সরকারি উদ্যোগে আবার ফিরছে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের বনবাংলো
শুরু হয়েছে হলং বনবাংলো পুনর্নির্মাণ-এর কাজ। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের ঐতিহ্য ও গর্বের বনবাংলো ফের মাথা তুলে দাঁড়াতে চলেছে। পুনর্নির্মাণের জন্য রাজ্যের তরফে প্রায় চার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জঙ্গলপ্রেমী পর্যটক থেকে শুরু করে পর্যটন ব্যবসায়ী, উত্তরবঙ্গের আম জনতা সকলেই খুশি রাজ্যের এহেন উদ্যোগে।
২০২৪ সালের ১৮ জুন রাতে বিধ্বংসী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের হলং বনবাংলো। জলদাপাড়ার জঙ্গল তথা ডুয়ার্সের অন্যতম আকর্ষণ হলং বনবাংলোয় সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ মজুমদার ও অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তীরা নিয়মিত আসতেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, বাংলার প্রাক্তন রাজ্যপাল বীরেন জে শাহ, গোপালকৃষ্ণ গান্ধী, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে থেকেছেন বারবার। বিদেশি পর্যটকেরাও আসতেন।
হলং বনবাংলো তৈরি হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। অসম ও অরুণাচল প্রদেশের রাজ্য গাছ হলং-এর নামেই বাংলোর নামকরণ করা হয়েছিল। কারণ, হলং কাঠ দিয়েই বনবাংলো তৈরি করা হয়েছিল। পরে সংস্কারের সময় অন্য কাঠ ব্যবহার করা হয়।
আগুনে পোড়া সেই ভয়াবহ ছবি
হলং বনবাংলো তৈরি হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। অসম ও অরুণাচল প্রদেশের রাজ্য গাছ হলং-এর নামেই বাংলোর নামকরণ করা হয়েছিল। কারণ, হলং কাঠ দিয়েই বনবাংলো তৈরি করা হয়েছিল। পরে সংস্কারের সময় অন্য কাঠ ব্যবহার করা হয়। তখন মাত্র দুটো ঘর ছিল। ফরেস্ট রেঞ্জাররা কাজের অবসরে বিশ্রাম নিতেন সেখানে, পর্যটকদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ১৯৮০ নাগাদ বাংলো তৈরি হয় বৃহদাকারে। আড়াই-তিন বছর ধরে দোতলা কাঠের বাংলো গড়ে ওঠে। খুলে দেওয়া হয় পর্যটকদের জন্য।
নুড়ি পাথরের রাস্তা পেরিয়ে কাঠের বাংলো, সামনে বয়ে চলা হলং ঝোরা। এই ঝোরা গিয়ে হলং নদীতে মিশেছে। নদী সাধারণত উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে যায়, কিন্তু হলং নদী একেবারে উল্টো। এটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে গিয়েছে। হলং ঝোরা পেরোলেই নাগালের মধ্যে হাতি, বাইসন, এক শৃঙ্গ গন্ডার। সবুজ, মায়াময় প্রকৃতি। বাংলোর সামনেই ‘স্লট পিট’। বাংলোর ব্যালকনিতে বসলেই তা দেখা যেত। পশুরা সেখানে লবন খেতে আসত। এক রাতের আগুনে কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল সব। নানা মহল থেকে পুনর্নির্মাণের দাবি উঠেছিল। সেই দাবিকে মান্যতা দিয়েছে রাজ্য সরকার। অবশেষে নির্মাণ শুরু হয়েছে। পুরোনো আদলেই ফিরছে বন বাংলো।
পুনর্নির্মাণ প্রসঙ্গে জলদাপাড়ার ডিএফও (DFO) প্রভীন কাসওয়ান বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “যেমন আগে ছিল, তেমনই ‘সেম প্লেস’, ‘সেম প্ল্যান’, ‘সেম হাইট’-এ তৈরি হচ্ছে। তবে এবার কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে না। সেই সময় কাঠ দিয়ে তৈরি হতো। এখন কংক্রিটের তৈরি হচ্ছে। কাঠ দিয়ে যদি আবার তৈরি হয়, সেই একই সমস্যা দেখা যেতে পারে। আবার আগুন লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, তাই কংক্রিটের হবে। কাঠের প্যানেল থাকবে।” তিনি আরও জানালেন, “কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, দেড় বছর সময় লাগবে নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হতে। রাজ্য সরকার গোটা কাজটা করছে। পুনর্নির্মাণের কাজে বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা।”
শাল, সেগুন আর পাইন কাঠে সেজে উঠছে হলং বন বাংলো। ভিতর ও বাইরের ‘ওয়াল উডেন ক্ল্যাডিং’ থাকবে। পুনর্নির্মিত বাংলোতে আগুন প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থাও থাকবে।
কয়েক বছর আগের হলং বাংলোর ছবি
বনদপ্তর সূত্রে খবর, শাল, সেগুন আর পাইন কাঠে সেজে উঠছে হলং বন বাংলো। ভিতর ও বাইরের ‘ওয়াল উডেন ক্ল্যাডিং’ থাকবে অর্থাৎ কংক্রিটের বাংলো তৈরি করে শাল, সেগুন ও পাইন কাঠ দিয়ে মুড়ে দেওয়া হবে গোটা বাংলোর ভিতরে ও বাইরের দিক। পুনর্নির্মিত বাংলোতে আগুন প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থাও থাকবে।
ভয়াবহ ১৮ জুন রাতের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন প্রভীন। তাঁর কথায়, “তখন আমি আমার পরিবারের সঙ্গে ছিলাম, সবে ডিনার করেছি। খবর পেলাম আগুন লেগেছে। যা যা পদক্ষেপ করার করলাম। পুলিশকে জানালাম। দমকলকে জানালাম। যেমন আমরা করি সব সময়। আমিও রওনা দিলাম। অন্যান্য অফিসাররাও এলেন। ওই বাংলোতে এমন কোনও জিনিস ছিল না, যাতে আগুন ধরে না… দেওয়ালগুলো কাঠ দিয়ে তৈরি, কার্পেট, টিভি, বেড, বেডশিট, গদি, চেয়ার-টেবিল। যখন গোটা বিল্ডিংয়ে আগুন ধরে যায়, তখন নিয়ন্ত্রণে আনা খুব কঠিন। বাংলোটা জঙ্গলের অনেক গভীরে অবস্থিত। মাদারিহাট গেট থেকেও বাংলোর দূরত্ব প্রায় পঁচিশ মিনিট। সময়টাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অফিসারদের জন্যও পরিস্থিতি খুব কঠিন ছিল। যাঁরা কর্মী ছিলেন সবাই অনেক চেষ্টা করেছেন। ঘটনার তিনদিন পর আমি বাড়ি ফিরি। তদন্ত চলছিল। ফরেনসিক দল এসেছিল। তদন্তে নানান দিক খতিয়ে দেখা হয়েছে। আমরা সমস্ত রকম সঠিক পদক্ষেপ করেছিলাম। যেকোনও দিন যেকোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, শর্ট সার্কিট হতে পারে। কিন্তু দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে আমরা কী কী করলাম, আমি সব কিছু নথিবদ্ধ করেছি, প্রতিটি পদক্ষেপ, কাকে জানালাম, কী করলাম। স্থানীয় থানায় রাত তিনটের সময় এফআইআর দায়ের করি। আমরাই ফরেনসিক দলকে ডাকি, তদন্ত করতে বলি। আমরা তদন্ত করে, আমরা বলে দেব আগুন লাগার কারণ কী, এটা আমরা চাইনি। ফরেনসিক দল এল, তাঁরা স্যাম্পেল, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করল। দমকল বিভাগও এল। আমরা রিপোর্ট পেলাম। শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগেছিল। এটা আমার জীবনে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।”
তবে বাংলোর পুনর্নির্মাণ ঘিরে সংশয় ছিল। অন্তরায় হয়েছিল ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী আইন। এই আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনও বাণিজ্যিক নির্মাণ নিষিদ্ধ। হলং বাংলো তৈরি হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। তখনও বন্যপ্রাণী আইন পাশ হয়নি। তবে হলং বাংলো কোনও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। বাংলো থেকে যে টাকা উপার্জন হয়, তা রাজ্য সরকারের কোষাগারে জমা পড়ে না। পুরো উপার্জিত অর্থ জাতীয় উদ্যানের উন্নয়ন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় ব্যয় হয়। ফলে পুনর্নির্মাণে বাধা থাকে না।
নতুন রূপে আবার ফিরছে ঐতিহ্যবাহী হলং
মানুষের দাবি পূরণ করে সরকারের এই পুনর্নির্মাণ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন প্রভীন। তাঁর কথায়, “বাংলোর ঐতিহ্য, ইতিহাস, গুরুত্ব অপরিসীম। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুনর্নির্মাণের। একই সঙ্গে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকবে না, এমনভাবেই এবার নির্মাণ করা হবে। সেভাবেই নির্মাণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সরকারের পরিকল্পনা ছিল একইভাবে, একই আকার, আকৃতিতে নির্মাণ করার। মানুষের দাবিও ছিল এটা তৈরি হোক। মানুষ চেয়েছে, সরকার তা পূরণ করছে, এটা ভালো হয়েছে।”
হলং বনবাংলো বহু ইতিহাসের সাক্ষী, ডুয়ার্সের গর্ব। আকস্মিক দুর্ঘটনা তা কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু মানুষের দাবি ও সরকারের উদ্যোগে ভর করে ফের মাথা তুলে দাঁড়াতে চলেছে ঐতিহ্যের বন বাংলোটি।
_____________
*এই প্রতিবেদনটি যখন লেখা হয়, তখন রাজ্যের সরকার পরিবর্তন হয়নি। নতুন সরকার কী উপায়ে হলং বাংলোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তার যেমন যেমন আপডেট আমাদের কাছে আসবে, এই লেখাটিও পরিবর্তিত হতে থাকবে