শ্রমজীবী মানুষের জীবনসত্যকে গানে ধরেছিলেন সলিল, সুমন
ছবি সৌজন্যে: দিজ ল্যান্ড ইজ মাই ল্যান্ড/ আমেরিকান ওয়ার্ক সংস/ ভল্যুউম ৩
ভাবনাটা ডানা মেলতে আরম্ভ করেছিল খুব চেনা দুটো গানের হাত ধরে। সলিল চৌধুরীর দুই কিংবদন্তি: রানার এবং পালকির গান। কিশোরবেলা থেকে কয়েক হাজারবার শোনা। তবু যতবার শুনি তত ভালো লাগে। কেননা গানের কথাগুলো সুরের সঙ্গে এমন মিতালি পাতিয়ে রয়েছে যে কথাটা স্মরণে এলেই কেমন করে যেন এসে যায় সুরটা এবং ঠিক উল্টোটাও। বলব না যে এটা আমার একার অভিজ্ঞতা – আমার বয়সী বা অগ্রজ বহু বাঙালির অনুভূতি একদম এক। এটা হলেও (স্মৃতি প্রতারণা না করলে জানানো ভালো, গত শতকের আশির দশকে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের কাছাকাছি এক ডাকঘরে শেষ রানারের সন্ধান মিলেছিল) চরিত্রটির আবেগ-দুঃখ-টেনশন-ট্র্যাজেডি আজও গানটা শুনতে শুনতে স্পর্শ করা যায়। ঠিক যেমন পালকি-বাহকদের শ্রমসিক্ত শরীরের ক্লান্তি গানের শেষভাগে শ্রোতার ঘাড়ের ওপর হেলে পড়ে সুরের সারথ্যে। এটা যে-কোনো শ্রমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। পালকি ও পালকিবাহকরা মিউজিয়ামের দ্রষ্টব্য হয়ে গেলেও এই শ্রমজ ক্লান্তি সত্যি, বাস্তব ওই শ্রম-শোষণ।
ধরা যাক, এক মেলট্রেনের ড্রাইভার অথবা মালগাড়ির গার্ড; তাকে একা একা ট্রেন চালিয়ে নিয়ে যেতে হয় রাতের পর রাত, এমনকী প্যাসেঞ্জার ট্রেনের মতো জনবহুল স্টেশনে দাঁড়াবারও কোনও সুযোগ নেই মালগাড়ির – এই মানুষগুলোর কি নিজের কোনও কথা আছে? যা গানে বলা যায়!
কবি সত্যেন দত্ত তাঁর কবিতায় চলন্ত পালকির অনুষঙ্গে নিসর্গ আর চলমান গ্রামজীবনের আলেখ্য রচনা করতে চাইলেও সলিল চৌধুরী কিন্তু গানে ধরতে চাইলেন শ্রমজীবী মানুষের জীবনসত্যকে। পালকি বাহক আর রানার সেখানে তুল্যমূল্য। অন্তত গানের সুরের চলন সেই কথাই বলে। ওই মাপের একজন কুশলী সংগীতকারের মেজাজটাই এমন। আর এইসব বিখণ্ড ভাবনাসূত্র থেকে আরও কিছু চিন্তার স্রোত বেয়ে এগিয়ে চলা। সলিল চৌধুরীর এই গান কমিউনিস্ট পার্টি সংজ্ঞায়িত গণসংগ্রামের গান বলে বিবেচিত হল কি হল না – সেই গোলকধাঁধায় ঢুকে কাজ নেই। তবে এটা প্রত্যক্ষ যে একক রানার বা দলবদ্ধ পালকিবাহকদের জীবিকাগত শ্রম ও তাঁদের সামগ্রিক জীবনের খবর নেওয়ার (এবং দেওয়ারও) একরকম বহমান দায় থেকে এই গানের সৃজন। কিন্তু এই গানের পর কতকাল কেটে গেল, এমন কোনও একক শ্রমজীবী বা বিচিত্র জীবিকালগ্ন মানুষের কথা আমরা পেলাম কি বাংলা গানে?
প্রশ্নটা আনকোরা এই কথা বলব না। বিশিষ্ট সংগীত-সন্ধানী ও গবেষক-গান-ভাবুক শ্রী সুধীর চক্রবর্তী গত শতকের আশির দশকের একটি নিবন্ধে এই ভাবনা উসকে দিয়েছিলেন – বাংলা গানের নানা বিন্যাসে ট্রেড সং-এর গরহাজিরা নিয়ে। কেমন সেই ট্রেড সং? ধরা যাক, এক মেলট্রেনের ড্রাইভার অথবা মালগাড়ির গার্ড; তাকে একা একা ট্রেন চালিয়ে নিয়ে যেতে হয় রাতের পর রাত, এমনকী প্যাসেঞ্জার ট্রেনের মতো জনবহুল স্টেশনে দাঁড়াবারও কোনও সুযোগ নেই মালগাড়ির – এই মানুষগুলোর কি নিজের কোনও কথা আছে? যা গানে বলা যায়! ঠিক তেমনই অন্য এক রকম গানের কথা জানিয়েছিলেন শ্রী চক্রবর্তী। সেই গানটা এক হাসপাতালের নার্সের। পথ দুর্ঘটনায় জখম এক মানুষের কাটা পা-টা তিনি বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা ট্রে-তে, সে বড়ো বেদনার। আবার অন্য একটা ট্রে-তে তিনি তুলে এনেছিলেন সদ্যোজাত একটা গোলাপি রং-এর ফুটফুটে শিশুকে – সেটা অনাবিল আনন্দের। এইসব অভিজ্ঞতা নিয়েই তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজের গান। কই, বাংলায় এমন সব আশ্চর্য অভিজ্ঞতা-সিঞ্চিত গান আমরা তো পাইনি! অথচ অভিজ্ঞতার বিচিত্র সম্ভার কি আমাদের নেই? আছে, ঢের আছে।
যে-কোনো কারণেই হোক এইসব সুর বাংলা গানের মূল শরীরে সাংগীতিকভাবে ঢোকেনি (অবশ্য সলিল চৌধুরী কিছু কিছু চেষ্টা করেছিলেন এটা মনে রাখতে চাই)। বরং সুমনের গানের ভুবনে আমরা অনেকদিন পর খুঁজে পেয়েছিলাম কিছু বিচিত্র পেশার একক মানুষের স্বরলিপি।
ওই নিবন্ধটি যখন লেখা হচ্ছিল তখন নতুন বাংলা গানের ভগীরথ কবীর সুমন মঞ্চে আসেননি। যদিও গ্রামেগঞ্জের সংস্কৃতিতে ধান বপন করার গান, ফসল কাটার গান, নৌকো বাইবার গান বহুকাল থেকেই ছিল। ছিল আমাদের চেনা ছাদ-পেটানো শ্রমিকদের বা ডিপ টিউবওয়েলের গর্ত খুঁড়বার শ্রমিকদের সমষ্টিবদ্ধ শ্রম-উদ্দীপক সুর। কিন্তু যে-কোনো কারণেই হোক এইসব সুর বাংলা গানের মূল শরীরে সাংগীতিকভাবে ঢোকেনি (অবশ্য সলিল চৌধুরী কিছু কিছু চেষ্টা করেছিলেন এটা মনে রাখতে চাই)। বরং সুমনের গানের ভুবনে আমরা অনেকদিন পর খুঁজে পেয়েছিলাম কিছু বিচিত্র পেশার একক মানুষের স্বরলিপি। শহরে খাটতে আসা দেহাতি শ্রমিকের বাঁশির সুরে সুমন আবিষ্কার করেছিলেন ‘বাঁশুরিয়া’-কে, অমল কিশোর এক রিক্সাচালককে নিয়ে লেখা হয়েছিল ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, রাস্তায় পাথর ভেঙে চলা শ্রমজীবী প্রৌঢ়ের মধ্যে দেখেছিলেন ‘হো চি মিন’-কে, সীমান্তে প্রহরারত দুই দেশের সীমান্তরক্ষীকে তিনি চিনিয়েছিলেন ‘দেশপ্রেমের দিনমজুর’ হিসেবে, সেই সঙ্গে নিতান্ত সাধারণ ওই দুই প্রহরীকে সামনে রেখেই উচ্চারণ করেছিলেন: খিদের কোনও সীমান্ত নেই! ঠিক! কিন্তু একজন সংগীতকারের কিছু স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা আছে, তিনি একাই সব করে ফেলতে পারবে এমন আষাঢ়ে চিন্তা বাতুলতা। কবীর সুমন তাঁর মতো করে বাংলা গানের একটা নবজাগরণ ঘটিয়ে দিয়েছেন, সেই ইতিহাসটা আজ আর কেউ গা-জোয়ারি করে মুছে ফেলতে পারবেনা না।
আরও পড়ুন: সংগীতের উৎপত্তি ধ্রুপদ না শ্রম থেকে?
কিন্তু সে তো এক ব্যক্তির কথা। আমাদের কথা ব্যক্তি ছাড়িয়ে অন্য মানুষকে নিয়ে। রানারের গান দিয়ে কথা শুরু করেছিলাম, রানার-রা আজ নেই। কিন্তু বিচিত্র পেশার মানুষ ছড়িয়ে আছে আমাদের চোখের সামনে। ধরা যাক, কুড়ি-পঁচিশ বর্গফুটের ব্যাংক এটিএমে ডিউটিরত নিরাপত্তারক্ষীটির কথাই। তারও সামনে কিন্তু ‘টাকার বোঝা’, যে টাকাকে আগলানোই তার কর্তব্য – একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তার রাত কাটে! অথবা ধরা যাক, ভিআইপি নিরাপত্তায় ডিউটি করা হাইওয়েতে দাঁড়ানো পুলিশভ্যানের সাধারণ পুলিশকর্মীর কথা – অনেকেই জানেন না, কী অমানুষিক চাপে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করেন! ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি নির্বাচনী ঋতুতে জেলা বা মহকুমা সদরে বিভিন্ন দফতরে চিঠি পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক শ্রেণির কর্মীর অস্থায়ী নিয়োগ হয়। কী অপরিসীম পরিশ্রমে তাঁরা নিষ্ঠাভরে পালন করেন তাঁদের দায়িত্ব। এঁদের কারোর কথা কি আমরা কোনও গানে শুনেছি কোনওদিন? মনে পড়ে গেল, মাত্র কয়েক বছর আগে এই শহরের কোনও বিষাদগ্রস্ত এক নিরাপত্তারক্ষী হত্যা করে ফেলেছেন ব্যাংকেরই এক কর্মীকে – তাঁর কি কোনও নিজস্ব কথা ছিল? কই, তাঁকে নিয়ে তো আমরা গান বাঁধতে পারলাম না আজও!