ইলিশের দুটি অজানা রেসিপি
“ইলিশ মাছ দিয়ে সবকিছুই রান্না করা যায়, একমাত্র ডেজার্ট ছাড়া”, জানালেন শুভজিৎ ভট্টাচার্য, যিনি অমিত ঘোষ দস্তিদারের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করেছেন ‘লস্ট অ্যান্ড রেয়ার রেসিপিস – কিচেন টেলস’। নাম থেকেই স্পষ্ট, হারিয়ে যাওয়া রেসিপি তাঁরা সংগ্রহ করেন। খুঁজে বের করেন এমন সব খাবার, যা আমাদের হেঁসেলে কখনও পৌঁছয়নি।
তাঁদের বেশিরভাগ রেসিপি দুই বাংলার নানা প্রান্ত থেকে সংগৃহীত। সিংহভাগ জুড়ে আছে ইলিশের বহু সুস্বাদু পদ। আম-বাঙালির কাছে ইলিশ কেবল মাছ নয়, এক আবেগের জগৎ। তবে বাংলার বাইরেও ভারত তথা বিশ্বের অনেক জায়গায় ইলিশ খাওয়ার চল রয়েছে।
ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ। প্রজননের সময় হলে ঝাঁকে ঝাঁকে ঢুকে পড়ে নদীর মোহনায়। বেশিরভাগ ইলিশ ধরা হয় সমুদ্র থেকে। বর্ষা এলে তাই নামখানা, কাকদ্বীপ, রায়দিঘি, ফ্রেজারগঞ্জ, পাথরপ্রতিমার মতো ইলিশ হটস্পটগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ইলিশ মাছের ভর্তা
বিশিষ্ট ফুড ব্লগার, খাদ্য রসিক এবং শেফ দেবযানী চট্টোপাধ্যায় আলমের সবচেয়ে পছন্দের ইলিশের পদগুলোর মধ্যে একটি ‘ইলিশ মাছের ল্যাজা ভর্তা’। তাঁর মতে, “পশ্চিমবঙ্গে ইলিশের দুই সেরা উৎস কোলাঘাট (পূর্ব মেদিনীপুর) এবং রূপনারায়ণ নদীর আশপাশ। মেদিনীপুরে সহজলভ্য বলে এই জেলায় ইলিশ রান্নার নিজস্ব রীতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রভাব একেবারেই নেই।”
এবছর কোভিড মহামারি এক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। তবে আশার কথা, সংক্রমণ কমছে দ্রুত হারে। হয়তো কয়েকদিন পরেই বেড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। তখন ঘুরে আসুন ইলিশ হটস্পটগুলোয়। সড়কপথে কলকাতা থেকে সময় লাগবে দু’ঘণ্টার মতো। চাইলে এক দিনেই ঘুরে আসতে পারবেন। অথবা কাটিয়ে আসতে পারেন উইকএন্ড।
গত বছর এই সময় পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবীদের কাছে ইলিশ ধরার দারুণ সুবিধে তৈরি করে দিয়েছিল লকডাউন। মানুষের গতিবিধি কমে যাওয়ায় প্রকৃতি নিজেকে মেলে ধরেছিল। সেরকম বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েনি এবছর। তবে যদি ১৫ জুন আংশিক লকডাউন শেষ হয়, আপনি সড়কপথে গিয়ে নিজের চোখে ইলিশ ধরা দেখতে পারবেন। এই সুযোগও কম মজাদার নয়। এমন সফরের নাম আমরা দিতে পারি ‘ইলিশ পর্যটন’। বাঙালিয়ানার মাধুর্য রয়েছে নামটার মধ্যে।
আরও পড়ুন: বাঁকিপুট সৈকতে নিস্তব্ধতার জাদু
ইলিশ হটস্পটগুলি ঘুরে দেখার সময় পরিবার অথবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে কয়েকদিন স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন ডায়মন্ড হারবারে সাগরিকা ট্যুরিজম প্রপার্টি (পূর্বতন ডায়মন্ড হারবার ট্যুরিস্ট সেন্টার সাগরিকা), বকখালিতে বালুতট ট্যুরিজম প্রপার্টি (পূর্বতন বকখালি ট্যুরিস্ট লজ) এবং গাদিয়াড়ায় রূপমঞ্জরী ট্যুরিজম প্রপার্টিতে (পূর্বতন রূপনারায়ণ ট্যুরিস্ট লজ)। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের অধীনেই সবক’টি। আংশিক লকডাউনের সময়েও পর্যটকদের জন্য এগুলি খোলা। কঠোরভাবে মেনে চলা হয় কোভিড স্বাস্থ্যবিধি। এই প্রপার্টিগুলো থেকে আপনি নদীর অসাধারণ ভিউ পাবেন। সবেমাত্র তোলা ইলিশের তাজা ডিশও থাকবে আপনার জন্য। গৃহবন্দি থাকার ক্লেদ নিমেষে উধাও হয়ে যাবে।
ইলিশ মাছ ধরার পর তাকে রান্না করবেন কীভাবে? দেবযানী বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা যে পূর্ববঙ্গের থেকে শেখার আগে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দারা ইলিশ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। দুই বাংলার ইলিশ রান্নার মধ্যে পার্থক্য অনেক। পূর্ববাংলার প্রচুর মানুষ পেঁয়াজ দিয়ে ইলিশ রাঁধেন । এখন বেশিরভাগ মানুষই সর্ষে ইলিশ কিংবা ইলিশ পাতুরির মতো সহজ পদ বেছে নেন। তবে আরও বিভিন্ন রকম সবজি ব্যবহার করা যায় ইলিশের সঙ্গে।”
এই দুটি রেসিপি আপনি বাড়িতে রেঁধে দেখতে পারেন –
কুমড়ো দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল (ছবি কৃতজ্ঞতা – দেবযানীর রান্নাঘর)
দেবযানী চট্টোপাধ্যায় আলমের ‘কুমড়ো দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোল’
উপাদান
• ৬-৭ টুকরো ইলিশ মাছ ( প্রত্যেকটি ১০০ গ্রাম ওজনের)
• ২৫০ গ্রাম কুমড়ো
• ২টি কাঁচা লঙ্কা
• ১ টেবিল চামচ তেঁতুল বাটা
• ৬ টেবিল চামচ সর্ষের তেল
• ১ চা চামচ হলুদ গুড়ো
• ১ চা চামচ লাল লঙ্কা গুড়ো
• অর্ধেক চা চামচ নুন
• মেরিনেশনের উপযোগী মশলা
• ১ চা চামচ নুন
• ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল
মিশ্রণ
• ১ চা চামচ কালোজিরে
• ২টি শুকনো লাল লঙ্কা
প্রণালী
• এক চা চামচ করে নুন, হলুদ গুড়ো এবং ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিয়ে ইলিশ মেরিনেট করুন।
• মাছ মেরিনেটেড হতে দিন ১৫ মিনিট।
• খোসা ফেলে দিয়ে কুমড়োর ছোটো ছোটো টুকরো করুন।
• দুটো কাঁচা লঙ্কা নিয়ে আধা-আধি ভাগ করুন।
• কড়াই গরম করে তার ওপর ৬ টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিন।
• তেল গরম হয়ে রং বদলানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
• ইলিশ মাছের টুকরোগুলো হালকা ভেজে নিন এক এক করে।
• মাছের প্রত্যেক পিঠ ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড করে ভাজুন।
• মাছ অল্প ভাজা হয়ে গেলে কড়াই থেকে ছেঁকে নিন।
• এভাবে প্রত্যেক টুকরো ভাজবেন।
• কড়াই থেকে ৩ টেবিল চামচ মতো তেল আলাদা করে নিন।
• মেরিনেড করে রাখা বাটিতে দু’কাপ জল যোগ করুন।
• কড়াইয়ের বাকি তেলে দু’টি শুকনো লাল লঙ্কা ভেজে নিন।
• তাতে এক চা চামচ কালোজিরে যোগ করুন।
• হাল্কা আঁচে চামচ দিয়ে ৩০ সেকেন্ড মতো নাড়ুন, যতক্ষণ না সুন্দর গন্ধ বের হয়।
• কুমড়োর টুকরো যোগ করুন।
• ১ চা চামচ করে হলুদ গুড়ো এবং লাল লঙ্কার গুড়ো যোগ করুন।
• অর্ধেক চা চামচ নুন ঢালুন।
• মশলা যোগ করে ৩ মিনিট হালকা আঁচে নাড়তে থাকুন।
• মেরিনেড করে রাখা বাটির সেই জল এবার দিন। ১০ মিনিট নাড়ুন।
• তেঁতুল বাটা যোগ করুন।
• কাঁচা লঙ্কা দিন।
• ১০ মিনিট পর কুমড়ো পুরোপুরি রান্না হয়ে যাবে।
• একের পর এক মাছের টুকরো দিন এবং ৫ মিনিট রান্না করুন।
• ইচ্ছে হলে ১ টেবিল চামচ সর্ষে তেল দিতে পারেন।
• আগুন নিভিয়ে অপেক্ষা করুন মিনিট পাঁচেক।
• গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ইলিশ মাছের দোলন (ছবি কৃতজ্ঞতা – লস্ট অ্যান্ড রেয়ার রেসিপিস)
লস্ট অ্যান্ড রেয়ার রেসিপিস-এর ‘ইলিশ মাছের দোলন’
উপাদান
• ৪ টুকরো ইলিশ মাছ
• ৬ টেবিল চামচ সর্ষের তেল
• অর্ধেক টেবিল চামচ লাল লঙ্কা গুড়ো
• ১ টেবিল চামচ হলুদ গুড়ো
• ২.৫ টেবিল চামচ পেঁয়াজ বাটা
• ২ চা চামচ তেঁতুল বাটা
• ২ চা চামচ সর্ষে বাটা
• পরিমাণ মতো নুন
প্রণালী
মাছের সঙ্গে হলুদ, লঙ্কা গুড়ো এবং ৩ রকমের বাটা মিশিয়ে মেরিনেট করুন। অল্প নুন এবং ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল দিন। ভালো করে মিশিয়ে ১ ঘণ্টার মতো রাখুন।
৪ টেবিল চামচ সর্ষের তেল গরম করে ধীরে ধীরে তাতে মাছের টুকরোগুলো দিন। মেরিনেডের বাকি অংশও দেবেন। মেরিনেট করার বাটিতে অল্প জল ঢেলে পরিষ্কার করুন। সেটাও মাছের সঙ্গে ঢেলে দিন।
মাছের টুকরো উল্টে-পাল্টে রান্না করুন। আঁচ হাল্কা করে অন্যান্য উপাদানও নাড়তে থাকুন, যাতে গ্রেভি সুস্বাদু হয়। গ্রেভি ঘন হয়ে গেলে গরমাগরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
