রবীন্দ্রনাথ, প্ল্যানচেট এবং ‘শমীর পৃথিবী’

সব আত্মাদের কাছে আদরের শমীর খোঁজ নিতেন রবীন্দ্রনাথ

শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট্ট জীবন! কিন্তু সকলের আদর কেড়ে মনের ভিতর নিজস্ব আসন তৈরি করেছিল অনায়াসে। মায়ের আদর বুঝতে না বুঝতেই হারিয়ে গেল। শমীও যে ওই আকাশপারের রূপকথা খুঁজতে একই পথের পথিক হবে, তাই বা কে জানত? লোকে বলত, শমীর সঙ্গেই রবি ঠাকুরের সবচেয়ে মিল ছিল। বিসর্জনের মতো শক্ত নাটক মুখস্থ বলত শমী। বাবার টেবিলে বসে তাঁর মতো লেখক হওয়ার অভিনয় করত। কিন্তু বাবার মতো বড়ো হওয়া তার হয়নি। ১৯০৭ সালের ৭ অগ্রহায়ণ হঠাৎ করেই শমী হারিয়ে যায় চিরতরে। বছর পাঁচেক আগে একই দিনে সে মাতৃহারা হয়েছিল। আজকের কথকতার বিষয় শমীন্দ্রনাথের জীবনকাহিনি নয়। মরণের ওপার থেকে তাকে ডাক পাঠানোর গল্প বলব আজ।

মৈত্রেয়ী দেবীকে শমী প্রসঙ্গে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, “আমার জীবনে যতবার মৃত্যু এসেছে, যখন দেখেছি কোনো আশাই নেই, তখন আমি প্রাণপণে সমস্ত শক্তি একত্র করে মনে করেছি, তোমাকে আমি ছেড়ে দিলাম, যাও তুমি তোমার নির্দিষ্ট পথে। নিজের সন্তানকেও আঁকড়ে রাখতে চাইনি। যেতে যখন হবেই তখন যেন আমার আসক্তি আমার বেদনা তাকে মর্ত্যের সঙ্গে বেঁধে না রাখে।” একথা বলেছিলেন বটে রবি ঠাকুর! নিজের শোকের গভীরতা নিজেই জানতেন না বলে। কিন্তু সকলেরই মনের গভীরতম বেদনার ঘর থাকে। সে ঘরের পুরোনো মরচে পড়া তালা খুললে, হুড়মুড় করে বাইরে আসতে পারে প্রাচীন স্মৃতি, জমাট বাঁধা বিষাদ, প্রিয়জনকে আঁকড়ে ধরে থাকা আবেগপ্রবণ নিজেরই ছায়া। মানুষ হয়তো সেই মগ্নচেতনের সত্তাকে নিজেই চেনে না। রবীন্দ্রনাথও নিজেকে চেনেননি। হয়তো তাই দুঃখ আঘাত মৌন হয়ে সহ্য করতে থাকা রবীন্দ্রনাথ ১৯২৯ সালের পর মোহিতচন্দ্র সেনের কন্যা বুলাকে মিডিয়াম করে একের পর এক ডাক পাঠাতে থাকেন হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের। এ মনোবিকার না বিস্ময় — অনভিজ্ঞ আমরা তা জানি না।

নতুন বৌঠানের পর যে প্রিয়জনকে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশিবার ডাক পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সে হল শমীন্দ্রনাথ। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে আটটি খাতায় সেইসব প্ল্যানচেটের প্রসঙ্গ লেখা আছে। তথাকথিত আত্মাদের উত্তর লেখা আছে পেন্সিলে। অন্য সব আত্মাদের কাছে আদরের ছোটোছেলে শমীর খোঁজ নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। বড়ো মেয়ে মাধুরীলতার আত্মাকে ডেকে বলেছেন, ‘চঞ্চল’ শমীকে সে যেন কাছে কাছে রাখে। শমীর আত্মা এলে তার কাছে জানতে চেয়েছেন, লৌকিক পৃথিবীর মায়াভরা স্মৃতি আজও তাঁর মনে আছে কীনা। কথায় কথায় মূর্ত করে তুলেছেন শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন, পরিজন, পরিবার সকলের কথা। সে থাকলে রথীদাদার স্ত্রী প্রতিমা তাকে কত্ত ভালোবাসত, সেকথাও বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। শমীর আত্মা রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতাকে অবলীলায় ‘বিশ্রী’ বলেছে। তবে বাবার কবিকৃতির উপর অগাধ আস্থাও দেখিয়েছে সে। সেই অপরিণত আত্মার কাছেই রবীন্দ্রনাথ শোনেন, সে পরলোকে একটা নতুন পৃথিবী গড়ে তুলেছে। নাম দিয়েছে ‘শমীর পৃথিবী’। রবীন্দ্রনাথ যেন ‘শমীর পৃথিবী’ নিয়ে কিছু লেখেন— এই ছিল শমীন্দ্রনাথের আবদার। রবি ঠাকুরেরও কৌতূহলের শেষ ছিল না এই নিয়ে। প্ল্যানচেটে বসে সব আত্মাদের কাছে খোঁজ নিতেন শমীর পৃথিবী নিয়ে। যেন প্রবাসী সন্তানের খোঁজ নিচ্ছেন অসহায় ব্যাকুল পিতা। পরলোকে শমী ছিল ব্যস্তসমস্ত। সবসময় তার কাজ। মিডিয়মের লেখা অনুসারে পরলোকেও শমী বাবাকে নিয়ে বিভোর।কোনো এক ৬ নভেম্বর সকালে শমী এসেছিল। বলেছিল, পৃথিবীর কথা কখনো কখনো তার মনে পড়ে। আবার কখনো ভুলে যায়। শান্তিনিকেতন, সহপাঠীদের কথা বলতে থাকে শমীর আত্মা। জ্বর হলে রবি ঠাকুর বসে কবিতা শোনাতেন, একথা তার মনে হয় ছবি দেওয়া গল্পের মতো করে। একবার জোড়াসাঁকোয় প্ল্যানচেটের আসরে এসেছিল শমী। শমী নাকি নিজের লেখা দিয়ে একটা জগৎ তৈরি করেছে। রবি ঠাকুর ঘোরের মধ্যে বলেছেন, ‘আমিও যখন তোদের কাছে যাব, আমারও নতুন পৃথিবী তৈরি করার শখ হচ্ছে।’ রবীন্দ্রনাথ শমীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মৃত্যুর পর প্রথম কে তোকে আহ্বান করে নিলেন?’ শমীর আত্মা বলেছিল, ‘আমি একটা নদীর ধারে দাঁড়িয়েছিলুম, কে একজন আমার হাত ধরে নিয়ে গেলেন, ভালো মনে পড়ে না।’ শমীর পরলোকে আরেকটি শান্তিনিকেতন গড়ার সাধ ছিল। এই প্ল্যানচেটে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বসেছিলেন তাঁর ছোটো মেয়ে মীরা। শমীর কথায় রবিঠাকুরকে মীরা ছুঁয়ে থাকলেই সে মীরাকেও স্পষ্ট দেখবে। শমীর হাওয়ার শরীর ঘুরে ঘুরে আসে। ভারি ভারি প্রশ্ন নিয়ে— ‘দেহ বড়ো না মন বড়ো। ছবি বড়ো না ছায়া বড়ো। মোহ বড়ো না সত্য বড়ো। সুখ বড়ো না আনন্দ বড়ো। ভাব বড়ো না ভাষা বড়ো।’ রবি ঠাকুর নাজেহাল হন। বলেন, ‘শমী। তুই ভারি দুষ্টু।’ শমীর বাতাসের শরীর জানান দেয়, বাবার ভাবনাতেই তার আগ্রহ। গভীর কথাও বলে, ‘কাজের মানুষদের দুঃখ নেই।’ দুঃখ যত ভাবুক মানুষদের। শমীকে ছবি আঁকতে বললে সে উধাও হয়ে যায়। তার নাকি অনেক কাজ। রবীন্দ্রনাথ গর্বিত বাবার মতো প্ল্যানচেটে নিয়ে আসেন নন্দলাল বসুকে। ছেলের আঁকা দেখাতে মন চায় যে! ছেলের সঙ্গে ঘুমাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোনোভাবেই দুজনের মধ্যের আড়াল ঘোচে না। পেন্সিল ছুঁয়ে বসে থাকেন বিশ্বকবি। নাকি সন্তানহারা বাবা? শমীর আত্মা এসে এই বুঝি লিখল কিছু! বাবা ছেলের আলোচনা হয়, ছেলের বিদেহী আত্মা বলে, ‘কেন নাম রাখোনি স্বপ্নকুমার? আমার কাজে ছন্দ আছে।’ রবি ঠাকুর উদাস হয়ে কত কথা বলেন। শমীর সঙ্গে শিলাইদহের নদীর চরে বসে গল্প করতে ইচ্ছে করে, সে থাকলে রথীর স্ত্রী প্রতিমা তাকে স্নেহ করত খুব, শমী হাসে কীনা —এইসব! তারপর বলেন, ‘তোর পৃথিবী তৈরি হচ্ছে? তাতে গিয়ে আমি থাকতে পারব?’ শমীর আত্মা সাদর আহ্বান জানায়। বলে, ‘মা আসবে না বলেছে।’ রবিঠাকুর মৃণালিনীর আত্মাকেও ডেকে দিতে বলেন। শমী হাওয়ার মতো মিলিয়ে যেতে যেতে বলে, ‘আগে আমার কথা ভাবো।’ উদাস হয়ে প্ল্যানচেটের পেন্সিল ছুঁয়ে থাকা কবি বাস্তবে ফিরতে চান না। প্রিয় মানুষগুলোই তো ওইপারে। তাঁর তো ঘরেও নয়, পারেও নয় দশা। অবাস্তবকে আঁকড়ে একটা সময় তিনি শুরু করেছিলেন  হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের তীব্র তল্লাশ। প্ল্যানচেট আদৌ সার্থকভাবে হয়েছিল? নাকি এসবই রবিঠাকুরের আত্মকথন ও নিজের মগ্নচেতনের আরোপিত সংলাপ — নিশ্চিতভাবে বলা যায় না কিছুই। কারণ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আমার শুধু মনে হয় শোকে স্থির থাকতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। তিনি স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন। আসলে আমরা কেউই সুখ-দুঃখে অবিচলিত থাকতে পারি না। কষ্ট লুকানোর চেষ্টা করে যাই মাত্র।

গ্রন্থঋণঃ

রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা, অমিতাভ চৌধুরী

Developed by DXDasia