৩০ জুলাই রচনা করেছিলেন জীবনের শেষ কবিতা— ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি’
১৯৪১ এর শ্রাবণ মাসের দারুণ দিন— বাইশে শ্রাবণ। দিকে দিকে স্তম্ভিত হয়ে আছে কান্নার মতো মেঘ। আপার চিৎপুর রোড, বিবেকানন্দ রোড, চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, কলুতলা স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট, গ্রে স্ট্রিট, বিকে পাল এভিনিউ ছুঁয়ে নিমতলা — সেদিন শুধুই জনসমুদ্র। চোখের জলের মতোই শহরের কানাগলিতেও ঝরে পড়ছে ফুলের তোড়া, ফুলের মালা। মনখারাপের কণার মতো ভেসে আসছে খই আর গোলাপ জল। লক্ষ লোকের সমাবেশ। মানুষ তখন যেন বেগবতী নদী। এগিয়ে চলেছে শোকযাত্রা। কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত কবিতার খাতায় আবেগের সুতোর ফোঁড় দিচ্ছেন —
“দূর হতে কানে আসছে
বিপুল পরাজয়ের তুমুল জয়ধ্বনি!
সহসা দেখা গেল
মরণের কুসুম কেতন জয়রথ!
কি বিচিত্র শোভা তোমার
কি বিচিত্র সাজ!”
শোকের তীব্রতাকে ব্যঙ্গ করেই দিকে দিকে গুমোট মেঘের মতো গর্জন করছে, ‘রবীন্দ্রনাথ কি জয়’ অথবা ‘বন্দেমাতরম্’-এর মতো পরস্পর বিপরীত শব্দবন্ধ। সূর্যের প্রবল দাবদাহে তপ্ত হয়ে ওঠা মানুষের মিছিলে একমাত্র নির্লিপ্ত যে পুরুষ, তিনি চির নিদ্রার ঘোরে। তিনিই রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যু তাঁর কাছে শ্যামসমান।
জীবনের সূচনালগ্ন থেকে যে মানুষটি মৃত্যু আর জীবনের দ্বৈরথ দেখে আসছেন, তাঁর নিজের মৃত্যু হয়তো একরকম স্বস্তি। নিমতলা শ্মশান ঘাটে বিকেল পাঁচটা চল্লিশে যে শিল্পীর নশ্বর শরীর পৌঁছলো এবং কয়েক ঘণ্টায় অবিনশ্বর হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ব্রহ্মাণ্ডে, মৃত্যু তাঁর কাছে নতজানু হয়ে বসে হয়তো। কারণ তিনি নিজে মৃত্যুঞ্জয়।
জনতার ভিড়
হেমন্তবালাদেবী একবার পত্রালাপে জানতে চেয়েছিলেন, রবি ঠাকুর মৃত্যুকে ভয় করেন কীনা। তখন রবীন্দ্রনাথ কথায় কথায় ঘুমের আবেশ আর মৃত্যুর ঘোরকে এক করে দেখিয়েছিলেন। ঘুম না হলে যেমন জাগরণটাই পীড়িত হয়ে ওঠে, তেমনি মৃত্যু যদি না আসত তাহলে নিরবচ্ছিন্ন প্রাণটাকে নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি করতে হত। জীবনের সঙ্গে যেটা অবর্জনীয়ভাবে যুক্ত, তাকে সহজ বিশ্বাসে গ্রহণ করাই উচিত— এমনটাই প্রবীণ বয়সে ভাবতেন রবীন্দ্রনাথ। তাছাড়া জীবনকে সত্যরূপে দেখতে চাইলে মৃত্যুর জানালা দিয়েই দেখা উচিত। অমিয় চক্রবর্তীকে একথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যুকে জীবনের প্রেমিক বর হিসেবে কল্পনা করতে পেরেছিলেন একমাত্র রবীন্দ্রনাথই। জীবন মৃত্যুতে বিবাহের গভীর বন্ধনের কথা কবি ছাড়া আর কেই বা বলবেন!
আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথ, প্ল্যানচেট এবং ‘শমীর পৃথিবী’
১৯৩৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই ইরিসিপ্ল্যাস রোগের আক্রমণে পঞ্চাশ ঘণ্টা অজ্ঞান হয়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথ। বারান্দায় বসে মুখে মুখে দীর্ঘ এক গল্প শোনাচ্ছিলেন। তখন বাদলা হাওয়া গায়ে লাগায় ঘরে গিয়ে বসেন। তারপরেই জ্ঞান চলে যায়। সে যাত্রা নীলরতন সরকার এবং তাঁর নেতৃত্বে একদল ডাক্তার এসে তাঁকে সারিয়ে তোলেন। মৃত্যুগুহা থেকে জীবনের আলোয় ফিরে আসেন তিনি। শারীরিক সব কষ্টকে উপেক্ষা করেই মেতে থাকতেন সৃজনে। লিখেছেন, ‘আসন্ন মৃত্যুর ছায়া যেদিন করেছি অনুভব/ সেদিন ভয়ের হাতে হয়নি দুর্বল পরাভব।’ ১৯৪০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, রবীন্দ্রনাথ তখন কালিম্পঙে। আবার জ্ঞান হারালেন। দার্জিলিঙের এক ইংরেজ সিভিল সার্জেন তখনই অপারেশন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে কলকাতা থেকে যাওয়া এক চিকিৎসকের দল পরম যত্নে তাঁকে নিয়ে এলেন কলকাতায়। এরপর আর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা হল না রবীন্দ্রনাথের। এর মধ্যে এল এক আশ্চর্য ভাইফোঁটার দিন। বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই রবীন্দ্রনাথের। ছোটোদিদি বর্ণকুমারী শীর্ণ হাতের আঙুল ছুঁইয়ে চন্দনের ফোঁটা দিলেন ভাইয়ের কপালে। রবি ঠাকুরের এই শেষ ভাইফোঁটার ছবি অক্ষরে গেঁথে রেখেছেন রানি চন্দ। এবার তাঁকে শান্তিনিকেতনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রাখা হয় জাপানী ঘরে। শরীরে অসীম রোগযন্ত্রণা, অথচ দিব্যি লিখছেন খুশির ছড়া— ‘গলদা চিঙড়ি তিঙড়ি মিংড়ি।’ প্রকাশিত হয়েছে ‘রোগশয্যায়’, ‘আরোগ্য’, জন্মদিনে’— কাব্য তিনটি। ‘তিনসঙ্গী’ আর ‘গল্পসল্প’ প্রকাশিত হয়েছে অভিনব কথন ভঙ্গি নিয়ে। সাতই পৌষের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পেরে মনখারাপ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তবে সাতই পৌষের ভাষণ কবির মুখ থেকে শুনে লিখে রেখেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। এত কাজের মধ্যেও রবি ঠাকুরের মন প্রস্তুতি নিচ্ছিল অনেক অনেক দূরের দেশে যাওয়ার জন্য। হালকা সুরে বলছেন,
“সময় হয়ে এল এবার
স্টেজের বাঁধন খুলে দেবার,
নেবে আসছে আঁধার যবনিকা।”
মারা যাবার আগে রবীন্দ্রনাথের শেষ ছবি
কবি বুদ্ধদেব বসু দেখতে গিয়েছিলেন অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে। সেদিন এক ঘণ্টা অনর্গল কথা বলে গিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু পরে লিখেছিলেন, ‘এঁর অসুখ! ভাবা যায় না।’ রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর কথাবার্তার দুটি ফসল— ‘সাহিত্যে ঐতিহাসিকতা’ আর ‘সাহিত্যের উৎস’ নামের দুটি প্রবন্ধ। কাজের স্রোতে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে রবি ঠাকুরের অসুখ। অপারেশনে মোটেও রাজি ছিলেন না তিনি। রসিকতার সুরে বলেছিলেন, “আমি কবি। আমার ইচ্ছে কবির মতো যেতে—সহজে এই পৃথিবী থেকে ঝরে পড়তে চাই শুকনো পাতার মতো। যাবার আগে আমাকে নিয়ে টানাছেঁড়া কেন? মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছেঁড়ি করা। দেহ অক্ষতভাবেই তাকে ফিরিয়ে দেওয়াই ভাল।”
তবে শেষ চেষ্টা তো করতেই হত ডাক্তারদের। তাই রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতন ছেড়ে শেষযাত্রা করতেই হল কলকাতার দিকে। ২৭ জুলাই রানি চন্দকে মুখে মুখে বলে চলেছেন কবিতা—
“প্রথমদিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আবির্ভাবে—
কে তুমি!
মেলেনি উত্তর——”
শুনতে চাইছেন ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’ কবিতা। মন্ত্র বলছেন কবিতার শব্দগুলিকে। ২৯ জুলাইয়ের কবিতার মধ্যেও এসে পড়েছে মৃত্যুর ছায়া। —
“দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে
এসেছে আমার দ্বারে—!”
৩০ জুলাই গভীর উপলব্ধি নিয়ে রচনা করেছিলেন জীবনের শেষ কবিতা— ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী।’ কবিতা রচনার পর অনেক কষ্ট সত্ত্বেও প্রতিমাদেবীর জন্য চিঠি লেখালেন। নিচে কাঁপা হাতে করলেন জীবনের শেষ স্বাক্ষর। তারপর অপারেশন, অসুখের ঘোর, যন্ত্রণা! তারপর যখন আকাশে রাখি পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে, তখন অবস্থা আয়ত্তের মধ্যে আর থাকে না। ৭ আগস্ট, ২২ শ্রাবণ ভোরবেলা দলে দলে ভিড় জমাচ্ছেন ভক্তরা। চাঁপা ফুলের অঞ্জলি দেওয়া হয়েছে পায়ে। গান ভেসে আসছে— ‘কে যায় অমৃতধামযাত্রী’। কবির কানের কাছে উচ্চারিত হয়ে চলেছে বীজমন্ত্র — ‘শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্’। তারপর ঠিক দুপুর বারোটা দশ মিনিটে কলকাতা শহরে সেদিন হঠাৎ যেন সূর্যাস্ত হয়ে যায়।
রবি ঠাকুর অমৃতলোকে যাত্রা করবেন। তাই সাদা বেনারসি জোড় পরিয়ে রাজবেশে সাজানো হল। কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, গলা থেকে ঝোলানো পাট করা চাদর, গোড়ে মালা, সাদা পদ্ম, রজনীগন্ধা! যে পালঙ্কে চিরনিদ্রিত রইলেন তিনি, সেটিও সকালে নকশা কেটে তৈরি করিয়েছিলেন নন্দলাল বসু।
তারপর বিহ্বল শোকার্ত মানুষের উন্মাদনা আর শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্যথার আগুনের উত্তাপ সকলের প্রিয় রবি ঠাকুর অনুভব করেছিলেন কীনা জানা নেই। অমৃতলোকের যাত্রী রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতেই ছিল অমৃতের ভাণ্ড, তাঁর আশ্চর্য সৃষ্টি।
শেষ নাহি যার, শেষ কথা কে বলবে?
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথঃ পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
বাইশে শ্রাবণঃ রানি চন্দ
গুরুদেবঃ রানি চন্দ