
বাংলার লোকমেলা : বঙ্গের লোক সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল
‘মেলা’ বড়ো মায়াময় এক শব্দ। উৎসব, আনন্দ, হুল্লোড় পেরিয়ে মেলা হয়ে ওঠে লোক সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। নাগরদোলা, তেলেভাজার দোকান, জিলিপি-গজা-নিমকি-মালপোয়ার ভিয়েন, সারি দিয়ে সাজানো ঢাকাই পরোটা, বেলুনওয়ালা, মনোহারী থেকে রকমারি দোকান, হরেক মালের দোকানিদের হাঁক, মাঝে বাঁধা ছোট্ট মঞ্চ, সেখানে কেউ পড়ছে কবিতা, একদল ‘মম চিত্তে’ বা ‘আয় তবে সহচরী’-তে পা মেলাচ্ছে, মেলা বলতেই ভেসে ওঠে এ ছবি।
জয়দেব-কেঁদুলি বা শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা ছাড়াও গ্রাম বাংলার নানা প্রান্তে আয়োজিত হয় অজস্র লোকমেলা। হয়তো কোনও না কোনও ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরেই জন্ম হয়েছিল সেসব মেলার কিন্তু সময়ের সরণি বেয়ে, সেই মেলাগুলো পরিণত হয়েছে লৌকিক উৎসবে। হয়ে উঠেছে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ধারক, বাহক।
উত্তর ২৪ পরগনার বাণীপুর লোক উৎসব আয়তনে বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা। উদ্বাস্তু অধ্যুষিত হাবড়া-অশোকনগর ঘেঁষা জনপদ বাণীপুর। মেলার বয়স সত্তর বছর। ১৯৫৬ সালের ২৮ মার্চ লোক উৎসব শুরু হয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় লোক উৎসব আয়োজিত হয়েছে। বিশেষ কারণে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত উৎসব বন্ধ ছিল৷ ১৯৮৬ সাল থেকে এলাকাবাসীর উদ্যোগে ফের শুরু হয়, যা এখনও চলছে। বিভিন্ন পসরা, বিকিনিনি ছাড়াও মেলার আকর্ষণ নানা প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক উৎসব, হস্তশিল্পের সম্ভার, ছৌ নাচ, ঝুমুর, রায়বেঁশে, নাটুয়া, পুতুল নাচ, লেটো, পালাগান, কবিগান, বাউল গান, যাত্রার আসর। মেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে তৈরি করা হয় সাত-আটটি মঞ্চ। লোক সংস্কৃতির উদযাপনই এ মেলার প্রধান উপজীব্য।
জমিদার, রাজা-মহারাজা, ভূ-স্বামীরাও বহুক্ষেত্রে মেলার সূচনা করেছেন। আপাতভাবে সেগুলোর জন্ম উৎসব উপলক্ষ্যে মনে হলেও, আড়ালে ছিল অন্য কারণ। যেমন, গোবরডাঙার গোষ্ঠবিহার মশলা মেলা। মেলার বয়স দু’শো বছরের বেশি, প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে এই মেলা বসে। মনে হতে পারে, নতুন বছর উপলক্ষ্যে মেলা। আদতে এটি ছিল খাজনা আদায়ের কৌশল।

জমিদার, রাজা-মহারাজা, ভূ-স্বামীরাও বহুক্ষেত্রে মেলার সূচনা করেছেন। আপাতভাবে সেগুলোর জন্ম উৎসব উপলক্ষ্যে মনে হলেও, আড়ালে ছিল অন্য কারণ। যেমন, গোবরডাঙার গোষ্ঠবিহার মশলা মেলা। মেলার বয়স দু’শো বছরের বেশি, প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে এই মেলা বসে। মনে হতে পারে, নতুন বছর উপলক্ষ্যে মেলা। আদতে এটি ছিল খাজনা আদায়ের কৌশল। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে কৃষকরা জমির উৎপাদিত ফসল মেলায় এসে বিক্রি করে জমিদারের খাজনা মিটিয়ে যাবেন, এ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল মেলা। জমিদারি প্রথা অবলুপ্ত এখন। তবুও মেলা চলছে। নিয়েছে উৎসবের চেহারা।
জেলার সোদপুর ও আগরপাড়া অঞ্চলে আরও দুটি প্রাচীন মেলা বসে। সোদপুরে জৈষ্ঠে আয়োজিত হয় দণ্ডমহোৎসব। পাঁচশো বছরের অধিক প্রাচীন এই বৈষ্ণব উৎসব দই-চিঁড়ের মেলা নামে পরিচিতি। ভক্ত, ভক্তি আর ভগবান পেরিয়ে পানিহাটির ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে উঠেছে চিঁড়ের মেলা। মাঘ মাসে আগরপাড়ায় পীরের মেলা বসে একটি মাজারকে কেন্দ্র করে। মেলার বয়স দু’শোর বেশি।
আরও পড়ুন: বাংলার মেলা বদলে দিয়েছে শিল্পের রুটম্যাপ
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের মথুরাপুরে এক অদ্ভুত মেলা আয়োজিত হয়। নাম ‘ভাঙা মেলা’। এই মেলায় শুধুমাত্র ব্যবহৃত, পুরনো, ফেলে দেওয়া জিনিসের কেনাবেচা হয়। একজনের অকেজো জিনিস কিনে নিয়ে যান আর একজন। এই মেলাটিও বৈষ্ণব সংস্কৃতির ফসল। শোনা যায়, উড়িষ্যা যাওয়ার পথে চৈতন্য মহাপ্রভু মকর সংক্রান্তির দিন একবার মথুরাপুরে রাত কাটান। তখন থেকে মেলার প্রচলন। পৌষ সংক্রান্তির দিন থেকে প্রতি বছর এক মাস ধরে মেলা চলে। দুই ২৪ পরগনার প্রান্তিক এলাকা যেমন মিনাখাঁ, সুন্দরবন, জয়নগর ইত্যাদি অঞ্চলে ভাদ্রর শেষে বাইচ প্রতিযোগিতা হয়। ধান রোপনের পর গ্রামের কৃষিজীবীদের অবসরের সময়ে আয়োজিত বাইচ প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে মেলা বসে।
নদিয়া জেলার কল্যাণীর ঘোষপাড়ায় দোলপূর্ণিমার সময় সতী মায়ের মেলা বসে। জনশ্রুতি আছে, আউলিয়া সম্প্রদায়ের সতীমা অর্থাৎ সরস্বতী দেবী এই মেলা শুরু করেছিলেন। মেলার বয়স দু’শো বছরের বেশি। মেলায় আউল, বাউল, ফকির, সন্ন্যাসীদের ভিড় উপচে পড়ে। চলে ভাবের গান। ধর্ম-ভাবনা পেরিয়ে এই মেলা হয়ে উঠেছে সর্বজনের উৎসব।
বড়োদিন উপলক্ষ্যে নদিয়া জেলার চাপড়ায় বসে সাতদিনের বড়োদিনের মেলা। চাপড়ার খ্রিস্ট মেলার বয়স শতবর্ষ অতিক্রান্ত। শোনা যায়, অবিভক্ত বাংলার রতনপুরে এই মেলার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে চাপড়ায় চলে আসে সেই মেলা। প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই মেলা চলে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই মেলা বাঙালির এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দু’শো বছরের বেশি সময় ধরে নদীয়া জেলার তেহট্টের পাথরঘাটা এলাকায় বিএসএফ ক্যাম্পের পাশে চাচা ফকিরের মেলা চলছে। একদা দুই বাংলার মানুষ এই মেলায় অংশ নিতেন। জনশ্রুতি অনুসারে, সীমান্ত লাগোয়া গ্রামে বাস করতেন চাচা-ফকির। এখন সেখানে আছে চাচা-ফকিরের দরগা। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের দু’তারিখ থেকে ৪ তারিখ পর্যন্ত এই মেলা চলে। প্রথম দিন সাধুসন্ত, ফকিররা মেলায় অংশগ্রহণ করেন। বাকি দু’দিন এলাকার সব ধর্মের মানুষ মেলায় জড়ো হন।
মাঘের পয়লায় হুগলির আদিসপ্তগ্রামের কাছে কৃষ্ণপুর বা কেষ্টপুর গ্রামে মাছের মেলা বসে। মেলার বয়স পাঁচশো বছরের বেশি। মাছের মেলা উত্তরায়ণ মেলা নামেও পরিচিত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন, আসেন মাছ ব্যবসায়ীরা। পুঁটি থেকে বোয়াল, রুই-কাতলা! মেলায় বিক্রি হয় ভেটকি, পমফ্রেট, চিতল, শংকর, চিংড়ি-সহ নানা ধরণের মাছ। মাছ কিনে, মজে যাওয়া সরস্বতীর তীরে মাছ ভাজা খেয়ে পিকনিক পর্যন্ত হয়। পেল্লায় সাইজের মাছ আনেন বিক্রেতারা। তা দেখতে ভিড় জমে। অন্যদিকে, শ্রীপাটে চলে নাম-গান, মহোৎসব।
হাওড়ার উদয়নায়ারণপুরের সিংটি গ্রামের মেলার অন্যতম আকর্ষণ আলুর দম। প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিন বসে খাঁ পীরের মেলা। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ আসেন, মাঠে বসে মুড়ি আলুর দম খান। আলুর দম বিক্রি হয় কেজি দরে। শীতকালে হাওড়া, হুগলির নানা প্রান্তে আলুর দমের মেলা বসে। খাঁ পীরের মেলায় কাঁকড়াও বিক্রি হয়। সিংটি গ্ৰামে আসা মুসলমান পীর ‘ভাই খাঁ’ নামেই একদিনের মেলা বসে।
উত্তরবঙ্গের চারু শেঠের মেলার জন্ম স্থানীয়দের উপার্জনের উপায় খুঁজতে। স্থানীয় মানুষদের বানানো কাঠের জিনিস বিক্রির জন্য আড়াইশো বছর আগে পুরাতন মালদহের ঐতিহ্যবাহী চারু শেঠের মেলা শুরু হয়েছিল। স্থানীয়রা নিজের হাতে বানানো কাঠের হাতা, খুন্তি, ডালের কাঁটা, বটি, বেলন-চাকি, কাঠের পিঁড়ি নিয়ে মেলায় আসেন, বেচেন।
মালদহের ধাওয়াইল গ্রামে বসে কংসব্রতর মেলা। গ্রামের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন এক বটগাছ। বটের নীচে ‘কংসের বেদী’র উপরে থাকে কষ্টিপাথরের কংস মূর্তি। কথিত আছে, এই গ্রামে কৃষ্ণ কংসকে বধ করেছিলেন। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে ফি বছর কংসব্রত উৎসব ও মেলা আয়োজিত হয়। মেলার বয়স পাঁচশো বছরের বেশি। মাঘী পূর্ণিমার দিন কংস মূর্তির পুজো হয়, পাশাপাশি আগুন পুজোও হয়। তাই এই মেলাকে আগুনের মেলাও বলা হয়। দিন পনেরো জুড়ে মেলা চলে। ১৯০৯ সালে ইসলামপুরে জমিদার ইউসুফ চৌধুরী উর্স্ মেলার সূচনা করেন। ১৯৬০ পীর ফজলে রব্বির স্মরণে এই মেলার নামকরণ হয় উর্স্ মেলা। মেলা প্রাঙ্গণে রয়েছে পীর রব্বির মাজার। সব ধর্মের মানুষ আসেন মাজারে। মেলায় জলসায় কাওয়ালি গান পরিবেশিত হয়। মেলার অন্যতম আকর্ষণ উটের পসরা। আগে হাতি-ঘোড়াও এখানে বিক্রি হত। পুরাতন মালদহের মোকাতিপুর কলোনির জুয়ার মেলা খুব বিখ্যাত। অগ্রহায়ণে মুলো ষষ্ঠী তিথিতে এই জুয়া বা শেউড়ির মেলা বসে। রায়গঞ্জের ছোট পারুয়া মিশনে বড়দিনের মেলা বসে। জলপাইগুড়ির জল্পেশ মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর শিব চতুর্দশীর মেলা বসে। এটিই উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ মেলা। লোকগানের আসর মেলার বিশেষ আকর্ষণ।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের মথুরাপুরে এক অদ্ভুত মেলা আয়োজিত হয়। নাম ‘ভাঙা মেলা’। এই মেলায় শুধুমাত্র ব্যবহৃত, পুরনো, ফেলে দেওয়া জিনিসের কেনাবেচা হয়। একজনের অকেজো জিনিস কিনে নিয়ে যান আর একজন। এই মেলাটিও বৈষ্ণব সংস্কৃতির ফসল। শোনা যায়, উড়িষ্যা যাওয়ার পথে চৈতন্য মহাপ্রভু মকর সংক্রান্তির দিন একবার মথুরাপুরে রাত কাটান। তখন থেকে মেলার প্রচলন।
উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার দলুয়া মেলার বয়স ১৪০ বছর। জনৈক পাহাড় সিংহ নামে এক সন্ন্যাসী দলুয়া এলাকায় ডাউক নদীর ধারে একটি শিব মন্দিরের স্থাপন করেন। মাঘী পূর্ণিমার পুণ্য স্নানকে ঘিরে মেলা বসে। সেই মেলাই দলুয়া মেলা বলে পরিচিত। এক মাস ধরে মেলা চলাকালীন চোপড়ার হাটের দিন হাট চত্বরে হাট বসে না। মেলাতে বসে হাটের দোকান। মেলায় পাওয়া যায় রকমারি মাছ। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সমবেত হন মেলায়।
বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ার সুপ্রাচীন মুড়ি মেলা ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। প্রতি বছর মাঘের ৪ তারিখ, দ্বারকেশ্বর নদের চরে মুড়ির মেলা বসে। চপ, আলু সেদ্ধ, ছোলা, মটর, চানাচুর ইত্যাদি দিয়ে মুড়ি মেখে, দ্বারকেশ্বরের তটে বসে খান মানুষজন।
ফি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিন পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর ১ ব্লকের বেড়ো গ্রামে লৌকিক দেবী খেলাই চণ্ডীর মেলা বসে। কথিত আছে, এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন পঞ্চকোট বংশের রাজারা। তাঁরা কেশবরাও জিউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মন্দির প্রতিষ্ঠার পর খেলাই চণ্ডীর মেলা শুরু হয়। মাঘের প্রথম দিনে খেলাই চণ্ডীর মন্দিরের সামনে হাট বসত। সেই হাটই পরে মেলার চেহারা নিয়েছে। মানভূমে কংসাবতী নদীর তীরে বুধপুর গ্রামে মাকুড়ি মেলা বসছে কয়েক শতাব্দী ধরে। সরস্বতী পুজোর একদিন পরে নদীর চড়ে মেলা বসে। মেলার মেয়াদ একদিন, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। পুরুলিয়ার দেউলঘাটা মেলা, ঘঙার মেলাগুলো আজ লোকমেলার চেহারা নিয়েছে।

পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুরে বুড়োরাজের মন্দিরকে ঘিরে বৈশাখের পূর্ণিমায় মেলা বসে। বুড়োরাজ লৌকিক দেবতা, শিব, যম-ধর্মরাজের মিলিত রূপ। এই জেলার ভেদিয়ায় অজয়ের তীরে বত্রিশ ফুঁকোর স্নানের মেলা বসে। পৌষসংক্রান্তির দিন মেলায় আসা মানুষ অজয়ের চরে বসে চড়ুইভাতি করে। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের রামনগর গ্রামে হয় একদিনের ব্রহ্মদৈত্য মেলা বসে। এই মেলার মাটির পুতুল খুবই জনপ্রিয়। মৃৎশিল্পীরা পসরা নিয়ে ভিড় জমান মেলায়। আউশগ্রামের বসন্তপুর গ্রামের বেরেণ্ডা অঞ্চলের কুনুর নদী তীরে বাবুরবাঁধে পৌষে আয়োজিত হয় খটিলা বিবির মেলা।
বীরভূমের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রাচীন মেলা, দাতাবাবার মেলা। এই মেলার জিলিপি খুব বিখ্যাত। বিউলির ডাল, আতপ চালের গুঁড়ো তৈরি হয় বিশেষ জিলিপি। জেলার রায়পুরে চব্বিশ প্রহরের মেলা বসে গ্রীষ্মে। ১৯২০ সালে দুর্গাপদ চক্রবর্তীর হাতে মেলার সূচনা হয়েছিল। প্রতি বছর ৭ জ্যৈষ্ঠে মেলা শুরু হয়, শেষ হয় ১০ জ্যৈষ্ঠে। বীরভূমের দেউলি গ্রামে পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষ্যে মেলা বসে। একদিনের মকরস্নানের মেলায় নানা প্রান্তের মানুষ গরুর গাড়ি নিয়ে পিকনিক করতে যান। গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির আসর হয়ে ওঠে মেলার মাঠে।
ঝাড়গ্রামের বিনপুরের হাড়দা গ্রামে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো উপলক্ষ্যে মেলা বসে। পুজোর বয়স ১৬২ বছর। দেবীর মূর্তিতে রয়েছে লৌকিক আদল। একই চালায় থাকে লক্ষ্মী-সরস্বতী। মাথার উপর থাকে নারায়ণ। এই পুজো ও মেলা, ওই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বাংলার দিকে দিকে মহরম উপলক্ষ্যেও মেলা আয়োজিত হয়। দার্জিলিঙের খড়িবাড়ির চুনীলালজোতের মহরমের মেলা প্রায় একশো বছরের পুরনো। ইংরেজবাজারের মীরচক মহল্লার লাঠিখেলা মাঠের মহরম মেলা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের অমৃতখণ্ডের মহরম মেলা, তপনের হজরতপুর গ্রামের মহরমের মেলা খুবই জনপ্রিয়।
বাংলার একাধিক অঞ্চলে মিষ্টি মেলাও আয়োজিত হয়। ফি বছর অগ্রহায়ণ মাসে কৃষ্ণা একাদশী তিথিতে কাটোয়া থেকে খানিক দূরে শ্রীখণ্ড গ্রামের বড়ডাঙায় নরহরির মিলনমেলা বসে। সপ্তাহব্যাপী এই মেলার মূল আকর্ষণ হল মিষ্টি। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের বেশি সময় ধরে এই মেলা চলে আসছে। কোলবালিশের মতো আকারের রসালো মিষ্টি বিক্রি হয় মেলায়। লম্বা আকৃতির জন্য মিষ্টির নাম দেওয়া হয়েছে রসবালিশ। পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে দোলপূর্ণিমায় মিষ্টি মেলা বসে। আকর্ষণের কেন্দ্র হল ‘নোড়া’ মিষ্টি। যেন অতিকায় ল্যাংচা! ছানা, ময়দা, সুজি আর চিনির রস দিয়ে তৈরি এই মিষ্টি। কালনার মেদগাছি এলাকায় ধর্মরাজের পুজো উপলক্ষ্যে মেলা বসে। এই মেলাও মিষ্টি মেলা হিসাবে জনপ্রিয়। বড় বড় পেল্লায় সাইজের মিষ্টি মেলার প্রধান আকর্ষণ। নদীয়ার শিমুরালির (ঘেটুগাছি) ধর্মতলাতেও মিষ্টির মেলা হয়। মেলার বয়স দু-আড়াই’শো বছর। অগ্রহায়ণ মাসের শেষ শনিবার ধর্মঠাকুরের পুজো উপলক্ষ্যে মেলা বসে। সেখানে ঢাউশ মিষ্টি বিক্রি হয়। বড় কাতলা মাছ, মানকচু আর নোড়া মিষ্টি ছিল মেলার তিন প্রধান পসরা। বাকি দু’টি হারিয়ে গেলেও টিকে আছে রসের ঢাউশ মিষ্টি। কালনার নান্দাই পঞ্চায়েতের হাতিপোতা গ্রামের দেবদাস স্মৃতি মেলাও হয়ে উঠেছে মিষ্টির মেলা, পেল্লায় সাইজের মিষ্টির বিকিকিনি চলে। ফি বছর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিনে শুরু হয় মেলা।
আবহমান বঙ্গ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল মেলা। মূলত কার্তিক-অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ-ফাল্গুন অবধি, শীত শীত সময়টায় মেলার আয়োজন বেশি হয়। পল্লি বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি মেলা। অধিকাংশ মেলার উৎপত্তি হয়েছে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কিন্তু মেলা যে বিকিকিনি ও লোক সংস্কৃতির বৃহত্তর ক্ষেত্র তা অস্বীকার করা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং লোক-সংস্কৃতিই শতাব্দী প্রাচীন মেলাগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মেলায় মাটির জিনিস, বেতের জিনিস, হাতে আঁকা পট বিক্রির বাজার পান স্থানীয় শিল্পীরা। মেলায় স্থানীয় সংস্কৃতির উদযাপন হয়। গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকা হয়ে ওঠার পাশাপাশি মেলা হয়ে উঠেছে লোক সংস্কৃতির বৃহত্তর মঞ্চ। মেলায় আসা বিক্রেতা এবং পর্যটকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান ঘটে। কোনও মেলা থেকে কোনও বিশেষ ঘরানার পুতুল, বিশেষ ঢঙের পট কিনে নিয়ে যান ক্রেতারা। এতে শিল্প ও শিল্পী দুই-ই বাঁচে। একই সঙ্গে প্রান্তিক শিল্পধারা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর আঙিনায়। এটাই লোকমেলার সার্থকতা।
