বন্দেমাতরম ভবন : ২২৫ বছরের এই বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর অমূল্য সৃষ্টি

একতলা বাড়ি, পাশেই রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের মূর্তি

চুঁচুড়া (Chinsura) স্টেশনে নেমেই ঘড়িতে দেখলাম, বিকেল তিনটে। স্টেশনে তখন হাতেগোনা কয়েকটা লোক। দুপুরের আলস্য কাটেনি তখনও চারিদিকে। স্টেশন থেকে বেরিয়েই টোটো। মিনিট পনেরো লাগলো। গন্তব্য বঙ্কিমের স্মৃতির ঠেক। এ শহরের চারিদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে ঠিকই, কিন্তু তারপরও যেন একটা ইতিহাসের গন্ধ লেগে রয়েছে গোটা শহর জুড়ে। বিশেষ করে নদীর পাড় ধরে জোড়াঘাট যাওয়ার রাস্তাটায় যেন একটা ইতিহাস দাঁড়িয়ে অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

“…তাহার দিনকতক পরে বঙ্কিমবাবু হুগলিতে বাসা করেন। দুইটি বাড়ি ভাড়া করেছিলেন। জোড়াঘাটের ঠিক দক্ষিণে দুইখানা বাড়ির পর একটি বাড়ি তাঁহার অন্দর ছিল। অন্দর-বাটীর পূর্ব্বাংশের চাতালটি স্তম্ভোপরি নির্ম্মিত। উহার নীচ দিয়া গঙ্গার স্রোত প্রবাহিত হইত। ঐ চাতালে দাঁড়াইয়া বঙ্কিমবাবু একদিন বলিয়াছিলেন- “সন্ধ্যার পর আমরা এইখানে বসিয়া থাকি।’ … বৈঠকখানা-বাড়িতে তিনটি ঘর ছিল; তন্মধ্যে মাঝের ঘরটি সর্ব্বাপেক্ষা বড়। সেই ঘরে গঙ্গার দিকে একটি বাতায়নের পার্শ্বে একখানি ইজিচেয়ারে বসিতেন। কথা কহিতেন, আর গঙ্গা দেখিতেন।…” – চন্দ্রনাথ বসু কলমে এমনটাই আভাস মেলে বন্ধু বঙ্কিমচন্দ্রের এই বাড়ি নিয়ে।

জোড়া ঘাটের পাড়

প্রথম ঘরে বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর পারিবারিক বেশ কিছু ছবি রয়েছে। আর দ্বিতীয় ঘরে রয়েছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন মুহূর্ত-সহ নানা স্থাপত্যের ছবি।

গঙ্গার পাড় ঘেঁষে সাদা রঙের একতলা বাড়ি। বাড়ির সামনের দরজাটা বন্ধ দেখে আশেপাশে উঁকি মারতেই চোখে পড়লো, গঙ্গার বাঁধানো ঘাটের দিকে রয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের (Bankima Chandra) মূর্তি। আর পাশেই, রয়েছে দ্বিতীয় দরজা। দরজার মাথার ওপর পাথরের ফলকে খোদাই করা “বন্দেমাতরম ভবন” (Bande Ma Taram Bhaban)। 

পাশেই বসে থাকা কিছু স্থানীয় বাসিন্দার কথায় জানলাম, এ দরজাটা সকলের জন্য খোলাই থাকে। তবে আর দেরি কেন! ঢুকে পড়া গেল, বঙ্কিমের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটায়। পলেস্তারার কারুকাজ, কড়িকাঠের ছাদ, খড়খড়িওয়ালা কাচের জানালা, হাওয়া ঢোকার জন্য কাঠের ঘুলঘুলি, ছাদের রেলিঙে ইতালীয় বালুস্টার (baluster) এসব নিয়ে যেন অতীতের অ্যালবাম হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে পুরোনো গন্ধ মাখা বাড়িটার ঘরগুলোয় যেন একটা আলো আঁধারি তৈরি হয়েছে।

বঙ্কিম ভবন

“বড়ো আলোগুলো জ্বালিয়ে দেব?”, নিঃশব্দতাকে ছাপিয়ে গমগম করে উঠলো একটা কণ্ঠস্বর। আলাপ হল বাড়িটির বর্তমান কেয়ারটেকার দেব কুমার সাঁতরার সঙ্গে। তিনিই জানালেন, “বর্তমানে ‘বন্দে মাতরম ভবন’ চুঁচুড়া পুরসভার ‘হেরিটেজ কমিটি’র তত্ত্বাবধানে। ২০০৮ সাল থেকে চুঁচুড়া পুরসভার দায়িত্বেই রয়েছে বাড়িটি।”

দেওয়ালে দেওয়ালে তথ্য ঠাঁসা। কতো স্মৃতি, কতো গল্প। ঘরে ঢুকেই প্রথম চোখ পড়ল বাঁদিকে বন্দেমাতরম-এর স্মৃতিফলকের দিকে। নিমেষের মধ্যে যেন ছবির দুনিয়ায় ধরা পড়ল কাহিনি। লাগোয়া ঘাটের দিক থেকে দু’টি ঘর খোলা থাকে দর্শনার্থীদের জন্য। প্রথম ঘরে বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর পারিবারিক বেশ কিছু ছবি রয়েছে। আর দ্বিতীয় ঘরে রয়েছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন মুহূর্ত-সহ নানা স্থাপত্যের ছবি।

প্রথম ঘর 

দ্বিতীয় ঘর 

দেবকুমারবাবু বললেন, “এইসব ছবি, স্মৃতিগুলো নিয়ে আজকাল প্রায়ই শুনি সবাই প্রোজেক্টের কাজ করে। স্কুল কলেজের সব ছেলেমেয়েরা আসে। সারাদিন এখানেই থাকে, ছবি তোলে।”

ঐতিহাসিকদের মতে, পলাশির যুদ্ধের সময় নির্মিত এই বাড়িটির বয়স এখন প্রায় ২২৫ বছর। লখনউয়ের এক ব্যবসায়ী মালিক কাশিম হুগলি নদীর পাড়ে নির্মাণ করেন এই বিশাল বাড়ি। ইতিহাস বাদ দিলে মালিক কাশিমের এই বাড়ির আরও একটি দিক আছে। সময়টা ১৮৭৬-৭৭ সাল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তখন হুগলি জেলার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর পৈতৃক ভিটে নদীর অপর পারে, নৈহাটির কাঁঠালপাড়া গ্রামে। চাকরির সুবাদে তাই বাড়ি ভাড়া করেন চুঁচুড়ায়। লেখালেখির সঙ্গে সঙ্গীত চর্চাও করতেন বঙ্কিমচন্দ্র। বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার করতেন মালিক কাশিমের এই বাড়িটি।

বাড়ির উঠোন 

যদিও হুগলির সঙ্গে বঙ্কিমের সম্পর্ক আরও আগের। হুগলি মহসিন কলেজে পড়ার সময় বঙ্কিমচন্দ্র নৈহাটি থেকে নিয়মিত নৌকা করে যাতায়াত করতেন। এর প্রায় কুড়ি বছর পর হুগলির ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে জোড়াঘাটের (Jora Ghat) বাড়িতে থাকা শুরু করেন। ইতিমধ্যে তিনি সাহিত্যিক হিসাবে খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছেছেন। তাঁর বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রত্যেক শিক্ষিত সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির অন্দরমহলে নিজের স্থান করে নিয়েছে। সেকালের বহু নামকরা কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা নিয়মিত তাঁর হুগলীর বাড়িতে আসতেন এবং তাঁর জোড়াঘাটের বৈঠকখানা ঘরে সাহিত্যচর্চা, আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের আসর জমে উঠত।

জোড়াঘাটের বাড়িতে কাটানো এই পাঁচটি বছর তাঁর সাহিত্যরচনার ভরপুর প্রেক্ষাপট রচনা করে। প্রকাশিত হয় ‘রজনী’, ‘উপকথা’, ‘কবিতা পুস্তক’ , ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ , ‘সাম্য’  প্রভৃতি বইগুলি। ১৮৮০ সালের ১৫ই জুলাই চুঁচুড়া থেকে নবীনচন্দ্র সেনকে লেখা বঙ্কিমের চিঠি থেকে জানা যায় যে এই বাড়িতে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন আনন্দমঠ এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস।

তাঁর ‘আনন্দমঠ’ (‘Anadamath’) উপন্যাস মানেই দেশবাসীর স্বাধীনতার (Indipendence) গন্ধ, লড়াইয়ের গন্ধ। এই সেই বাড়ি, যেখানে বসেই বঙ্কিমের গানে জোয়ার এসেছিল সেই সুরের গন্ধের। ‘বন্দে মাতরম’, আপামর দেশবাসীর পরিচিত সেই সুরের সৃষ্টি হয় এই আঙিনায়। আজও যেন, ঘরের কড়িকাঠগুলো, খিলানগুলো সেই অতীতকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। স্মৃতির ভারে একটুও নুব্জ হয়নি সে, বরং পরিণত হয়েছে।

মাটির নিচের ঘরখানা 

“এই বাড়ির কিন্তু আরেকটা ঐতিহ্য আছে, গঙ্গার দিকে মাটির নিচে একটা ঘর আছে। বছরে অন্তত বার পাঁচেক ছবির প্রদর্শনী হয় ওই ঘরে। বছরের ওই কটাদিন জমজমাট পরিবেশ থাকে এই বাড়িতে”, বললেন দেবকুমার সাঁতরা।

শহরতলির অলিতে গলিতে আজও রয়েছে ইতিহাসের হদিশ। চুঁচুড়ার বঙ্কিমভবনও (Bankim Bhaban) যেন সেই ইতিহাসের কথাই বলে। গঙ্গার হাওয়া গায়ে মেখে নিজের ছন্দে দাঁড়িয়ে আছে। আর হাট করে খুলে রেখেছে বাড়িতে প্রবেশের দরজাটা। অপেক্ষা করে আছে নতুন কিছু মুখের। এ বাড়িটার অন্দরে দাঁড়ালে আজও যেন শিহরণ লাগে। দেওয়ালের লেখা গুলো পড়লে হারিয়ে যেতে হয় অতীতের দেশে। আবার কখনও বা সেই অতীতের দেশ থেকে বাস্তবে নিয়ে আসে এই বাড়িটার আজকের বাসিন্দাদের কোলাহল। না এরা কোনোও মানুষ নয়, এরা একঝাঁক পায়রার দল। যারাই হয়তো সশব্দে পাহারা দিচ্ছে বাড়িটাকে। পাহারা দিচ্ছে বাংলা সাহিত্যের তথা দেশের স্বাধীনতার একটা উজ্বল অধ্যায়কে।

___________ 

ছবি: প্রতিবেদক

Developed by DXDasia