দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অবিস্মরণীয় অধ্যায়
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ইতিহাসের পাতায় স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন এবং তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প “গোসাবা” এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এটি কেবল একটি দ্বীপের উন্নয়নের গল্প নয়, বরং এটি ছিল শোষিত গ্রামবাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির এক অনন্য মডেল।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার গোসাবা ব্লকটি আজ পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত হলেও, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এটি ছিল এক দুর্গম, বাদা ও ম্যানগ্রোভ অরণ্যে ঘেরা জনশূন্য এলাকা। এই পরিত্যক্ত ভূমিকে এক আদর্শ জনপদে রূপান্তর করেছিলেন এক স্কটিশ ব্যবসায়ী— স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন। ১৮৮০ সালে তিনি কলকাতায় আসেন ‘ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি’ কোম্পানির অংশীদার হিসেবে। ব্যবসায়িক সাফল্যে তিনি প্রচুর অর্থের মালিক হলেও তাঁর মন পড়ে থাকত বাংলার অবহেলিত গ্রামগুলোতে।
স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টনের সাহস ও উদ্ভাবনী চিন্তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হলো তাঁর প্রবর্তিত নিজস্ব মুদ্রা। ১৯২৪ সালে তিনি গোসাবায় নিজস্ব নোট ছাপান। এই নোটগুলো ছিল আসলে এক টাকার ‘প্রমিসরি নোট’।

গোসাবা পত্তন ও হ্যামিল্টনের দর্শন
হ্যামিল্টন সাহেব বিশ্বাস করতেন, ভারতের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণে। ১৯০৩ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সুন্দরবনের প্রায় ১০,০০০ একর জমি (গোসাবা, সাতজেলিয়া এবং রাঙাবেলিয়া দ্বীপ) ইজারা নেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে কোনো জমিদার বা মহাজনের শোষণ থাকবে না। তিনি বলেছিলেন, “মানুষই সম্পদ, টাকা নয়”। তিনি জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি তৈরি করেন এবং মেদিনীপুর, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর থেকে ভূমিহীন কৃষকদের নিয়ে এসে বসতি স্থাপন করান। তিনি তাঁদের জমি দেন, কিন্তু কোনো খাজনা বা ঋণের জালে জড়াতে দেননি।
সমবায় ব্যবস্থার প্রবর্তন (১৯২৪)
হ্যামিল্টন সাহেবের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব ছিল ভারতে আধুনিক সমবায় (Co-operative) আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। ১৯২৪ সালে তিনি গোসাবায় একটি সমবায় সমিতি গঠন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গরিব চাষিরা মহাজনদের উচ্চ সুদের ঋণের জালে আটকে সর্বস্বান্ত হয়। এই শৃঙ্খল ভাঙতে তিনি তৈরি করেন ‘গোসাবা সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক’।
এর মাধ্যমে তিনি চাষিদের কম সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এটি কেবল একটি ব্যাংক ছিল না, এটি ছিল একটি গ্রামোন্নয়ন কেন্দ্র। তিনি সমবায় ভিত্তিতে ধান ভানার কল, তেলের কল এবং বস্ত্র বয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

নিজস্ব মুদ্রা বা ‘গোসাবা কারেন্সি’
স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টনের সাহস ও উদ্ভাবনী চিন্তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হলো তাঁর প্রবর্তিত নিজস্ব মুদ্রা। ১৯২৪ সালে তিনি গোসাবায় নিজস্ব নোট ছাপান। এই নোটগুলো ছিল আসলে এক টাকার ‘প্রমিসরি নোট’। এই নোটের গায়ে লেখা থাকত— “I promise to pay the bearer the value of one rupee in goods or services at the Gosaba Cooperative Stores.”
অর্থাৎ, গোসাবার ভেতরে এই কাগজটি মুদ্রার মতোই ব্যবহার করা যেত। এটি করার উদ্দেশ্য ছিল গোসাবার মূলধনকে স্থানীয় এলাকার মধ্যেই রাখা এবং ব্রিটিশ মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানো। মজার বিষয় হলো, ব্রিটিশ সরকার এই কাজে তাঁকে বাধা দেয়নি, কারণ তারা দেখেছিল এই ব্যবস্থার ফলে গোসাবার অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হ্যামিল্টন সাহেবের বন্ধুত্ব
হ্যামিল্টন সাহেবের এই গ্রামীণ অর্থনীতির মডেলে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ নিজেও শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে পল্লী পুনর্গঠনের কাজ করছিলেন। ১৯৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে হ্যামিল্টন সাহেবের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ গোসাবায় আসেন।
কবি সেখানে তিন দিন ছিলেন। তিনি এখানকার সমবায় ব্যবস্থা, চাষিদের স্বনির্ভরতা এবং হ্যামিল্টনের দূরদর্শিতা দেখে অভিভূত হন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, হ্যামিল্টন সাহেব যা করে দেখিয়েছেন, তা পুরো ভারতের জন্য এক অনুপ্রেরণা। আজও গোসাবায় হ্যামিল্টন সাহেবের বাংলোর পাশে রবীন্দ্রনাথের থাকার স্মৃতি বিজড়িত ঘরটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
কখনও গোসাবা ভ্রমণে গেলে, হ্যামিল্টন সাহেবের সেই বাংলো এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কক্ষটি অবশ্যই দেখবেন, যা এই নীরব বিপ্লবের কথা মনে করিয়ে দেবে।

শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার
হ্যামিল্টন কেবল অর্থব্যবস্থা নিয়েই কাজ করেননি, তিনি মানুষের মেধা বিকাশের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি গোসাবায় স্কুল তৈরি করেন এবং চাষিদের জন্য আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর একটি বিশেষ নিয়ম ছিল— যারা এই দ্বীপে বাস করবে, তাদের কোনো নেশা করা চলবে না এবং নিরক্ষর থাকা চলবে না। তিনি স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। সুন্দরবনের বাঘ আর সাপের সঙ্গে লড়াই করে যারা বেঁচে থাকত, তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
হ্যামিল্টনের স্বপ্নের বর্তমান অবস্থা
স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন ১৯৩৯ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী এই কাজ কিছুদিন চালিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকারি স্তরে উদ্যোগের অভাব এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ফলে হ্যামিল্টনের সেই সমবায় বিপ্লব অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘হ্যামিল্টন ট্রাস্ট’ আজও রয়েছে। গোসাবার হ্যামিল্টন হাই স্কুল এবং তাঁর সেই বাংলো বাড়িটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রমাণ করে যে:
* সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ কেবল ব্রিটিশ সরকার ছিল না, হ্যামিল্টনের মতো কিছু মহৎ প্রাণ মানুষের অবদানও অনস্বীকার্য।
* গ্রামীণ ভারতে নিজস্ব মুদ্রা বা বিকল্প অর্থনীতির সফল প্রয়োগ গোসাবা থেকেই শুরু হয়েছিল।
* সুন্দরবনের মানুষের কাছে হ্যামিল্টন সাহেব কোনো ব্রিটিশ শাসক ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন ত্রাতা।

অথচ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা বললেই আমরা অনেক সময় পিছিয়ে পড়া বা নোনা জলের দেশ ভাবি। কিন্তু এই জেলারই একটি প্রান্তে স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন একশ বছর আগে এমন এক আধুনিক ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যা আজও পৃথিবীর যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের কাছে গবেষণার বিষয় হতে পারে। সুন্দরবনের কাদামাখা মানুষের হাতে আত্মসম্মান আর স্বনির্ভরতার অস্ত্র তুলে দেওয়ার সেই কাহিনি বাংলার ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। কখনও গোসাবা ভ্রমণে গেলে, হ্যামিল্টন সাহেবের সেই বাংলো এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কক্ষটি অবশ্যই দেখবেন, যা এই নীরব বিপ্লবের কথা মনে করিয়ে দেবে।
______________
তথ্যসূত্র:
1. District Gazetteer of South 24 Parganas: ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত
প্রকাশিত জেলা গেজেটিয়ারে গোসাবা এবং হ্যামিল্টন সাহেবের জমিদারি ও সমবায় ব্যবস্থার
বিশদ বিবরণ রয়েছে।
2. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি ও ডায়েরি: ১৯৩২ সালে গোসাবা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হ্যামিল্টনকে একাধিক চিঠি লিখেছিলেন এবং তাঁর লেখায় এই আদর্শ
গ্রামের প্রশংসা করেছিলেন। (সূত্র: শান্তিনিকেতনের আরকাইভ)।
3. The Hungry Tide (অমিতভ ঘোষ): বিশ্ববিখ্যাত এই উপন্যাসে অমিতভ ঘোষ সুন্দরবনের
ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন এবং তাঁর সমবায় আদর্শের একটি সুন্দর
কাল্পনিক অথচ তথ্যনির্ভর চিত্রায়ন করেছেন।
4. “Sir Daniel Hamilton and the Cooperative Movement in Bengal”: বিভিন্ন
অর্থনৈতিক জার্নাল এবং ভারতের সমবায় আন্দোলনের ইতিহাসে এই গবেষণা পত্রটি
গুরুত্বপূর্ণ।
5. The Hamilton Trust Records: গোসাবাতে অবস্থিত ‘হ্যামিল্টন ট্রাস্ট’ আজও তাদের
নথিপত্র সংরক্ষণ করে, যেখানে ১৯২৪ সালের সেই ‘এক টাকার নোট’ বা প্রমিসরি নোটের
উল্লেখ পাওয়া যায়।
6. Ananda Bazar Patrika & The Statesman Archives: এই দুই সংবাদপত্রের পুরনো
আরকাইভে হ্যামিল্টন সাহেবের কাজ এবং রবীন্দ্রনাথের গোসাবা সফর নিয়ে সমসাময়িক
প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
7. West Bengal Tourism: পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের ব্রোশার এবং নথিতে ‘হ্যামিল্টন
বাংলো’ ও ‘রবীন্দ্রনাথের ঘর’ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যের রেফারেন্স দেওয়া থাকে।
8. The Telegraph Article: 11 January, 2020