টেরাকোটা কাজের অপূর্ব নিদর্শন দশঘরার ৩০০ বছরের গোপীনাথ মন্দিরে

দশঘরা গ্রামই যেন আস্ত পুরাকীর্তির বিষ্ণুপুর

বন্ধুকে নিয়ে দশঘরা গ্রামের দিকে যাত্রা করলাম। পৌঁছলাম বিশ্বাস ও রায় পাড়ায় জমিদার বাড়িতে। ব্রিটিশদের তৈরি মার্বেল প্যালেসের আদলে বিশ্বাসদের কাছারি বাড়িটি গড়ে তোলা হয়েছে। অপূর্ব এই বাড়িটি সাদা রঙে আছন্ন। ছয়টি স্তম্ভের উপরে আছে ত্রিভুজের মতো আকৃতি, এতে তিনটি ঘোড়া ও চাঁদের ছবি দেখা যাচ্ছে। দশঘরা গ্রামের বিশ্বাস পাড়ায় বিখ্যাত জমিদার ছিলেন জগমোহন বিশ্বাস। তিনি উড়িষ্যার মানুষ ছিলেন। বারদুয়োরি রাজা রামনারায়ণ পালচৌধুরীর কাছ থেকে রাজস্ব চুক্তি বা লিজ নিয়ে এই গ্রামে বসতি স্থাপন করেন এবং দশঘরা গ্রামকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই বংশের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা সদানন্দ বিশ্বাস বিখ্যাত গোপীনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এটিকে জিউ মাতার মন্দিরও বলা হয়। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দ। হুগলি জেলা গেজেটিয়ারে লেখা আছে, “The Pancharatna temple of Gopinath built by Sadanada Biswas in AD 1729 and standing within the predicts of the residence of the Biswas family is remarkable for the excellent terracetta embelishments decorating it’s fcades”। তখন ভারতবর্ষের মুঘল সম্রাট ছিলেন মহম্মদ শাহ্‌। এটি একটি পঞ্চরত্ন মন্দির। এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি এসেছে রত্ন মন্দির থেকে। রত্ন মন্দির বলতে সাধারনত চূড়া বা শিখরকে বোঝানো হয়। চালা মন্দিরের উপর চূড়া বসানো থাকলে তখন তাকে রত্ন মন্দির বলা হয়। এই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হল চারদিকে বাঁকানো কার্নিস। রত্ন মন্দিরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হল পঞ্চরত্ন। চারচালার মাঝখানের ছাদে একটি রত্ন থাকলে তাকে একরত্ন বলে। এই একরত্ন ছাদের চার কোণায় চারটি ছোটো ছোটো রত্ন বসানো থাকলে তাকে পঞ্চরত্ন বলা হয়। বাংলার অনেক স্থানে এই পঞ্চরত্ন মন্দির দেখতে পাওয়া যায়।

গোপীনাথ মন্দিরটি ২৫০-৩০০ বছর পুরোনো। যা টেরাকোটা কাজে প্রভূত খ্যাতি লাভ করেছে। এই টেরাকোটার কথার অর্থ হল পোড়ামাটি। ‘মাটির সাথে খড়কুটো মিশিয়ে কাদামাটি প্রস্তুত করা হত। এই কাদামাটি থেকে মূর্তি তৈরি করে রোদে শুকানো হয়। পরে আগুনে পুড়িয়ে টেরাকোটা ভাস্কর্য তৈরি করা হয়’। বিশ্বাসদের কাছারি বাড়িটির পাশেই এই মন্দিরটি অবস্থিত। তাদের দুর্গা দালান থেকে মন্দিরটি সুন্দর দেখা যায়।

এই মন্দিরের উচ্চতা  ৪০-৫০ ফুট বলে ধরা হয়। দেখতে রথের মতো এবং ত্রিখিলানবিশিষ্ট। মন্দিরের বাইরের তিন দিকের দেওয়ালে হরেকরকম টেরাকোটা চিত্র বা দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে। মন্দিরের ফলকগুলির মধ্যে আছে রামায়ণ-মহাভারতের ছবি, গাছপালা, পশু-পাখি, লঙ্কাকাণ্ডের যুদ্ধ, কৃষ্ণলীলা, নর-নারীর নাচ প্রভৃতি দৃশ্য। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে বহু টেরাকোটা মূর্তি-ফলকগুলি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেগুলি আবার নতুন করে কলকাতার কুমোরটুলি শিল্পী তারাপদ পালকে দিয়ে তৈরি করানো হয়। নতুন ফলকগুলির মধ্যে আছে শ্রীচৈতন্যের সপারিষদ ভক্তবৃন্দ সংকীর্তন, মহিষাসুরমর্দিনী, দুর্গা, লক্ষ্মী, বীণাবাদনরত সরস্বতী। মন্দিরের উপরের চারদিকে চারটি বাঁকানো কার্নিশের গায়ে ‘বাস-রিলিফের’ অনেক টেরাকোটা মূর্তি বর্তমান। কার্নিসের নিচের চারটি কোণে অসাধারণ ‘মৃত্যুলতা’ বা ‘কল্পলতা’ প্যানেল দেখতে পাওয়া যায়। শম্ভু ভট্টাচার্য তাঁর ‘পশ্চিমবঙ্গের মন্দির’ গ্রন্থে বলেছেন, “‘কল্পলতা’ হল উপর থেকে নীচে লতার মত কোণাচ। হাতি, সিংহ, লতা-পাতা অরণ্যের প্রতীক। এইভাবে মন্দির হয় অভীষ্ট ফলপ্রদ ‘কল্পতরু’। আবার সমস্ত মায়ার মৃত্যু ঘটায় বলে একে ‘মৃত্যুলতা’-ও বলা হয়”। এগুলো ছাড়া আরো সামাজিক জীবনের বেশ কিছু ফলক চিত্রিত হয়েছে, যেমন- স্ত্রীলোকের চরকাকাটা, সাধু ব্যক্তি, বন্দুক হাতে নিয়ে সৈনিক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। মন্দিরের ভিতরে আছে রাধা-গোপীনাথের মূর্তি। মন্দিরের সামনে প্রার্থনা ও বসার জায়গাও আছে।

(চলবে…)

তথ্যসূত্রঃ 
১। এ. কে. ব্যানার্জী, হুগলী ডিস্ট্রিক্ট গেজেটার, কলকাতা, ১৯৭২। 
২। প্রণব রায়, বাংলার মন্দিরচর্চা, বিবেকানন্দ বুক সেন্টার, কলকাতা, পৃষ্ঠা : ৪৩-৪৪।
৩। শম্ভু ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গের মন্দির।

Developed by DXDasia