
কচি কচি কুলি বেগুন, পালং শাকে পাঁচ কড়াইয়ের ডালে মাখামাখি করে শুয়ে থাকে আস্ত মটরশুঁটি, সিম
একটা জন্মের পর আরেকটা জন্ম আসে, গ্রাম বাংলার খঞ্জনা পাখি সিজমনসার ডালে বসে ঘুঙুরের শব্দ শোনে আর মঙ্গলকাব্যের দাবি মেনে বেহুলা ইন্দ্রের রাজসভায় নর্তকী হয়ে ওঠে। বাংলার মঙ্গলকাব্য শুনে আর পাঁজি-তে সচিত্র ব্রত মাহাত্ম্যের পাতা উল্টে উল্টে আমরাও এরকমই এক অলীক বাংলার সন্ধান পেয়ে যেতাম।
শহরে বসে গ্রাম বাংলা বলতে এখনও জীবনানন্দের কিশোরীর চাল ধোয়া আঙুল আর বিভূতিভূষণের তালনবমীর অনুষঙ্গ আমাদের মনে অজান্তেই চলে আসে। নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে অপু শহরে চলে যাওয়ার পর আর গাঁয়ে ফিরে আসেনি। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনেই অপু শান্তি খুঁজে নিয়েছিল। আমরাও শহুরে কর্মকেন্দ্রিক জীবনে একরকম থিতু হয়ে গিয়েছি। তবু বুকের ভেতর মনসার থান, গাজন, ইতু পুজো, পুণ্যিপুকুর ব্রত, ঘেঁটু পুজোর গ্রাম বাংলা জেগে থাকে জন্মান্তরের স্মৃতির মতোই।
নবান্নের নতুন ধান নিয়ে বাংলা জুড়ে উৎসবের রেশ ধরে এসে যায় পৌষ সংক্রান্তি, শীতলষষ্ঠী। মফস্বলে থাকাকালীন এ উৎসবগুলো জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জুড়ে গিয়েছিল। একান্ত বাঙালির উৎসব ঘিরে আমাদের মনেও রচিত হয়েছে কত মঙ্গলকাব্য। সরস্বতী পুজোর পরের দিন শীতলষষ্ঠী। পৌষ সংক্রান্তির মতো পাড়া প্রতিবেশীর গোটা সেদ্ধ বিলি হত বাড়িতে বাড়িতে। তখনও জানতাম না অরন্ধনের মাহাত্ম্য। তখনও আন্তর্জাতিকতা বুঝিনি। ছাদে লাগানো অ্যান্টেনার স্টিকে সায়া শুকানো বাঙালি রবিবার দুপুরে আঞ্চলিক ভাষায় সিনেমা দেখে মৃণাল সেনকে বোঝার চেষ্টা করত। কেবল টিভির রমরমা তখনও আসেনি। ফলে বিপত্তারিণী, চণ্ডী, ইতুর মতো গোটা সেদ্ধও তার প্রভূত মহিমা নিয়ে আমাদের শিশুমনে বিরাজ করত।
পিৎজ্জা, বার্গারের সাম্রাজ্যবাদের তোয়াক্কা গ্রাম বাংলা এখনও করে না। সে সব তখন বাংলার ঘরে ঘরে জানাই ছিল না। তাই চড়া দামে শাকসবজি কিনে সোৎসাহে পালন হত অরন্ধন। আগের দিনের রান্না খাওয়ার চল আসলে উনুন, আর শীলনোড়াকে বিশ্রাম দেওয়ার ছল মাত্র। নিকোনো উনুনে সেদিন আর কিছু রান্না হবে না। তার বদলে গোটা সেদ্ধ খেয়ে থাকা। সরস্বতী পূজার দিন মূলত গোটা গোটা রাঙা আলু, আলু, কড়াইশুঁটি, সিম, কচি বেগুন, শীষ পালং পাঁচরকম কড়াইয়ের (মতান্তরে মাষকলাই) সঙ্গে এক ঘটি জলে সেদ্ধ করে গোটা সেদ্ধ তৈরি হয়। পরের দিন অরন্ধনে সেটা খাওয়া হয়।
হালকা মিষ্টি মিষ্টি, মশলা ছাড়া শুধু জলে সেদ্ধ এই সব্জিগুলোর স্বাদ ভারী অদ্ভুত লাগত। কাঁচা সরষের তেল ছড়ানোর তর সইত না আর! শুক্তো, ডাল, ভাত, চচ্চড়ি, মাছের রোজকার জীবনে এই সবজি সেদ্ধ একপ্রকার স্বর্গীয় ‘সিম্পলিসিটি’। সেই সিম্পলিসিটি আমাদের মধ্যেও ছিল বলেই আমরা সরস্বতীর পায়ের কাছে ‘নব গণিত মুকুল’ জমা রেখে দিতাম, যাতে আগামী কয়েকদিন বই না থাকার অজুহাতে অঙ্ক থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আর পুষ্পাঞ্জলির সময় কায়মনোবাক্যে পাশ করার প্রার্থনা করতাম। বাগদেবীর আরাধনায় বিদ্যানুরাগী হিসেবে স্কুলে স্কুলে মুক্ত হস্তে টোপাকুল, খিচুড়ি খেয়ে খেয়ে যখন পেট অসন্তুষ্ট, তাকে শান্ত করার মন্ত্র গোটাসেদ্ধ। ফলে আমরা গোটা সেদ্ধ ভালোবাসতাম।
কচি কচি কুলি বেগুন, পালং শাকে পাঁচ কড়াইয়ের ডালে মাখামাখি করে শুয়ে থাকে গোটা গোটা মটরশুঁটি, সিম। সেদ্ধ হতে খোসা থেকে বেরিয়ে এসেছে শুঁটির দানা। খোসাটাও পরম মমতায় চিবোতাম। গ্রামের বাড়িতে খেসারি কড়াই চাষ হত, সেগুলোর কথা মনে হত। সেগুলো পড়লে বেশ হত। টিভিতে ডিডি মেট্রোর আরব্য রজনীতে চোখ রেখে মনের সুখে গোটাসেদ্ধ খেতাম। আর উড়ন্ত কার্পেটে মফস্বল পেরিয়ে অচিন দেশে পৌঁছে যেতাম। তখনও সরস্বতী স্কুলে বসে আছেন। দেখা করার দায় ছিল। আবার বেরিয়ে পড়তাম অ্যাটেনডেন্স জমা করতে। পথে দেখা হতো, সেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে। রিয়াদের বাড়ি থেকে ওর ঠাকুমার জিজ্ঞাসা আসত, ‘কিরে, গোটা প্রসাদ খেয়েছিলিস?’ পটে আঁকা ভক্ত ধ্রুবের মত চোখ ঢুলু ঢুলু করে ঘাড় নাড়তাম, ‘হ্যাঁ, খেয়েছিলাম। খুব ভাল।’
এই ঠাকুমা-দিদিমারা ছিল আমাদের কমফোর্ট জোন। ব্রত পালনের পর সিন্নি, মকর, পিঠেপুলি এসব সবাইকে ডেকে ডেকে খাওয়ানোর জন্য তাদের প্রাণ ছটফট করত।
আমাদের বাড়ির রীতিতে গোটা সেদ্ধর চল ছিল না। অপেক্ষা করে থাকতাম, কখন পাশের বাড়ি থেকে গোটা সেদ্ধ ভরা রেকাবি আসবে! প্রতি বছর শীষ পালং উঠলেই অপেক্ষা শুরু হয়ে যেত। ঘোষেদের বাড়ি, কবিরাজদের বাড়ি, বসুদের বাড়ি থেকে ফি বছর গোটা সেদ্ধ আসত।
সত্যনারায়ণের সিন্নি বা গোটা সেদ্ধ বিলি করার মধ্যেই মাহাত্ম্য বাড়ে। কাজেই আমরাও অরন্ধনের সকাল থেকে রেকাবি গুনতাম, এখনো রেকাবি আসা বাকি। একইরকমভাবে ভাদ্র সংক্রান্তির অরন্ধনের দিনেও অপেক্ষা থাকত পান্তা ভাত, বিভিন্ন রকম ভাজার। সে আরেক গল্প। রান্না পুজোর। উনুনের চারপাশে ও ভিতরে আলপনা এঁকে সিজমনসার ডাল পুঁতে রান্না করে খাবার সাজাত আমার দিদিমা। চলত মনসার পুজো। তারপর হরেক নাড়ু আর ভাজাভুজির পাশে ফুটকড়াই ভাজা প্রসাদ পেতাম আমরা।
গোটা সেদ্ধর রেকাবি না এলে সশরীরে প্রতিবেশীর বাড়িই চলে যেতাম। বসন্ত তখন সবার মনে, হলুদ হলুদ শাড়ি পরে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। সবাই এমনিই খুশি। খুশি করতে কৌশল করতে হত না। ‘কমফোর্ট ফুড’-এর সংজ্ঞা সেদিন জানতাম না। আজ শুনি গোটা সেদ্ধ, পান্তা ভাত আসলে কমফোর্ট ফুড। বসন্তের আগমনে শরীরে যাতে বসন্ত না ধরে, সে জন্যই এসব বাঙালির পথ্য। ঋতু পরিবর্তনে শরীর সুস্থ রাখতে পূর্ববঙ্গে জ্যৈষ্ঠ মাসে শুক্ল ষষ্ঠীর দুপুরে এবং কার্তিক সংক্রান্তির দুপুরে এমন অরন্ধনের চল ছিল। বাঙালি অবশ্য সেই অরন্ধনে খই চিঁড়ে খেত।
