মন্দিরের দেশ দেউলঘাটা
পুরুলিয়া জেলায় কংসাবতী নদীর ধারে লুকিয়ে রয়েছে অমূল্য এক রত্ন। মন্দিরের দেশ দেউলঘাটা। জয়পুর অরণ্য থেকে ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পুরুলিয়া শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে তার অবস্থান। পুরুলিয়ায় এক সময় জৈন ধর্মের বিস্তার ঘটেছিল। কয়েকজন ইতিহাসবিদ মনে করেন, জৈনদের ২৪তম অর্থাৎ শেষ তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর এখানে ছিলেন বেশ কিছু দিন। আচারাঙ্গ সূত্র এবং ভগবতী সূত্রের মতো জৈন শাস্ত্রে মহাবীরের রাঢ়দেশ (পুরুলিয়া এবং সংলগ্ন এলাকা) ভ্রমণের উল্লেখ পাওয়া যায়। আজও প্রায় ১৫টি প্রাচীন মন্দির এবং ছোটো ছোটো কয়েকটি ধর্মীয় সৌধের ধ্বংসস্তূপ দাঁড়িয়ে আছে বাংলার জৈন ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে। এগুলি গড়ে উঠেছিল ১০-১০ শতাব্দী নাগাদ।

রাঁচি-পুরুলিয়া রোড থেকে একটি ছোটো রাস্তা বেরিয়ে চলে গিয়েছে গড় জয়পুর গ্রামের দিকে। সেখানে পৌঁছে পায়ে হেঁটে শান্ত বনভূমি দিয়ে খানিকটা চললেই খুঁজে পাবেন উঁচু ইটের গাঁথনি। খানিকটা জঙ্গলে ঢাকা – তা সত্ত্বেও বেশ রাজকীয়। এগুলোই দেউলঘাটার প্রাচীন মন্দিরগুলোর ধ্বংসাবশেষ। বেশিরভাগই গড়ে উঠেছিল ১১ শতকে রাজা অনন্তবর্মন চোড়গঙ্গ দেবের পৃষ্ঠপোষকতায়। ১৮৬৪-৬৫ নাগাদ জায়গাটি আবার খুঁজে পান ই টি ডালটন, ছোটোনাগপুরের ব্রিটিশ কমিশনার। জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তিনি আবিষ্কার করেন তিনটি বড়ো আকারের মন্দির। ভারতের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের জি ডি বেগলার ১৮৭২-৭৩ সাল নাগাদ ওই অঞ্চলে থাকা মন্দিরের কথা জানান। জৈন নিদর্শন ছাড়াও বেগলার ওই মন্দিরগুলি থেকে তিনটি হিন্দু মূর্তি খুঁজে বের করেন – একটি অষ্টভুজা দুর্গা, একটি গণেশ এবং একটি চতুর্ভুজা পার্বতী।

এতগুলো মন্দিরের মধ্যে এখন কেবল দুটি অক্ষত রয়েছে। ইটের দেওয়ালে সূক্ষ্ম স্টাকোর কারুকার্য এবং প্রবেশদ্বারে ত্রিকোণ করবেল মুগ্ধ করে। চৈত্য এবং ছোটো ছোটো রেখার নকশা ফুটে উঠেছে সেখানে। স্টাকোতে রয়েছে হাঁস এবং পাতার স্ক্রলওয়ার্ক এবং বামনের ভাস্কর্য – যা বাংলার পাল-সেন আমলের শিল্পকলায় দেখা যেত। প্রথম মন্দিরটি প্রায় ৬০ ফুট উঁচু। নজরকাড়া অলঙ্করণে ভরপুর। দেওয়ালে ফুলের নকশা এবং হিন্দু ও জৈনধর্মের নানা প্রতীক বসানো। দ্বিতীয় মন্দির প্রথমটির মতোই – কেবল ভিতরে গণেশের মূর্তি আলাদা করেছে তাকে। আরও কিছু দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে, যেগুলো নেপালি-হিন্দু চিত্রের নানা অবয়বের মতো দেখতে। একটি ছোটো ঘরে রাখা আছে চতুর্ভুজা পার্বতীর মূর্তি – যা আজও দেখা যায়।

ইটের মন্দির ছাড়াও দেউলঘাটায় বেশ কিছু পাথরের মন্দির গড়ে উঠেছিল ১২ শতক নাগাদ, জৈন ধর্মের প্রভাব যখন ক্ষয়ের মুখে। এরকমই একটি পাথরের মন্দিরে গর্ভগৃহ থেকে পাওয়া গিয়েছে এক পরিশোভিত শিবলিঙ্গ। যার থেকে ছোটোনাগপুর অঞ্চলে হিন্দুধর্মের উত্থানের প্রমাণ মেলে। আপনি যদি ইতিহাস ভালোবাসেন এবং প্রাচীন ভারত সম্পর্কে আগ্রহী হন, তাহলে দেউলঘাটা আপনার আদর্শ গন্তব্য।

কীভাবে যাবেন: হাওড়া স্টেশন থেকে পুরুলিয়া যাওয়ার পর্যাপ্ত ট্রেন রয়েছে। সড়কপথে পুরুলিয়া শহর পৌঁছোতে মোটামুটি ৬ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। পুরুলিয়া শহর থেকে দেউলঘাটা প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে।
কোথায় থাকবেন: দেউলঘাটায় কোনো হোটেল বা খাওয়াদাওয়ার সঠিক বন্দোবস্ত নেই। আপনি পুরুলিয়া শহরে থাকতে পারেন, অথবা বাঘমুন্ডি কিংবা অযোধ্যা পাহাড়ে বেশ কিছু রিসর্ট পেয়ে যাবেন। অযোধ্যা পাহাড় থেকে দেউলঘাটার দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার।
যাওয়ার সেরা সময়: নভেম্বর থেকে মার্চ, বিশেষ করে শীতকাল সবথেকে ভালো সময়। টুসু উৎসবে আশেপাশের অঞ্চলে প্রচুর লোকের জমায়েত হয়। যা এখানকার এক প্রধান আকর্ষণ।