সংগীতের উৎপত্তি ধ্রুপদ না শ্রম থেকে?

শিবপ্রিয়র কলাম : পর্ব ১

মানব সভ্যতার এক অনন্য সৃষ্টি সংগীত। প্রশ্ন হল, এই সংগীতের শেকড় কোথায় নিহিত? উচ্চাঙ্গ ধ্রুপদের গর্ভে নাকি শ্রমজীবী মানুষের শ্রমে জন্ম হয়েছে সংগীতের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ইতিহাস, নৃতত্ত্ব এবং সংগীততত্ত্বের নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে।

বেশিরভাগ গবেষকের বক্তব্য, সংগীতের জন্ম স্বাভাবিক মানবিক প্রয়োজন থেকে। এর সঙ্গে শ্রমের সম্পর্ক নিবিড়। মেসোপটেমিয়া, মিশর ও ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতিতে শ্রমসংগীতের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন মানব সভ্যতায় মানুষ যখন শ্রমের মাধ্যমে কাজ করতেন তখন ছন্দবদ্ধ শব্দের মাধ্যমে কাজের সমন্বয় সাধন করা হতো। কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝিরা যখন কাজ করতেন তাঁরা একটা ছন্দে, সুরে নিজেদের শ্রম লাঘবের উপায় বার করতেন। শিকার করার সময় শিকারীরাও ছন্দময় ধ্বনি ব্যবহার করতেন। এই ভাবেই আসত সুর, ছন্দ। এভাবেই শ্রম সংগীত বা লেবার সং বিকশিত হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতির লোকসংগীতে রূপান্তরিত হয়। বাংলার বাউল, ভাটিয়ালি, ঝুমুর, চকটা, নৌকা বাইচের গান, আফ্রিকার দাস শ্রমিকদের লেবার সং বা আমেরিকার ব্লুজ সংগীত তার উদাহরণ। এসব গান ছিল সহজ-সরল, সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষার, স্বতঃস্ফূর্ত এবং সামগ্রিক অংশগ্রহণমূলক একটা রূপ।

কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝিরা যখন কাজ করতেন তাঁরা একটা ছন্দে, সুরে নিজেদের শ্রম লাঘবের উপায় বার করতেন। শিকার করার সময় শিকারীরাও ছন্দময় ধ্বনি ব্যবহার করতেন। এই ভাবেই আসত সুর, ছন্দ। এভাবেই শ্রম সংগীত বা লেবার সং বিকশিত হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতির লোকসংগীতে রূপান্তরিত হয়।

শ্রম সংগীতের মধ্যেই সংগীতের প্রাথমিক ছন্দ ও তাল গঠিত হয়। বৈঠার চালনা, কাস্তের শব্দ, তাঁত বোনার ছন্দ, ইট ফেলার তাল—এসবই সংগীতের ছন্দ তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। শ্রম সংগীত শুধুমাত্র শ্রমিকদের একত্র করার জন্যই নয়, এটি সামাজিক সংহতি ও ঐক্যের প্রতীক। লোকসংগীত, গণসংগীত ও বিভিন্ন আঞ্চলিক গানের মধ্যে শ্রম সংগীতের ছাপ স্পষ্ট।

অন্যদিকে, গবেষকদের আর একটি অংশ মনে করেন, সংগীতের সৃষ্টি ধ্রুব (স্থায়ী) পদ বা ধ্রুপদ থেকে। এই ধ্রুবপদ ঈশ্বর আরাধনার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। এই সংগীতের মূল ভিত্তি রয়েছে নির্দিষ্ট সুর ও রাগ-রাগিণীতে, যা প্রাচীন ভারতে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সামবেদের মন্ত্র যে ত্রিমাতৃক বা ত্রি-স্বরীয় ছন্দে গীত হত তাও সেই ধ্রুপদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সামবেদে বিভিন্ন স্বরলিপির উল্লেখ পাওয়া যায়, যাকে গবেষকরা সংগীতের প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত করেন।

ধ্রুপদের মূল লক্ষ্য ছিল আধ্যাত্মিকতা ও রাজকীয় উপভোগ। ধ্রুপদ মূলত রাজসভা ও মন্দিরকেন্দ্রিক সংগীতই ছিল। সাধারণ মানুষের শ্রমজীবন থেকে তা ছিল অনেক যোজন দূরে। উঁচু সমাজে, তথাকথিত ‘এলিট’ শ্রেণির চর্চার বিষয় ছিল। সংগীত-নিয়মের বেড়াজালে, ব্যাকরণের প্রাচীরে ঘেরা ধ্রুপদ ছিল শ্রম সংগীতের থেকে অনেক অনেক আলাদা।

ধ্রুপদের চারটি প্রধান অংশ
ধ্রুপদ সংগীত গঠনগতভাবে চারটি অংশে বিভক্ত:  
১. স্থায়ী অর্থাৎ রাগের মূল অংশ 
২. অন্তরা অর্থাৎ রাগের বিস্তার 
৩. সঞ্চারী অর্থাৎ রাগের গভীর ও জটিল সংগীত উপস্থাপন
৪. আভোগ অর্থাৎ রাগের সমাপ্তি  

এই গঠনই পরবর্তী সংগীতধারাগুলোর ভিত্তি তৈরি করেছে। ধ্রুপদ সংগীত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তি গড়ে তোলে, যা পরবর্তী সময়ে খেয়াল ও অন্যান্য রাগসংগীতের ভিত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় ধ্রুপদ শিক্ষা সংগীতকে সুসংগঠিত করে তোলে।

তবে শ্রমসংগীত এবং ধ্রুপদ- দুই ক্ষেত্রেই ‘সা’ থেকে ‘র্সা’ স্বর ব্যবহার করা হয়েছে। চারটি কোমল স্বর ‘রে’, ‘গা’, ‘ধা’, ‘নি’, একটা কড়ি বা তীব্র স্বর ‘মা’ ও তিনটি অষ্টক বা অক্টেভের মধ্যে স্বচ্ছন্দে চলাচল করেছে ধ্রুপদ ও শ্রম সংগীতের সুর ও স্বর। তাই, সংগীতের উৎপত্তি শ্রম থেকে না ধ্রুপদ থেকে, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু সংগীতের মূল যে ‘স্বর’ তাতে কোনও প্রভেদ নেই বা থাকবে না।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে লোকসংগীত ও ধ্রুপদ—উভয় ধারাই সংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লোকগানের বাণী সহজাত, সরল, সহজ। অন্যদিকে ধ্রুপদ সংগীতকে কাঠামোবদ্ধ করেছে।

এই প্রসঙ্গে বলা যায় সংগীতের প্রকৃত উৎস অনেকটাই সংমিশ্রণমূলক। শুদ্ধ ‘রে’-র পাশে যেমন কোমল ‘রে’ ঠিক তেমনই ‘শ্রম’-এর পাশে ‘ধ্রুবপদ’। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতেই সংগীতের উৎপত্তি নিয়ে শ্রম ও ধ্রুপদের বিতর্কের মাঝে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হল—সংগীতের জন্ম স্বাভাবিক মানবিক প্রয়োজন থেকে। যা পরে আভিজাত্য ও কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সংগীত শ্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলেও, ধীরে ধীরে তা নিয়মতান্ত্রিক ধ্রুপদ বা শাস্ত্রীয় সংগীতে পরিণত হয়েছে।

তবে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে লোকসংগীত ও ধ্রুপদ—উভয় ধারাই সংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লোকগানের বাণী সহজাত, সরল, সহজ। অন্যদিকে ধ্রুপদ সংগীতকে কাঠামোবদ্ধ করেছে। শাস্ত্রীয় ভিত্তি প্রদান করেছে এবং উচ্চতর স্তরে উন্নীত করেছে। তবে ধ্রুপদের বাণী দুর্বোদ্ধ, তারানায় নিবদ্ধ। তাই বলা ভালো, সংগীতের প্রকৃত উৎস একক কোনও বিষয় নয়, বরং এটি শ্রম ও আভিজাত্যের সম্মেলক প্রয়াসেরই ফল। সংগীত সৃষ্টিতে ধ্রুবপদ ও শ্রম একে অপরের পরিপূরক। মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে বিভিন্ন আকারে গড়ে উঠেছে। তাই সংগীতের শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের শ্রমজীবী মানুষের গান এবং ধ্রুপদের শাস্ত্রীয় কাঠামোর উভয় দিককে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সংগীত সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের চিন্তাভাবনা এখনও প্রাসঙ্গিক। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নীতিশাস্ত্রের উপর সংগীতের প্রভাব সম্পর্কে গভীরভাবে আলোকপাত করেন, এই প্রসঙ্গে চরিত্র এবং সদ্গুণ গঠনের ক্ষমতা তিনি তুলে ধরেন। এটা লক্ষণীয় যে, অ্যারিস্টটলের কাছে সংগীত শুধু বিনোদন ছিল না। তিনি মনে করতেন, সংগীত হচ্ছে ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিকাশ এবং মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সংগীতকে মানুষের আবেগ জাগিয়ে তোলার এবং চরিত্র গঠনে প্রভাবশালী বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন তিনি। সংগীত মানুষের মনে এমন একটি অবস্থা তৈরি করে, যেখানে মানুষের আবেগ যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যযুক্ত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, “সংগীত হল শিল্পের সবচেয়ে বিশুদ্ধতম রূপ এবং তাই সৌন্দর্যের সবচেয়ে সরাসরি প্রকাশ, যার একটি রূপ এবং চেতনা এক, সরল এবং বহিরাগত কোনও কিছুর সাথে কম জড়িত।”

________________ 
বঙ্গদর্শন.কম-এ শুরু হয়েছে সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলাম। প্রকাশিত হচ্ছে প্রতি বুধবার।

Developed by DXDasia