বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রাণপুরুষ রামশঙ্কর ভট্টাচার্য

মহাভারতের বন পর্ব আর বিরাট পর্ব নিয়ে পুঁথি লিখেছিলেন রামশঙ্কর

দেবদত্ত গুপ্ত ও পার্থ দাশগুপ্ত
রামশঙ্কর ভট্টাচার্য হলেন বিষ্ণুপুর সঙ্গীত ঘরানার প্রথম বাঙালি গায়ক আচার্য। ১৭৬১ সালে রামশঙ্কর ভট্টাচার্যের জন্ম। একটি মতানুসারে তিনি বাহাদুর খাঁ-র কাছে সঙ্গীত শিক্ষা লাভ করেন ও পরবর্তী কালে তিনিই বিষ্ণুপুরের অন্যান্যদের নিজের মতো করে তৈরি করে নেন। তাই রামশঙ্করকেই বিষ্ণুপুর ঘরের প্রথম পুরুষ বলে ধরে নেওয়া হয়। যদিও বাহাদুর খাঁ-র কাছে রামশঙ্করের আগেই সঙ্গীত শিক্ষা নিয়েছিলেন গদাধর চক্রবর্তী কিন্তু তাঁর সম্পর্কে বা তাঁর ছাত্রদের সম্পর্কে কোনও তথ্য মেলে না। আবার অনেকে মনে করেন রামশঙ্কর গদাধর চক্রবর্তীর কাছেও সঙ্গীত অধ্যয়ন করেছিলেন। এই মতামত প্রতিষ্ঠা করে রামশঙ্কর ছিলেন সেনী ঘরানার বাহাদুর খা-র ছাত্র শাখাতেই। এই মতে রামশঙ্কর বিষ্ণুপুরের পণ্ডিত বংশের সন্তান হয়েও বাহাদুর খা-র সঙ্গীতের আকর্ষণে পিতা প্রপিতামহের ঘরের অমতেই বাহাদুর খা-র কাছে যান। তাঁর সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বাহাদুর খাঁ- তাঁকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতে মনস্থ করেন।

জগন্নাথ দাশগুপ্তের কণ্ঠে বিষ্ণুপুর ঘরানার রামশঙ্কর ভট্টাচার্যের গান

অন্য মতে মথুরা বৃন্দাবন অঞ্চলের কোনও এক সঙ্গীত সাধক পুরী যাওয়ার পথে বিষ্ণুপুর রাজ দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। ওই সময় শ্রুতিধর রামশঙ্কর ওই গায়কের গান শোনেন। পরের বার রাজার অনুরোধে যখন তিনি আবার বিষ্ণুপুর রাজ দরবারে পুনরায় গান করেন সেই সময় ওই গায়কের আগের গানটি নিখুঁত ভাবে গেয়ে শোনান রামশঙ্কর। সেই থেকেই খুশি হয়ে সেই সঙ্গীত গুণী রামশঙ্করকে তাঁর ছাত্র করে নেন। উভয়প্রকার তথ্য থেকে একটাই কথা পরিষ্কার হয় যে রামশঙ্কর উচ্চমানের গায়ক ছিলেন। পরবর্তী কালে রামশঙ্কর রাজা চৈত সিংহ-র সভাগায়ক নিযুক্ত হয়েছিলেন। সেই রাজ সভায় বিভিন্ন রাজ্য থেকে অনেক সঙ্গীত শিল্পীরা আসতেন। তখন শ্রুতিধর রামশঙ্কর তাঁদের গান শুনে শুনে নিজের কণ্ঠে তুলে নিতেন।

এইভাবে রামশঙ্করের কণ্ঠে আশ্রয় নিল একে একে তানসেন, বৈজু বাওরা, বিলাস খাঁ, গুলাব খাঁ প্রভৃতি শিল্পীদের শৈলী ও সঙ্গীত। এগুলি নিয়মিত চর্চা করতে করতেই একদিন তিনি বিষ্ণুপুরী চালের উদ্ভব করলেন। তিনি নিজে ধ্রুপদ খেয়াল রচনা করলেন এবং যদুভট্ট, ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী, রামকেশব ভট্টাচার্য, কেশবলাল চক্রবর্তী, দীনবন্ধু গোস্বামী, অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের সঙ্গীতের শিক্ষা দিলেন। সেই কারণেই বিষ্ণুপুরে সঙ্গীতের একটা ঘর তৈরি হল রামশঙ্করকে ঘিরে।

এই রামশঙ্কর ভট্টাচার্য তাঁর পিতা বিষ্ণুপুর রাজ দরবারের সভা পণ্ডিত গদাধর ভট্টাচার্য-র কাছে এবং পরবর্তী কালে বারাণসীতে গিয়ে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করেন। সেই শিক্ষার ধারাতেই রামশঙ্কর মহাভারতের বন পর্ব আর বিরাট পর্ব নিয়ে পুঁথি লিখেছিলেন। এই পুঁথির চলন দেখলে মনে হয় যেন গানের চলনে পুঁথিটি লেখা হয়েছে। রামশঙ্করের লিখিত পুঁথি দেখার সুযোগ করে দিলেন তাঁর বংশধর মল্লেশ্বর ভট্টাচার্য পাড়ার ইন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। পুঁথি পর্যবেক্ষণ করে আমাদের মনে হয়েছে পংক্তি বিন্যাস ও শব্দের ধারায় যে সঙ্গীত হিসেবে এগুলি হয়তো পরিবেশন করা সম্ভব হতে পারে। এই ধারণার স্বপক্ষে আরেকটা উদাহরণ আমরা রাখতে পারি যা আমরা অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছি। সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আত্ম জীবনী মূলক স্মৃতিকথা ‘সুরের পথে একটি জীবন’ নামক গ্রন্থে জানিয়েছেন তাঁর পিতামহের কনিষ্ঠ ভ্রাতা উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র গীতা-কে সঙ্গীতের ছন্দে লিখেছিলেন। এই লেখনী ‘গীতা গীতি’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছিল। রামশঙ্করের পুঁথিটি পর্যবেক্ষণ করেও সেরকম একটা ধারণা আমাদের তৈরি হয়েছে যে এই পর্ব দুটির পুঁথি রামশঙ্কর হয়তো বা সঙ্গীতের ছন্দেই লিখে রেখেছেন।

রামশঙ্করের পুত্র ছিলেন রামকেশব ভট্টাচার্য (১৮০৯-১৮৫০)। ধ্রুপদ খেয়ালে তাঁর পারদর্শিতার কথা সঙ্গীতের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তিনিই প্রথম বিষ্ণুপুর ঘরাণায় এস্রাজ বাদনের সূচনা করেন। পরবর্তী কালে বিষ্ণুপুর ঘরের প্রসিদ্ধ এস্রাজ বাদকেরা হলেন গৌরহরি কবিরাজ, সুনীল কবিরাজ, ভাস্কর নন্দী, নির্মল নন্দী, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিউলি বসু, মথুর দত্ত, গোপাল দাস, বুদ্ধদেব দাস, রণধীর রায় প্রমুখ। বর্তমানে উল্লিখিত এস্রাজ বাদক মথুর দত্তের বয়েস বিরানব্বই বছর। তিনি চূড়ান্ত দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে টিকে রয়েছেন। তাঁর কন্যা অর্চনা দত্ত মথুরবাবুর দেখভাল করেন সামান্য প্যারা টিচারের চাকরি করে। এই গভীর বার্ধক্যে দাঁড়িয়েও মথুর বাবু ঘরোয়া অনুরোধে গেয়ে শোনালেন দু এক কলি টপ্পার আঙ্গিক। তাঁর সেই ধুলি মাখা এস্রাজ আজও তাঁর গৃহে শোভা পায় দেওয়ালে ঝোলানো অবস্থায়। তাঁর কণ্ঠের অন্তর থেকে বেড়িয়ে এলো বিষ্ণুপুর ঘরানার নিবেদনের চেহারাটি।

Developed by DXDasia