চড়ক সদৃশ্য ধর্মীয় সংস্কৃতি
বাংলার চড়ক পুজোর একটি ইতিহাস আছে। তবে তা স্পষ্ট না। চড়ক নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন চড়ক বাংলার বৌদ্ধ অবশেষ, কেউ বলেন নাথ অবশেষ আবার কেউ বলেন চড়ক বাংলার প্রাচীন কোম ধর্মের একটি রূপ। বিতর্ক যাই হোক, আজ পর্যন্ত চড়ককে কেউ পৃথিবীর অন্য কোনো সভ্যতার সঙ্গে তুলনা করে দেখেননি। বড়ো জোড় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও মধ্যভারতের নানা জাতিগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে চড়ক ও গাজনের সম্পর্ক নির্ধারন করে ক্ষান্ত হয়েছেন। কিন্তু একটু এদিক-ওদিক তাকালে দেখা যাবে চড়ক শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ না, পৃথিবীর আরও কিছু অঞ্চলে চড়ক সদৃশ্য ধর্মীয় ক্রিয়া হয়ে থাকে। চড়কের সঙ্গে শুধু যে তাদের ক্রিয়াগত মিলই আছে এমন না, আছে দর্শনগত মিলও।
চড়ক শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ না, পৃথিবীর আরও কিছু অঞ্চলে চড়ক সদৃশ্য ধর্মীয় ক্রিয়া হয়ে থাকে। চড়কের সঙ্গে শুধু যে তাদের ক্রিয়াগত মিলিই আছে এমন না, আছে দর্শনগত মিলও।
এপ্রিল-মে-জুন-জুলাই জুড়ে মেক্সিকোর নানা স্থানে ভোলাদোর (টোটোনেক ভাষাতে – Kgosni) আয়োজন করা হয়। ভোলাদোর হলো মেক্সিকোর চড়ক পুজো। টোটোনেক, মেক্সিনেক, টোলনেক, হুয়াসনেক প্রভৃতি জনজাতির মধ্যে বৃষ্টির আশায় প্রার্থনার প্রাচীন রূপ থেকেই ভোলাদোরের সূচনা বলে মনে করা হয়। বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ব মেক্সিকোর জঙ্গলাকীর্ণ গ্রামগুলিতে উৎসবের সূচনা হয় পাহাড় ও জঙ্গলের দেবতার (কিউইকগোলো) কাছে, একটি গাছ প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে। পাহাড় ও জঙ্গলের দেবতার অনুমতি মিললে নির্দিষ্ট প্রার্থিত গাছ ভোলাদোরের জন্য কেটে নেওয়া হয়। পাহাড় জঙ্গল পেরিয়ে সেই কাছে আনা হয় গ্রামের নির্দিষ্ট ভোলাদোর ময়দানে। মাটি খুঁড়ে পৃথিবীর দেবী ও ঝড়ের দেবতা ম্যামলেয়াব (Mâmlâab, ইনি কখনও কখনও জঙ্গল ও বনস্পতিরও দেবতা হয়ে ওঠেন, বাংলার ধর্মঠাকুর, পঞ্চনন ঠাকুরের মতো) ও আকযিনিকে (Aktzin) উদ্দেশ্যে কালো মোরগ বলি দিয়ে পৃথিবীবৃক্ষ বা চড়ক গাছ (Tsakatkiwi) স্থাপন করা হয়। গাছের একদম মাথাতে একটি চৌকোনা কাঠের চরকি লাগিয়ে তাতে চারটি দড়ি বাঁধা হয়। ভোলাদোররা একে একে উপরে উঠে আসে। মোট পাঁচজন মানুষ পৃথিবী বৃক্ষের উপরে ওঠে, তাদের মধ্যে একজন যিনি সবচেয়ে অভিজ্ঞ (k’ohal) তিনি গাছের একদম মাথাতে উঠে দাঁড়ান এবং তার বাঁশি (tapitzalli) ও ধুবকির (huehuetl) নির্দিষ্ট শব্দ শুনেই বাকি চারজন ভোলাদোর একে একে পায়ে দড়ি আটকে ঝুলে পড়ে এবং ঘুরতে থাকে। ঠিক যেন আমাদের চড়ক।
বাংলার চড়ক
বাংলাতে চড়ক পুজোর উৎস সন্ধানে মেক্সিকোর ভোলাদোর আরও একটি সূত্র আমাদের হাতে দেয়। মেসোমেরিকানদের মধ্যে কোথাও কোথাও বিশ্বাস ভোলাদোর ঝড়ের দেবতা আকযিনিকে (Aktzin) শান্ত করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়। এই ঝড় শান্ত করার প্রাচীন রীতিটিকে এড়িয়ে যাওয়া চলে না। বাংলার জনজীবনে ঝড় একটি প্রধান বিপদ। সামুদ্রিক ঝড়ের পাশাপাশি চৈত্র বৈশাখ মাসের কালবোশেখি বাংলার মানুষের কাছে বিভীষিকা। চন্ডিমঙ্গলে চন্ডি ধনপতির সপ্তডিঙা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পবনপুত্র হনুমানকে পাঠান। ঝড় হয়ে সে ধনপতির ছটি ডিঙা ধ্বংস করে, হনুমানের সঙ্গ দেয় বাংলার সমস্ত নদী, যাদের নেত্রী পদ্মাবতী। শিবের উপাসক বলে ধনপতি ছাড় পেলো। পরবর্তী কালে মুসলমান পীর পয়গম্বররা বাংলাতে এলে মাঝি মোল্লাদের মধ্যে বদর পীর ও খিজির পীর খুব বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এছাড়া বাংলার বিভিন্ন নদী তীরবর্তী গ্রামে যাত্রাসিদ্ধি ধর্ম ঠাকুরের পুজো হয়, যা ওই একই চেতনার প্রতিফলন।
আরও পড়ুন: টেরাকোটায় চড়ক : ঐতিহ্যের অনন্য আখ্যান
ঝড় মানেই ফসলের ক্ষতি, ঘরবাড়ি সম্পত্তির ক্ষতি, প্রাণহানি। ঝড় যেন বাঙালির চির শত্রুদের একজন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাকে শান্ত রাখার উপাসনা নিশ্চয় একসময় বাংলাতে সৃষ্টি হয়েছিলো। আজও গাজনে বহু জায়গাতে খেজুরভাঙ্গা বা খেজুর গাছে উঠে পাতা ধরে ঝুলে পড়া বা গাছকে সজোরে ঝাঁকানোর রীতি আছে। খেজুর বাঙালির কাছে একটা অকাজের ফল, সম্ভবত ঝড়ের উদ্দেশ্যে এমন একটি অকেজো ফল বলি দিয়ে বাকী কাজের ফসলকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো অভিসন্ধি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে। ঝড়ে গাছের দুলে ওঠার পবিত্র এই অভিনয় জন্ম-মরণ খেলারই আর একটি রূপ যেখানে ফসল ও জীবন একে অন্যের সমার্থক হয়ে ওঠে, ফসলকে বাঁচিয়ে রাখা আর পূর্বজ বীরদের বাঁচিয়ে তোলা তাই একই ধর্মীয় ক্রিয়ার অংশে পরিণত হলো।
ভোলাদোরের মধ্যে যেমন ম্যালেভোলেন্ট (অপশক্তি) আকযিনিকে শান্ত করা পরিলক্ষ্যিত হয়, ঠিক একই ভাবে বেনেভোলেন্ট (শুভশক্তি) বৃষ্টি বা ঋতুচক্রকে প্রত্যক্ষ করা যায়। বাংলার চড়কের মধ্যে এই দুইয়ের সরূপই লক্ষ্য করা যায়। চৈত্র থেকে শ্রাবণ, দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের ধানচাষি জনজাতিগুলির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি সময়, এই ক’মাসে প্রকৃতির মতিগতি তাঁদের সারা বছরের ভাগ্য নির্ধারন করে। বৃষ্টি হলো এই সময়ের সবচেয়ে কাঙ্খিত বিষয়। বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য ধ্বংসাত্মক (অশুভ) প্রাকৃতিক ঘটনা গুলি হলো খরা, বন্যা ও ঝড়। ফলে একই ধর্মীয় ক্রিয়ার মধ্যে সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তিকে তুষ্ট করার মধ্যে দিয়েই মেক্সিকোর ভোলাদোর ও বাংলার চড়ক-গাজনের উৎপত্তি বলে ধরা যেতে পারে।
পৃথিবীর নানা প্রান্তের এই সাংস্কৃতিক সংযোগগুলি মানুষের বহু কালের অভিবাসন ও সংস্কৃতির আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে জন্ম নিয়েছে। কোনো সভ্যতা ছোটো আর কোনো সভ্যতা বড়ো এই প্রচলিত ধারণা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে।
মেক্সিকোর ভোলাদোর
প্রথাগত দিক দিয়ে আরও একটি বিষয়ে মেসোমেরাকিয়ান ও দক্ষিণ পূর্ব ভারতের মিল লক্ষ্য করা যায়। ভোলাদোরে যে কালো মোরগের বলি দেওয়া হয় সেই কালো মোরগ আসলে অপশক্তির প্রতীক। কালো মোরগ বা তিতির জাতীয় পাখি বলি সারা পৃথিবীর আদিম ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। হর, টিপ্রি, হাজং, গারো, লিম্বু, গুর্খা প্রভৃতি জনজাতিদের পরবে কালো মোরগ আসলে অশুভ শক্তির প্রতীক ও তাকে বলি দেওয়া হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে চুরুক চাউলের কথা। হরদের পরবে বাড়ি বাড়ি চাল সংগ্রহ করে সেই চাল ও বলি দেওয়া কালো মোরগ বা কালো শুয়োরের মাংস মিশিয়ে যে খাদ্য তৈরি হয় তাকে চুরুক চাউল (মাংসের খিচুরি) বলে। সম্ভব এই চুরুক (সংগ্রহ করা) শব্দ থেকেই চড়ক শব্দটি বাংলাতে গৃহীত হয়েছে। আদিম গোষ্ঠী জীবনে ব্যক্তিগত প্রার্থনা বলে তেমন কিছু ছিলো না, সমস্ত আচার অনুষ্ঠান সমগ্র গোষ্ঠীর স্বার্থে সংগঠিত হতো বা এখনও হয়। চুরুক চাউল আসলে এই গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের প্রতীক।
আরও পড়ুন: চড়ক উৎসবের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে ধন্দ
পৃথিবীর নানা প্রান্তের এই সাংস্কৃতিক সংযোগগুলি মানুষের বহু কালের অভিবাসন ও সংস্কৃতির আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে জন্ম নিয়েছে। কোনো সভ্যতা ছোটো আর কোনো সভ্যতা বড়ো এই প্রচলিত ধারণা আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। এই চিন্তাধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে দুনিয়াকে বার বার বোঝা দরকার। পৃথিবীর মানুষের পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরের নানান ছোটো-বড়ো মিল গুলিই মানব সভ্যতার এক অখণ্ড সংস্কৃতির পরিচায়ক।
_______________
তথ্যসূত্র:
১। The Voladores (Flyers’) dance ceremony amongst the coastal peoples of Totonacapan – an aquatic ritual
২। The Voladores-Spectacle in Mexico – The ‘Ritual Ceremony of the Voladores’ as Intangible Cultural Heritage। Link: The Voladores-Spectacle in Mexico – The ‘Ritual Ceremony of the Voladores’ as Intangible Cultural Heritage.pdf.
৩। Ancient Indian Rituals And Their Social Contents
৪। FOLKLORE OF THE SANTAL PARGANA।
৫। আদিবাসী সংস্কৃতি ও সাহিত্য, আব্দুস সাত্তার।
৬। 2015.265840.Bangla-Samayikpatre.pdf বাংলার সাময়িক পত্রে আদিবাসী কথা।
৭। SANTALS OF THE SANTAL PARGANAS.pdf
৮। বাঁকুড়া কেন্দ্রিক মল্লভূমির উপভাষা।