যে বনে ফুল ছেঁড়া বারণ : খাসি পাহাড় ও ৮০০ বছরের পুরনো রহস্য

শহুরে কৃত্রিমতা আর মুঠোফোন-যাপন এর মাঝে একদিন আবিষ্কার করলাম নিজেকে বড্ড ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত লাগছে। এমন নয় যে, মাঝে মাঝে হাওয়াবদল হয় না, কিন্তু সেসবই বাঙালি সাবধানী মধ্যবিত্তের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে, ছক কষে করা প্ল্যানড ট্রিপ। তাতে এক ঘেয়েমি খানিক কাটলেও এডভেঞ্চার প্রিয়, ভ্রমনবিলাসি মনের চাহিদা সম্পূর্ণ মেটে না। তাই মাঝেমধ্যে একাই বেরিয়ে পড়ি পরিচিত গণ্ডির বাইরে। যেমন এবারেও শরতের এক বিকেলে ব্যাগপ্যাক নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম, গন্তব্য আপাতত গুয়াহাটি। পরদিন ভোরবেলা গুয়াহাটি স্টেশন থেকে শেয়ার ক্যাবে পৌঁছে গেলাম মেঘের রাজ্য, মেঘালয়ের রাজধানী শিলং-এ। সেখানে খাওয়া দাওয়া সেরে, শিলং-এর বিখ্যাত বড়বাজারে খানিক ঘোরাঘুরি করে শেয়ার ক্যাবে যখন মফ্লাং-এ ঢুকছি, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে। শিলং থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটারের দূরত্ব হলেও এই গ্রাম শিলং-এর মতো কোলাহলপূর্ণ নয়, এখানকার ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া অনেকটাই আলাদা।

মাওফ্লং-এ ঢুকতেই আমাকে রিসিভ করতে এলো ক্যারি। ১৯ বছরের হাসিখুশি একটা ছেলে। ওদের হোমেস্টেতেই আমার থাকার কথা ছিল, কিন্তু ওদের বাড়িতে ছোট্ট একটা অনুষ্ঠান থাকায় তা সম্ভব হয়নি। ক্যারি আমাকে পাশের একটা হোমস্টেতে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এই গ্রামে কারো বাড়িতে অনুষ্ঠান থাকলে, পুরো গ্রামের নেমন্তন্ন থাকে, এমনকি অতিথিদেরও। গ্রামের অন্য কারও বাড়িতে সেদিন আর উনুন জ্বালানো হয় না, এটাই এই গ্রামের রীতি। তাই, একরকম জোর করেই, ক্যারি আমাকে নিজের বাড়ি নিয়ে যায়। এই খাসি পরিবারটির আতিথেয়তা আর তাঁদের হাতে তৈরি লোকাল খাসি খাবার যেমন- জাদোহ, দোহ খলিহ, টুং রিম্বাই – এসবের স্বাদ ভোলার মতো নয়।

কারণ জিজ্ঞেস করাতে সে জানালো, এই জঙ্গলের এটাই নিয়ম, বাইরের পৃথিবীর কোনো জিনিস এখানে ফেলে যাওয়া যায় না, ঠিক তেমনই এখানকার কিছু, এমনকি একটি পাতাও বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। কেউ নিয়ম ভাঙতে চাইলে নিয়ম-ভঙ্গকারীর ওপর নেমে আসে লাবাসার অভিশাপ।

পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে ক্যারির সঙ্গে বেরিয়ে গেলাম এখানকার বিখ্যাত স্যাক্রেড ফরেস্টের উদ্যেশ্যে, যার সম্বন্ধে ইতিমধ্যেই অনেক রহস্যময় গল্প শুনেছি এবং পড়েছি। এখানে বৃষ্টি নামে যখন তখন, সারাদিন মেঘ আর রোদের লুকোচুরি। একটি ছাতাকে সর্বক্ষণের সঙ্গী না বানালেই নয়। দুপুর নাগাদ একটা উপত্যকার মতো জায়গায় এসে পৌঁছলাম। আশে পাশে ২-৪টে লোকাল ফুডের ছোটো দোকান, এখানে এক জায়গায় বড়ো করে লেখা মাওফ্লাং, যার বাংলা অর্থ হলো শ্যাওলা-ঢাকা পাথর। এর পর থেকেই জঙ্গল শুরু। জঙ্গলের প্রবেশপথে একগুচ্ছ প্রাচীন অখণ্ড পাথর দাঁড়িয়ে আছে। এই বিশাল প্রস্তর সমূহ খাসিদের ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সামনেই কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলে দাঁড়িয়ে। ক্যারি জানালো যে ওরা ক্যারির মতোই গাইড, এই জঙ্গলে লোকাল গাইড ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। প্রায় ১৯২ একর বিস্তৃত, ৮০০ বছরেরও অধিক প্রাচীন এই পবিত্র বনভূমি খাসি উপজাতির আরাধ্য লাবাসার বাসভূমি। এখানকার অধিবাসীরা বিশ্বাস করে, লাবাসা স্বয়ং এই বনভূমি রক্ষা করেন।

জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করতেই মনে হলো বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে এর যেনো কোনো যোগাযোগ নেই। বাইরের পৃথিবীর নিয়ম এখানে খাটে না। যত অগ্রসর হতে লাগলাম, জঙ্গল গাঢ় হতে লাগলো, চারপাশে শতাব্দী প্রাচীন বিশাল বিশাল বৃক্ষের নজরদারিতে সূর্যের আলোও যেন এই বনে ঢুকতে সাহস পায় না। দিনের বেলাতেও এই জঙ্গল জুড়ে থাকে জোলো, বুনো গন্ধ মাখা রহস্যময় আলো-আঁধারি। জঙ্গলে নানান দুর্লভ ভেষজ উদ্ভিদের সঙ্গে ক্যারি আমার পরিচয় করালো। সে আমাকে দেখালো আসল রুদ্রাক্ষের গাছও। বাইরে যে রুদ্রাক্ষ দুষ্প্রাপ্য, তা এই জঙ্গলভূমিতে অনায়াসে পড়ে থাকে গাছের তলে। ব্যবসায়িক উদ্যেশ্যে কেউ সেগুলো তুলে বা চুরি করেও নিয়ে যায় না – একটু অবাকই হলাম। ঘুরতে ঘুরতে আনমনে একটা ফুল নিচ থেকে কুড়িয়ে মাথায় গুঁজেছিলাম, ক্যারি সঙ্গে সঙ্গে সাবধান করলো এই বলে যে, বেরোনোর সময় কিন্তু ফুলটি এই জঙ্গলেই ফেলে বেরোতে হবে, ভুলে গেলে চলবে না। কারন জিজ্ঞেস করাতে সে জানালো, এই জঙ্গলের এটাই নিয়ম, বাইরের পৃথিবীর কোনো জিনিস এখানে ফেলে যাওয়া যায় না, ঠিক তেমনই এখানকার কিছু, এমনকি একটি পাতাও বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। কেউ নিয়ম ভাঙতে চাইলে নিয়ম-ভঙ্গকারীর ওপর নেমে আসে লাবাসার অভিশাপ। এই নিয়ে ক্যারি অনেক গল্পও শোনালো।

বনের আরো ভেতরের দিকে কিছু স্টোন অল্টার বা রিচুয়াল স্টোন দেখিয়ে ক্যারি বললো, এখানে নাকি রাজা এবং গোষ্ঠিপ্রধানদের উপস্থিতিতে একসময় বলি হতো, এখনও বিশেষ দিনে সবাই এখানে জড়ো হয়ে একসঙ্গে প্রার্থনা করে, এই উপজাতিরা মূলত নেচার ওর্শিপার।

ক্যারি আমাকে কিছু প্রাচীন মোনোলিথও দেখালো —বড়ো বড়ো দাঁড়িয়ে থাকা কিছু পাথর, যেগুলো এই খাসি উপজাতির পূর্বপুরুষদের স্মরণে তৈরি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর গায়ে শ্যাওলা জমলেও, এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জায়গাটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মফ্ল্যাং-এর সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, এখানে প্রকৃতিকে লিভিং স্পিরিট হিসেবে মানা হয়, সম্মান দেওয়া হয়। হয়তো সেই কারণেই তাদের এই পবিত্র বন এখনও এত জীবন্ত – শহুরে সভ্যতার মলিনতা আজও ছুঁতে পারেনি এই বনভূমিকে।

পবিত্র জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ক্যারি আমাকে নিয়ে গেলো জঙ্গলের ঠিক পাশে গড়ে তোলা খাসি হেরিটেজ ভিলেজে, যা মূলত খাসি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, স্থাপত্য, সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য তৈরি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এখানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী খাসি ঘরের আদলে নির্মিত কাঠামো, প্রাচীন মনোলিথ, লোকজ সংস্কৃতির নিদর্শন, ঐতিহ্যবাহী সভাস্থল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা ইত্যাদি। এই বিস্তীর্ণ উপত্যকার বুকে নেমে আসা রঙিন সন্ধ্যা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এই সময় গ্রামের লোকজন জড়ো হয় এখানে, বসে গল্পগুজব করে, ছেলেরা তীর ধনুক খেলে। আর অন্ধকার নেমে আসার আগে যে যার বাড়ির দিকে রওনা দেয়, আর সেই রহস্যময় জঙ্গল রাতের অন্ধকারে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে তার জাদু-বাস্তবময় অস্তিত্ব নিয়ে।

ক্যারির দাদার গাড়িতে চেপে শিলংয়ের পথে রওনা দিলাম। সঙ্গে করে নিয়ে চললাম এই খাসি পরিবারটির অকৃত্রিম উষ্ণতা ও আন্তরিকতার স্মৃতি, রহস্যে মোড়া স্যাক্রেড গ্রোভের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, ডেভিড স্কট ট্রেইলের ইতিহাসের অনুরণন, আর সেই নাম-না-জানা পথের কিছু অমূল্য মুহূর্ত—যা হয়তো বহুদিন পর্যন্ত মনে রয়ে যাবে।

পরের দিন ভোর থাকতেই আবার ক্যারির সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম, গন্তব্য – ডেভিড স্কট ট্রেইল, এই ট্রেকিং রুট প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এই ট্রেইল বিখ্যাত এর ইতিহাসের জন্য। উনিশ শতকে, এক ব্রিটিশ প্রশাসকের নামে নামকরণ করা এক প্রাক্তন বাণিজ্য পথের অংশ। একসময় এটি ছিল mule track বা ঘোড়া-খচ্চরে মাল পরিবহনের রাস্তা। এই ট্রেইলটিতে খাসি পাহাড়ের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, উপত্যকা, পাইন বন ছাড়াও ব্রিটিশ আমলে তৈরি পাথরের সেতু ও পুরনো পথের কিছু অংশ দেখা যায়। ট্রেক শেষ করে ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে গেলো। যখন ট্রেক শেষ করলাম, খেয়াল করলাম এই ট্রেইল যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, ঠিক তার পাশ দিয়ে আরেকটি মেঠো রাস্তা চলে গেছে অন্যদিকে, ক্যারিকে জিজ্ঞেস করতে সে জানালো যে ওদিকটায় জঙ্গল, আর একটা ভিউ পয়েন্ট আছে, কেউ তেমন যায় না ওদিকে। ঠিক করলাম আজ বাকি দিনটা রেস্ট করে, কাল সকালে একা আসবো এই রাস্তাটা এক্সপ্লোর করতে।

পরদিন সকালে একটা ছাতা আর জলের বোতল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সেই রাস্তায়। আজ অবশ্য একাই। একটু হাঁটতেই সেই খোলা জায়গাটাতে এসে পড়লাম, যেখানে রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটি রাস্তা গেছে ডেভিড স্কট ট্রেইলে, আর অপর রাস্তাটি ধরে আমি এগোতে লাগলাম। দু-একটা বাড়ি, সব্জির বাগান, নাম না জানা অজস্র ফুলের গাছ, এসব পেরোতেই অপেক্ষাকৃত নির্জন একটি জায়গায় এসে পৌঁছলাম। এদিকটাতে জনবসতির শেষ চিহ্নটুকুও মিলিয়ে গেছে। চারপাশে কেবল ঝোপঝাড়, ছায়ামাখা বন আর বুনো ফুলে ভরা গাছপালা। এখানেই এক জায়গায় নাম না জানা ফুল গাছে ঘেরা তিনটি ছোটো ছোটো এবং একটি বড়ো, মোট চারটি বাঁধানো সমাধি দেখলাম – যেন পথের ধারে দাঁড়িয়ে তারা বহু দিনের কোনো অজানা ইতিহাস বা গল্পের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আরও অনেকটা এগিয়ে যেতে একটা উঁচু জায়গা দেখে বুঝতে পারলাম, এটা নিশ্চয়ই ক্যারির বলা সেই ভিউ পয়েন্ট। সেই উঁচু জায়গাটিতে উঠে, চারিদিকে চেয়ে মন ভরে গেলো – নিচে পাহাড় ঘেরা সবুজ উপত্যকা, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুত রঙা নদী। প্রাণ ভরে সেই দৃশ্য অনেকক্ষণ উপভোগ করলাম, ছবি তুললাম। এবার ফেরার পালা, জঙ্গলের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলাম। বলে রাখা ভালো, এই পুরো রাস্তাটিতে আমার সঙ্গে কোনো মানুষের সাক্ষাৎ হয়নি, সত্যিই এদিকে তেমন কেউ আসে না। আর মোবাইলের নেটওয়ার্কও থাকে না, কাজেই রাস্তা ভুল করলে নিজেকেই চিনে ফিরতে হবে।

হোমস্টেতে যখন ফিরলাম, প্রায় দুপুর। তাড়াতাড়ি স্নান-খাওয়া সেরে বিকেলের আলো ফুরোনোর আগেই ক্যারি ও তার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর ক্যারির দাদার গাড়িতে চেপে শিলংয়ের পথে রওনা দিলাম। সঙ্গে করে নিয়ে চললাম এই খাসি পরিবারটির অকৃত্রিম উষ্ণতা ও আন্তরিকতার স্মৃতি, রহস্যে মোড়া স্যাক্রেড গ্রোভের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, ডেভিড স্কট ট্রেইলের ইতিহাসের অনুরণন, আর সেই নাম-না-জানা পথের কিছু অমূল্য মুহূর্ত—যা হয়তো বহুদিন পর্যন্ত মনে রয়ে যাবে।

______________
কেউ কখনও এই সুন্দর গ্রামটিতে ঘুরতে গেলে, তাঁদের সুবিধার্থে ক্যারির ফোন নম্বরটি দিয়ে রাখা হল – ৯৪০২১৪২৫৭০। সঙ্গে মাওফ্ল্যাং-এর কিছু ছবিও ভাগ করে নেওয়া হল।

Written by
Developed by DXDasia