গ্রীষ্মে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়, যানজট ও জলকষ্টে কি নাজেহাল দার্জিলিং?

উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও পরিবেশগত সমস্যা

গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে বাঙালির প্রিয় ট্যুর ডেস্টিনেশনে দার্জিলিং-এর নাম থাকে সবার উপরে। একরাত্রের ট্রেন সফরের পরই হিমালয়ের মৃদুমন্দ হাওয়া উপভোগ করার জন্য এর থেকে ভালো বিকল্প আর নেই। ভাগ্য একটু সদয় হলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখাও মিলে যায় কোনোদিন সকালে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের আবহাওয়ায় যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা থেকে নিষ্কৃতি পায়নি দাজিলিং-সহ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পার্বত্য ও তরাই অঞ্চলের জেলাগুলি।

বিগত দুই-তিন মাসে দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পংয়ে পর্যটক সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। দার্জিলিঙের হোটেল, হোমস্টে, রেস্টুরেন্ট-এর কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ৪ মে-র পর পর্যটক সমাগম আরও বেড়েছে। ব্যবসার জন্য এই অবস্থা অত্যন্ত লাভজনক হলেও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে সীমিত জলের যোগান।

২০২৬ সালে গ্রীষ্মের দাবদাহে অত্যধিক আর্দ্রতা কলকাতা ও শহরতলির অনুভূত তাপমাত্রাকে পৌঁছে দিয়েছে পঞ্চাশের কোঠায়। ফলশ্রুতিতে দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দাদের অধিকাংশ দার্জিলিং ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলিকেই সপ্তাহান্তে একটু ঠান্ডার আমেজ খোঁজার জন্য বেছে নিয়েছেন। বিগত দুই-তিন মাসে দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পংয়ে পর্যটক সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। দার্জিলিঙের হোটেল, হোমস্টে, রেস্টুরেন্ট-এর কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ৪ মে-র পর পর্যটক সমাগম আরও বেড়েছে। ব্যবসার জন্য এই অবস্থা অত্যন্ত লাভজনক হলেও সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে সীমিত জলের যোগান। যে ট্যাঙ্কারগুলিতে জলসরবরাহ হয়ে থাকে, সেগুলি আসবার সময় অনিশ্চিত হয় উঠেছে। ফলে হোটেল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে পর্যটকদের প্রয়োজন অতিরিক্ত জলের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলছেন। দার্জিলিং শহর ছাড়া অন্যান্য পাহাড়ি গন্তব্যেরও প্রায় একই হাল।

অন্যদিকে, আরেকটি গুরুতর সমস্যা হল যানজট। পর্যটক সমাগমের অনুপাতে স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে ট্যুরিস্ট গাড়ির সংখ্যাও। বিগত কয়েকটি দশকে উত্তরবঙ্গের পর্যটনকেন্দ্রগুলির পর্যটক ধারণ ক্ষমতা যে হারে বেড়েছে, সেই হারে প্রশস্ত হয়নি পরিবহনের পরিকাঠামো। যার ফলে যানজট বিকট আকৃতি ধারণ করেছে। যে রাস্তা সাধারণ অবস্থায় পনেরো মিনিটে পার করা যায়, সেই রাস্তা পেরোতে সময় লেগে যাচ্ছে প্রায় তিন ঘণ্টা। সাধারণত, শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পৌঁছাতে যা সময় প্রয়োজন তার থেকে অন্তত দ্বিগুণ সময় লাগছে এই অবস্থায়।

এই সমস্যাগুলি হঠাৎ উদ্ভুত এমন নয়। এবং সমস্যার বদলে এগুলি উপসর্গ বলা অনেক বেশি সমীচীন। মূল সমস্যা আরও অনেক গভীরে। আমাদের উত্তরবঙ্গ শুধু নয়, হিমালয়ের যাবতীয় পর্যটনকেন্দ্রের একই অবস্থা। বিপুল পরিমাণ পর্যটকের নাগরিক বোধের অভাবে প্লাস্টিক দূষণ বাড়ছে মাত্রাতিরিক্ত। বেআইনি নির্মাণ, পর্যটকবাহী যানের ক্ষেত্রে একাধিক নির্দেশিকা ও প্রবিধান থাকার পরেও গলদ থেকে যায় সেই আইন বলবৎ করার সময়। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হোটেল-হোমস্টেগুলির নির্মাণ ভূমিধ্বসের সম্ভাবনা আরও একটু বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। পলিউশনের কাগজ ফেল করা ইঞ্জিন এবং রিসোল করা স্বচ্ছ-মসৃণ টায়ারের উপর ভর করে কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অধিকাংশ গাড়ি দিব্যি ছুটে বেড়াচ্ছে পাহাড়ি রাস্তায়। গুরুতর নিম্নচাপে লাগাতার ভারী বর্ষণের সময়ে পাহাড়ি ঢালে, নদী তীরে তৈরি হওয়া বেআইনি নির্মাণগুলির অবস্থা হয় তাসের ঘরের থেকেও খারাপ। আর গাড়ির ধোঁয়ার লোকালাইজড পলিউশনের কারণে পুরো বছর জুড়েই বৃষ্টির পরিমাণ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। উত্তরবঙ্গ ছাড়াও সিকিম, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রভৃতি রাজ্যে প্রায় প্রত্যেক মরশুমেরই দেখা যাচ্ছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। পর্যটন ব্যবসা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করলেও পর্যটনশিল্পের পরিকল্পনাহীনতা তাঁদের পরিবেশ ও প্রতিবেশে যে অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে চলেছে প্রতিনিয়ত, তার ফলাফলও মিলছে ফিবছর।

পর্যটন ব্যবসা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করলেও পর্যটনশিল্পের পরিকল্পনাহীনতা তাঁদের পরিবেশ ও প্রতিবেশে যে অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে চলেছে প্রতিনিয়ত, তার ফলাফল ও মিলছে ফিবছর

এবারেও বিগত বছরগুলোর বাঁধা নকশাই সম্ভবত দেখতে চলেছি আমরা। এপ্রিল-মে মাস দার্জিলিঙে নিদারুণ জলকষ্ট ও যানজট প্রত্যক্ষ করতে করতেই জুন মাসে দেশে প্রবেশ করেছে মৌসুমী বায়ু। অন্যবারের তুলনায় মৌসুমী বায়ু দুর্বল হওয়ার ফলে বিগত কয়েকদিন দক্ষিণবঙ্গ সামান্য বৃষ্টিপাত প্রত্যক্ষ করেছে। অন্যদিকে, দার্জিলিং ও সংলগ্ন অঞ্চল তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গে হয়ে চলেছে ভারী বর্ষণ। যা গত বছর অক্টোবরের দুর্যোগ মনে করিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। অজস্র স্থানে ধ্বস, রাস্তা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিলিগুড়ি থেকে মিরিকগামী রাস্তায় দুধিয়ার সেতুটি ভেঙে পড়ে সেবার। একটি আধুনিকতর সেতু আপাতত সেখানে নির্মীয়মাণ। একটি অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে তার উপর দিয়ে যান চলাচল চলছিল স্বাভাবিক ছন্দে। ভারী বৃষ্টির ফলে নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় অস্থায়ী সেতুটি পুনরায় বিপর্যস্ত। স্থানীয় সূত্রে খবর, সেটি পুনরায় মেরামত করা হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে সেতুটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠবে বলে জানা যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, প্রশাসন পক্ষ থেকে সেতুটি এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশিকা এসেছে। একাধিক স্থানে ভূমিধ্বসের ফলে স্বাভাবিক যান চলাচলের পথ সাময়িকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।

বর্ষা ঋতুর সূত্রপাতে পর্যটক সংখ্যাও ধীরে ধীরে কিছুটা কমবে। গ্রীষ্মকালীন দাবদাহ থেকে কিছুটা মুক্তি মিলেছে বিগত ১৯ জুন থেকেই। দুর্বল হলেও মৌসুমী বায়ুর কৃপায় দক্ষিণবঙ্গ সামান্য শীতল হবে। নগরজীবন ফিরবে কিছুটা স্বাভাবিক গতিতে। প্রতিবছর মানুষের কৃতকর্মের যে ফল পাহাড় ভোগ করে চলেছে তা অচিরেই শেষ হবে এবং সবটা মসৃণভাবে চলতে থাকবে এমনটা বলা যাচ্ছে না। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সমগ্র বিশ্বের আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ সম্পর্কিত যা যা তথ্য আমাদের সামনে আসছে, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা একটু দূরবর্তী বলেই বোধ হয়। কিন্তু একটু আশাবাদী না হলেও নয়। বাংলার অন্যতম ঐতিহ্যমণ্ডিত পর্যটনকেন্দ্র তথা সমগ্র হিমালয়ের পর্যটনশিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকার ও প্রশাসনের উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সচেতনতা ও পর্যটন সম্পর্কিত শিক্ষা খুবই প্রয়োজন। পর্যটক এবং পরিষেবা প্রদানকারী – এই দুই পক্ষ যদি সচেতন হয়, তবেই পাহাড়ি পর্যটনকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘সাসটেইনেবল’ করে তোলা সম্ভব। নচেৎ নয়।

Developed by DXDasia