
উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় জেলা কালিম্পং, দার্জিলিং থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে এর অবস্থান। শোনা যায়, এক সময় কালিম্পং শহরের মাধ্যমেই ভারত-তিব্বতের বাণিজ্য চলত। ভুটানের রাজ্যপালের কেন্দ্রীয় দফতরও ছিল এই শহরেই। কালিম্পং জেলাশহরে নানান ঐতিহাসিক নিদর্শন শুধু পর্যটকদের কাছেই নয়, স্থানীয় মানুষদের জন্যেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলির মধ্যেই একটি ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুল (Dr. Graham’s Homes School)। ১৪০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত একটি সুপ্রাচীন মিশনারি স্কুল, এ বছর ডঃ গ্রাহামস হোমের ১২৫ বছর পূর্ণ হল।

স্কুল ক্যাম্পাস
কে ডক্টর গ্রাহাম
জন আন্ডারসন গ্রাহাম ১৮৮৯ সালে স্কটল্যান্ড থেকে ব্রিটিশ ভারতের কালিম্পংয়ে আসেন ইয়ং মেনস গিল্ড অফ স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধি হিসেবে। মূলত মিশনারি কাজ সামলাতেন। কালিম্পংয়ে আসার কয়েক বছরের মধ্যেই ডঃ গ্রাহাম হয়ে ওঠেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম সেরা একজন সমাজ সংস্কারক। তাঁর লক্ষ্য ছিল মূলত ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার দারিদ্রকরণ খুঁজে বের করা এবং শিশুদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা। তৎকালীন কালিম্পং গ্রামকে গ্রাহাম সাহেবের ভালো লেগে যায়। মূলত অনাথ শিশুদের শিক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং সকলের জন্য শিক্ষা – এই মনোভাব থেকেই ১৯০০ সালে ডঃ জেমস আন্ডারসন গ্রাহাম প্রতিষ্ঠা করলেন অনাথ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিশুদের জন্য একটি হোম। যদিও সেটা ভাড়াবাড়ি ছিল। সে সময় হোমের নাম ছিল সেন্ট অ্যানড্রুজ কলোনিয়াল হোমস। পরে একটু একটু করে জায়গা কেনেন গ্রাহাম। ভাড়াবাড়ি নিজের হয়ে ওঠে। ছোট্ট সেই হোম রূপান্তরিত হয় স্কুলে। ১৯৪২ সালে গ্রাহাম প্রয়াত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে (অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার বছর) তাঁর স্মৃতিতে স্কুলের নতুন নামকরণ হয় ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুল। সেই থেকে আজও জেলার অন্যতম সেরা বিদ্যালয় এটিই।
গত বছর দ্য অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান হল অফ ফেম (The Anglo-Indian Hall of Fame)-এ নাম জুড়েছে স্কুলটির। অল ইন্ডিয়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুলকে ওই বিশেষ স্বীকৃতি দিয়েছে। স্কুলের বর্তমান অধ্যক্ষ নেল মন্টেরিও বর্তমানে ব্যতিক্রমী কাজ করছেন।

খোলা আকাশের নিচে ক্লাস
ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুল : গুরুত্ব ও বিশেষত্ব
কালিম্পংয়ে ১৪০ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই স্কুলের মোট ৫৬টি স্থাপনা রয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১,২০০ জন। ৩০-৩৫ জন ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন কটেজে থাকে। বর্তমানে ছেলেদের জন্য সাতটি এবং মেয়েদের জন্য সাতটি কটেজ রয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের অন্য কাজে নিযুক্ত করাও এই স্কুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ডঃ গ্রাহামের ভাবনা অনুযায়ী আজও এখানে হাঁস-মুরগি পালন, কৃষি খামার, বেকারি, জেনারেল স্টোর বিভাগ ও একটি হাসপাতাল রয়েছে।

ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা
১২৫ বছরের প্রাকলগ্নে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল এই স্কুল। গত বছর দ্য অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান হল অফ ফেম (The Anglo-Indian Hall of Fame)-এ নাম জুড়েছে স্কুলটির। অল ইন্ডিয়া অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুলকে ওই বিশেষ স্বীকৃতি দিয়েছে। স্কুলের বর্তমান অধ্যক্ষ নেল মন্টেরিও বর্তমানে ব্যতিক্রমী কাজ করছেন। এর আগে লখনউয়ের লা মার্টিনিয়ার কলেজ, পুনের বিশপস স্কুল, চেন্নাইয়ের সেন্ট জর্জ স্কুল দ্য অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান হল অফ ফেম-এর স্বীকৃতি পেয়েছে। সারা দেশে মোট ১৬০টি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান স্কুল রয়েছে। সেগুলির মধ্যে কালিম্পংয়ের ডঃ গ্রাহামস হোমস চতুর্থ স্কুল, যার এই স্বীকৃতি মিলেছে।
অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি হওয়া এই স্কুল পঞ্চাশের দশকে নিজেদের দেশ থেকে পালিয়ে আসা তিব্বতি শরণার্থীদের জন্যেও তার দরজা খুলে দিয়েছিল। যেকোনো পর্যটক অথবা পরিদর্শক এখানকার পরিবেশ দেখে অনুপ্রাণিত না হয়ে থাকতে পারবেন না।

স্কুলের নিজস্ব ব্যান্ড
উত্তরাধিকার
কালিম্পংয়ের এই স্কুল কতটা জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় স্কুলের প্রাক্তনীদের তালিকা দেখলেই। ভুটানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেরিং টবগে এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লিওনচেন জিগমি ইয়োসার থিনলে এই স্কুলে পড়েছেন। বিশ্ব বিখ্যাত চিত্রকর নরম্যান হাচিনসনও (যিনি কুইন এলিজাবেথ ২-এর ছবি এঁকেছিলেন) গ্রাহামস হোমসের প্রাক্তন ছাত্র। এছাড়া প্রখ্যাত ভারতীয় শিক্ষাবিদ পদ্মশ্রী ডোভিড আর সিমলিহ, লেখক ও টেলিভিশন প্রযোজক-পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য, বলিউড সিনেমাটোগ্রাফার বিনোদ প্রধান প্রমুখরা এই স্কুলের উজ্জ্বল নাম। স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়ে যাবার পরেও বিশ্বের নানান জায়গায় কর্মরত প্রাক্তনীরা স্কুলের বেশ কিছু পড়ুয়ার পড়াশোনার যাবতীয় দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

শিশুদের জন্য স্কুলবাস
পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চাতেও ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করে এই স্কুল। ডঃ গ্রাহামস হোমস কর্তৃপক্ষ মনে করে, স্কুল জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল সংগীত। ২০০৭ সালে, স্কুলের কিছু নির্বাচিত ছাত্রছাত্রী যুক্তরাজ্যে অত্যন্ত সফল একটি সফর করে। লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল এবং এডিনবার্গ ক্যাসেলের গ্রেট হলে পরিবেশিত হয় তাঁদের গান, যেখানে উপস্থিত ছিলেন জাস্টিন টিম্বারলেক এবং এলটন জন-এর মতো ব্যক্তিত্বরা।
এই স্কুল শিশুদের মানসিক বিকাশ গঠনেও প্রভূত সাহায্য করে এবং এমন সব দক্ষতা প্রদানের চেষ্টা করে যা স্কুলের গণ্ডির বাইরেও জীবনকে সমৃদ্ধ করবে। নানারকম বিতর্ক, ক্যুইজ, নাটক, সাঁতার, ভলিবল, বাস্কেটবল-সহ নানা ধরনের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুনাম অর্জন করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

স্কুলের ভিতর বাস্কেটবল ও ভলিবল খেলার মাঠ
ডঃ গ্রাহামস হোমস-এর সঙ্গে যুক্ত একটি চ্যাপেল রয়েছে, যা ক্যাথরিন গ্রাহাম মেমোরিয়াল চ্যাপেল নামে পরিচিত। এই চ্যাপেলটি ১৯২৫ সালে জন গ্রাহাম কর্তৃক তাঁর স্ত্রীর স্মরণে নির্মিত হয়েছিল। এছাড়াও, এই প্রতিষ্ঠানে একটি সুন্দর চার্চও রয়েছে, যা পর্যটক বা দর্শনার্থীদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। এই চার্চ থেকে স্পষ্ট দেখা মেলে রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘার।

গ্রাহামস সাহেবের বাড়ি
অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি হওয়া এই স্কুল পঞ্চাশের দশকে নিজেদের দেশ থেকে পালিয়ে আসা তিব্বতি শরণার্থীদের জন্যেও তার দরজা খুলে দিয়েছিল। যেকোনো পর্যটক অথবা পরিদর্শক এখানকার পরিবেশ দেখে অনুপ্রাণিত না হয়ে থাকতে পারবেন না। নেপাল, ভুটান আর তিব্বতের সীমান্তের কাছে অবস্থিত কালিম্পংয়ের ডঃ গ্রাহামস হোমস স্কুল সর্বদা বলে চলেছে, বাড়ির থেকে দূরে আরেকটি বাড়ি (A home away from home)-র কথা। যে শিক্ষা দেয়, সেটাই তো বাড়ি। এই স্কুলে না এলে তা বোঝা যাবে না।
___________________
স্কুলের ঠিকানা: ডঃ গ্রাহামস হোমস, পো.অ. তোপখানা, কালিম্পং ৭৩৪৩১৬
অফিস: +91 8900238554
স্কুলের সময়: সোম-শুক্র সকাল ৮:৩০-দুপুর ৩:১০
___________________
ছবি: সুমন সাধু এবং স্কুলের ওয়েবসাইট

