
শিলিগুড়ির বেশ কিছু তরুণ পৃথক পৃথকভাবে বানরদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন ত্রাণ হিসাবে
করোনা দুর্যোগের কারণে লকডাউন হওয়াতে দার্জিলিং পাহাড় ও সিকিম এখন পর্যটক শূন্য। কবে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে পর্যটন আবার স্বাভাবিক হবে তা এখনই নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন না। তবে এই দুর্যোগে মানুষের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছে পাহাড়ের বানরেরাও। বিশেষ করে শিলিগুড়ি লাগোয়া সেভক পাহাড় ও সুকনার জঙ্গল এলাকায় যেসব বানর পর্যটক নির্ভর, সেই সব বানর-পরিবার চরম সংকটে। তাই শিলিগুড়ি শহর থেকে বেশ কিছু তরুণ পৃথক পৃথকভাবে বানরদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন ত্রাণ হিসাবে।
সেভকে বাঘ পুলের কাছে দেখা যায় অনেক বানরকে। শিশু সন্তানকে শরীরে আঁকড়ে অনেক বানর রাস্তার ধারে বসে থাকে। পর্যটকরা সে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ওদের দিকে বিভিন্ন খাবার ছুঁড়ে দেয়। সারাদিন ধরে সেই সব খাবারেই পেট ভরে যায় বানরদের। জঙ্গল ছেড়ে মানুষের কাছ থেকে খাবার পাবার আশায় ওইসব বানরের ঠিকানাও হয়ে উঠেছে রাস্তার ধার।

আবার সেভক কালি মন্দির ও শিব মন্দিরে প্রতিদিন বহু পর্যটক উপস্থিত হতেন পুজো দিতে। সেই সব পর্যটকদের মধ্যেও অনেকে পুজোর বিভিন্ন প্রসাদ, যেমন কলা ইত্যাদি বিলি করেন বানরদের মধ্যে। ফলে মানুষের সঙ্গেও অন্যরকম এক আত্মিক যোগ হয়ে যায় বানরগুলোর। কিন্তু করোনা দুর্যোগ হওয়ায় পাহাড় পর্যটক শূন্য হয়ে পড়েছে। কার্যত যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ওদিকে লকডাউনের বিধিনিষেধে মন্দিরও বন্ধ থাকে। আর এতেই খাদ্য সংকট তৈরি হয় বানরগুলোর সামনে। তারা রাস্তাতেই মানুষের অপেক্ষায় ছটফট করতে থাকে।
খবর পেয়ে শিলিগুড়ি থেকে বেশ কিছু তরুণ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে লকডাউন পর্বে ওইসব বানরদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বন্টনের কাজে নামেন। যেমন শিলিগুড়ি অরবিন্দ পল্লীর সমাজসেবী বাপন ঘোষ। বাপন লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন গরিব মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিলির কাজে নামেন। বাপন বলেন, দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ বিলির সময় তাঁর কাছে খবর আসে সেভকে বানরগুলো অভুক্ত রয়েছে। আর খবর পাওয়া মাত্রই তিনি শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট থেকে লকডাউনে তাঁর গাড়ি চালানোর অনুমতি সংগ্রহ করেন। এরপর টানা কয়েকদিন ধরে তিনি সেভকে গিয়ে বানরগুলোর মধ্যে রুটি, কলা, বিস্কুট বিলি করেন।
বাপনের মতো শিলিগুড়ি সেভক রোডের যুবক জয় সরকার, পিন্টু সাহা, সঞ্জিত দাস, জয়দেব বিশ্বাস প্রমুখ সেভকে গিয়ে বানরগুলোর মধ্যে কলা, রুটি বিলি করেন টানা ক'দিন ধরে। তাঁরা সুকনার মধুবন জঙ্গল এলাকাতে গিয়েও রাস্তার ধারে বসে থাকা বানরগুলোর মধ্যে খাবার বিলি করেন। এভাবে শিলিগুড়ির আরও কিছু তরুণ উৎসাহিত হয়ে বানরগুলোর মধ্যে খাদ্য বন্টনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।

বানরগুলোর মধ্যে এরকম খাদ্য বন্টন কর্মসূচির তারিফ করেন স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী সংস্থা অপটোপিকের কর্ণধার দীপজ্যোতি চক্রবর্তী। তিনি বলেন, করোনার জেরে পাহাড়ে পর্যটক নেই। এই অবস্থায় বানরগুলো বিপাকে। ফলে বানরদের মধ্যে খাদ্য বন্টন নিশ্চয়ই শুভ উদ্যোগ। তাঁরাও এরকম কর্মসূচি গ্রহণ করতে চলেছেন। যদিও দীপজ্যোতিবাবু একইসঙ্গে জানান, পর্যটক নির্ভর হয়ে থাকায় বানরগুলোর শরীরেও পরিবর্তন আসছে। বহু পর্যটক নিয়ম না মেনে বানরগুলোকে গাড়ি থেকে চিপস, কুরকুরের প্যাকেট ছুঁড়ে দেন। আর সেসব খেয়ে বেশ কিছু বানরের শরীর মেদও হয়ে গিয়েছে। এমনকি তাদের ধারনা টানা দূষণ এবং মানুষের দেওয়া কিছু খাবার খেয়ে কিছু বানর প্রজনন শক্তিও হারিয়েছে। বহু দিন ধরে তাঁরা দেখছেন ওই এলাকায় বানরের সংখ্যা প্রায় একইরকম রয়েছে। তাদের সংখ্যা খুব একটা বাড়ছে না। বিষয়টি চিন্তার। আর তারা বনের মধ্যেকার নির্ভেজাল খাবার না খেয়ে মানুষের দেওয়া বিভিন্ন ভেজাল খাবার খেয়ে অন্যরকম হয়ে উঠছে যা তাদেরকে ভাবিয়ে তুলছে।
দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি এই অবলা প্রাণীগুলোর পাশে প্রত্যেককেই দাঁড়ানো উচিত। লকডাউনে একদিকে যেমন মানুষের দিশেহারা পরিস্থিতি, তেমনই এই অবলা প্রাণীরা একটু খাবারের আশায় রাস্তায় বসে আছে। ওদের যত্ন করা মানবিক কর্তব্য। সবাই সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকলেই একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন গড়তে পারব আমরা।
