
সেই বাড়ির ছবি আঁকা বসার ঘরটিই ছিল তাঁর একমাত্র শান্তির আশ্রয়
রবি ঠাকুরের তিন কন্যার মধ্যে কনিষ্ঠটি কেবল দীর্ঘায়ু। মীরা ওরফে অতসীবালার দীর্ঘ জীবনের গল্প কিন্তু বিষাদময়। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে। যেমন রূপ, তেমনি গুণ। অথচ দীর্ঘ জীবন প্রতিপদে যেন ঠকিয়ে গিয়েছে তাঁকে। অন্য দুই মেয়ের মৃত্যু যেমন কাঁদিয়েছে রবীন্দ্রনাথকে, মীরার জীবনও তাঁকে কম কাঁদায়নি। আজকের কথকতার কেন্দ্রে রইলেন মীরাদেবী, রবীন্দ্রনাথের ছোটো মেয়ে।
মীরার দাম্পত্যজীবনের কঠিন পর্বে রবীন্দ্রনাথ রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, “ওর জীবনের প্রথম দণ্ড তো আমি ওকে দিয়েচি— ভালো করে না ভেবে বুঝে আমিই ওর বিয়ে দিয়েছি। –বিয়ের রাত্রে মীরা যখন নাবার ঘরে ঢুকছিল তখন একটা গোখরো সাপ ফস্ করে ফণা ধরে উঠেছিল— আজ আমার মনে হয় সে সাপ যদি ওকে কাটত তাহলে ও পরিত্রাণ পেত।” কত বেদনায় স্নেহময় বাবার এই উচ্চারণ! অথচ জীবনের শুরুতে তো সবটাই সাজানো, সবটাই সুন্দর ছিল। দাদা-দিদিদের সঙ্গে তাসের দুর্গ ও পুতুল বানিয়ে চলত ছোট্ট মীরার খেলা। ইংরেজ শিক্ষক লরেন্স এসে পড়িয়ে যাচ্ছেন মীরাকে। ছবি আঁকার হাতে খড়ি হচ্ছে শান্তিনিকেতন আশ্রমে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু খুব স্নেহ করতেন মীরাকে। নিজের ভাগ্নে অরবিন্দমোহনের ভাবী স্ত্রী হিসেবে মীরাকে কল্পনা করে মস্করাও করেছেন। রবীন্দ্রনাথ এই মস্করায় সামিল হলেও বাস্তবজীবনে মেয়ের অসবর্ণ বিবাহ দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। মৃণালিনী জীবিত থাকলে মীরার জীবন কেমন হত জানি না, কিন্তু মাতৃহারা মেয়েটিকে শৈশবেই পাত্রস্থ করেন রবীন্দ্রনাথ। মীরাকে ডেভিড কপারফিল্ড, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, মহাভারত ইত্যাদি পড়ার কথা বলতেন বটে রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু তার চেয়েও তীব্র হয়ে উঠেছিল নিশ্চয়ই মেয়েকে কারো ঘরের লক্ষ্মী হিসেবে দেখার ইচ্ছে। তাই অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই মীরার বিয়ে ঠিক হল। পাত্র নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। পাত্রের চাহিদা নেহাত কম ছিল না। বিলেত বাস, শিক্ষার সমস্ত খরচ, এছাড়াও প্রচুর দান সামগ্রী । ঠাকুরবাড়ির রেওয়াজ ছিল পাত্র বিয়ের দিন উপবীত ধারণ করবে। কিন্তু সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য নগেন্দ্রনাথ নাকি উদ্ধতভাবে সে উপবীত ছুঁড়ে ফেলে দেন। রবীন্দ্রনাথের কথাতেও নগেন্দ্রনাথের ঔদ্ধত্য কাটেনি। আসলে পরবর্তী সময় এইটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে, নগেন্দ্রনাথ এই বিয়ে করেছিলেন অর্থের জন্য। কিন্তু প্রেমহীন এই দাম্পত্যে অবিরল কষ্ট পেয়ে গেলেন মীরাদেবী। নিজেকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে স্বামীকে বড়ো করে দেখানোটা ছিল রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা। মীরাও সেইভাবেই নগেন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে নিজেকে ছোটো দেখিয়ে স্বামীকে বড়ো করে দেখিয়েছিলেন। নগেন্দ্রনাথের মতো মানসিকতার মানুষের পক্ষে সে সূক্ষ্ম বিনয় বোঝা অসম্ভব ছিল। কাজেই তিনি সত্যিই অনেক বড়ো মনে করতে শুরু করলেন। পরিণতিতে অতি বড়ো সুন্দরী এবং অতি বড়ো ঘরণী হওয়া সত্ত্বেও মীরা বর ও ঘরের সুখ পেলেন না। শূন্যতা তাঁর জীবনের সঙ্গী হল।
শৈশবে মা, ভাই, দিদিদের হারানোর বেদনা তো ছিলই। তার চেয়েও অধিক হল দাম্পত্যের মৃত্যু। অথচ চেষ্টার কোনো অভাব ছিল না মীরার তরফে। কিন্তু নগেন্দ্রের বিলেতযাত্রা এবং তারপরে নগেন্দ্রের আজীবন উপেক্ষা — এই বিরহই ছিল মীরার ভবিতব্য। এর মধ্যে মধ্যে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহময় সাহচর্য। প্রবাসী পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে, বিদেশি পত্রিকায় মুদ্রিত প্রবন্ধের সারাংশ লিখেছেন। সারাজীবনের বিন্দু বিন্দু কষ্ট দিয়ে লিখেছিলেন নিজের স্মৃতিকথা। নীতিন্দ্রনাথ আর নন্দিতার জন্ম মীরাকে মাতৃত্বের আস্বাদ দেয়। দ্বিজেন্দ্রনাথের অকালপ্রয়াত পুত্রের নাম ছিল নীতিন্দ্রনাথ। তাই এই নামটি নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে আপত্তি উঠেছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে আপত্তি নাকচ করেন। বিধির এমনই বিধান এই নীতিন্দ্রেরও অকাল প্রয়াণ সহ্য করতে হয় মীরাকে। সত্তরোর্ধ বয়সে কন্যা নন্দিতারও মৃত্যুশোক বুক পেতে নিয়েছিলেন মীরা। তিনি আজীবনের কষ্ট প্রশান্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে নিজেই বহন করেছেন। মীরা ও নগেন্দ্রের আইনানুগ বিচ্ছেদ ঘটে ১৯২৯ সালে। মেয়ের জন্য শান্তিনিকেতনে ‘মালঞ্চ’ বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই বাড়ির ছবি আঁকা বসার ঘরটিই ছিল তাঁর শান্তির আশ্রয়। রবি ঠাকুরের মেয়ে বলে কোনোদিন কোনো মঞ্চে বা সভায় নিজেকে প্রচার করেননি মীরা। পঁচাত্তর বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। বিশ্বসংসারের কোনো বিশেষ হেলদোল হয়নি তাতে। শোক করার মতোই বা কে ছিল আর! শুধু মালঞ্চের শূন্য ঘর আঁকড়ে থাকা মেয়েটির একলা, দুঃখী অন্তরটুকু জুড়িয়েছিল। একথা হলফ করে বলতে পারি।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
