হুগলি জেলার প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট বাংলো রয়েছে দশঘরাতেই!

‘ব্রাডলি বার্ট বাংলো’- একটি বিস্মৃত ইতিহাসের গল্প

(তৃতীয় পর্বের পর আজ শেষ পর্ব)

বিশ্বাস বাড়ির পর এবার রায় বাড়ি দর্শন করলাম। এখানে বেশ কিছু পুরাকীর্তি দেখতে পাওয়া যায়। এই রায় বাড়ির বিখ্যাত জমিদার ছিলেন বিপিনকৃষ্ণ রায়। তিনি এই বংশের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কলকাতা বন্দরের স্টিভেডর অধীনে কাজ করতেন। তারপর প্রচুর টাকা উপার্জন করে দশঘরা গ্রামে চলে আসেন এবং ধন সম্পত্তির মালিক হন। দশঘরায় বিশাল বড়ো বাড়ি বানান, প্রচুর জমি জমা কেনেন এবং জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। রায়দের রাজবাড়ি ঢুকতে গেলে একটা বিশাল গেট বা তোরণ পেরোতে হয়। এই তোরণটি হল সিংহের দরজা অৰ্থাৎ তোরণের উপরে দুই দিকে যেন সিংহ দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে আছে রানি ভিক্টোরিয়া, তার দুপাশে আছে দুই নারী-মূর্তি। রায়বাড়ির তোরণটি গভর্নর হাউস অফ ক্যালকাটার (রাজভবন) আদলে তৈরি। এই তোরণটির পাশেই আছে দু’টি ভাঙা সিংহের ছোটো গেট। গেটগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। এই গেটের ভিতরেই ছিল বিপিনকৃষ্ণ রায়ের ম্যানশন বাগান। এটি এখন গাছ গাছালিতে জঙ্গলে ভরা।

রায় বাড়ির প্রধান গেটের পাশেই আছে এক প্রাচীন ঘড়ি স্তম্ভ বা ক্লক টাওয়ার। তোরণ আর ঘড়ি পাশাপাশি গা ঘেঁষেই অবস্থিত। ঘড়িটি দেখতে অষ্টভূজাকৃতি, চারদিকে চারটি জানালা। জানালার কাচগুলো এখন ভঙ্গুর অবস্থায়। ঘড়িগুলি এখন আর চলে না। কিন্তু কাঁটাগুলো স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে এক প্রস্তুতকারক সংস্থার নাম লেখা আছে – J M DASS & BROTHERS, CALCUTTA। ঘড়িটির একদম মাথার উপরে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী-মূর্তি। এর ঠিক পেছনেই নাচ ঘর। নাচঘরের সামনের উঠোনে বেশকিছু মূর্তি রাখা আছে, যেগুলো দেখলে বোঝা যায় জমিদার মশাই বেশ শৌখিন ছিলেন। নাচঘরটি এখন কোনো অনুষ্ঠান হলে খুলে দেওয়া হয়। এছাড়া সবসময় বন্ধ করা থাকে। তোরণটির বাঁদিকে আছে এক বিশাল বড়ো শিব মন্দির। মন্দিরটি দেখতে উঁচু গম্বুজ আকৃতির এবং দেউল রীতিতে তৈরি। সামনে চালা সদৃশ ত্রিখিলান বিশিষ্ট। এই মন্দিরে টেরাকোটার কোনো কাজ নেই। সামনের দিকের উপরে দেখা যাবে ত্রিশূল, ডমরু আর সাপের আঁকা চিহ্ন। হুগলি জেলার পুরাকীর্তি গ্রন্থে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন – “দশঘরায় অনান্য মন্দিরগুলির মধ্যে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে রামজয় মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত রাধাগোবিন্দের মন্দিরটি সমতল ছাদ, উদগত কার্নিস এবং তদুপরি নাতিউচ্চ পরোট বিশিষ্ট। বন্দোপাধ্যায় পরিবারের প্রতিষ্ঠিত একটি প্রথাগত আটচালা শিবমন্দির ১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। তার নিচে বক্রবেষ্টনী। সুন্দর টেরাকোটার কাজ। ওই পরিবারের প্রতিষ্ঠিত বাসুলি মন্দিরের নির্মাণকাল মধ্য-অষ্টাদশ শতক। মন্দিরটি দক্ষিণমুখী, জোড়বাংলা ধরনের।”

প্রধান তোরণটির ঢোকার পর বাঁদিকে চোখে পড়বে ভারতীয় ডাকঘর। তার উল্টোদিকে আছে বিপিনকৃষ্ণ রায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘দাতব্য চিকিৎসালয়’ বা ‘Charitable Dispensary’, সংক্ষেপে বলা হয় ‘CD’। এই চিকিৎসালয়টি ১৯১৫ সালের পর থেকে শুরু হয়েছিল। উদ্বোধন করেছিলেন জেনারেল হ্যারিস সাহেব। তিনি তৎকালীন সার্জেন ছিলেন। সুধীরকুমার মিত্রের মতে বলা যায়, “এই দাতব্য চিকিৎসালয় স্থানীয় চারপাশে দরিদ্র ও দুঃস্থ অধিবাসীদের রোগ নিরাময়ে সহায়তা করে। কঠিন অসুখ হলে জেলা পর্ষদের দেওয়া ওষুধ ছাড়াও তিনি বহু দামী ওষুধ নিরাময়ের জন্য সরবরাহ করতেন। এই চিকিৎসালয়ে নিম্নলিখিত উৎকীর্ণ আছে : 
This building which was erected by the generosity Babu Bepin Kristo Roy was opened on the 30th January 1915  by surgeon general  G.F.A Harris C.S.I, I.M.S. and handed over to the district Board of Hooghly for use as as Charitable Dispensary।

চিকিৎসালয় থেকে সোজাসুজি দেখতে পাওয়া যায় চকচকে দ্বিতল ভবন। বাড়িটির নাম ‘ব্রাডলি বার্ট বাংলো’। এফ বি ব্রাডলি বার্টের নাম থেকেই এই বাড়িটির নামকরণ করা হয়। এটিই হুগলি জেলার প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট বাংলো। ১৯১৫ সালে তিনি এই বাড়িতে প্রথম আসেন এবং থাকতেন। এখন এই বাড়িতে ভাড়াটিয়া থাকেন। এই বাড়িটির সামনের দিকে আছে ঝিল বা পুকুর। এটি ‘কৃষ্ণ রায় ঝিল’ নামে পরিচিত। ‘ব্রাডলি বার্ট বাংলো’ ও ‘কৃষ্ণ রায় ঝিল’– এই দু’টি প্রতিষ্ঠা করেন বিপিনকৃষ্ণ রায়, বাংলা ২৯ বৈশাখ ১৩২০ বঙ্গাব্দে। এই বাংলোর সামনের দিকে লেখা আছে যে: 
BRADLEY-BIRT-BUNGALOW 
This Bungalow was first occupied by Mr. F. B. Bradley Birt I.C.S Magistrate Collector Hooghly on 25th August 1915.

বাংলো ভবনটির পাশেই আছে রাসমঞ্চ। দূর থেকে লক্ষ্য করলাম যে, রাসমঞ্চটি সাদার উপরে চকচকে রং করা গাছের ডাল পাতা আর নানা ধরণের মূর্তি। রাসমঞ্চের উল্টোদিকে আছে রায়দের প্রধান বাড়ি ও বাড়ির ভিতরে আছে বড়ো দুর্গা দালান। এখানে দুর্গাপুজো হয়। বাড়িটি দোতলা, উপরে বিশাল লম্বা বারান্দা, পাশেই পুকুর পাড় আর পুকুর পাড় ঘেঁষেই বসার জায়গা। বাড়ির মূল দরজা আর পুকুর পাড়ের মাঝেই মাটির রাস্তা, এই রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। বিশ্বাসদের মতো রায় পরিবারের দুর্গাপুজো প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। কিন্তু বারে বারে মনে করিয়ে দেবে বাংলার ফেলে আসা এক ঐতিহ্য, বাংলার ভুলে যাওয়া এক ঐতিহ্য।

তথ্যসূত্র
•    নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, হুগলী জেলার পুরাকীর্তি, প্রত্নতত্ত্ব অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, আগস্ট, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা – ৮১
•    সুধীরকুমার মিত্র, হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা- ২৮১
•    তারাপদ সাঁতরা, পশ্চিমবাংলার ধর্মীয় স্থাপত্যে মন্দির ও মসজিদ , পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি, কলকাতা
•    কমল চৌধুরী, হুগলী জেলার সেকাল-একাল, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা
•    সুধীরকুমার মিত্র, হুগলী জেলার দেব-দেউল, অপর্ণা বুক ডিস্ট্রিবিউটার, কলকাতা, প্রথম অপর্ণা সং, ১৯৯১
•    নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস, দেজ পাবলিশিং, কলকাতা
•    তিলক পুরকায়স্থ, টেরাকোটার গ্রাম দশঘরা, ২৬/০৩/২০১৮, ওয়েবসাইট
(সমাপ্ত)

Developed by DXDasia