলেও দুর্গমতার কারণে অধিকাংশ মানুষই এই পথে পা বাড়ান না। সেই সূত্রে কিছু তথ্য দিলেন গৌতম দত্ত। এভারেস্ট আরোহণের মোট ১৮টি (মতান্তরে ২০টি) রুট রয়েছে। তিনি জানাচ্ছেন, ২০২১ পর্যন্ত এভারেস্টে আরোহণ সংখ্যা ১০,১৮৫ টি। যার মধ্যে প্রায় ২৭০টি আরোহণ ব্যাতিত সবই নেপাল এবং চীনের দুই জনপ্রিয় বাণিজ্যিক রুট ধরে। আজ পর্যন্ত, সমগ্র বিশ্বজুড়ে এভারেস্টের সফল আরোহী সংখ্যা ১৫০০০ ছাড়িয়েছে। কিন্তু কঠিন পথগুলি ধরে আরোহণ সংখ্যা খুব বেশি বদলায়নি। তবে, পর্বতারোহণের বর্তমান এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও গৌতম দত্ত আশাবাদী। তাঁর মতে, “প্রকৃত অভিযাত্রীর কাছে এডভেঞ্চার হারিয়ে যায়নি এখনও। এবং তা সম্ভবও নয়।… ‘ট্র্যাফিক জ্যাম’-এর রুটগুলিকে পরিহার করলেই তো হয়।” আর, মাউন্ট এভারেস্ট ছাড়াও অনেক শৃঙ্গ আছে, যেখানে ব্যবসা এখনও থাবা বসায়নি। আজও পড়েনি কোনও মানুষের পদচিহ্ন।
_________________
তথ্যসূত্র:
১। ‘শতবর্ষের আরোহণ-আলোকে মাউন্ট এভারেস্ট’ | গৌতম দত্ত
২। দ্য হিমালয়ান জার্নাল : HJ/49/14 – INDIAN EVEREST EXPEDITION: NORTH FACE, 1991, written by Group Captain A. K. BHATTACHARYYA https://www.himalayanclub.org/hj/49/14/indian-everest-expedition-north-face-1991/
৩। Indian Mountaineer No. 11 : “… We had Gautam Dutta, who fell 500 feet while descending… It was a miracle that he survived and that too with no injury…” – Brig. D.K. Khullar (Indian Pre-Everest Expedition – 1982)

