বাঙালি জনমানসে পঞ্জিকাই ছিল চিকিৎসক, ধর্মীয় গুরু, অনুশাসক ও অভিভাবক

নানা ধরনের বিক্রেতারা পঞ্জিকাতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন

ধ্যবিত্তের সংসারে দেখেছি, নতুন ক্লাসে ওঠার মাসখানেকের মধ্যে বইয়ে মলাট দিতে হত। না দিলে পড়ুয়ার যে পড়াশুনায় বিশেষ মতি নেই, তা রোদের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যেত। একইরকম ভাবে নববর্ষে (Bengali New Year) বা হালখাতার (Halkhata) দিনে নিয়ম করে আমাদের বাড়িতে ফুল পঞ্জিকা (Panjika) কিনতে হত, নইলে বাড়িতে মা কুরুক্ষেত্র বাঁধাত। বাড়িতে পাঁজি না থাকলে নাকি মুখ দেখানো যেত না। সোমবার অমাবস্যা কখন পড়বে কিংবা আজ নখ কাটা যাবে কিনা জানতে আমার মা কাকিমারা কাউকে জিজ্ঞাসা করতে লজ্জা কিংবা শঙ্কা বোধ করতেন। গেরস্থের হাতের কাছে পঞ্জিকা থাকা মানে সর্ব কর্মে ধর্মের কাছাকাছি অবস্থান করার নিষ্ঠা লাভ। গ্রহণে কী কী খেলে বাঙালির নরকে গমন অবশ্যম্ভাবী, সেটা জেনেছি পঞ্জিকার পাতা উল্টেই। পরীক্ষার দিন মাছ না ডিম কিংবা দাদুর বাৎসরিক কোন তিথিতে- সবকিছু প্রশ্নের একটাই মেডিজি, পাঁজি। 

বছরের পর বছর ধরে এভাবেই হাতে হাতে ঘুরেছে পঞ্জিকা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের অলিখিত অভিভাবক হয়ে কখনও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে অথবা উপদেশ দিয়েছে। ভাবলে অবাক লাগে, বাংলা নববর্ষ পালনের অনেক আগে থেকে পঞ্জিকা চালু হলেও কীভাবে যেন কবেকার সেই পঞ্জিকা বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে। বরং বিশ শতকে পঞ্জিকায় সচিত্র হালখাতা উৎসব ছাপার পরই যেন পঞ্জিকা ঠাঁই দিল নববর্ষকে।    

নববর্ষের প্রথম দিনটির সঙ্গে পঞ্জিকার সম্পর্ক কেমন ছিল, বটতলা সাহিত্যে তার ব্যাখা মেলে।

নববর্ষ পালনের আগে সেকালে হাতে লেখা পঞ্জিকা গোটানো পটের মতো হত, এইসব হাতে লেখা পঞ্জিকা ব্রাহ্মণরা বাড়িতে বাড়িতে পাঠ করে শুনিয়ে দু’পয়সা রোজগার করতেন। এতে নিরক্ষররা ব্রাহ্মণদের ওপর খুবই নির্ভরশীল ছিলেন। বছরের প্রথম দিনে জমিদারবাড়িতে বসত পঞ্জিকা পাঠের আসর। সেখানে প্রচুর লোকজন আসতেন তিথি-নক্ষত্র, আচার-বিচার আর নিয়ম জানতে। এভাবেই প্রথম থেকেই বছরের প্রথম দিনটি পাকেচক্রে পঞ্জিকার সঙ্গে জড়িয়ে গেল। তারপর পঞ্জিকা ছাপার রমরমা শুরু হতেই ব্রাহ্মণদের প্রসার গেল কমে। উনিশ শতকে পঞ্জিকার বিক্রিবাট্টা এতটাই ভালো ছিল যে একই প্রেস থেকে বিভিন্ন পঞ্জিকা ছাপা হয়েছে। আবার একই ব্যক্তির সম্পাদনায় বিভিন্ন পঞ্জিকা ছাপা হয়েছে বিভিন্ন প্রেস থেকে। এমনকী বাংলাভাষায় মুসলমানদের জন্য “বৃহৎ মোহাম্মদীয় পঞ্জিকা” এবং খ্রিস্টানদের জন্য খ্রিস্টিয় পঞ্জিকা প্রকাশিত হয়েছে।

মোট কথা, বাঙালির জ্ঞানভান্ডারের অন্যতম উৎস এই পঞ্জিকা সেকালের অন্যতম নির্দেশিকা, অন্যতম বার্তাবহ। বাঙালি (Bengali) জনমানসে পঞ্জিকাই ছিল চিকিৎসক, ধর্মীয় গুরু, অনুশাসক ও অভিভাবক। তাই নববর্ষের প্রথম দিনটির সঙ্গে পঞ্জিকার সম্পর্ক কেমন ছিল, বটতলা সাহিত্যে (Battala sahitya) তার ব্যাখা মেলে।

কর্ম শেষে নববর্ষে বাবু ঘরে আসে।
হাতে মিষ্টি ইসেন্স শিশি আর পাঁজি পাশে ||

চড়ক, গাজন, জন্মাষ্টমী, দুর্গাপুজো (Durga Puja) নিয়ে ব্যস্ত বাঙালির প্রথমে নববর্ষের আমোদ আহ্লাদ ছিল না। উনিশ শতকে বাবুদের হঠাৎই ইংরেজ সংস্কৃতির ছায়ায় নববর্ষ পালনের হিড়িক পড়ল। এর আগে পুরোনো তিথিনক্ষত্র দেখার বিধান অনুযায়ী রোজকার জীবনে হাতে লেখা পঞ্জিকার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। পুস্তকাকারে ছাপা পঞ্জিকার গুরুত্ব হল দ্বিমুখী- ধর্মীয় প্রয়োজনে তিথি দেখা, জীবনযাপনের জন্য বিজ্ঞাপন দেখা। মানে ইংরেজ অনুকরণে হইচই করে নববর্ষ পালনের অনেক আগেই পাঁজি ছিল বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনে। ছাপার প্রসারে বেড়েছিল বাঙালির পাঁজি নির্ভরতা। এরপর প্রকাশকরা বাবু সংস্কৃতির ছায়াতেই নববর্ষকে বেছে নিল পঞ্জিকা প্রকাশের উপযুক্ত দিন হিসেবে।

বিজ্ঞাপনকে মনোরম করার জন্য ছবি আঁকার কাজ পেতেন চিত্রশিল্পীরা। বৈশাখ থেকেই এই ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেখে কেনাকাটা শুরু হয়ে যেত!

 

এবার বলতে হয় পঞ্জিকা শুরুর দিনগুলোর কথা। উনিশ শতকে বটতলার মুদ্রণ সংস্কৃতিকে পল্পবিত করেছিল এই পঞ্জিকা। ছাপানো পঞ্জিকা যখন বাজারে এল তখন তাকে ঘিরে গড়ে উঠল অসংখ্য মানুষের অন্নসংস্থান। পঞ্জিকা ছাপা, সম্পাদনা ও বিক্রিতে যুক্ত হলেন বহু মানুষ৷ একটিমাত্র বিষয়ের বইকে ঘিরে কর্মসংস্কৃতির এমন ছবি অন্যত্র দুর্লভ। চিত্রশোভিত পঞ্জিকার ছবি ও অলংকরণে এমন এক বিশেষত্ব ছিল, যাতে এক নজরেই তাকে পঞ্জিকার ছবি বলে চেনা যায়।

 

মানুষের হাতে দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার সবচেয়ে বেশি রেকর্ড পঞ্জিকার। পঞ্জিকাগুলোর বিক্রিও ছিল অনেক। শহর কলকাতা ছাড়াও ফেরিওয়ালারা গ্রামে গঞ্জে ঘুরে এগুলো বিক্রি করতেন। এক একটি পঞ্জিকায় ছাপার পরিমাণ ছিল ২০০০ থেকে ১২০০০ কপি। ১৮৫৭ সালের হিসেব অনুযায়ী সে বছর প্রায় দেড়লাখ পঞ্জিকা ছাপা হয়েছিল। তাই নানা ধরনের বিক্রেতারা পঞ্জিকাতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। সারা বছরের প্রয়োজনীয় জিনিসের বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি এই পঞ্জিকায়। আজকের দিনে যাকে আমরা বলি “কমার্শিয়াল আউটলুক”, পঞ্জিকার দৃষ্টি প্রথম থেকেই ছিল সেদিকে। তাই পঞ্জিকার তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে আবির্ভূত হয়েছিল বিজ্ঞাপন।

বিজ্ঞাপনকে মনোরম করার জন্য ছবি আঁকার কাজ পেতেন চিত্রশিল্পীরা। বৈশাখ থেকেই এই ছবিসহ বিজ্ঞাপন দেখে কেনাকাটা শুরু হয়ে যেত! সেটা গরমে ঘামের দুর্গদ্ধ দূর করতে দর্জিপাড়া কেমিক্যাল ওয়ার্কসের চামেলি, বেলা, চম্পক, হেনা, জেসমিন, বকুল ফুলের এসেন্স হোক অথবা চুলের বৃদ্ধির জন্য সুগন্ধী কেশতেল- পঞ্জিকার বিজ্ঞাপনে সেটাই থাকত যেটা নিত্য প্রয়োজনীয় অথবা গুরুতর সমস্যার সমাধান।

আজ নববর্ষে কলেজ স্ট্রিটে যে নতুন বই প্রকাশের চল হয়েছে, তা শুরু হয়েছে বটতলার হাত ধরেই। আর পঞ্জিকার সূত্রেই নববর্ষে নতুন বই কেনার চল। আজ কলকাতায় চড়ক বা জন্মাষ্টমীর মহা ধুমধাম নেই, কিন্তু নাগরিক সমাজে পঞ্জিকা রয়ে গিয়েছে। অন্তত ২০ লাখ কপি বিক্রি হয় পঞ্জিকার। পঞ্জিকার হাত ধরেই তাই রয়ে গিয়েছে বাংলা নববর্ষও।

 

Developed by DXDasia