কলিকাতার বটতলা, ব্রডশিট এবং মুখে মুখে ফেরা বেণীমাধবের ‘ফিরিঙ্গি হাতের’ কালী

কলকাতার বাঙালিদের মধ্যে তো বটেই, এমনকি সাহেবদের মধ্যেও বেশ শোরগোল ফেলে দিল এই ছবি

লকাতায় রীতিমতো হইচই ফেলে দিল একটা ছবি। ছবি, অথচ হাতে আঁকা নয়। ইয়াব্বড়ো একটা কাঠ খোদাই করে সেখান থেকে ছাপানো। তখনও অবধি বটতলার কোনো ছাপাখানা থেকেই এমন জিনিস ছেপে বেরোতে কেউ খুব একটা দেখেনি। শুধু আকারে বড়ো বলে নয়, গোটা ছবিটাই বেশ অদ্ভুত। রহস্যময় এবং সুন্দর। দেখামাত্রই নজর কেড়ে নেয়। কলকাতার নব্যশিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে তো বটেই, এমনকি সাহেবদের মধ্যেও বেশ শোরগোল ফেলে দিল এই ছবি।

ছবিটা কালীপ্রতিমার। শিল্পী বেণীমাধব ভট্টাচার্য। ছবির নিচে সইও আছে। মানে, খোদাই করা স্বাক্ষর আরকি। লোকমুখে এই কালীপ্রতিমার ছবিই বিখ্যাত হয়ে গেল ‘বেণীমাধবের কালী’ নামে। অথচ, দুগ্গা-কালী-অন্নদা-মনসা নিয়ে রোজ ঘর করা বাঙালি সমাজকে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো নতুন কীই বা থাকতে পারে একটা কালীপ্রতিমার ছবিতে? তাও আবার সাহেবদের প্রেস থেকে নয়, বটতলার প্রেস থেকে ছাপা ছবি। এই কালীর মহিমা না জানলে বিস্ময়করই ঠেকবে বটে।

উইলিয়াম কেরির হাত ধরে ছাপাখানা-বিপ্লব ঘটার আগেই ১৭৭৮ সালে হুগলিতে অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়েছে নাথানিয়েল হ্যালহেডের ‘গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ’। সেখানে উইলকিন্স সাহেবকে বাংলা অক্ষরের ছাঁদ গড়তে সাহায্য করেছিলেন পঞ্চানন কর্মকার। কাঠ-ধাতু খোদাই করে সেই অক্ষরের ছাঁদ তৈরিও আসলে পরবর্তীকালে উডকাট ছবির সলতে পাকানো। পরে, এই পঞ্চাননকেই কোলব্রুক সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ছিনিয়ে এনেছিলেন কেরি। শ্রীরামপুর মিশনের বিখ্যাত ছাপাখানার অক্ষরদের জীবন্ত করে তুলতে পঞ্চাননকেই প্রয়োজন ছিল। পঞ্চাননকে তাই বলাই যায় উডকাটের প্রথম বাঙালি শিল্পী। এরপর, উনিশ শতকের গোড়াতেই একাধিক ছাপাখানা গড়ে উঠছে কলকাতায়। সোনাগাজীর পাশে বটতলাতে গড়ে উঠেছে বাঙালির ‘অপর’ সংস্কৃতির মুক্তাঞ্চল। সেখান থেকেও ছাপা হচ্ছে হরেক বই, পুস্তিকা। অধিকাংশই সচিত্র। আজকের ভাষায় অলঙ্করণ ভরে আছে বইয়ের পাতায়-পাতায়। জন্ম নিচ্ছে বটতলার ছবির এক নিজস্ব ঘরানা।

তবে, বইয়ের অলঙ্করণের জন্য ছাপা ছবির বাইরেও বটতলার ছবির আরেকটি নিজস্ব ধারা ছিল। স্বাধীন ‘ব্রডশিট’ প্রিন্টের ছবি। ব্রডশিট প্রিন্টের ছবি মানে, সেইসব ছবি বাজারে বিকোবে এককভাবেই। বইয়ের প্রয়োজনে অলঙ্করণের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি নিয়ে স্বাধীনভাবে এগুলিকে আঁকবেন শিল্পীরা। এর ফলে, লেখক যা লিখবেন, প্রকাশক যা চাইবেন—তার মধ্যে আর আটকে থাকতে হবে না শিল্পীকে। তাঁর নিজের ভাবনাই জন্ম দেবে ছবির। কালীঘাটের পোটো-পাড়াতে অবশ্য এমন স্বাধীন ছবির পট আঁকা হয়। কিন্তু, সে শুধুই পটের ছবি। তাছাড়া, বটতলাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? যদিও, কালীঘাটের পটের মতো রঙের বাহার এইসব ছাপা ছবিতে নেই। রং বলতে সাদা আর কালো। তাতেই নানা রঙের ছল তৈরি করতে হবে শিল্পীকে। ক্রেতা যাতে রংহীন ছবি দেখে নাক না সিঁটকোন। তবে, এইসব সাদা-কালো ছবি কেনার মতো খদ্দেরও কিন্তু নেহাত কম ছিল না তখন শহরে। বিলিতি ক্যানভাসে আঁকা তেলরঙের ছবি আর কজনই বা কিনতে পারেন? তাছাড়া,সেইসব ছবি দেখে সবসময় পছন্দও হয় না গেরস্তদের। তার চাইতে এইসব ছবি ঢের ভালো। সস্তাও। বিরাট বড়ো কাঠ কেটে বানানো ছবি। সে এক বিস্ময়ও বটে।

এভাবেই, বটতলার ব্রডশিট প্রিন্টের চৌহদ্দিতেই আত্মপ্রকাশ করলেন রামধন স্বর্ণকার, মাধবচন্দ্র দাস, রূপচাঁদ আচার্য, পঞ্চানন কর্মকার, কার্তিকচন্দ্র কর্মকার, গুপীচরণ স্বর্ণকার এবং সর্বোপরি বেণীমাধব ভট্টাচার্যর মতো শিল্পীরা। প্রকাশকের কবল থেকে বেরিয়ে এসে এঁরা শুরু করলেন ছবির স্বাধীন ব্যবসা। আর, সেই ছবির বাজারকেই মাত করে দিয়েছিল যে তিন-চারটি ছবি তারই অন্যতম ‘বেণীমাধবের কালী’। বটতলার ব্রডশিটের ইতিহাসে এক মহার্ঘ্য ছবি।

‘বেণীমাধবের কালী’-র দুর্লভ ছবি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

এই কালী কেন অন্যান্য কালীপ্রতিমার ছবির থেকে ব্যতিক্রম, তা বুঝতে জহুরির চোখ লাগে না। কালীপ্রতিমার কোণা-গোলেল মুখে পুরীর জগন্নাথ মূর্তির প্রভাব। এহেন মুখের গড়নে গ্রাম্য শিকড়ের ছাপ স্পষ্ট। প্রতিমার পা আঁকেননি বেণীমাধব। গোটা ফ্রেম জুড়ে কালীর ভরাট ছবি। সবটা মিলিয়ে প্রতিমার এই আদল বেণীমাধবের কালীকে অন্য মাত্রা দিল। সঙ্গে সাদা-কালোর দ্বিত্ব যেন এই ছবির অন্যতম সম্পদ। আর, ছবির ঐশ্বর্যকেই বাড়িয়ে তুলল এই ছবির কয়েকটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য।

বেণীমাধবের কালীর বাঁদিকের উপরের হাতে খড়্গ, নিচের হাতে অসুরের মুণ্ড। আর ডানদিকের দুই হাত অস্ত্রহীন। এক হাতে অভয়মুদ্রা, অন্য হাতে সম্প্রদান মুদ্রা। গলায় মুণ্ডমালা। গা ভরা গয়না। শিল্পীর কল্পিত গয়না নয় কিন্তু। রীতিমতো গরানহাটার স্যাকরাদের গয়নার ক্যাটালগ দেখে আঁকা সমস্ত অলঙ্কারে দেবীকে সাজিয়েছেন বেণীমাধব। এরই সঙ্গে এই ছবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে দেবীর ‘ফিরিঙ্গি হাত’।

‘ফিরিঙ্গি হাত’ মানে সাদা হাত। কালীর ভরাট গোল মুখের কালিমার সঙ্গে অদ্ভুত বৈপরীত্যে স্থাপিত এই ফিরিঙ্গি হাত। এমন হাত কেন আঁকলেন, তার কোনো ব্যখ্যা শিল্পী নিজে দেননি। কেউ কেউ বলেন, ছবিতে সাদা-কালোর মায়া-বিভ্রম জোরদার করতেই এমন কৌশল নিয়েছিলেন বেণীমাধব। সেক্ষেত্রে, এই ‘স্বাধীনতা’ সম্পূর্ণ শিল্পগত। কারণ যাই হোক, এই ফিরিঙ্গি হাত যে বেণীমাধবের কালীর রহস্য আর উৎকর্ষ দুই-ই বাড়িয়ে তুলেছে, সন্দেহ নেই।

নিছক বাজার কাঁপানোর জন্য নয়, শিল্পগুণের বিচারেও উনিশ শতকীয় বাংলাদেশের স্বাধীন ব্রডশিট ছবির ঘরানায় এবং ইতিহাসেও বেণীমাধবের কালী নিজের মহিমাতেই প্রতিষ্ঠিত। দুশো বছর পরেও যাঁকে দেখে সহজে বিস্ময় কাটতে চায় না দর্শকদের।

Developed by DXDasia