
থাইল্যান্ডে নববর্ষ পালিত হয় ১২-১৪ এপ্রিল
জল নিয়ে খেলা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যতগুলি দেশ হিন্দু সভ্যতার দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং অনুসারী, থাইল্যান্ডের নাম তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ভারি চমত্কারভাবে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের নিটোল বুননে গড়ে ওঠা এক অপূর্ব সমাজ-সংস্কৃতি তথা রাজকীয় গরিমায় উজ্জ্বল এক দেশ। এখানে নববর্ষ পালিত হয় ১২-১৪ এপ্রিল। বর্ষবরণের এই দেশীয় আচার পরিচিত ‘সংক্রাণ’ নামে। সমগ্র দেশে এই উদযাপন হয় ধুমধামের সঙ্গে। ‘সংক্রাণ’ কথাটি এসেছে সংক্রান্তি থেকে। থাই সংক্রাণ অনুষ্ঠান শুরু হয় মহা সংক্রাণ অনুষ্ঠান দিয়ে। তারপর হয় ‘ওয়ান নাও’ (‘ওয়ান’ মানে দিন) অর্থাৎ পুরোনো বছর ও নতুন বছরের যোগক্ষণ সেটি এবং ১৫ এপ্রিল পালন করা হয় ‘ওয়াল থালোত্রং’ বা নববর্ষের শুভারম্ভ। তিনদিন ব্যাপি অনুষ্ঠানের মূল সুরটি থাকে আমাদের দোল উত্সবের মতো। থাইল্যান্ডের নিয়মটি অনুসৃত হয় ‘সুরিয়াইয়ারাত’ অর্থাৎ সূর্যসিদ্ধান্তের থাই-রূপকে মেনে। যখন সূর্যদেব মেষ রাশিতে প্রবেশ করেন সেই মুহূর্তটিকে ‘মহাসংক্রাণ’ রূপে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ে জ্যোতিষবিদরা জানিয়ে দেন দেশের আগামী অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে কৃষি ব্যবস্থার সব জরুরি এবং পূর্ণাঙ্গ খবরাখরব। এই বিষয়টি পরিচিত ‘প্রাকাত সংক্রাণ’ নামে। অনেকটা আমাদের পঞ্জিকার মতো।

স্থানীয় মানুষ, সন্ন্যাসী ও গুরুজনদের পা ধুয়ে দিচ্ছেন ভক্তরা
‘সংক্রাণ’ থাইল্যান্ডের জল-উত্সব বা ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল হিসেবে পরিচিত। এই উত্সবের সঙ্গে প্রাচীন ভারতবর্ষের কিছু যোগ আছে। শুধু থাইল্যান্ডে নয়, এখানে উল্লেখিত প্রতিটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গেই। একটি ছিল বাণিজ্যিক সম্পর্ক, দ্বিতীয়টি ছিল চোলা ও শ্রীবিজয়ার শাসকদের বার্ষিক বিজয় উত্সব। আজ হয়তো সেসব জিনিস চোখের সামনে নেই, কিন্তু এক সময়ে ছিল। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে নৌকা বা তরণীগুলি ব্যবহৃত হতো, সেগুলি প্রাচীন শ্যাম কম্বোজের যে দেশগুলিতে যেত তার খুব সুন্দর বর্ণনা আছে মেয়েদের ব্রতকথার ছন্দে, পাঁচালির কথাবার্তায়। কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলেও অনেক উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়। প্রাচীন মানুষরা বলেন অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গসহ এইসকল প্রতিবেশী দেশগুলিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যে মুনাফা হতো এবং নতুন করে মৌসুমী বায়ুকে সম্বল করে যাত্রা শুরুর আগে এটি ছিল সম্বত্সরের উদযাপন উত্সব। সাধারণ মানুষ পূজার্চনা করে, খুব ভালো করে নতুন কাপড়জামা পরে, ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করে উত্সবে মেতে ওঠেন।
সংক্রাণ উপলক্ষে প্রায় সমস্ত দেশের বুদ্ধমূর্তিকে জল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। মন্দিরে, গৃহে সর্বত্র। এছাড়া সবজায়গাতে তাত্ক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য পাম্প ব্যবহার করা হয় শহরের সব ক্যানালগুলির সঙ্গে যুক্ত করে, সেই জল দিয়ে শহর, গ্রামের সমস্ত রাস্তা ধুয়ে দেওয়া হয়।

লাইন দিয়ে পুজো দেবার ভিড়
থাইল্যান্ডের সংক্রাণ-এ রঙের ব্যবহার হয় না। কিন্তু সকালবেলায় ভগবান বুদ্ধের পাদপদ্মে সুগন্ধী জল দিয়ে ধৌত করে, ফুল-ফল, ধূপ-মোমবাতির আরাধনা করে দিন শুরু হয়। স্থানীয় মানুষ, সন্ন্যাসী ও গুরুজনদের পা ধুয়ে দেন সুগন্ধী জলে। ব্যক্তিগত সামর্থ্য অনুযায়ী দান-ধ্যানও করেন। তারপর শুরু হয় জল নিয়ে খেলা। সকাল থেকে প্রায় বিকাল পর্যন্ত দলে দলে মানুষ সুগন্ধী জল বা পরিষ্কার জল ও সাদা পাউডার একে অপরকে লাগিয়ে দেন। সমস্ত বয়সের মানুষ, এমন কি থাইল্যান্ডে বসবাসকারী বিদেশিরাও এতে যোগদান করেন। বেলফুলের মালা, অর্কিড এই সময়ে প্রচুর ব্যবহার হয়। সুন্দর ফুলের মোটিফ দেওয়া ডিজাইনের জামা-কাপড় পরেন সবাই। গলায় বা মাথায় পরেন অর্কিডের মালাও।
পরিবারের সকল সদস্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন সবাই একসঙ্গে এই উত্সব পালন করার। নিজে দেখেছি ব্যাঙ্কক থেকে হাজার হাজার গাড়ির ট্রাফিক চলেছে বাইরের জেলাগুলিতে। নববর্ষের ছুটিতে প্রত্যেকেই চান পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে।
জাতীয় পোশাক পরে, সুন্দরভাবে সেজে নানা অনুষ্ঠানে মহিলারা অংশগ্রহণ করেন। খাওয়া-দাওয়াও হয় নানান থাই-মিষ্টি দেশীয় প্রথায় বানিয়ে। থাই খাবার অত্যন্ত সুস্বাদু ও নানান উপাদানে তৈরি। তারই মধ্যে ‘থংইয়োদ’ (Thongyod) নামে একটি বিশেষ মিষ্টি খাবার বানানো হয়। সেটি ডিমের কুসুম, ময়দা ও ফুলের নির্যাসের সিরাপ দিয়ে তৈরি। এই খাবারটিকে থাইরা সৌভাগ্য ও সুসাম্যের প্রতীক রূপে গ্রহণ করেন। এছাড়াও উত্তর থাইল্যান্ডের মানুষরা এক বিশেষ ধরনের মুরগি ও ডিমের স্যালাড বানান যা অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘ইয়ুম গিন গাই’ (Yum Gin Gai) নামে। নানারকম অনুষ্ঠান, নাচ-গান তো হবেই।

থাই নবগ্রহ মূর্তি
সংক্রাণ উপলক্ষে প্রায় সমস্ত দেশের বুদ্ধমূর্তিকে জল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। মন্দিরে, গৃহে সর্বত্র। এছাড়া সবজায়গাতে তাত্ক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য পাম্প ব্যবহার করা হয় শহরের সব ক্যানালগুলির সঙ্গে যুক্ত করে, সেই জল দিয়ে শহর, গ্রামের সমস্ত রাস্তা ধুয়ে দেওয়া হয়।

থাই হিন্দু ব্রাহ্মণ নতুন বছরের পুজো করেছেন
থাই মানুষদের নবগ্রহের প্রতি বিশ্বাস বহু প্রাচীন। থাই নববর্ষে এই নবগ্রহের পুজো একটি বিশেষ ঘটনা। রাজ পরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ প্রত্যেকেই এই নবগ্রহের পুজোর আশীর্বাদ পান। কিন্তু হয়তো বর্তমান যুগে তার মূল উৎপত্তিটি কোথায় সেটি সম্বন্ধে সকলে অবগত নন, কিন্তু প্রাচীন থাই পাণ্ডুলিপিতে নবগ্রহের সূচনা এবং চরিত্রগুলির উল্লেখ করা হয়েছে। সেই কাহিনি অনুযায়ী সৃষ্টির যে নিরন্তর চক্র, সেই চক্র যখন আবার নতুন করে চলতে থাকে, যখন সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংস, তখন শিব নতুন করে এই জগত সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি নতুন করে মহাবিশ্ব ও নতুন প্রাণ সৃষ্টি করেছিলেন এবং সৃষ্টিতত্ত্বকে শাসন করার জন্য নির্মাণ করেন নবগ্রহ। আর সেই নবগ্রহকে দেখা শোনা করার জন্য ছিলেন শিব পুত্র গণেশ। সেই জন্য থাইদের বিশ্বাস গণেশকে যদি সন্তুষ্ট রাখা যায় তাহলে সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র সবকিছুই সন্তুষ্ট থাকবে। সেই জন্য এই কদিন ধরে গণেশের পুজো ভীষণভাবেই সারা থাইল্যান্ডে চলতে থাকে।

ফল-ফুল দিয়ে নববর্ষের অর্ঘ্য নিবেদন
ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রে গ্রহ এবং মহাকাশীয় বস্তু হিসাবে: সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি এবং আরোহী-অবরোহী চন্দ্র যথাক্রমে রাহু এবং কেতু নামে পরিচিত। যখন আমরা থাই ভাষায় নবগ্রহের উল্লেখ করি, তখন এর দুটি নাম রয়েছে। থাই পণ্ডিত এবং শিল্পীদের ঐতিহ্যগত জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে নবগ্রহদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তাঁদের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। তদুপরি, নয়টি গ্রহের দেবতার সাতটি দেবতা, প্রত্যেককে প্রতিটি দিনের দেবতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়, উদাহরণস্বরূপ মঙ্গলা (বা অঙ্গার) মঙ্গলবারের দেবতা। একটি দেবতাদের নামে এবং দ্বিতীয়টি দিনের নাম;
ফ্রা আর্থিট/আর্থিত, আদিত্য, সূর্য – রবিবার
ফ্রা চ্যান/চ্যান চন্দ্র বা চাঁদ – সোমবার
ফ্রা অ্যাং কার্ন/ অ্যাং কার্ন, মংখন – মঙ্গলবার
ফ্রা পুট/পুট, বুধ – বুধবার
Phra Pruehatsabodee/ Prue Hat প্রা পুয়েত সাবদি, বৃহস্পতি – বৃহস্পতিবার
ফ্রা সুক/সুক, শুক্র – শুক্রবার
ফ্রা সাও/সাও, শনি, সানি – শনিবার
থাই মতে ফ্রা রাহু/ রাত্রে, এবং
ফ্রা কেট/ —কেতু দিনের বেলা বুধবারের একটি অর্থ রাহু একটি অর্ধকেতু বলে তারা বিশ্বাস করেন এবং প্রতিটি দিন হিসেবে তাদের কাপড় জামার রং পরিবর্তন হয়।
থাইরা তাদের নববর্ষের উত্সবকে কেবলমাত্র একটি অনুষ্ঠান রূপে না দেখে একটি বিশুদ্ধিকরণ উত্সব হিসেবে দেখতে ভালবাসেন। ভগবদ্গীতায় যে অন্তঃশৌচ ও বহিঃশৌচ-এর ধারণার কথা শ্রীকৃষ্ণ উল্লেখ করেছেন, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি যেন সেই উপদেশকেই নিজেদের জীবনে প্রতিফলিত করে তোলেন।
_____________
ছবি সৌজন্যে: Ploy Yamapaywon, Pichada Rajavechpisal, Monk Apichet
