আনকোরা কালিম্পং : অফবিট মানচিত্রের নতুন কিছু সংযোজন

কালিম্পং-এর ৫টি গ্রাম, যেখানে পর্যটকদের ভিড় পৌঁছায়নি

মূলধারার হিলস্টেশন ট্যুরিজমের বিকল্প হিসেবে উত্তরবঙ্গে হোমস্টে মডেলের প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত। শহুরে ঝাঁ চকচকে হোটেল-রেস্তোরাঁর বাইরে একটু ঘরোয়া আটপৌরে পর্যটনে বাঙালির মন মজেছে বহুদিন। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে গাড়ির রাস্তা প্রবেশ করার পরেই সেই রাস্তা নিয়ে এসেছে নতুন পর্যটনের দিশা। তবে আজকের দিনে এই ধরণের অধিকাংশ পাহাড়ি গন্তব্যের পাশে ‘অফবিট’ শব্দটি লেখা থাকলেও পর্যটক সমাগম হয়ে পড়েছে শহুরে হিলস্টেশনের মতোই। চার পাঁচ কামরার ছোট্ট ঘরোয়া পরিবেশের হোমস্টেগুলি চেহারা বদলে হয়ে উঠেছে দার্জিলিং কিংবা গ্যাংটকের ম্যাল লাগোয়া গতানুগতিক হোটেল। পাহাড়প্রেমীদের কাছে সেই একই ‘থোড়-বড়ি-খাড়া’ হয়ে উঠেছে চটকপুর, সিটং, কোলাখাম, লেপচাজগৎ, ধোত্রে, লামহাট্টা, সীমানা, রামধুরাসহ দার্জিলিং, কার্শিয়াং ও কালিম্পং-এর বিভিন্ন ‘অফবিট’ গন্তব্য। তবু কিছু গন্তব্য এমন আছে, যেগুলি নিজের দুর্গমতার কারণেই আবেদন হারায়নি এখনো। অন্যদিকে, উর্দ্ধমুখী চাহিদার কথা মাথায় রেখে দূর থেকে দূরতর প্রত্যন্ত বিন্দুতে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন গন্তব্য।

অধিকাংশ পাহাড়ি গন্তব্যের পাশে ‘অফবিট’ শব্দটি লেখা থাকলেও পর্যটক সমাগম হয়ে পড়েছে শহুরে হিলস্টেশনের মতোই। চার পাঁচ কামরার ছোট্ট ঘরোয়া পরিবেশের হোমস্টেগুলি চেহারা বদলে হয়ে উঠেছে দার্জিলিং কিংবা গ্যাংটকের ম্যাল লাগোয়া গতানুগতিক হোটেল।

আনকোরা, নতুন, স্নিগ্ধ, মনোরম, শান্ত – এতগুলি বিশেষণের কথা মাথায় রেখে নতুন গন্তব্য খুঁজতে হলে উত্তরবঙ্গের অন্যতম জেলা অবশ্যই কালিম্পং। লাভা, লোলেগাঁও, চারখোলা, রিশপ, সিলেরিগাঁও এই জেলার বহুল প্রচলিত গন্তব্যগুলির মধ্যে অন্যতম। তবে, এর বাইরেও আছে অজস্র ছোটছোট নতুন রাত্রিবাসের ঠিকানা।  শহুরে ট্যুরিস্টদের ভিড় ও কোলাহল থেকে মুক্ত এমনই কিছু গন্তব্যের সন্ধান রইল এই লেখায়। পর্যটকের ভিড় এসব অঞ্চলে প্রবেশ করার আগে গ্রামগুলিতে একটিবার ঘুরে আসাই যায়।

পেডং

কালিম্পং থেকে মাত্র ২১ কিমি এবং সিলেরিগাঁও থেকে ১০ কিমি দূরে অবস্থিত ছোট জনপদ পেডং। উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪১০০ ফুট। একটি দুই শতাব্দী পুরানো প্রায় ৩০ মিটার উঁচু একটি পাইন গাছ থেকে এই জনপদের নামকরণ। স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনেক। পুরানো সিল্করুট লাসা থেকে জেলেপ-লা হয়ে পেডং ছুঁয়ে গিয়েছিল। পাখিপ্রেমী ও চিত্রান্বেষীদের এই গ্রামটিতে একটিবার অবশ্যই সময় কাটানো উচিত বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। মানুষের ভিড় কম হওয়ার কারণে নানাবিধ পাহাড়ি পক্ষীকূল সর্বদা ভিড় করে থাকে এই গ্রামের আশেপাশে। এখানে এলে ঘুরে দেখতে পারেন পেডং মনাস্ট্রি ও লেপচাদের তৈরি ড্যামসাং দুর্গ, যা আজও বহন করে চলেছে ভুটিয়া ও লেপচাদের শত্রুতার ইতিহাস। হাঁটা পথে বেড়িয়ে আসতে পারেন ১৮৮২ সালে এক ফরাসি মিশনারি প্রতিষ্ঠিত ‘ক্রস হিল’।  বেড়াতে যাওয়ার সব থেকে ভাল সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। 

মুদুংখোলা

পেডং থেকে কাগে যাওয়ার পথে একেবারেই নতুন এবং আনকোরা একটি গন্তব্য মুদুংখোলা। পাশে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদীর নামেই গ্রামের নামকরণ। কালিম্পং শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৩০ কিমি। সম্প্রতি কয়েকটি হোমস্টে গড়ে উঠেছে এই গ্রামে। নির্জন এই স্থানে সবুজের মাঝে নদীতে নেমে একটু স্নান করেও নিতে পারেন। অবসরযাপনের জন্য কয়েকটি রাত্রি এখানে অনায়েসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। 

 

লিংসে

পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের সীমান্তে ৪৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ছোট্ট একটি গ্রাম লিংসে। কালিম্পং শহর থেকে এর দূরত্ব ৪৮ কিমি এবং পেডং থেকে মাত্র ২৪ কিমি। শিলিগুড়ি থেকে সর্বমোট দূরত্ব প্রায় ১০০ কিমি। সরাসরি গাড়ি রিজার্ভ করে অথবা শেয়ার গাড়িতে কালিম্পং ও রেহনক হয়ে লিংসে পৌঁছানো যায়। এই গ্রাম থেকে আশেপাশে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা প্রচুর। লিংসে থেকে বিখ্যাত মুলখারকা লেকের দূরত্ব মাত্র ৪ কিমি। সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিবিম্ব লেকের জলে দেখার সুযোগ একদমই হাতছাড়া করা যায় না। আরিটার লেকের অবস্থানও খুবই কাছে। যাঁরা পাখির ছবি তুলতে ভালোবাসেন, নিরিবিলি পরিবেশে দেখতে পাবেন হিমালয়ের অসংখ্য প্রজাতির পাখি। ঘুরে দেখতে পারেন স্থানীয় বিভিন্ন মনাস্ট্রি, ঝর্না এবং অবশ্যই ঝুসিং ভিউপয়েন্ট। সকাল সকাল এই ভিউপয়েন্টে পৌঁছে কাঞ্চনজঙ্ঘার ব্যাকড্রপে সমগ্র লিংসে গ্রামের একটি দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। বছরের যেকোনো সময়েই এখানে যাওয়া যায়, তবে ভারী বর্ষার সময়টি এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

লাভা, লোলেগাঁও, চারখোলা, রিশপ, সিলেরিগাঁও এই জেলার বহুল প্রচলিত গন্তব্যগুলির মধ্যে অন্যতম। তবে, এর বাইরেও আছে অজস্র ছোটছোট নতুন রাত্রিবাসের ঠিকানা।

সামথার

কালিম্পং শহর থেকে ৪২ কিমি দূরে অবস্থিত সামথার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই খ্যাত। ৪০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রাম থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ম্যাসিফ-সহ আশপাশের সবুজ পাহাড়ের অপূর্ব সুন্দর প্যানোরেমিক ভিউ দেখতে পাওয়া যায়। কাছেই রয়েছে লাভা এবং লোলেগাঁও, মাত্র ৬১ কিমি দূরেই ন্যাওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। শিলিগুড়ি থেকে সামথার পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা। পাহাড়ি ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে বেড়াতে যাওয়ার সব থেকে ভাল সময় মার্চ থেকে মে মাস। অঞ্চলটি ভূমিধ্বসপ্রবণ হওয়ার কারণে বর্ষার সময় যাওয়া একটু ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।  

কাশন

প্রায় ৪০০০ ফুট উচ্চতায় পেডং ও ঋষিখোলার মাঝে অবস্থিত কাশন খাসমহলের দূরত্ব শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৯০ কিমি এবং কালিম্পং থেকে ৩০ কিমি। প্রকৃতির কোলে শান্ত নির্ঝঞ্ঝাট কয়েকটি বিকেল কাটাতে কাশনের জুড়ি মেলা ভার। একটু অলস সময় কাটনোর বদলে কালিম্পং ঘুরে বেড়াতে চাইলে অন্যান্য গন্তব্যগুলিও একেবারে হাতের নাগালে। ঋষি নদীর ধারে অস্থায়ী ক্যাম্পগুলিতে সময় কাটাতে পারেন। পরিস্থিতি সঠিক হলে দুপুর রোদে স্নানও করে নিতে পারবেন নদীর জলে। আশেপাশের পায়ে হাঁটা রাস্তা ধরে নিরালায় সময় কাটাতে পারেন পাহাড়ি প্রকৃতির কোলে। বছরের যেকোনো সময়ই বেড়িয়ে আসার পক্ষে উপযুক্ত।

কীভাবে যাবেন?

আকাশপথে: কালিম্পং থেকে ৭৯ কিমি দূরে অবস্থিত বাগডোগরা নিকটবর্তী বিমান বন্দর। কলকাতা কিংবা ভারতের বিভিন্ন মেট্রো শহর থেকে অনায়াসে এই বন্দরে পৌঁছানো যায়।

রেলপথে: নিকটবর্তী ট্রেন স্টেশন নিউ জলপাইগুড়ি। কালিম্পং থেকে দূরত্ব ৭৩ কিমি। তাছাড়াও, কিছু ট্রেন শিলিগুড়ি জংশনেও থামে।

সড়কপথে: শিলিগুড়ি থেকে একমাত্র সড়ক পথেই কালিম্পং পৌঁছানো সম্ভব। সব থেকে জনপ্রিয় রুট দশ নম্বর জাতীয় সড়ক, সেবক থেকে রংপো হয়ে পৌঁছানো যায়। দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিমি ; যানজট না থাকলে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা। উইকেন্ডের যানজট এড়াতে সেভক রোড হয়ে দশ মাইলের রাস্তায় যাওয়া যায়। পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আরও বেশ কয়েকটি বিকল্প রাস্তা রয়েছে। একটু সংকীর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম মসৃণ হলেও শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি পেডং হয়ে কালিম্পং পৌঁছানো যায়। অন্য আরেকটি রুটে ঋষি হয়ে কালিম্পং পৌঁছাতে পারেন।

বাহন: অনেকেই শহর থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে আসেন। তবে অধিকাংশ পর্যটক পাহাড়ের বাঁকে স্থানীয় গাড়িচালকদের ভরসা করেন বেশি। গাড়ির অগ্রিম বুকিং করা যায় এজেন্সি মারফত। তবে যথাযথ মূল্যে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন, শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ড বা বাগডোগরা থেকে সরাসরি রকমারি গাড়ি রিজার্ভ করা যায়। সুমো কিংবা ইনোভা পেয়ে যাবেন ৩৫০০ – ৪০০০ টাকার মধ্যে। একা অথবা দুই-তিনজন কম বাজেটে বেড়াতে চাইলে কালিম্পং-এর শেয়ার গাড়ি পাওয়া যায় শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ড এবং দার্জিলিং মোড়ে। তবে শেয়ার গাড়ি সাধারণত দুপর অবধি চলে। তাই একটু আগে পৌঁছে স্থানীয়দের থেকে গাড়ির সময় সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে রাখা ভালো। একটু এডভেঞ্চারপ্রেমীরা শিলিগুড়ি থেকে বাইক কিংবা স্কুটিও ভাড়া নিতে পারেন। মডেল হিসেবে দৈনিক ভাড়া হয় দেড় থেকে আড়াই হাজার মধ্যে। লিংসে কিংবা মুলখারকার রাস্তায় অত্যন্ত চড়াই থাকার কারণে ফোর হুইল ড্রাইভওয়ালা গাড়ি নিয়ে যাওয়াই ভালো।

__________

প্রচ্ছদ ও লিংসের ছবি সৌজন্যে: অস্মিতা চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia