শান্তিনিকেতনের বাটিক ও একতারার ‘জিআই’ স্বীকৃতি : গ্রামীণ অর্থনীতির নয়া দিগন্ত

রবীন্দ্র-স্মৃতিবিজড়িত দুই শিল্পের বিশ্ব স্বীকৃতি

দ্যই বাংলার একগুচ্ছ পণ্য ‘জিআই’ তকমা পেয়েছে। রবি ঠাকুরের শান্তিকেতনের মুকুটে যুক্ত হয়েছে জোড়া পালক, কারণ শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্প এবং একতারা পেয়েছে ভৌগোলিক স্বীকৃতি। স্বভাবতই এ খবরে খুশি গোটা রাঙামাটির দেশ। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘বাটিক শিল্প’ এবং ‘একতারা’ গৌরবময় স্বীকৃতি পাওয়ায় বীরভূম জেলার হস্তশিল্প আরও গতি পাবে, এমনই আশা শিল্পীদের। সুফল পাবে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং পর্যটন শিল্প। অতীতে শান্তিনিকেতনের চামড়ার সামগ্রী, কোরিয়াল শাড়ি, গরদ শাড়ি, নকশিকাঁথা এই স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশিষ্ট শিল্পী ও শিল্প-শিক্ষক সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘বাটিক শিল্প ও একতারার ‘জিআই’ প্রাপ্তি খুবই আনন্দের খবর।’’

বাউল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল একতারা। আখড়া, রসকলির মতো একতারাও বাউল-সংস্কৃতির যাপনে মিশেছে। বীরভূমের লালমাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাউল গানের প্রাণ, একতারা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতন চিরকাল বাউল ও তাঁদের সুরকে, সংগীতকে লালন করে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ‘রবি-বাউল’ বলেছেন। প্রান্তজনের বাউলগান ও একতারাকে সুধীজনের দরবারে হাজির করেছেন রবি ঠাকুর এবং তাঁর শান্তিনিকেতন। শান্তিদেব ঘোষেরা বাউলাঙ্গের গানে রবীন্দ্রনৃত্যে মিশিয়ে দিয়েছেন একতারাকে। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা থেকে জয়দেব-কেঁদুলির পৌষ সংক্রান্তির মকর মেলা; বাউল ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ। দীনজীবী বাউলেরা ট্রেনে-বাসে একতারা হাতেই মাধুকরী করে চলেছেন আবহমানকাল জুড়ে। শহর থেকে শান্তিনিকেতনগামী ট্রেনে আজও এ দৃশ্য দেখা যায়। ট্রেনে একতারা হাতে বাউলের সাক্ষাৎ মানেই শান্তিনিকেতন সফর শুরু বাঙালির।

রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ‘রবি-বাউল’ বলেছেন। প্রান্তজনের বাউলগান ও একতারাকে সুধীজনের দরবারে হাজির করেছেন রবি ঠাকুর এবং তাঁর শান্তিনিকেতন। শান্তিদেব ঘোষেরা বাউলাঙ্গের গানে রবীন্দ্রনৃত্যে মিশিয়ে দিয়েছেন একতারাকে।

প্রান্তজনের এই বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয় লাউয়ের খোলা বা নারকেলের মালা দিয়ে। সঙ্গে লাগে ছাগলের চামড়া, এক খণ্ড সরু বাঁশ, একগাছি তার। জন্ম হয় মরমি সুরের। তবে এখন কাঠের একতারাও তৈরি হয়। বাউল, ফকিরদের একতারাকে ‘এক তারের বিস্ময়’ আখ্যা দিয়ে জিআই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একতারার জন্ম অবিভক্ত বঙ্গেই। শান্তিনিকেতন নিজস্ব ঘরানায় একে গড়েপিঠে নিয়েছে, এসেছে স্বতন্ত্র এক ছাপ। এক তারের সহজ-সরল বাদ্যযন্ত্র কদরের অভাবে সমাজের মূলস্রোতে অনালোচিতই থেকে গিয়েছে। অথচ পল্লীবাংলার আঁকাবাঁকা মেঠোপথে একতারা হাতে গেরুয়া বসন পরা বাউল-দরবেশের ছবি, সকলের মনেই আঁকা থাকে। এর কারণ, একটিই। একতারা প্রান্তজনের গানে ব্যবহৃত হয়। উচ্চাঙ্গ সংগীত, শাস্ত্রীয় সংগীত বা মার্গ সংগীতে এর ব্যবহার নেই। দেহতত্ত্ব-র গানের রাজা একতারা। উপেক্ষিত একতারার এই স্বীকৃতি যেন প্রান্তিক মানুষদের জয়। বঙ্গের বাউল-ফকির-কীর্তনীয়াদের জয়। এহেন স্বীকৃতি শান্তিনিকেতনের একতারা তৈরির কারিগরদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক নয়া পরিচয় এনে দেবে। শহুরে মানুষের কাছে খোয়াইয়ের হাটে বিক্রি হওয়া ঘর সাজানোর শো-পিস পরিচয়ে আর আটকে থাকবে না একতারা।

অন্যদিকে, শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্পের বয়স প্রায় একশো বছর। জাভার বাটিক শিল্প নিজস্বতা পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে এসে। হয়ে উঠেছে অনন্য। মোম এবং রঙের যুগলবন্দিতে কাপড়ের উপর তৈরি হয়েছে বাটিকের শান্তিনিকেতনী ঘরানা। শান্তিনিকেতনের বাটিকের গৌরবময় কাহিনি জানতে বঙ্গদর্শন.কম যোগাযোগ করে বর্তমানে বাংলার আলপনা শিল্পের সেরা ধারক ও বাহক তথা বিশিষ্ট শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর কথায়, ‘‘১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম জাভা গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন শিল্পী ও স্থপতি সুরেন্দ্রনাথ কর। সবাই তাঁকে সুরেন কর বলেই চেনেন। আরও দু-একজন গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। নন্দলালেরও (নন্দলাল বসু) যাওয়ার কথা ছিল। জাভাযাত্রীর পত্র থেকে জানতে পারছি, ছেলে রথীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘নন্দলাল এখানে এলেন না বলে আমার খুব আক্ষেপ হয়।’ হয়তো কোনও কারণে যেতে পারেননি নন্দলাল। জাভার শিল্প সম্ভার দেখে উনি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) মুগ্ধ হয়েছিলেন… একদিকে জাভার স্থাপত্য, নকশা, অলঙ্করণ। আর একদিকে, জাভার গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্যের পোশাক, অলংকার, মুকুট ইত্যাদি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি শ্রীনিকেতন গড়ার পরিকল্পনা করছেন। তিনি ভাবছেন, ‘শ্রীনিকেতনে যদি আমি এই রকম লক্ষ্মীশ্রী আনতে পারতাম।’ জাভাযাত্রীর পত্রে এগুলো সম্পর্কেই উনি বর্ণনা করেছেন। ওখানকার রাজপরিবার থেকে রবীন্দ্রনাথ সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। তাঁরা দুটো বাটিকের কাজ রবীন্দ্রনাথকে উপহার দিয়েছিলেন। দু’টি বস্ত্রখণ্ড, অর্থাৎ জাভার ঐতিহ্যবাহী পোশাক।’’

শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্পের নেপথ্যে জাভার বাটিকই কাজ করেছিল অনুপ্রেরণা রূপে। তবে শান্তিনিকেতনের বাটিক স্বকীয়। বাটিকের দুই ধারার ফারাক সম্পর্কে সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় জানালেন, ‘‘শান্তিনিকেতনে বাটিকের কাজ হয়, তুলি দিয়ে… গরম মোমে তুলি ডুবিয়ে কাপড়ে নকশার উপর লাগানো হয়। বাটিকের কাজ হচ্ছে অবরোধ। মানে যেখানে মোম লাগানো হচ্ছে, সেখানে সেই রংটাই থেকে যাবে। পুরো কাপড়কেই রঙে ডোবানো হচ্ছে, যদি একটা ফুল বা পাতাকে সাদা রাখতে হয়, সেক্ষেত্রে ফুল বা পাতাকে মোম দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সেখানটায় রং ঢুকছে না। এটাই জাভানিজরা করতো নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সরঞ্জামের মাধ্যমে। দেখতে চামচের মতো হাতল দেওয়া, চামচের সামনের অংশটা ঝুলন্ত বাটির মতো। সেখানে একটা সরু নল বেরিয়ে থাকে। ওরা বাটির মধ্যে গরম মোম ঢেলে নেয় এবং দ্রুত তা নকশার উপর লাগিয়ে কাজ করে। এটাই ছিল ওদের পদ্ধতি। ওদের ‘অর্নামেন্টাল’ কাজের ধরন কিছুটা আলাদা। সেখানে ওরা ‘ফিগারেটিভ’ কাজ রেখেছে। রামায়ণ, মহাভারতের কাহিনি রেখেছে। চরিত্রও আছে। ওদের ‘কম্পোজিশন’-এর ধরন আলাদা। যেমন ‘জিওমেট্রিক’ কাজ আছে, পাখি, পোকামাকড়, কীট-পতঙ্গও আছে। ওরা যে সব ‘টুলস’ দিয়ে বাটিক করে, সেই উপকরণগুলো সুরেন কর এনেছিলেন। তা দিয়েই শান্তিনিকেতনে বাটিক চর্চা শুরু হয়। কিন্তু অসুবিধা হল…তখন কলাভবনে যাঁরা ছিলেন নন্দলাল বসু, গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেন, তাঁদের ওই জাভানিজদের সরঞ্জামে অর্থাৎ নলওয়ালা চামচের মতো জিনিস দিয়ে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছিল। গরম মোম কাপড়ে পৌঁছতে পৌঁছতেই ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। নকশা অনুযায়ী মোম লাগানো যাচ্ছিল না। রানি চন্দের লেখা থেকে জানতে পারছি, নন্দলাল হঠাৎই একদিন ছবি আঁকার তুলি গরম মোমে ডুবিয়ে দিলেন। কাপড়ের উপর টানলেন। দেখলেন সুন্দর আলপনার মতো রেখা পড়ছে। ততদিনে শান্তিনিকেতনের আলপনা বিশেষ স্থান অধিকার করে ফেলেছে। কারুসঙ্ঘ তো ছিলই। গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেনরা তৈরি করেছিলেন। নন্দলাল ছিলেন, প্রভাতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনোদবিহার মুখোপাধ্যায় ছিলেন এবং আরও অনেকে ছিলেন। তালধ্বজ বাড়িতেই বাটিকের চর্চা হতো।’’ 

শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্পের মূল ভিত্তিই আলপনা। এতে ভর করেই বাটিক শিল্পের নিজস্ব ঘরানার জন্ম। এ সম্পর্কে সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শান্তিনিকেতনের আলপনা কিন্তু বাংলার গ্রামীণ আলপনার মতো নয়। এটা প্রতিষ্ঠানিকভাবে কলাভবনকে ধরেই গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতি-পর্যবেক্ষণ করে, সেখান থেকে নকশা বানানো হয়। এটা নন্দলালের আদৰ্শ যে, প্রকৃতি থেকে নকশা-উপাদান সংগ্রহ। ভারতের মন্দির ভাস্কর্য, স্থাপত্য ভাস্কর্যের নকশা, অজন্তার অলংকরণও স্থান পেয়েছিল আলপনায়। সব মিলিয়ে শান্তিনিকেতনের আলপনা নানা কিছুর সমন্বয়। সেই আলপনাকে ভিত্তি করে বাটিক গড়ে উঠেছিল। গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেনরা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে বাটিক করতেন। পদ্ম ফুল হোক বা কদম ফুল, তাকে নকশার ছন্দে ভাঙতেন। একেবারেই নিজস্ব ঘরানা। শান্তিনিকেতনের চামড়ার বাটিকও খুব বিখ্যাত। এখনও পাওয়া যায়। আগে মোড়ার উপরেও ওরকম নকশা হতো। এখন সেটা বিশেষ দেখা যায় না।’’

শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্পের মূল ভিত্তিই আলপনা। এতে ভর করেই বাটিক শিল্পের নিজস্ব ঘরানার জন্ম। এ সম্পর্কে সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলেন, “শান্তিনিকেতনের আলপনা কিন্তু বাংলার গ্রামীণ আলপনার মতো নয়। এটা প্রতিষ্ঠানিকভাবে কলাভবনকে ধরেই গড়ে উঠেছিল। প্রকৃতি-পর্যবেক্ষণ করে, সেখান থেকে নকশা বানানো হয়।”

তিনি আরও বললেন, ‘‘শান্তিনিকেতনের বাটিকের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল জ্যামিতিক বিভাজন। ধরা যাক, একটা পাড়। টানা লতা, পাতা যেমন আছে, তেমন মাঝে মাঝে একটু ‘ব্রেক’ আছে। বিরতি। সেখানে হয়তো চৌকো বা লম্বাটে একটা খোপ আছে। তাতে একটা আলাদা নকশা। টানা পাড়ের একঘেয়েমিকে মাঝে মাঝে ‘ব্রেক’ করে দেওয়া হল। আঁচলের ক্ষেত্রেও ফারাক আছে। শান্তিনিকেতনের বাটিকের শাড়ির আঁচলের নিচের দিকে ঝালোর। লতা, পাতা দিয়ে নকশা। আঁচলে বাক্সের মতো অতটা জায়গা! সেখানে নানা রকমভাবে সাজানো। জায়গাটা নানান ভাবে ভাঙা হচ্ছে, খোপ তৈরি করা হচ্ছে। এক একটা খোপে এক এক ধরনের নকশা। তাতে বড়ো করে একটা বিষয় আসছে। হয়তো একটা পাখি বা মাছ বা ময়ূর ইত্যাদি এসে পড়ছে। শান্তিনিকেতনের আলপনা বাটিকের প্রধান উপজীব্য। বাটিক সুরুচিসম্পন্ন শিল্পকলা, সেটা বাণিজ্যিকভাবেও সফল।’’

কেবল বাটিকের প্রচলন এবং স্বাধীন ঘরানার জন্ম নয়। বাটিককে জনপ্রিয়ও করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সে গল্প শোনালেন সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘জাভা থেকে আসার পর, সম্ভবত ১৯৩৩ সালে ‘তাসের দেশ’ মঞ্চস্থ হয়। তখন জাভা বাটিক অনুসরণে তাসের দেশের রানির পোশাক অর্থাৎ শাড়িটা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় জাভা বাটিক নিয়ে বেশ কিছু কাজ হয়েছিল। তবে তখনও পুরোপুরি শান্তিনিকেতন নয়, নকশায় জাভা বাটিকের প্রভাব ছিল। লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের নায়িকা বা অন্যান্য চরিত্ররা একটা করে বাটিকের শাড়ি পরছেন। এইভাবেই শান্তিনিকেতনে বাটিকের শাড়ি পরার প্রচলন হয়েছিল। তারপর বাটিকের নকশা বদলে গেল, আলপনার দিকে চলে গেল।’’

শান্তিনিকেতনী বাটিক শিল্প দেশ-বিদেশে সমাদৃত। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার যেখানে মেলবন্ধন, সেখানেই বাটিকের সৃষ্টি। আগামী বছর রবীন্দ্রনাথের জাভাযাত্রার শতবর্ষ। রবি ঠাকুরের জাভা সফরই এদেশে বাটিকের আগমন ঘটিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের জাভাযাত্রার প্রাক শতবর্ষে বাটিক শিল্পের স্বীকৃতি আনন্দের, গর্বের। এই স্বীকৃতি শান্তিনিকেতনের বাটিক শিল্প ও শিল্পীদের প্রচার ও প্রসারে আরও সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে সুফল পাবেন বাটিক চর্চায় যুক্ত শিল্পীরা।
 

Developed by DXDasia