“দাদা, বাঙালি নাকি?” সবচেয়ে দুর্গম জায়গাতেও এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গুজরাটের ৬ ট্রাভেল এজেন্ট সারা ভারত জুড়ে সড়ক ভ্রমণের আয়োজন করেন। উদ্দেশ্য ছিল ডোমেস্টিক ট্যুরিজম বাড়ানো এবং করোনা মহামারির ফলে পর্যটন শিল্পে যে মন্দা এসেছিল, তা কাটিয়ে ওঠা। যখন তাঁরা কলকাতায় পৌঁছলেন, স্থানীয় গণমাধ্যমকে ট্রাভেল এজেন্ট রাজীব শেঠি জানান, “বাঙালিরা এবং গুজরাটিরাই ডোমেস্টিক ট্যুরিজমের মেরুদণ্ড। এরা ঘর থেকে না বেরোলে ডোমেস্টিক ট্যুরিজমের কোনও উন্নতি হবে না।”
যে কোনও ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনে বাঙালির দেখা পাওয়া গড়পরতা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবাঙালিদের কাছে। তবে এর পিছনে কারণ রয়েছে। নয়া দিল্লিতে ‘ওয়ান্ডারার্স ফুটপ্রিন্ট’ নামে ট্রাভেল বুটিক চালান পার্বতী ভট্টাচার্য। তাঁর মনে পরে, প্রায় ১৫ বছর আগে ছুটি কাটাতে লেহ’র এক নির্জন প্রান্তে গিয়েছিলেন। অনিবার্যভাবেই সেখানে দেখা পেলেন একদল বাঙালির। লাদাখ সবে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে তখন।
দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেন
একইভাবে কলকাতার এক প্রবীণ দম্পতি হেসে জানান, ১৯৭১ সালে মধুচন্দ্রিমা যাপনে তাঁরা গিয়েছিলেন কাশ্মীর। গুলমার্গ এবং বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পটগুলোয় দেখেছেন, গাইডেরা সাবলীল হিন্দি, অল্প অল্প ইংরেজি এবং আশ্চর্যভাবে খুব ভালো বাংলা বলতে পারেন। কারণ, প্রচুর বাঙালি পর্যটকের সঙ্গে তাঁদের কথা বলতে হয়।
“দাদা, বাঙালি নাকি?” সবচেয়ে দুর্গম জায়গাতেও এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কলকাতার বাসিন্দা পিনাকি ঘোষ বললেন, ১৯৯০-এর দশকে জার্মানির এক ছোট্ট শহরে গিয়েছিলেন এয়ার শো দেখতে। “আমি হাজির হয়েছিলাম হঠাৎই। শহরটার নামও মনে নেই। সেখানেও দেখি দু’জন বাঙালি। চলে গিয়েছে কলকাতার দুই গবেষক পড়ুয়া।”
গ্লেনারি’স, দার্জিলিং
বিশ্বের প্রত্যেক কোণে পৌঁছে গিয়েছে বাঙালি। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী ‘চাঁদের পাহাড়’-এর শংকর। তবে, বাংলাদেশের বাসিন্দারা ভ্রমণপাগল হিসেবে নাম করতে পারেননি। নিউ ইয়র্কের অধিবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক মাহবুব আহমেদ মজা করে বললেন, আম-বাংলাদেশিরা সৈকতে নামবেন স্যুট কিংবা শাড়ি পরে। ভ্রমণ এখনও আমাদের প্রতিবেশী দেশটিতে জনপ্রিয় নয়।
তবে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা তেমন না মোটেই। খোরলো ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের নীলাঞ্জন বসু জানান, এরাজ্যের বাসিন্দারা ঘুরতে ভালোবাসেন, তবে গন্তব্যের ব্যাপারে একটু খুঁতখুঁতে। “বেশিরভাগ বাঙালি অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণ পছন্দ করেন না। অফবিট জায়গাতেও গরম খাবার এবং থাকার আরামদায়ক বন্দোবস্ত আশা করেন। খুব বেশি খরচ করতে চান না। তবে তাঁরা কৌতূহলী এবং নতুন বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রচুর।”
ভোরের আলো ট্যুরিজম প্রপার্টি
খরচের কথা বিবেচনা করলে দেখা যাবে, বেশির ভাগ বাঙালিই পছন্দ করেন বাজেট ট্যুরিজম। ট্রাভেল অপারেটররা এই তথ্য দিয়েছেন। কয়েক বছর আগে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় পর্যটন মেলার এক মুখপাত্র বলেন, “সারা দেশে সর্বোচ্চ স্থানে এমনকি বিশ্বের অন্যতম ভ্রমণপ্রিয় জাতি বাঙালি, যাঁরা বাজেট ট্যুরিজম পছন্দ করেন।” এই কারণেই লকডাউনের পর যখন পর্যটন আবার শুরু হল, খুব দ্রুতই পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের অর্থ উপার্জন বাড়তে থাকে। হোক অতিমারি, কুছ পরোয়া নেহি। দূরে না হলেও, নিজের রাজ্যেই ঘুরতে বেড়িয়ে পড়েন বঙ্গসন্তানেরা।
দিঘা সৈকত
পার্বতী ভট্টাচার্যের মতে, “কেবল দিঘা-পুরী-দার্জিলিং (বাঙালির সবথেকে প্রিয় তিন গন্তব্য) যাওয়ার জন্য সারা বছরের বাজেটে খরচ বরাদ্দ করে রাখেন বাংলার মধ্যবিত্তরা। পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে বিচিত্র সব গন্তব্য – পাহাড় থেকে সমুদ্র। বাংলার ভ্রমণ সাহিত্যও অনন্য। আমি জানি না ভারতে অন্য কোথাও ভ্রমণ সাহিত্যের এমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে কিনা!”
সুন্দরবন-এ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার
তাঁর থেকে জানা গেল, ভ্রমণ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাতেও এগিয়ে রয়েছে বাঙালি। যেমন কুণ্ডু স্পেশালের ‘কিচেন ট্যুরস’। অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা বাইরের খাবারে স্বছন্দ নন। তাঁরা যাতে নিজেদের রান্নার সামগ্রী নিয়ে যেতে পারেন, তার বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয় ‘কিচেন ট্যুরস’-এ। আরও নানারকম ব্যবস্থা করে থাকেন ট্যুর অপারেটররা। সবই ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির সর্বগ্রাসী বেড়ানোর খিদে মেটানোর জন্য।