দশঘরা গ্রামই যেন আস্ত পুরাকীর্তির বিষ্ণুপুর
গোপীনাথ মন্দিরের পাশে একটি নাটমন্দির আছে। এটি ১৮৩৬ সালে তৈরি হয়। কাছারি বাড়ির ভিতরে ঠাকুরদালানে প্রতি বছর দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। বিশ্বাসবাড়ির দুর্গাপুজো প্রাচীনতম প্রচলিত রীতি মেনেই হয়। বিশ্বাসদের জমিদার বাড়ি ঢোকার আগে একটা সাদা তোরণ চোখে পড়ে। বর্তমানে তোরণটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। এই কাছারি বাড়িটির পাশেই একটা দিঘি আছে, নাম গোপীসাগর। গোপীনাথের নাম থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। বাড়িটির ডান দিকে আছে ঘন গাঢ় লাল রঙের একচূড়া দোলমঞ্চ, সাতটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। পুকুর পাড় ঘেঁষেই এটি অবস্থিত। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি হয়েছিল। দোলমঞ্চের পাশেই আছে আটটি খিলানভাবে যুক্ত সাদা রঙের রাসমঞ্চ। বাঁদিকে বিশ্বাসদের বৈঠকখানা ও ছ’টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে নহবতখানা।

বিশ্বাসদের দু’টি আটচালা শিবমন্দিরও আছে। একটি বিশ্বাস পাড়ায় এবং অপরটি বামুনপাড়ায় বিশালাক্ষি তলায়। বামুনপাড়ায় মন্দিরটি খুবই প্রাচীন। ইট দিয়ে তৈরি এবং পশ্চিমমুখী। সামনের দিকে তিনটি খিলানভাবে দাঁড়িয়ে আছে, এটি মন্দিরের প্রবেশপথ। মন্দিরটি ভঙ্গুর, জরা-জীর্ণ এবং গাছের ডাল পাতা দিয়ে আবরণে ঢাকা। কিছু অক্ষত অবস্থায় আছে। গোপীনাথ মন্দিরের পর এই মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৮৪৬ সালে। গোপীনাথ মন্দিরের বাইরের দেওয়ালের নকশা থেকে এই মন্দিরের কিছু আভাস মেলে। কোনো মূর্তি ফলক নেই। তবে কিছু ফুলের বড়ো বড়ো নকশা এবং দু-একটা খোদাই শিল্প আছে।
এই আটচালা মন্দিরের পাশেই আছে বিশালাক্ষী জোড়বাংলা মাতার মন্দির। এই মন্দিরটি বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা মন্দিরের ধাঁচের মতো দেখতে। পরস্পর সংযুক্ত দু’টি দো-চালা কুটিরের সমন্বয়ে গঠিত। এই মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার কোনো কাজ নেই। মন্দিরের ভিতরে আছে শাড়ি পরিহিতা মা বিশালাক্ষী দেবীর মূর্তি। গলায় নরমুণ্ডমালা। দেবীর মুখের দন্তপংক্তি বিকশিত, স্মিতহাস্যযুক্ত।

সদানন্দ বিশ্বাসের পরবর্তী বংশধরগণ বিশ্বাস পরিবারের জমিদার ছিলেন। এই প্রসঙ্গে মানগোবিন্দ বিশ্বাসের নাম উল্লেখ্য। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর তিনি দশঘরাতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানকাল ১৮৫৮ সাল। বিদ্যালয়টি দশঘরাতে হাশোলি গ্রামে অবস্থিত। ১০০ বছর পর ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্যালয় পূর্ণ হল। বাংলার প্রাচীনতম স্কুলগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। নরেন্দ্রকৃষ্ণ বিশ্বাস, নিমাইচন্দ্র বিশ্বাস, নির্মলচন্দ্র বিশ্বাস, রজনীকান্ত বিশ্বাস, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বিশ্বাস, পীতপাবন বিশ্বাস, ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ বিশ্বাস, বীরশ্রেষ্ঠ বিশ্বাস, পৃথ্বীশচন্দ্র বিশ্বাস এবং অন্য কিছু মহান আত্মার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ১৯৫৯ সাল থেকে এই বিদ্যালয়ের উচ্চমাধ্যমিক কোর্স চালু হয়। বিশ শতকের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক সত্যেন বোস কর্তৃক ‘সাতবদা স্মরণিকা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৬ সাল থেকে এই বিদ্যালয়ের গবেষণার মান শুরু হয়েছে। বিদ্যালয়ে একটি সাদা পাথরের ফলকে লেখা আছে: ‘The building has been constructed and donated in memory of Late Revered Nimai Chandra Biswas by his sons & grandsons Late K C Biswas. Sri J. C. Biswas, Sri P. C. Biswas & Sri R. K. Biswas. Tablet affixed by the Managing Committee of the School, October 1955’।
(চলবে…)