কৃষ্ণাঙ্গদের জ্যাজ মিউজিককে ভালোবাসতে শেখালো কলকাতা, বাঙালিকে দেখালো মুক্তির সেলিব্রেশন

কলকাতা ও আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গদের জ্যাজ

জ্যাজ (Jazz)। নিয়ম ভাঙার গান। কিংবা নিয়মহীনকেই নিয়ম বানিয়ে নেওয়ার গান। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকার নিউ অরলিন্সে আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের হাত ধরে জন্ম নেয় জ্যাজ। কী আছে জ্যাজের মধ্যে? যন্ত্রণা আর দুঃখের কথা। কিন্তু কষ্টের ভেতর থেকেও কীভাবে আনন্দ আর মুক্তির সুর খুঁজে নেওয়া যায়, জ্যাজ তারই এক দুর্দান্ত সেলিব্রেশন। বাঁধনহারার সেলিব্রেশন। কারণ জ্যাজ মানেই ইম্প্রোভাইজেশন অর্থাৎ তাৎক্ষণিক সুর তৈরি। কোনো বাঁধাধরা স্ক্রিপ্ট নেই! মঞ্চে শিল্পীরা একে অপরের সুরের ইশারা বোঝেন আর অন দ্য স্পট নতুন সুর বানিয়ে ফেলেন। একারণেই জ্যাজের একই কম্পোজিশন দুইবার শুনলে দুইরকম অনুভূতি হতে পারে। আর জ্যাজের পারফরম্যান্স মানেই তো একটা জীবন্ত গল্প। খেয়াল করে দেখবেন, বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে একপ্রকার আড্ডা চলে। ট্রাম্পেট একটা সুর ছুড়ে দিল, স্যাক্সোফোন তার জবাবে একটা মোচড় দিল আর ব্যাকগ্রাউন্ডে পিয়ানো বা ড্রামস সেই আড্ডার তাল-লয় বজায় রাখল। জ্যাজের এই কল অ্যান্ড রেসপন্স আজও এনার্জি জুগিয়ে চলেছে রাত থেকে দিন। (কলকাতা ও জ্যাজ মিউজিক)

কিন্তু আফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গদের জ্যাজ কীভাবে ঢুকে পড়ল সিটি অফ জয় কলকাতায়! কারণ জানতে খানিক পিছিয়ে যেতে হবে। এমনিতে কলকাতা পৃথিবীর প্রায় সবকিছুই সাদরে গ্রহণ করেছে। খাবার থেকে পোশাক, চলচ্চিত্র থেকে সংগীত, চিত্রশিল্প থেকে লাইফস্টাইল – একবার যে কলকাতায় এসেছে, কোনোদিন ভুলতে পারেনি। এতটাই চার্মিং শহর ছিল কলকাতা। কলকাতার জ্যাজ সংগীতের ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন এক প্রাণবন্ত মহাকাব্য, আমেরিকা থেকে আছড়ে পড়েছিল ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানীতে। (কলকাতা ও জ্যাজ মিউজিক)

ব্রিটিশ আমলের বিলাসবহুল হোটেলের বলরুম থেকে শুরু হয়ে জ্যাজ সুরের ধারা ধীরে ধীরে কলকাতার ধমনীতে মিশে গিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকে কলকাতায় প্রথম জ্যাজ সংগীতের পদধ্বনি শোনা যায়, যা আমেরিকার বর্ণবৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া আফ্রো-আমেরিকান সংগীতশিল্পীদের হাত ধরে পৌঁছেছিল।

টেডি ওয়েদারফোর্ড

ব্রিটিশ আমলের বিলাসবহুল হোটেলের বলরুম থেকে শুরু হয়ে জ্যাজ সুরের ধারা ধীরে ধীরে কলকাতার ধমনীতে মিশে গিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকে কলকাতায় প্রথম জ্যাজ সংগীতের পদধ্বনি শোনা যায়, যা আমেরিকার বর্ণবৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া আফ্রো-আমেরিকান সংগীতশিল্পীদের হাত ধরে পৌঁছেছিল। পিয়ানোবাদক টেডি ওয়েদারফোর্ড (Teddy Weatherford) এবং ট্রাম্পেটবাদক ক্রিকেট স্মিথের (Cricket Smith) মতো কিংবদন্তি অগ্রজরা কলকাতার মধ্যে এমন কিছু রসদ খুঁজে পেয়েছিলেন, যা কেবল তাদের স্বাগতই জানায়নি, কলকাতা বরাবর প্রাচ্য সংগীতের ধারার পাশাপাশি পশ্চিমি সংগীতকেও আপন করে নিতে পেরেছিল। (কলকাতা ও জ্যাজ মিউজিক)

বিশেষত ওয়েদারফোর্ড কলকাতার জ্যাজ ইতিহাসের এক মজবুত স্তম্ভ হয়ে ওঠেন; সাংহাই ঘুরে এসে তিনি কলকাতাকেই নিজের ঘর বানিয়ে নেন। গ্র্যান্ড হোটেলে শুরু করেন একটি বিগ ব্যান্ড পরিচালনা, যা তৎকালীন অভিজাত সমাজ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শহরে মোতায়েন সামরিক কর্মকর্তাদের মুগ্ধ করে রাখত। সে সময় গ্র্যান্ড হোটেলের বলরুমে পশ্চিমি পিয়ানোর স্ট্রাইড শৈলী (পিয়ানোর স্ট্রাইড শৈলী হল জ্যাজ পিয়ানো বাজানোর একটি বিশেষ কৌশল, যা মূলত ১৯২০-এর দশকে উদ্ভূত হয়। এই শৈলীতে বাঁ হাত দিয়ে ড্রাম ও বেসের মতো ছন্দের কাজ এবং ডান হাত দিয়ে প্রধান সুর বা ইম্প্রোভাইজেশন করা হয়।) বাংলার আর্দ্র রাতের সঙ্গে মিলেমিশে এক মহাজাগতিক পরিবেশ তৈরি করত। ঘটনাচক্রে এই সুরের পরিবেশ এশিয়ার খুব কম শহরেই দেখা যেত, কলকাতা ছিল ব্যতিক্রম। (কলকাতা ও জ্যাজ মিউজিক)

এরপর ভারতে শেষ হয় ব্রিটিশ রাজ। যদিও স্বাধীনতার পরেও কলকাতার জ্যাজ সংগীত ফিকে হয়ে যায়নি। তা বিবর্তিত হয়ে চলে আসে পার্ক স্ট্রিটের রাজপথে। পার্ক স্ট্রিটকে অনেকেই নিশিজাগরণী রাজপথ বলে উল্লেখ করেন। আমার মতে জ্যাজ শোনার আদর্শ সময় রাত। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে ও খানিক আরাম পেতে জ্যাজ শোনেন মানুষ। কে বলতে পারে, জ্যাজই হয়ত পার্ক স্ট্রিটকে জাগিয়ে রাখত। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে ট্রিঙ্কাস, ব্লু ফক্স, মোকাম্বোর মতো আইকনিক রেস্তোরাঁগুলোকে কেন্দ্র করে জ্যাজের এক স্বর্ণযুগ শুরু হয়। কারন ট্রিঙ্কাস বা মোকাম্বো শুধুমাত্র রেস্তোরাঁ ছিল না, ছিল পশ্চিমি সংস্কৃতির মিলনমেলা কেন্দ্র। সেই সময়েই উত্থান ঘটে ‘পার্ক স্ট্রিটের রানি’ পাম ক্রেইনের (Pam Crain), যাঁর কণ্ঠ-মাদকতায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল মোকাম্বো। ১৯৫৫ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পাম ক্রেইন তাঁর সংগীত জীবন শুরু করেন। তৎকালীন কলকাতার অন্যতম অভিজাত ও বিখ্যাত নাইটক্লাব মোকাম্বোর প্রথম ও প্রধান গায়িকা হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত জ্যাজ ও পপ সংগীত পারফর্ম করেন।

পার্ক স্ট্রিটের রানি পাম ক্রেইন

 

স্যাক্সোফোনবাদক ব্র্যাজ গনসালভেসের (Braz Gonsalves) নামও এখানে উল্লেখযোগ্য। কারণ পশ্চিমা ধ্রুপদী সংগীতে তালিম নেওয়া এই শিল্পীরা কলকাতার জ্যাজ অর্কেস্ট্রার মেরুদণ্ড হয়ে ওঠেন। কাজ করতে শুরু করেন হিন্দি সিনেমার মিউজিশিয়ান হিসেবে।

স্যাক্সোফোনবাদক ব্র্যা জ গনসালভেস

‘পার্ক স্ট্রিটের রানি’ পাম ক্রেইন, যাঁর কণ্ঠ-মাদকতায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল মোকাম্বো। ১৯৫৫ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পাম ক্রেইন তাঁর সংগীত জীবন শুরু করেন। তৎকালীন কলকাতার অন্যতম অভিজাত ও বিখ্যাত নাইটক্লাব মোকাম্বোর প্রথম ও প্রধান গায়িকা হিসেবে নিযুক্ত হন।

তবে কলকাতার জ্যাজ সংগীতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম হিসেবে উঠে আসেন লুই ব্যাংকস (Louis Banks), যাঁকে ভারতীয় জ্যাজের গডফাদার বলা হয়। দার্জিলিংয়ে জন্ম নেওয়া লুই ব্যাংকস ৭০-এর দশকের শুরুতে কলকাতায় চলে আসেন—তাঁর বাবা জর্জ ব্যাংকসও ছিলেন একজন ট্রাম্পেটবাদক, যিনি কলকাতার বিভিন্ন হোটেলে বাজাতেন। লুই ব্যাংকস ‘লুই ব্যাংকস ব্রাদারহুড’ গঠন করেন, ধীরে ধীরে কলকাতার জ্যাজ সংগীতে এক নতুন মোড় আসে, যেখানে প্রথাগত সুইং জ্যাজ-ফিউশন মিশে যায় রক মিউজিকে। ব্যাংকস হয়ে ওঠেন ইন্দো-জ্যাজ ফিউশন-এর রূপকার। ভারতীয় জ্যাজকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার পাশাপাশি তিনি আরডি বর্মনের মতো কিংবদন্তি সুরকারদের সঙ্গেও কাজ করেছেন।

ভারতীয় জ্যাজের গডফাদার লুই ব্যাংকস

৬০ ও ৭০-এর দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি লাইভ মিউজিকের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছিল, তখনও পার্ক স্ট্রিটের ট্রিঙ্কাজ ছিল জ্যাজ মিউজিকের অবিচল দুর্গ। ট্রিঙ্কাজের সেই মঞ্চেই তরুণী ঊষা উত্থুপ (Usha Uthup) ওঁর রাশভারী ও জোরালো কণ্ঠ নিয়ে দর্শকদের স্তম্ভিত করতে শুরু করলেন— পরনে সিল্কের শাড়ি আর চুলে ফুল। ঊষা উত্থুপ প্রমাণ করলেন কলকাতার জ্যাজ যেমন বিশ্বজনীন তেমনি তার শিকড় স্থানীয় ঐতিহ্যের গভীরে। বলা যেতে পারে ঊষা কলকাতার নাইটলাইফে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটালেন। ১৯৬৯ সালের ১ অক্টোবর ট্রিঙ্কাজে ঊষা উত্থুপ তাঁর প্রথম পারফর্ম করেন। পশ্চিমা ধাঁচের ক্লাবগুলোতে তখন মহিলাদের জন্য ড্রেস কোড প্রচলিত থাকলেও, তিনি সম্পূর্ণ ভারতীয় পোশাকে অর্থাৎ শাড়ি পরে জ্যাজ পরিবেশন করে সেই স্টিরিওটাইপ ভেঙে দিলেন। তাঁর গম্ভীর, ভারী ও জাদুকরী কণ্ঠস্বর জ্যাজ মিউজিকের জন্য একেবারে উপযুক্ত ছিল। লিটল উইলি জন-এর ফিভার-এর মতো জনপ্রিয় জ্যাজ ও ব্লুজ গানগুলো গেয়ে ঊষা খুব দ্রুত সংগীতপ্রেমীদের মন জয় করে নেন। উল্লেখ্য, আগামী ২০২৭ সালে ট্রিঙ্কাজ শতবর্ষে পদার্পণ করবে।

ট্রিঙ্কাজে ঊষা উত্থুপ

 

কলকাতার সঙ্গে জ্যাজের সম্পর্ক কখনোই কেবল অনুকরণের ছিল না; ছিল বন্ধুত্ব স্থাপনের। আজ যদিও বড়ো ব্যান্ডের নিয়মিত আসর বসে না, তবুও ফিকে হয়ে যায়নি কলকাতার জ্যাজ প্রীতি। স্কিনি মো’এস জ্যাজ ক্লাব-এর মতো তৈরি হয়েছে নতুন আস্তানা। এই আর্ট ডেকো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে জ্যাজের মাদকতা। মধ্য কলকাতার ব্রডওয়ে বার মাঝেমধ্যেই তরুণ জ্যাজ শিল্পীদের পারফর্ম করার সুযোগ করে দেয়। এছাড়া কলকাতার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক জ্যাজ মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ‘জ্যাজফেস্ট কলকাতা’ (Jazzfest Kolkata) এখনও নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে ডালহৌসি ইনস্টিটিউটে। 

স্কিনি মো’এস জ্যাজ ক্লাব (কলকাতা)

আসলে কলকাতার জ্যাজ সংগীতের ইতিহাস এক লড়াইয়ের গল্প— যা আজও বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা রুচির পরিবর্তনকে জয় করেই টিকে আছে। অন্যান্য আরও অনেক জিনিসের মতোই জ্যাজ মিউজিক ও লেগাসি কলকাতার আত্মজীবনীর এক অপরিহার্য অধ্যায়, যা নিজের ছন্দে নাচতে ও নাচাতে চেয়েছে। বিদেশি সুরকে নিজের ঐতিহ্যে রূপান্তর করে কলকাতা প্রমাণ করেছে, যা তোমার, তা আমারও। তাই তো এই একুশ শতকেও শহরের অসংখ্য বাড়ি থেকে মধ্যরাত্রে ভেসে আসে একটুকরো জ্যাজ। ভুলে গেলে চলবে না, একমাত্র মিউজিকই পারে শহরের চরিত্র বদলে দিতে। বেঁধে ফেলতে পারে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের বিপ্লব।
_____________

Developed by DXDasia