‘চন্দ্র-সূর্য যতদিন, আমার ভাইয়ের আয়ু ততদিন’ : ঘরে ঘরে ভাই-বোনের মিলন পার্বণ

মা-ঠাকুমার ভাষায় যা ‘যম দ্বিতীয়া’, নগর-কথনে তা-ই ‘ভাই দ্বিতীয়া’

শ্যামাকালীর থানে পিদিম পড়ল। বাজি পোড়ার কাজ চললো দিনভর। বাজি শেষে কাঠামের লাল শালু-র একরত্তি বছরের হিসেব গুণতি করা শুরু। গাঁ গঞ্জে বা নগরে বাংলার গার্হস্থ্য জীবনে কার্তিকী দ্বিতীয়ার প্রবেশ ঘটলো। মা-ঠাকুমার ভাষায় এই ক্ষণ নাম নিয়েছে ‘যম দ্বিতীয়া’। আর নগর-কথনে ‘ভাই দ্বিতীয়া’ (Bhai Phota)। আজ ভাই-বোনের প্রীতি মিলন। আসলে বোন যমুনার কীর্তি সংলাপ এমন দিনে বচন হয়ে ওঠে। মন কোটরের রূপ দর্পণে আজ সব ভাইয়েরাই যমুনার মুখ দেখে নিজের বোন রূপের আড়ালে আবডালে। ওদিকে বাপের চোখে পানি উজান পায়। তাঁর নকশি কাঁথার মাঠ উজিয়ে দূর থেকে শোনা যায় পালকি বেহারার ‘হুম হুনা, হুম হুনা’। এমনভাবেই বোনেদের ঘর বেড়ে ওঠা। ঘরের কন্যে পরের মেয়ে হয়ে যায়, কিন্তু ভাই-বোনের সুতোর গিঁট ছেঁড়ে না। তাই বোনের বচন  ‘যমুনা দেন যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।’

ঘরের কন্যে পরের মেয়ে হয়ে যায়, কিন্তু ভাই-বোনের সুতোর গিঁট ছেঁড়ে না। তাই বোনের বচন  ‘যমুনা দেন যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।’

সেই কোন টুকটুকে বয়স থেকে মায়ের কাছে শোনা এক রাত শয়ানের গল্প। “…তারপর যমের বোন যমুনা শাস্ত্র মেনে চান করলে। চানের পর শালগ্রাম শিলা অর্চনা করে তাঁকে নম করে যমের কপালে প্রথম তিলক ফোটায়। সে আবার যেমন তেমন তিলক নয়। ভোরের শিশির দিয়ে সেই তিলকের চন্দন পাটায় তুলেছিল যমুনা। সেই ফোঁটার এমন গুণ যে তার মঙ্গল জোরে নরকের রাজা যম প্রথমে দীর্ঘায়ু আর পরে অমরত্ব পেলে।” বাংলার বোন টুকটুকিদের মনে বাসা বেঁধে থাকে যমুনার সেই উজানি কথা।

দেখতে দেখতে যমুনা ফোঁটার ভোর আসে। ঊষাকালে ভ্রাতৃমঙ্গল কাব্য রচনা পায়। "ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি চোখে লেগো না। ভোরের শিশির গো আমার ঝাঁপিতে আসন পাতি কর। আমার ভাইয়ের শিশির চন্দন করব।”

ওদিকে চিৎপুরে ছানা সন্দেশের ছাঁচ উঠেছে। ময়রা পাকায় ‘ভাইফোঁটা সন্দেশ’। সঙ্গে জোড়ে ফুলেল লতা পাতা। আর নগর কলকাতার ঘটি-বঙ্গের উত্তর সীমায় দোকানে দোকানে মিষ্টি খাজার চুড়ো ওঠে। এ পার্বণে বাড়ির অন্দরে চলে বস্ত্র, ধুপ-দীপের সঙ্গে ধান-দুব্বোর বাটি সাজান। দিওয়ালির দিনকে যম দুয়ারের বাতি পড়ে। আর দস্তুর-বোন কাজল তুলে রাখে ভাইয়ের জন্য সেই বাতির আগুন ছেনে। তোলা তোলা ভাইয়ের নাম লেখা কাঁসার বাসনে তেঁতুল ঘষা পরে। ভিয়েনে পায়েস ওঠে। ঘরে ম-ম সুবাস।

কারও ভাই রওনা দিলো বোনের জন্য আদর পুঁটুলি নিয়ে, আবার কারও ভাই আকাশ ঝাঁপির তারা হয়ে বোনকে আলো দেখায়। আবার কারও বা বোন আকাশ তারার ফোঁটা নিয়ে ভাইয়ের কপালে ‘টি’ দিয়ে যায়। ভাই-বোনের সুতোয় ভোঁ কাট্টা নেই।

বোনের বচন আলো হয়ে কথা কয়ে ওঠে।

“আকাশেতে দুন্দুভি বাজে

দ্বিতীয়াতে ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিতে সাজে।

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

যমের দুয়ারে পরল কাঁটা।

যমুনা দেন যমকে ফোঁটা

আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।

চন্দ্র-সূর্য যতদিন

আমার ভাইয়ের আয়ু ততদিন।”

Developed by DXDasia