
১৯২৬ সালে রাধাবিনোদ রায় দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন
বাবাইশে শ্রাবণ বাঙালির বিষাদের দিন। আমেরিকা থেকে আমতলা, কলম্বো থেকে কাঁথি, বাঙালি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, এই দিনে তার মনের গোপন কুঠুরিতে এক রাশ দুঃখ, বেদনা এসে জমা হয়। কারণ, দিনটিতে দিকশূন্যপুরের ঠিকানায় পাড়ি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গুরুদেবের শরীর আগে থেকেই অসুস্থ ছিল, প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিতেন না। শেষ জীবনে রোগশয্যায় যে ক’জন তাঁর সঙ্গে থাকতেন, তাঁদের সঙ্গে রীতিমতো হাসি-ঠাট্টা করতেন। নীলরতন সরকার, বিধানচন্দ্র রায়ের মতো চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছাড়েন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার সময় নতুন পাওয়ার হাউস দেখে তিনি নাতনি নন্দিতাকে মজা করে বলেছিলেন, “পুরোনো আলো চললো, আসবে বুঝি এবার তোদের নতুন আলো।” প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ‘রবীন্দ্রজীবনকথা’তে লিখেছেন, “যাবার সময় চোখে রুমাল দিচ্ছেন (রবীন্দ্রনাথ) দেখা গেল।” প্রভাতকুমার তাঁর লেখায় সঙ্গত প্রশ্নই করেছেন, “কবি কি বুঝতে পেরেছিলেন এই তাঁর শেষযাত্রা (শান্তিনিকেতন থেকে)?”
১০০ বছর পুরোনো দোকানটির বর্তমান অবস্থা
কলকাতার ২৭৮, রবীন্দ্র সরণিতে আজও দাঁড়িয়ে এই প্রাচীন ওষুধের দোকান। গণেশ টকিজ মোড়ের অদূরেই দোকান। প্রকাণ্ড এক বাড়ির নিচতলায় পেল্লায় সেই ওষুধের দোকান। কাঠের শোকেসে থরে থরে সাজানো ওষুধ। দোকানে গিয়ে দাঁড়ালে একুশ শতকেও দিব্যি ফেলে আসা সময়ের হাতছানি অনুভব করা যায়।।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে আনা হয় কবিকে। ৩০ জুলাই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অস্ত্রোপচার হয়। ঠাকুরবাড়ির পাথরের ঘরের পূর্বদিকের বারান্দায় পাতা হয়েছিল অপারেশন টেবিল। অস্ত্রোপচার করেছিলেন বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ডাক্তারিশাস্ত্রের পরিভাষায় সেই অপারেশনের নাম ‘সুপ্রা পিউবিক সিস্টোস্কপি’। ২৫ মিনিটের অপারেশন সফল হলেও কবির শরীরের যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। বিধানচন্দ্র রায়, ইন্দুভূষণ বসু, ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাতে নীলরতন সরকারের মত ছিল না। কবির প্রিয় নীলু আশঙ্কা করেছিলেন, অস্ত্রোপচারের ধকল হয়তো কবির জীর্ণ শরীর নিতে পারবে না। কিন্তু অস্ত্রোপচার হল। খবর পেয়ে নীলরতন ছুটে গিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোতে। তখন অচৈতন্য অবস্থায় বিছানায় শুয়ে আছেন রবি ঠাকুর। নীলরতন বুঝেছিলেন আর কিছুই করার নেই। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের লেখায় এর বর্ণনা পাওয়া যায়, “তখন আর সময় নেই। সব্যসাচীর হাত থেকে তখন গাণ্ডীব পড়েছে খসে। দুই চোখ তাঁর (নীলরতন সরকার) জলে ভরে এল।”
৩০ জুলাই থেকে ৭ অগাস্ট অবধি চিকিৎসা চলল। কবির শেষ চিকিৎসার সাক্ষী ছিল কলকাতার শতাব্দী প্রাচীন এক ঔষধের দোকান। দোকানটির নাম: মহাত্মা অ্যান্ড কোং (Mahatma & Co.), নামের সঙ্গেই লেখা কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস। কলকাতার ২৭৮, রবীন্দ্র সরণিতে আজও দাঁড়িয়ে এই প্রাচীন ওষুধের দোকান। গণেশ টকিজ মোড়ের অদূরেই দোকান। প্রকাণ্ড এক বাড়ির নিচতলায় পেল্লায় সেই ওষুধের দোকান। কাঠের শোকেসে থরে থরে সাজানো ওষুধ। দোকানে গিয়ে দাঁড়ালে একুশ শতকেও দিব্যি ফেলে আসা সময়ের হাতছানি অনুভব করা যায়।
রোগশয্যায় রবীন্দ্রনাথ
এই দোকান থেকেই রবীন্দ্রনাথের শেষ চিকিৎসার ওষুধপত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। আজও কবির শেষ প্রেসক্রিপশনের রসিদ সযত্নে রেখে দিয়েছেন তাঁরা। ১৯২৬ সালে রাধাবিনোদ রায় দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। রাধাবিনোদ রায়ের পুত্র, দোকানের বর্তমান কর্ণধার শম্ভুনাথ রায় জানাচ্ছিলেন, তখন এলাকায় ওষুধের দোকান বলতে কেবল তাঁদের। বিধানচন্দ্র রায়, নলিন চ্যাটার্জি, নীলরতন সরকারের মতো কিংবদন্তি চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন আসতো তাঁদের দোকানে। তদানিন্তন সময়ের খ্যাতনামা চিকিৎসকেরা মহাত্মা অ্যান্ড কোং-এর নাম ‘সাজেস্ট’ করতেন। রাধাবিনোদ ছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ভক্ত। তাই দোকানের নামও তাঁর নামেই রাখেন।
সেই ঐতিহাসিক প্রেসক্রিপশন (ঋণ: সূর্যাস্তের আগে রবীন্দ্রনাথ, অমিতাভ চৌধুরী)
রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষলগ্নে ডাক্তার ডিএন চ্যাটার্জি এবং ডাক্তার জেপি সরকার-র প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী, কবির জন্য ওষুধ কিনে আনা হয়েছিল মহাত্মা অ্যান্ড কোং থেকে। বেশ কয়েক দফায় ওষুধ এসেছিল। ওষুধ বলতে মিক্সচার। চিকিৎসকদের নির্দেশ মতো যা বানিয়ে দেন রাধাবিনোদ রায়। তিনি নিজে একজন দক্ষ কেমিস্ট ছিলেন। কবির জন্য ওষুধের মিশ্রণ বানিয়ে দেওয়ায় বিবরণ-সহ রসিদ যত্নে, আগলে রেখেছিলেন রাধাবিনোদ। আজও সেই ইতিহাস আগলাচ্ছেন তাঁর পুত্র শম্ভুনাথ রায়। এই প্রেসক্রিপশন প্রসঙ্গে তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন, “এই বিষয়টা খুব ভালো লাগে। নিজেদের ঐতিহ্যের অংশ মনে হয়। পরিচয় দিতেও ভালো লাগে। তৃপ্তিদায়ক। এটা বড়ো করে, নতুন করে বাঁধিয়ে রাখার পরিকল্পনাও আছে। অনেকে আসেন এসব দেখতে… আমার খুব ভালো লাগে।”
দোকানের বর্তমান কর্ণধার শম্ভুনাথ রায়
এই প্রেসক্রিপশন প্রসঙ্গে শম্ভুনাথ রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন, “এই বিষয়টা খুব ভালো লাগে। নিজেদের ঐতিহ্যের অংশ মনে হয়। পরিচয় দিতেও ভালো লাগে। তৃপ্তিদায়ক। এটা বড়ো করে, নতুন করে বাঁধিয়ে রাখার পরিকল্পনাও আছে।
কবির মৃত্যুর পাঁচদিন আগে ২ অগাস্ট মিক্সচার বানানোর জন্য জেপি সরকার প্রেসক্রিপশন করেছিলেন। মিক্সচারের জন্য পিল সাইট্রাস, সোডি বাইকার্ব, পট এসিডাস, সিরাপ রোজ এবং এজন এড, মোট পাঁচটি ওষুধের কথা লেখা হয়েছিল। শেষে লেখা ছিল, ‘মিক্সচার ফর ওয়ান ডোজ’। তলায় লেখা ‘সেন্ড এইট সাচ ওয়ান ডোজ এভরি ফোর আওয়ার্স’। সঙ্গে লেখা ছিল ‘ফর আর এন টেগোর’। মৃত্যুর তিনদিন আগে, ৪ অগাস্ট আর একটি প্রেসক্রিপশন করেছিলেন ডিএন চট্টোপাধ্যায়। তাতে লেখা ছিল ‘ফর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’, হাইড্রোগ ৮ গ্রেন, মেনথল ৮ গ্রেন, একজল বেলাডোনা ৮ গ্রেন, একজল নুসিঞ্জ ভোম ৮ গ্রেন, একজল জেনটিন কিউ এস গ্রেন। এস টি পিল্লুলা ফর ডোজ ওনলি সেন্ড এইট সাচ। টু বি টেকেন অ্যাজ ডিরেকটেড। দুদিনই বেশ কয়েকবার ‘মহাত্মা অ্যান্ড কোং’ থেকে ওষুধ কেনা হয়েছিল। (তথ্যঋণ: সূর্যাস্তের আগে রবীন্দ্রনাথ, অমিতাভ চৌধুরী) তবু শেষ রক্ষা হয়নি।
ঐতিহাসিক প্রেসক্রিপশন
৭ অগাস্ট, ১৯৪১ অর্থাৎ মৃত্যুর দিন সকালেও বিধানচন্দ্র রায়, ললিত বন্দ্যোপাধ্যায় এসে দেখে গিয়েছিলেন কবিগুরুকে। বিষণ্ন মনে বিদায় নিয়েছিলেন প্রত্যেকে, তাঁরা জানতেন কী হতে চলেছে! ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তখন জোড়াসাঁকোয় বসে সকলে… সত্যি শোনার অপেক্ষায়। কলকাতা বেতারকেন্দ্রের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর কবির স্বাস্থ্যের খবর জানানো হবে বেতারে। যাতে রবীন্দ্র-অনুরাগী শ্রোতাদের দুশ্চিন্তা দূর হয়। জোড়াসাঁকো থেকে খবর সেই মতো বেতার অফিসে পৌঁছাতে থাকল। সম্প্রচার চলল। ঘড়িতে ঠিক দুপুর ১২টা বেজে ১৩ মিনিট। খবর পৌঁছাল বেতারকেন্দ্রে, চলে গিয়েছেন কবি। বেতারকেন্দ্র ঠিক করল, কবির অন্তিম যাত্রার ধারাবিবরণী শোনানো হবে। এই প্রথমবারের জন্য কলকাতায় কারও শবযাত্রার ধারাবিবরণী রেডিওতে শোনা গেল। পরিকল্পনার নেপথ্য ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ধারাবিবরণীর প্রথম দিকের কথাগুলো ছিল, “ওপারে দূরের ওই নীলাকাশে অস্তগামী সূর্য শেষ বিদায়ের ক্ষণে পশ্চিম দিগন্তে ছড়িয়ে দিল অগ্নিবর্ণ রক্তিম আভা, আর এপারে এই পৃথিবীর বুকে বহ্নিমান চিতার লেলিহান অগ্নিশিখায় পঞ্চভূতে বিলীন হল এক মহাপ্রাণের পূত-পবিত্র শরীর। রবি গেল অস্তাচলে…।” বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে।’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কবিগুরুর শেষ সময়ের স্মৃতির সাক্ষী হয়ে রয়েছে জোড়াসাঁকোর ২৭৮, রবীন্দ্র সরণির ‘মহাত্মা অ্যান্ড কোং’। দোকানের সামনে থাকা নিথর ট্রাম লাইনগুলোর মতো মহাত্মা অ্যান্ড কোংও কলকাতার ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
