
ফিরে দেখা সেই বাংলা গানগুলি, যাদের উৎস কবিতা
বাড়ির ফিলিপ্স রেডিওটার দশা তখন আজকের মতো নয়। এখনকার মতো মহালয়ার আগেরদিন সেটাকে বের করে ঝেড়েপুঁছে ঠিকঠাক চলছে কিনা পরীক্ষা করতে হত না। সেটি তখন ছিল সকাল থেকে মায়ের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গী। বাড়িতে টেলিভিশন তখনও এসে পৌঁছোয়নি। বিনোদনের একমাত্র ভরসা রেডিওটি। ‘রেট্রো’ গান থেকে শুরু করে নতুন হিন্দি সিনেমার গান। শাহরুখ-কাজল জুটির কোনও সিনেমার গানে, নায়ক দাঁড়িয়ে থাকলেও ‘জমি’ (Zameen) কেন চলতে শুরু করেছে তা শিশুমনের বোধগম্য হতো না। আর, এসবের মাঝে শোনা অজস্র বাংলা গান। এবং তারই মধ্যে কিছু গান, যেগুলি সুর ও কথায় একটু অন্যরকম। গানের কথা দিয়েই তখন গানগুলি মনে রাখা। পরে চিনে নেওয়া সেই গানের শিল্পী-সুরকার-গীতিকারদের। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল থেকে কবীর সুমন, লোপামুদ্রা মিত্র, শ্রীকান্ত আচার্যের কণ্ঠে গান কিংবা ওপার বাংলার ‘তোমাকে চাই’ চলচ্চিত্রের একটি গান। যে গানগুলিকে নিয়ে আজকের স্মৃতিচারণ, সবগুলির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলিকে আমরা বলতে পারি ‘কবিতার গান’।
‘ছাড়পত্র’-এর মলাট পেরিয়ে সমগ্র বাংলাতেই প্রবলভাবে বিখ্যাত হয় গানটি। মূল কবিতার পংক্তিগুলিতে থাকা ভোররাত্রির অপরূপ চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন কবি। সলিল চৌধুরীর সুর ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তা আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল।
উনিশ শতকের গোড়ায় আমাদের সাহিত্যে আধুনিক আঙ্গিকগুলির প্রবেশ। তার আগে ছিল একটিই আঙ্গিক – পদ্য। আজকাল সেসব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘেরাটোপে সীমিত থাকলেও বহু শতাব্দী পুরোনো সেইসব কাব্য কিংবা পদাবলি নিভৃতে জানিয়ে যায়, তাদের লেখ্যরূপ পদ্যের ছকে বাঁধা হলেও প্রাণভোমরা ছিল তাদের সুর। কথক ঠাকুর, গায়নদের মুখে মুখে ফিরত সেসব কাব্য। আধুনিক সময়ে গানের লিরিক ও কবিতা সমান্তরালভাবে দুটি ভিন্ন অবববাহিকায় প্রবাহিত হলেও মাঝে মাঝে তাদের তীব্র জলোচ্ছ্বাসে দুটি মিলে মিশে যায়। ‘কবিতার গান’-গুলি সেই মিশেলেরই উদাহরণ।
সন্ধ্যা থেকে রাত্রির সময়টা বিভিন্ন রেডিও স্টেশনে হতো পুরোনো দিনের গান। বেশ মনে পড়ে, ‘পালকির গান’, ‘কৃষ্ণকলি’ কিংবা ‘কাজলা দিদি’। কবি বা গীতিকারের নাম তো দূর অস্ত, ছোট্ট বাক্সটার মধ্যে বসে কে বা কারা গাইছেন সে সময় জানা নেই। হাঁ করে শুনছি দেখে মা অথবা বাবা গায়ক-গায়িকার নাম বলতেন মাঝে মধ্যে। আরেকটু বড়ো হয়ে অনুষ্ঠান সঞ্চালকের মুখের কথাগুলি যখন আর হিজিবিজি মনে হয় না, গায়কের নাম ছাড়াও মনে থেকে যেত গীতিকার ও সুরকারের নাম। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’-এর সঙ্গে পরিচয় এভাবেই। গানটির কাছে এখন ফিরে গেলে কথাগুলির অভিঘাত টের পাওয়া যায় ভালোভাবে। চল্লিশের দশকে পরাধীন ভারতবর্ষের এক বিশেষ পেশার সঙ্গে যুক্ত চরিত্রটি সুকান্ত সৃষ্ট রূপক। যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম। এরপর, গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম শরিক সলিল চৌধুরী কবিতাটির উপর সুর আরোপ করেন। ‘ছাড়পত্র’-এর মলাট পেরিয়ে লেখাটি সমগ্র বাংলাতেই প্রবলভাবে বিখ্যাত হয় গানটি। মূল কবিতার পংক্তিগুলিতে থাকা ভোররাত্রির অপরূপ চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন কবি। সলিল চৌধুরীর সুর ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তা আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। ‘রানার’ কবিতাটি ছাড়াও সলিল চৌধুরী সুর আরোপ করেছেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের একাধিক গানে। ‘অনুভব’ (অবাক পৃথিবী), ‘দেশলাইয়ের কাঠি’ যার মধ্যে অন্যতম।
প্রিয়তমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির উৎস ছিল শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি। সুমন এখানে কবিতার ভাষায় সরাসরি সুর আরোপ করেননি। কবিতাটিকে লিরিকের রূপ দেওয়ার সময় নিজের মনের মতো করে পুনর্গঠন করেছিলেন।
ফেলে আসা দিনের গানগুলির পাশাপাশি শোনা হতো ‘আধুনিক’ বাংলা গান। নতুন সময়ের নতুন রকমের সুরে কবীর সুমনের ‘প্রিয়তমা’ গানটি (১৯৯৪) এখনও স্পটিফাই কিংবা ইউটিউব মারফত মনের মধ্যে একটু নস্টালজিয়া উস্কে দিয়ে যায়। প্রিয়তমাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলির উৎস ছিল শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি। সুমন এখানে কবিতার ভাষায় সরাসরি সুর আরোপ করেননি। কবিতাটিকে লিরিকের রূপ দেওয়ার সময় নিজের মনের মতো করে পুনর্গঠন করেছিলেন।
কবিতার গান নিয়ে আলোচনায় নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে নতুন শতাব্দীর শুরুর সময়ে একটি সুরকার-গায়িকা জুটির কথা উল্লেখ করতেই হয়। ১৯৯৯ সালে ‘অন্য হাওয়ার অন্য গান’ অ্যালবামে জয় গোস্বামীর ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ কবিতাটিতে সুর আরোপ করেন সমীর চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শঙ্খ ঘোষ রচিত দুটি কবিতার গান। লোপামুদ্রা মিত্রের কণ্ঠে ‘বেণীমাধব’ প্রবল জনপ্রিয় হয়। ২০০২ সালে মুক্তি পায় ‘কবিতা থেকে গান’। ‘বেণীমাধব’-সহ এই অ্যালবামটিতে ছিল মোট দশটি কবিতার গান। শঙ্খ ঘোষের ‘যমুনাবতী’ ও ‘মনে হয় অনেক দিনেই’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘এ ঘর তখন’ ও ‘মেঘলা দিনে দুপুরবেলা’, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘যে যায় সে যায়’, ‘জিভ টানলেন, নাড়ি টিপলেন’ ও ‘কাল থেকে ঠিক পাল্টে যাবো’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’ এবং জয় গোস্বামীর আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘নুন’ থেকে ‘আমরা তো অল্পে খুশি’। ২০০২ সালেই লোপামুদ্রা মিত্রের কণ্ঠে গান রূপে মুক্তি পায় জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী কবিতা ‘আবার আসিব ফিরে’। সেই সময়ের বাংলায় এই গানগুলির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। রেডিওর পাশাপাশি পাড়ার সম্ভ্রান্ত বাড়িতে একটা করে ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল। মনে পড়ে, সেদিক থেকে বহু ছুটির বিকেলে এসব গান ভেসে আসতো হাওয়ায়। পুজোর সময়ে ইলেকট্রিক পোস্টে বাঁধা চোঙা মাইক্রোফোনে পাড়ার সবাই শুনতো ‘আবার আসিবো ফিরে’। পয়লা বৈশাখ কিংবা স্কুলের বাৎসরিক উৎসবে কোনও একজন অবশ্যই নাচতো ‘বেণীমাধব’ কিংবা ‘যমুনাবতী’-র সঙ্গতে।
পুজোর সময়ে ইলেকট্রিক পোস্টে বাঁধা চোঙা মাইক্রোফোনে পাড়ার সবাই শুনতো ‘আবার আসিবো ফিরে’। পয়লা বৈশাখ কিংবা স্কুলের বাৎসরিক উৎসবে কোনও একজন অবশ্যই নাচতো ‘বেণীমাধব’ কিংবা ‘যমুনাবতী’-র সঙ্গতে।
স্মৃতিপথের উজান বেয়ে এগোলে এরকম অনেক গানই মনে পড়বে। একটু সন্ধান করলেই পাওয়া যাবে, অনুপ ঘোষালের সুরে ও কণ্ঠে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’। আরও পাওয়া যাবে অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘ইতি মৃণালিনী’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘স্মৃতির শহর-১’। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ সদ্য গিটার হাতে নেওয়া কিশোর কিশোরীর ঠোঁটের ডগায় থাকতো একটি সময়ে।
শতবর্ষ পেরিয়েও জনপ্রিয় কিংবা উচ্চাঙ্গের বাংলা গানের ঐতিহ্যে ‘রবি’ এখনও প্রায় মধ্যগগনে। তাঁর রচনা ও সুরকে নিয়ে নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের শেষ নেই। অদূর ভবিষ্যতে হবে বলে মনেও হয় না। ‘বিদ্রোহী’কেও ফিরে দেখা হয় মাঝেমাঝে। তারই মধ্যে একটু নস্টালজিয়া, পুরোনো স্মৃতিদের ভিড়ে রয়ে গিয়েছে এই গানগুলিও। বিভিন্ন সময়ের সংগীতশিল্পীরা তাঁদের সমসাময়িক কবিতাগুলির আবেদন সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এভাবেই, পাঠক মহলে বিখ্যাত এই কবিতাগুলি বৃহত্তর সমাজের ধারায় লীন হয়ে গিয়েছে গান রূপে। জনসাধারণের মাঝে কবিতায় অন্তর্লীন ভাবের বাহন হয়ে উঠেছে সুর।
