বিষ্ণুপুর : সুর, সংগ্রাম এবং স্থাপত্যের এক হাজার বছর পার

মন্দির শহর মল্লভূম ও সাতসুরের ইতিবৃত্ত

দানীং দারুণ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন উস্তাদ বাহাদুর খান। শহনশাহ্ আউরঙ্গজেব সংগীতকে হারাম ঘোষণা করেছেন। দিল্লিতে গানা-বজানা বন্দ্। রাতের ঘুম উবে গেছে উস্তাদজীর। তানসেনের বংশধর তিনি। তবে কি সেনিয়া ঘরানা শেষ হয়ে যাবে! কোন মুখ নিয়ে তিনি যাবেন আল্লাহ্’র দরবারে! উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একমাত্র সম্পদ গান, তাও তিনি রক্ষা করতে পারলেন না। দোজখ্ নসীব হবে তো! কী করবেন এখন তিনি! কোথায় যাবেন! ভারতবর্ষ থেকে কি তাহলে গান-বাজনা চলে যাবে! সে যে মানুষের অন্তরের শান্তি। সংগীত না থাকলে মানুষ বাঁচবে কী নিয়ে! সংসারই বা চলবে কী করে তাঁর! আর তো তিনি কিছু পারেন না। দরগায় দরগায় ঘোরেন, আর মোনাজাত করেন – ‘ইয়া আল্লাহ্, জিল্লে ইলাহি কো অক্ল্ বক্স’। দিন যায়, মাস যায়, জঁহাপনাহ্’র আদেশের কোনো পরিবর্তন হয় না। তাঁর জীবন দুঃস্থ থেকে দুঃস্থতর হতে থাকে। এমন সময় একদিন এক হমউম্র দোস্ত মৌলবি সখেদে নিচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে বললেন – ‘শুনা হ্যায় বঙ্গাল মে কোই এক রাজদরবার মে সংগীত কি বড়ি ইজ্জৎ হোতি হ্যায়’। উস্তাদজী ততোধিক নিচুস্বরে বললেন – ‘ইস সিদ্দৎ সে তো তড়িপার ভী জন্নত হ্যায় জনাব। জরা খবর লে পায়েঙ্গে ক্যা? বহত মহরবানি হোগি’। সেদিন আর কথা এগোয়নি। (বিষ্ণুপুর ঘরানা)

সম্ভবত সেটা ১৫০০-র একেবারে শেষ দিক। ভক্ত ও শিষ্যদল নিয়ে শ্রীনিবাস আচার্য বৃন্দাবন থেকে গৌড় অভিমুখে চলেছেন। বিষ্ণুপুর হয়ে যেতে হবে তাঁদের। লুণ্ঠিত হলেন মল্লরাজের সেনা বাহিনীর হাতে। তাঁকে নিয়ে আসা হল বীর হাম্বীরের কাছে।

হ্যাঁ, খবর পাওয়া গেছে। মৌলবি সাহেব বন্ধুত্বের মর্যাদা রেখেছেন। ‘বঙ্গাল কে সরহদ সে পরে এক কসবা হ্যায়। পর উসে বঙ্গাল কা হি হিস্সা সমঝিয়ে। নাম বিষ্ণুপুর। জঙ্গল সা ইক জগহ। রাজা মুসলমাঁ নহি, কাফর হ্যায়। বুত-পরস্ত। জগহ জগহ ইমারত ঔর পুতলোঁ কা ঢের। রহ পায়েঙ্গে ক্যা! হাঁ পর হ্যায় বড়া সংগীত প্রেমী’। উস্তাদ জবাব দিলেন – ‘মৌলবি সাহব, হম সংগীত কে জরিয়ে খুদা তক পঁহচনে কি কোশিশ করতে হ্যাঁয়, ও বুত কে জরিয়ে ভগওয়ান তক। আখিরকার মিলতে তো একহি জগহ। যো সংগীত-পরস্ত্ হ্যাঁয়, ওহি খুদা-পরস্ত্। হম যায়েঙ্গে বিষ্ণুপুর। জরুর জায়েঙ্গে’। (বিষ্ণুপুর ঘরানা)

**************

প্রায় সোয়া তেরশো বছর আগের কথা। প্রচলিত আছে উত্তর ভারতের কোনো এক রাজপুত্র জগন্নাথ দর্শনে বেরিয়ে লাউগ্রামের গভীর অরণ্যে তাঁবু ফেলেছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে এক ব্রাহ্মণের তত্ত্বাবধানে রেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পুরী অভিমুখে। মাননীয় আর ফিরে আসেননি। আসেননি, না কি আসতে পারেননি, ইতিহাস অবশ্য সেদিকে কোনো আলোকপাত করে না। এদিকে সেই রানি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়, আর সেই ব্রাহ্মণ তাকে সন্তানস্নেহে লালন পালন করতে থাকে। দেখতে দেখতে সে মল্লবীর হয়ে ওঠে। দুর্ধর্ষ মল্লবীর। এতটাই শক্তিশালী যে সে অনায়াসে সে অঞ্চলের শাসকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় সেই লাউগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমুহ। তিনিই আদিমল্ল। সেটা তখন ৬৯৫ সাল। তেত্রিশ বছর তিনি লাউগ্রামেরই শাসক হয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁর ছেলে জয়মল্ল রাজা হওয়ার পর সরাসরি পদম্পুর (সম্ভবত পদ্মপুর) আক্রমণ করে দুর্গ অধিকার করেন ও রাজধানী বিষ্ণুপুরে স্থানান্তরিত করেন। সাতশো সালের প্রথম দশকের শেষ ভাগ সেটা। (বিষ্ণুপুর ঘরানা)

তারপর প্রায় এক হাজার বছর ধরে সে অঞ্চলে ছিল মল্ল রাজাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। মূলত এগিয়ে যাওয়ার গল্প। সমৃদ্ধির কথা। একেবারে এক কোণায় থাকার কারণে দেশজ রাজনীতির ছোঁয়াচ পোহাতে হয়নি খুব একটা। তবে কোনো কিছুই তো থেমে থাকে না। নিজের মতো করেই এগিয়ে যায়। রাজনীতির শকুনেরা ঠিক মাংসের গন্ধ পেয়ে যায়। ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবুজকে সবুজ থাকতে দেয় না। লোভ আর চাহিদার আগুন পুড়িয়ে মারে। বিষ্ণুপুরের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবং অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে শেষমেশ ‘হাম্বীর মল্লদেব (বীর হাম্বীর)’ ১৫৮৬ সালে আকবর বাদশাহর আধিপত্য স্বীকার করে বাংলার সুবেদারকে বার্ষিক রাজস্ব দিতে স্বীকৃত হন। তবু তখনও তাঁর রাজ্যে তাঁর শাসনই অক্ষুণ্ণ ছিল। এক শক্তিশালী রাজার সময় সেটা, যাঁকে স্বয়ং মোগল সম্রাট আকবর আফগান বিদ্রোহ দমনে তাঁর পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করার অনুরোধ করেন, ও তিনি তা গ্রহণও করেন। সে যুদ্ধে তাঁর পারদর্শিতার গল্প ইতিহাস জানে। তবে তার থেকেও রোমাঞ্চকর যে গল্পের কথা কম উচ্চারিত, তা হল বীর হাম্বীরের মতি বদল। চণ্ডাশোক-এর ধর্মাশোকে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা যতটা ভয়ানক, যত আলোচিত, এ ঘটনা ততটা না হলেও কম কিছু নয়। সালটা খুব পরিষ্কার নয়, তবে সম্ভবত সেটা ১৫০০-র একেবারে শেষ দিক। ভক্ত ও শিষ্যদল নিয়ে শ্রীনিবাস আচার্য বৃন্দাবন থেকে গৌড় অভিমুখে চলেছেন। বিষ্ণুপুর হয়ে যেতে হবে তাঁদের। লুণ্ঠিত হলেন মল্লরাজের সেনা বাহিনীর হাতে। তাঁকে নিয়ে আসা হল বীর হাম্বীরের কাছে। যেহেতু তখন নানান ছদ্মবেশে শত্রুপক্ষের গুপ্তচরের আনাগোনা খুব স্বাভাবিক প্রথা ছিল, তাই মল্লরাজ তাঁর আত্মপরিচয়ের প্রমাণ চাইলেন। আচার্য তাঁকে ভাগবত পাঠ করে শোনালেন। মুগ্ধ হলেন বীর হাম্বীর। গ্রহণ করলেন বৈষ্ণব ধর্ম। প্রভূত অর্থ ও সম্পত্তি দিয়ে আচার্যকে নিজের রাজ্যে বরণ করে নিলেন। দ্বারকার শ্রীকৃষ্ণ জড়িয়ে গেলেন বিষ্ণুপুরের রাঙা ধুলোয়। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন তাঁর পুত্র ‘রঘুনাথ সিংহদেব’। ও হ্যাঁ, এই প্রথম মল্লরাজা নিজের উপাধি বদল করলেন। মল্ল থেকে সিংহদেব। (বিষ্ণুপুর ঘরানা)

রাজা ঘোষণা করেন – ‘যে কোনো সুকণ্ঠ গায়ক বিনামূল্যে ওস্তাদজী’র কাছে গান শিখতে পারবে। রাজকোষাগার থেকে সে ব্যয়ভার বহন করা হবে’। উড্ডীন হোল বিষ্ণুপুরে সংগীতের বিজয়কেতন। আর তাঁরই সুযোগ্য শিষ্য পণ্ডিত রামশঙ্কর ভট্টাচার্যর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হল সম্মানীয় ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’।

এরপর তৈরি হতে থাকল একের পর এক মন্দির, যা আজও টেরাকোটার অপূর্ব ভাস্কর্য নিয়ে স্বমহিমায় বিরাজমান। কী করে থাকল! এক সময় তো সারা দেশে মুসলমান শাসনের ঝড় বয়ে গিয়েছিল। ধ্বংস হয়েছে নানান মন্দির, নানান উপাসনালয়। তবু কী করে টিকে গেল বিষ্ণুপুর! সেটাও বড়ো মজার ঘটনা। আজও যে কোনো বাঁকুড়া নিবাসী মাথা তুলে সোজা সাপ্টা কথা বলতেই ভালোবাসেন। প্যাঁচ-পয়জার বিশেষ বোঝেন না। সেদিনও তাই ছিল। ‘খাজনা চাইয়েছ, দিব। রাইজ্যে দাঁত ফুটাইতে আইলে ছাইড়ব নাই। ধসাইড়ে দিব’। হাঃ…হাঃ…হাঃ…। হ্যাঁ, এমনই ছিলেন মল্লরাজারা। ফলে রাজস্ব দিতেন ঠিকই, তবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাধীন। এমনকী মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে তাঁদের সেলাম জানাতে যেতে হত না। বরং সেখানে নবাবের খরচে মল্লরাজের এক প্রতিনিধি থাকতেন। ফলে বিষ্ণুপুরের মদনমোহন থাকলেন অক্ষত। মানুষের মুখে মুখে সে কাহিনি আরও বেশি প্রচার পেল ১৭০০ সালে এসে। ১৭১২ সালে রাজা হলেন ‘গোপাল সিংহদেব’। তাঁর শাসনের একেবারে শেষ দিকে ১৭৪২ সালে ভাস্কর রাও-এর নেতৃত্বে মারাঠারা আক্রমণ করল বিষ্ণুপুর। সে আক্রমণ প্রতিহত করার মত শক্তি ছিল না মল্লরাজের। ফলে তিনি নগরবাসীকে মদনমোহনের সাহায্য প্রার্থনা করতে বলেন। আর কী আশ্চর্য, বিখ্যাত দলমাদল কামান নাকি সে ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষের সাহায্য ছাড়া নিজে নিজেই গর্জে উঠেছিল। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর।

 

উস্তাদজী তখন বিষ্ণুপুরেই আসীন। এসেছিলেন গোপাল সিংহদেব-এর বাবা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহদেব-এর রাজত্বকালে। তখন থেকেই তিনি সভাগায়ক। তা ছাড়া তিনি যে শুধুমাত্র কণ্ঠসংগীতেই পারঙ্গম ছিলেন তাই তো নয়। বীণা, রবাব, সুরশৃঙ্গারের মতো বাদ্যযন্ত্রেরা কথা বলত তাঁর আঙুলের স্পর্শে। রাজা ঘোষণা করেন – ‘যে কোনো সুকণ্ঠ গায়ক বিনামূল্যে ওস্তাদজী’র কাছে গান শিখতে পারবে। রাজকোষাগার থেকে সে ব্যয়ভার বহন করা হবে’। উড্ডীন হোল বিষ্ণুপুরে সংগীতের বিজয়কেতন। আর তাঁরই সুযোগ্য শিষ্য পণ্ডিত রামশঙ্কর ভট্টাচার্যর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হল সম্মানীয় ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’। যদিও সেই সুদূর ১৩০০ সাল থেকেই বিষ্ণুপুরের সংগীত চর্চা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে, তবু যেন তার ৪০০ বছর পর ১৭০০-তে এসে তা পূর্ণতা পেলো।

মন্দিরসংলগ্ন মাঠে আজও প্রতি বছর বসে সে সংগীতের আসর। যখন টেরাকোটা খচিত মন্দিরের গায়ে নেচে যায় আলোকমালা, আর মঞ্চে একের পর এক গুণী মানুষেরা তাঁদের অসীম দক্ষতায় সাত সুর নিয়ে, বা নানান তাল আর ছন্দ নিয়ে, খেলা করতে থাকেন, তখন মনে হয় – ‘স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে, তা এখানে, তা এখানে, তা এখানে’।

________ 
তথ্যসূত্র: বিষ্ণুপুর ঘরাণার উৎপত্তি ইতিহাস- দেবব্রত সিংহ ঠাকুর, ভারবি প্রকাশনী | বিষ্ণুপুরের গান- চিত্তরঞ্জন দাসগুপ্ত/ প্রত্ন পরিক্রমা : মল্লভূম, সম্পাদক জলধর হালদার। সেন্টার ফর আর্কিওলজিকাল স্টাডিস এন্ড ট্রেনিং, ইস্টার্ন ইন্ডিয়া | ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ- উৎপলা গোস্বামী, দীপায়ন | বিষ্ণুপুর  ঘরানা – দিলীপ কুমার মুখোপাধ্যায়, বুকল্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড | ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিষ্ণুপুর ঘরানা – শর্মিষ্ঠা-বাঁকুড়া। বিষ্ণুপুর ঘরানার উৎস…
 

Developed by DXDasia