রবীন্দ্রনাথ ‘আফ্রিকা’ কবিতা লিখেছিলেন যাঁর অনুরোধে

দুই কবি — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অমিয় চক্রবর্তী

বিশ শতকের সদ্য আধুনিক সময়। রবীন্দ্রনাথকে তখন বাংলা সাহিত্যের ভাগ্যবিধাতাই বলা যায়। সেই সময় কয়েকজন কবি শব্দের ম্যাজিক নিয়ে অনন্য হয়ে উঠলেন। কেউ প্রকাশ্য রবীন্দ্রবিরোধিতায় নামলেন। আবার কেউ রবি ঠাকুরকে ছুঁয়েই কবিতাকে সাজালেন ভিন্নতর শব্দের পোশাকে। অমিয় চক্রবর্তী রবি ঠাকুরকে মান্যতা দিয়েই বিশিষ্ট কবি। আজকের কথকতা তাঁকে নিয়েই। 

‘চেনা কণ্ঠে ডাকল দূরে
সব হারানো এই দুপুরে 
ফিরে কেউ না চাওয়া—
এও কি রেখে গেলে?’

এমনই সহজিয়া বেদনায় ঋদ্ধ অমিয় চক্রবর্তীর উচ্চারণ। এক বেদনার বিনি সুতোয় তিনি বাঁধা পড়েছিলেন রবি ঠাকুরের সঙ্গে। তখন তিনি হেয়ার স্কুলের ছাত্র। সদ্য পড়েছেন রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস। মনে কিছু প্রশ্ন নিয়ে চিঠি লিখলেন রবীন্দ্রনাথকে। ১৯১৬ সালের ১২ মার্চ সে চিঠির উত্তর লিখেছিলেন পঞ্চান্ন বছরের রবীন্দ্রনাথ। ভেবেছিলেন পত্রপ্রেরক প্রৌঢ় কেউ হবেন। তাই রীতিমতো ‘আপনি’ সম্বোধন করে চিঠি পাঠালেন। তারপর রহস্যের পর্দা সরে গেল। জানা গেল পত্রপ্রেরকের বয়স মাত্র পনেরো। অমিয় চক্রবর্তী রবি ঠাকুরকে প্রথম দেখেছিলেন প্রমথ চৌধুরীর বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব তাঁর জীবনে ছিল দৈব নির্ধারিত আশীর্বাদের মতো। সেই সময় আকস্মিকভাবে অমিয় চক্রবর্তীর দাদা অরুণ চক্রবর্তী আত্মহত্যা করেন। সেই শোক অমিয় চক্রবর্তীকে বিহ্বল করে। তখন তাঁর জীবনে বরাভয় হয়ে আসে রবি ঠাকুরের চিঠি। রবি চিঠির শব্দে  শব্দে যেন গাঁথা ছিল ওষধি। অমিয় চক্রবর্তীর দিশেহারা মন আলোর পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেছিলেন তাঁর সেই চব্বিশ বছরের শোককে। কাদম্বরীদেবীর আত্মহত্যায় যে তাঁর পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল, একথাও বলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর আকাশে জীবনের যে বিরাট মুক্তরূপ প্রকাশ পায় প্রথমে তা বড়ো দুঃসহ। কিন্তু তারপরে তার ঔদার্য মনকে আনন্দ দিতে থাকে। তখন ব্যক্তিগত জীবনের সুখ দুঃখ অনন্ত সৃষ্টির ক্ষেত্রে হালকা হয়ে দেখা দেয়। বিশ্বের রথ চলেচে, মানুষের ইতিহাসের রথ চলেচে—বাধা বিঘ্ন সম্পদের মধ্য দিয়ে সে আপনার গতিবেগে আপনার মানুষের পথ পথ কাটচে— সেই পথই সৃষ্টির পথ।’ চিঠির হরফে রবি ঠাকুর বললেন, ‘মৃত্যু তোমার যা হরণ করেছে তার চেয়ে বড় করে পূরণ করুক। নিজেকে তুমি দীন বলে অপমান কোরো না, বেদনার মধ্যে তোমার জীবন সার্থক হোক।’

সময় জানে অমিয় চক্রবর্তীর কবিজীবনের সার্থকতার উপাখ্যান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এক কষ্টের সময় ধ্রুবতারা হয়ে তাঁকে পথ দেখিয়েছেন। অমিয় চক্রবর্তী ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন শান্তিনিকেতন আশ্রমে যাওয়ার জন্য। ১৯২১ সালে অমিয় চক্রবর্তীর বিএ পাশ ও বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা দুটি ঘটনাই ঘটে। অধ্যাপনার সূত্রে তিনি প্রবেশ করেন আশ্রমে। সবুজ দরজাওয়ালা একটুকরো ঘরে নিরন্তর চলত তাঁর কাব্যচর্চা। তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সহকারী। তাঁর কাজ ছিল বিদেশি চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়া, কবিতা কপি করা, অতিথি আপ্যায়ন, প্রুফ দেখা, ইন্টারভিউ নেওয়া ইত্যাদি । রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন ‘প্রবাসীদের বন্ধু’। অমিয় চক্রবর্তীও শান্তিনিকেতনের কাজের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আপিসের ঘর ছিল, কিন্তু কোনোদিনই মনে হয়নি আপিসে আছি।’ অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী হিয়রডিগ সিগর ডেনমার্ক থেকে এসেছিলেন রবি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। হিমের দেশের মেয়ে! তাই রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন হৈমন্তী। রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগেই অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের দাম্পত্যজীবনের গৌরচন্দ্রিকাও হয় শান্তিনিকেতনে, মৃন্ময়ী বাড়িতে। অনেকবার রবীন্দ্রনাথের বিদেশযাত্রায় সফরসঙ্গী হয়েছেন অমিয় চক্রবর্তী। একবার এই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘সম্রাটের মতো জারমেনি পরিভ্রমণ করচি— শ্রেষ্ঠ যা কিছু আপনিই আমাদের কাছে  এসে পড়চে— যেখানে যা কিছু সুন্দর, স্মরণীয়। –এমন গভীর করে বিচিত্র করে য়ুরোপকে জানবার শুভযোগ হবে কখনো ভাবিনি।’ 

এরপর যখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করতে চলে যাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ আত্মীয় বিয়োগের ব্যথা অনুভব করছেন, পরে চিঠিতে লিখেছেন, ‘এতদিন পরে আজ তোমরা চলে গেলে কীরকম খারাপ লাগচে বলতে পারিনে। এ যেন মৃত্যু বিচ্ছেদের মতোই কেবল মনকে বৃথা আঘাত করচে। — তোমার সঙ্গে এমন একটা নিবিড় যোগ হয়ে গিয়েছিল যে এ বয়সে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। — তোমার সহযোগিতা আমার পক্ষে বহুমূল্য হয়েছিল সেকথা কোনোদিন ভুলতে পারব না—কোনোদিন তোমার অভাব পূর্ণ হবে না।’

এরপর কত কত চিঠির আদানপ্রদান হবে।আনুমানিক ১৩৭টি চিঠি অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন রবি ঠাকুর। রবীন্দ্র-অমিয় পত্রাবলী রবীন্দ্রসাহিত্যের অনন্য সম্পদ আর তাঁদের পারস্পরিক নির্ভরতা একান্ত ব্যক্তিগত। অমিয় চক্রবর্তী যেন ছিলেন রবি ঠাকুরের কাছে ‘পশ্চিমের জানালা।’ বিদেশ থেকে ইংরেজ কবিদের কবিতা, কবিতার বই পাঠাতেন অমিয় চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ ‘আফ্রিকা’ লিখেছিলেন অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধেই। ‘সাহিত্যের পথে’ অমিয় চক্রবর্তীকে উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতন থেকে অমিয় চক্রবর্তীকে ডিলিট উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তারপর রবি ঠাকুরের আন্তরিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে আবার এসেছেন অমিয় চক্রবর্তী। মংপুতে সফর সঙ্গী হয়েছেন আবার। রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ সাতই পৌষের অনুষ্ঠানে অনুলেখক হয়ে জাগিয়ে তুলেছেন নস্টালজিয়া। একসময় দেশিকোত্তম! পদ্মভূষণের মতো বড়ো বড়ো পুরস্কার পাবেন অমিয় চক্রবর্তী। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ‘খসড়া’ ও ‘একমুঠো কাব্য’ কে ‘নবযুগের কাব্য’ বলেছিলেন —সেই বিশেষণ সব পুরস্কারের অধিক।

বন্ধুত্ব এক আশ্চর্য অনুভূতি! বয়সের বেড়া পার হয়ে মুঠো মুঠো রঙিন আবেগ নিয়ে হাজির হয়। রবি ঠাকুর আর অমিয় চক্রবর্তীর বন্ধুত্বের গল্পটাও তেমন। অসম বয়স সম্পর্কের পূর্ণতা দিতে দ্বিধা করেনি। অমিয় চক্রবর্তী যেমন রবি ঠাকুরের বন্ধুত্বের ঋণ স্বীকার করে গেছেন আজীবন, তেমনই রবি ঠাকুরের দেওয়া স্বীকৃতিও কবচ কুণ্ডলের মতো তাঁকে আগলে রেখেছে। বিদেশ ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে লিখেছিলেন— ‘বাহিরে তোমার যা পেয়েছি সেবা/ অন্তরে তাহা রাখি,/ কর্মে তাহার শেষ নাহি হয়, প্রেমে তাহা থাকে বাকি।/ আমার আলোর ক্লান্তি ঘুচাতে/ দীপে তেল ভরি দিলে/ তোমার হৃদয় আমার হৃদয়ে/ সে আলোকে যায় মিলে।’

এ এক আশ্চর্য সম্পর্ক! দুই কবির বন্ধুত্ব যেন অক্ষরের জপমালার মতো সুন্দর, অলৌকিক এক বন্ধন। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্র পরিকর, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia