বাংলার মেলা বদলে দিয়েছে শিল্পের রুটম্যাপ

মাদের বারো মাসে তেরো পার্বণ। শীত এলেই সেই পার্বণের পোয়া বারো। চারিদিকে উৎসব আর ধোঁয়া ওঠা গরম চা। সঙ্গে হই-হুল্লোড়, মজা এবং আরও কতকিছু। বাংলার সঙ্গে মেলার যোগটা প্রাচীন। বাংলার মেলা (Banglar Mela) যেমন মেলায়, তেমনি পরিচিতিও দেয়। নিজের শিল্পকর্মকে বহু লোকের সামনে তুলে ধরতে সাহায্য করে। অর্থনীতির আদানপ্রদান বাড়ে। বাংলায় মেলার ইতিহাস আদতে সামগ্রিক সভ্যতারই আখ্যান। হাজার বছরের সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের প্রাণস্পন্দন।

প্রাচীন নদী-সভ্যতার হাটবাজার থেকেই মেলার প্রথম রূপরেখা তৈরি হয়। চাষি, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের নিয়মিত লেনদেনের সঙ্গে সাপুড়ের খেলা, কবিগান, বায়নাপালা, লোকসংগীত ও নাট্যপ্রদর্শনী মিলিয়ে এই জমায়েতকে ধীরে ধীরে উৎসবে পরিণত করে। পাল ও সেন যুগে গঙ্গাস্নান, শিবপূজা, মনসা ও গ্রামীণ দেব-দেবীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে বৃহৎ জনসমাবেশের উল্লেখ পাওয়া যায় যা আজকের মেলার ধারাবাহিক রূপ। মধ্যযুগে বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাবে রথযাত্রা, দোলযাত্রা, ঝুলনযাত্রা ইত্যাদি উৎসবকে ঘিরে মেলা আরও বিস্তৃত হয়। ঔপনিবেশিক যুগে মেলার সঙ্গে যোগ হয় যাত্রা, পুতুলনাচ, হস্তশিল্প ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনী। স্বাধীনতার পর শহর ও গ্রামে বইমেলা, হস্তশিল্প মেলা, সাংস্কৃতিক উৎসব ও লোকউৎসবের পুনর্জাগরণে মেলা হয়ে ওঠে সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান মিলনমঞ্চ। বাংলার মেলা শুধু উৎসব নয়, বাংলার ইতিহাস, অর্থনীতি, লোকবিশ্বাস ও শিল্প-পরম্পরার এক টানা ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক মানচিত্র।

 

পৌষমেলা, শান্তিনিকেতন

গ্রাম বাংলার কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে যে মেলা-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা বাংলার মহিলাদের স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে।

পশ্চিমবাংলার মেলা কেবল উৎসব বা আনন্দের ক্ষেত্র নয় এগুলো আসলে বাংলার কুটির শিল্প, হস্তশিল্প ও লোকশিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো। বাংলার গ্রামাঞ্চলের হাজার বছরের কারুশিল্প ঐতিহ্য, যা বহুদিন ধরে আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল, সেই পণ্যগুলোকে প্রথম বৃহৎ বাজার দিয়েছে এই মেলাই। শান্তিনিকেতনের পৌষ মেলাকে কেন্দ্র করে বাউলসংগীত, শোলার কাজ, নকশি কাঁথা বা ডোকরার মতো শিল্প শুধু জাতীয় পর্যায়ে নয়, বিদেশি পর্যটক, গবেষক ও কিউরেটরের চোখে ধরা পড়ে বিশ্বব্যাপী পৌঁছেছে। একইভাবে বাঁকুড়ার ঘোড়া, কুমোরটুলির মূর্তি, পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ এই সবকিছুর আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে মূলত মেলার সরাসরি সংযোগ ও হাতেকলমে প্রদর্শনের মাধ্যমে। মেলার অন্যতম বড়ো শক্তি হল, এখানে শিল্পী ও ক্রেতার মাঝে কোনও মধ্যস্বত্বভোগী থাকে না। শিল্পী তাঁর হাতের কাজ সরাসরি দেখাতে পারেন এবং কাজের পিছনের গল্প বলতে পারেন। দেশ-বিদেশের ক্রেতা, ডিজাইনার বা সংগ্রাহকরা সেখান থেকেই পরিচিতি তৈরি করেন। ফলে ছোটো শিল্পীরা পাইকারি অর্ডার, এক্সপোর্ট লিঙ্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার পান, যা গ্রামাঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে, মেলায় বিভিন্ন রাজ্য ও দেশের শিল্পীরা এক জায়গায় প্রদর্শনী করে শিল্পের মধ্যেও একটি আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটে।

আজকের আন্তর্জাতিক বাজারে হ্যান্ডমেড, লোকাল, টেকসই, এথনিক এই চারটি ধারণার মূল্য বিপুল। মেলাগুলো শিল্পীদের সেই মূল্যকে সামনে আনার সুযোগ করে দিয়েছে। একজন গ্রামীণ শিল্পী যখন নিজের তৈরি শোলা, কাঠখোদাই, টেরাকোটার শিল্প সরাসরি বিদেশি ক্রেতার হাতে তুলে দেন, তখন তাঁর পণ্যের সঙ্গে মানবিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে। এই সংযোগই ক্র্যাফটকে কেবল বস্তু না রেখে একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় রূপ দেয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিম বাংলার মেলা শুধু শিল্পের প্রদর্শনী নয় এগুলো বাংলার লোকঐতিহ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচয় করানোর সেতুবন্ধন, যেখানে শিল্প, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করে।

মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তুলছে রাজ্য হস্তশিল্প মেলা

২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারতের হস্তশিল্প রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১,০৯৫ কোটি, এর থেকেই বোঝা যায় যে দেশজুড়ে হ্যান্ডমেড পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা কত দ্রুত বাড়ছে। এই বৃহৎ বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে পশ্চিমবঙ্গের ডোকরা, নকশিকাঁথা, শোলা, টেরাকোটা ও বাঁকুড়ার ঘোড়ার মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিনিয়ত নতুন বাজার পাচ্ছে। স্থানীয় উৎসবমুখী মেলাও এ ক্ষেত্রে কার্যকর যেমন শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় বছরে প্রায় ১,৫০০ স্টল থাকে এবং ১০,০০০-এর বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক আসে। এই বিপুল জনসমাগম শিল্পীদের জন্য সরাসরি বিক্রি, পাইকারি অর্ডার এবং বিদেশি কিউরেটরদের নজরে আসার সুযোগ তৈরি করে। গ্রাম বাংলার কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে যে মেলা-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা বাংলার মহিলাদের স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতের হস্তশিল্প খাতে কর্মরত কারিগরদের মধ্যে ৫৬.১ শতাংশই নারী, যা প্রমাণ করে এই ক্ষেত্রটি নারীদের কর্মসংস্থানের একটি স্তম্ভ। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ হস্তশিল্পে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৫.৫ লক্ষ কারিগর, যাঁদের বড়ো অংশই মহিলা। এদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে স্থানীয় ও রাজ্যস্তরের মেলা।

সব মিলিয়ে, মেলা এখন আর কেবল একটি লোকাল ইভেন্ট নয় ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা হয়ে উঠেছে গ্লোবাল প্রদর্শনী, যেখানে শিল্পীরা অফলাইন স্টলের পাশাপাশি অনলাইন বাজারও তৈরি করে ফেলছেন।

ডুয়ার্স উৎসব

শান্তিনিকেতন, বিষ্ণুপুর, ডুয়ার্স, কলকাতার হস্তশিল্প মেলার মতো প্ল্যাটফর্মে শিল্পীরা তাঁদের পণ্য মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি বিক্রি করতে পারেন, ফলে প্রতি মরশুমেই উল্লেখযোগ্য আয় হয়। সাম্প্রতিক একটি হস্তশিল্প মেলায় মাত্র ১০ দিনে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে। এই বিশাল বাজারের একটি বড়ো অংশই নারী-নির্ভর উৎপাদনের ফল। মেলায় আসা শহুরে ক্রেতা, পাইকারি অর্ডার এবং বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নারীদের আয়, সামাজিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়িয়েছে। ঘরের কাজের ফাঁকে বুটিক, কাঁথা, শোলা, ডোকরা বা বেতের কাজ করে মহিলারা নিয়মিত আয় করতে পারছেন। পরিবারে তাঁদের ভূমিকা আর সহযোগী নয় বরং উপার্জনকারী। ফলে মেলা নারীদের শুধু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে না,তাঁদের নিজের সৃষ্টিশীলতার মূল্য বুঝতে সাহায্য করে, সামাজিক পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের জীবনকে সত্যিকারের স্বাবলম্বী করে তুলেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার গত কয়েক বছরে কারিগরদের জন্য যে সব প্রকল্প চালু করেছে, তা রাজ্যের লোকশিল্প ও কুটিরশিল্পকে নতুন গতি দিয়েছে। বিশ্ব বাংলা মার্কেটিং কর্পোরেশন (BBMC)এবং রুরাল ক্রাফ্ট হাব (RCH) এর মতো উদ্যোগ শিল্পীদের উন্নয়ন, দক্ষতা-বৃদ্ধি, মাননিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ করে দিচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলোর আওতায় বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষেরও বেশি শিল্পী যুক্ত রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে বড়ো অংশই গ্রামীণ মহিলা। RCH-এর আওতায় থাকা কারিগরদের আয় যেখানে ২০১৪ সালে মাসে ৪–৫ হাজার টাকার মতো ছিল, এখন তা বহু ক্ষেত্রে ৮–১০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়ে গিয়েছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি সাহায্যে হস্তশিল্প মেলাগুলিতে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি। ২০২৪ সালে চালু হয়েছে West Bengal Artisans Financial Benefit Scheme যার মাধ্যমে কারিগররা আধুনিক যন্ত্রসামগ্রী, কাজের অবকাঠামো এবং ডিজিটাল ইকমার্স বাজারে প্রবেশের বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে, রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পগুলো শুধু শিল্প সংরক্ষণ করছে না, বাংলার কারিগর সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বাজারে টেকসই অবস্থান এবং সামাজিক মর্যাদা দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা

ডিজিটাল যুগ পশ্চিম বাংলার মেলাকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে। আগে যেখানে মেলার প্রচার হতো পোস্টার, মাইকে ঘোষণা বা স্থানীয় পুজো কমিটির হাতঘরে, এখন সেখানে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক প্রচার, ফেসবুক ইভেন্ট পেজ, ইনস্টাগ্রাম রিল, ইউটিউব ভ্লগিং এবং গুগল ম্যাপ ভেরিফায়েড লোকেশন। ২০২২–২৪ সালের মধ্যে রাজ্যের প্রায় সব বড়ো মেলাতেই ডিজিটাল পেমেন্ট, ইউপিআই, কিউ আর কোড, ফোন পে , গুগুল পে-এর ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। কিছু মেলায় তো ৬০–৭০ শতাংশ লেনদেনই ক্যাশলেস। শিল্পীরা আগেই নিজেদের ক্যাটালগ ও প্রাইসলিস্ট হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রামে  আপলোড করে দেন, ফলে ক্রেতারা মেলায় আসার আগেই জেনে যান কী কী পাওয়া যাবে। কলকাতা হস্তশিল্প মেলা, পৌষ মেলা বা আন্তর্জাতিক মাঙ্গলিক মেলার মতো জায়গায় স্টলগুলোর লাইভ স্ট্রিমিং, রিয়েল-টাইম ক্রাউড আপডেট, এমনকী  অনলাইন অর্ডারের সুবিধাও চালু হয়েছে। এর ফলে বিদেশি ক্রেতা বা গবেষকরাও ভার্চুয়ালি স্টল ঘুরে দেখতে পারেন। ডিজিটাল টিকিটিং ও ই–পাস ব্যবস্থাও কিছু জায়গায় চালু হয়েছে, যা ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাকে আরও সহজ করে।

পোড়ামাটির হাট, বিষ্ণুপুর

সব মিলিয়ে, মেলা এখন আর কেবল একটি লোকাল ইভেন্ট নয় ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা হয়ে উঠেছে গ্লোবাল প্রদর্শনী, যেখানে শিল্পীরা অফলাইন স্টলের পাশাপাশি অনলাইন বাজারও তৈরি করে ফেলছেন। বাংলার মেলা তাই আর শুধু উৎসবের ভিড় নয়, এগুলো এক একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক চক্র, যেখানে অতীতের ঐতিহ্য, বর্তমানের শিল্পচর্চা এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এক সুতোয় গাঁথা। গ্রামীণ কারিগর থেকে আন্তর্জাতিক কিউরেটর, বাউল থেকে ডিজাইনার, সবাইকে একই মঞ্চে এনে মেলা তৈরি করেছে এক আশ্চর্য সমবায়। ডিজিটাল যুগ এই সম্পর্ককে আরও দ্রুত, আরও বিস্তৃত করেছে। স্থানীয় শিল্প এখন স্মার্টফোনের একটি স্ক্রলে বিশ্বের দরজায় পৌঁছে যায়। হস্তশিল্পের বাজার যত বাড়ছে, বাংলার মেলাও তত হয়ে উঠছে সৃজনশীলতার বৈশ্বিক প্রদর্শনী। তাই মেলার গুরুত্ব কেবল বিনোদনে নয় এগুলো বাংলার শিল্প, অর্থনীতি, নারীস্বনির্ভরতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অন্যতম ভিত্তি। বাংলার মেলা বদলে দিয়েছে শিল্পের রুটম্যাপ এবং আগামী দিনেও সেই রুটম্যাপই পথ দেখাবে নতুন সম্ভাবনার দিকে।
_______________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by