ইদের চাঁদ

আধফালি চাঁদ সারা মাঠজুড়ে কাস্তের মতো ছড়িয়ে থাকে

খনও কখনও মনে হয়, ইদ কি হারিয়ে গেছে, না আমিই দূরে সরে গেছি। ছোটোবেলায় কয়েকটা হলেও রোজা রাখতাম। কখনও কখনও হাফরোজা। বাচ্চাকাচ্চাদের মধ্যে এই হাফরোজার প্রচলন ছিল। আসলে বারণ করা সত্ত্বেও না শুনলে বোঝানো হত, বড়োদের যেমন সারাদিন না খেয়ে রোজা রাখতে হয়, ছোটোদের তেমন দুপুর অবধি না খেয়ে। আমরা ছোটোবেলায় বুঝে যেতাম। দুপুরে খেয়ে রোজা ভঙ্গ করতাম।

এখনও সেই কাজল চোখের নিচে রেখে উৎসবের আবহে মাতি। চাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করি। ওই আধফালি চাঁদ সারা মাঠজুড়ে কাস্তের মতো ছড়িয়ে থাকে। যেন নতুন ফসল কেটে ঘরে উঠবে…

যতদিন গেছে ধর্মীয় রীতিনীতি এড়িয়ে চলার অভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছি। আমাদের মন সবচেয়ে বড়ো ধর্মগ্রন্থ। এই গ্রন্থ পাঠ করতে করতে উৎসবের প্রকৃত আলো মেখেছি। তবে তার রঙে ধূর্ত কোনো কাক এসে গন্ধ ছড়িয়ে দিক চাইনি। এখনও ইদ আসে। একইরকম আলতা পায়ে। আমি বাড়ির দরজা খুলে রেখে তাকে জল মিষ্টি দিই। সে-ও আমাকে জড়িয়ে ধরে। চুমু দেয়। 

ইদের প্রকৃত আলো হল, কবে ইদ আসবে। রোজার পনেরো দিন পর থেকে শুরু হত কাউন্টডাউন। আর আঠাশটা রোজা পেরিয়ে গেলে শুরু হত ইদ নিয়ে দ্বন্দ্ব। এবার কি ঊনত্রিশ রোজার পর ইদ হবে, না ত্রিশটার পর?

ইদ-উল-ফিতর এমনই এক উৎসব যেখানে নিজেকে বড়ো বেশি খুঁজে পাওয়া যায়। আর নিজেকে খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ছোটোবেলাতে। উৎসবের একটা আলাদা আনন্দ থাকেই। খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি। এসব পরের কথা। তবে চাঁদ দেখাটাই ছিল আরেক উৎসব। শেষ ক-টা দিন, মানে সাতাশি রাত থেকে বুড়োবুড়ি, বাচ্চাকাচ্চা সকলেই প্রায় রোজা রাখার চেষ্টা করে। মসজিদের নীচতলা, দোতলা, তিনতলা ভর্তি হয়ে সামনের ফাঁকা মাটিতেও জায়গা থাকে না। মানুষে থইথই করে। নামাজ পড়ার ভিড়। সবচেয়ে বেশি ভিড় হত ঊনত্রিশের মাগরিবে। রোজা রাখুক বা না-রাখুক আযান পড়ার পর সবাই মসজিদে হাজির।

মাগরিবের আজান শুনে ইফতার। কিছুক্ষণ পরেই চাঁদ উঠবে। সবার মনে বিরাট উদ্দীপনা। আমরা কমবয়সি ছেলেরা ঊনত্রিশের দিন একদম শেষ সারিতে বসার চেষ্টা করতাম। মসজিদের শেষ লাইনে বসার যেন ধুম। যে আগে চাঁদ দেখবে সে হিরো। আমরা কেউ সম্পূর্ণ রাকাত নামাজ কেউ শেষ করতাম না। হাফেজ সাহেবের নামাজ শেষ হলেই মোটামুটি আমাদের শেষ। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে চাঁদ দেখার পালা। কখনও কারো দোতলা বাড়ির মাথা ডিঙিয়ে, কখনও আমগাছ, নিমগাছের ডালের ফাঁকে চোখকে গলিয়ে দিয়ে। আমাদের উঁকিঝুঁকি চলতে চলতে বড়োরা ততক্ষণে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়ত। আমাদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে জিজ্ঞাসা পর্ব। কেউ কেউ বলত, ওই তো আমি চাঁদ দেখেছি। পরেরজন কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলত, ওই তো। আমি তো স্বয়ং দেখতে পাচ্ছি। কেউ বলত, কিছুক্ষণ আগে দেখেছি। মেঘে ঢেকে গেছে হয়তো। এর মধ্যে বাড়ির মহিলারা ছাদে উঠে বা ফাঁকা কোনো জায়গাতে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখার চেষ্টা করত। কেউ কেউ রটিয়ে দিত, অমুকদের বাড়ির ছাদে দেখা যাচ্ছে। সবাই ছুটে যেতাম। ওইদিন সব ছাড়। দলবল ছাদে উঠে দেখতাম, না কেউ ভুল খবর দিয়েছে। পাড়াময় হুল্লোড় চাঁদ। কিন্তু ইদের চাঁদ কি আদৌও উঠেছে? কেউ জানে না। সৌদি আরবে ইদ কি হয়ে গেছে? সৌদির পরেরদিনই তো আমাদের ইদ… সম্ভাবনা নিয়েই সকলে বাজারহাট করে। নানা রকম মিষ্টান্ন, সিমুই, লাচ্চা আরও কত… জামাকাপড় কিনবে না বলে মনস্থির করেও কেউ কেউ হাজির দোকানে। নাপিতের দোকানে লম্বা লাইন… মধ্যরাত্রি পর্যন্ত চলবে শাহরুখ, সালমান, ঋত্বিক কাটিং… বাড়িতে বসে কেউ কেউ চ্যানেলের পর চ্যানেল পালটিয়ে যাচ্ছে… কোথাও চাঁদ দেখার খবর দেখাচ্ছে কিনা… টিভির পর্দা থেকে কিছুতেই চোখ সরছে না… অপেক্ষা করতে করতে রাত হয়ে যেত। অপেক্ষা থাকত, দিল্লি থেকে কখন খবর আসবে। কখন মসজিদে ঘোষণা করবে, আগামীকাল ইদ-উল-ফিতরের নামাজ অমুক সময়ে হবে।

পুরো সাসপেন্স। পুরোটাই রহস্য। এই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। কোনোদিন ভোরে মা বলত, ‘ওঠ, ওঠ। আজ ইদ।’ আবার কোনোদিন বলত, ‘আরেকটা রোজা রাখতে হবে।’ ঢুলু ঢুলু চোখে এই আনন্দোৎসবের কাজল পরে নিতাম। এখনও সেই কাজল চোখের নিচে রেখে উৎসবের আবহে মাতি। চাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করি। ওই আধফালি চাঁদ সারা মাঠজুড়ে কাস্তের মতো ছড়িয়ে থাকে। যেন নতুন ফসল কেটে ঘরে উঠবে…  আজও যখন ইদের আগের দিন রাস্তা দিয়ে চলি কচি কচি বাচ্চাগুলোকে দেখি, সেই একইরকম। ওরা ইদ-চাঁদের রহস্য উদ্‌ঘাটন করবে বলে তোলপাড় করছে পাড়া। ওরাও উৎসবের মধ্যে নিজেকে খুঁজতে শিখে গেছে হয়তো…

Developed by DXDasia