‘হিউম্যান এরর’-কে বাদ দিয়ে এআই কি প্রকৃতপক্ষেই সৃজনশীল?

বাংলা সাহিত্য রচনায় এআই, বর্তমান ও অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যৎ

—‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর ভবিষ্যৎ কী? সে মানুষের গোটা মস্তিষ্কটাই হাঁ করে গিলে নেবে কিছু বছর পরে?’

বা—‘আমি নিশ্চিত, মানুষের চেয়ে ঢের চৌকস, বুদ্ধিমান ও নিপুণ সে হতে পারবে। কিন্তু আমাদের মতো বোকা হতে পারবে না। আসলে এই বোকামিগুলো থেকে আমাদের মনের নতুন নতুন ডাইমেনশন খুলে যায়।’ বলছিলেন, স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্ল্যাভো জিজেক। এখন প্রশ্ন হল, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মডেল সাধারণত বোকামি করতে পারে না কেন? একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

ধরে নিন, একটি মেশিন লার্নিং মডেল। যা আসলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সেরই একটি সাবসেট। এইবার, যে কোনও মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি হয়ে থাকে সুনির্দিষ্ট ডেটাসেটের ওপর। ওই ‘ট্রেনিং ডেটাসেট’ থেকেই সে ক্রমাগত শিখছে। আরও নিখুঁত হচ্ছে। যেমন, লজিস্টিক রিগ্রেশন—ভীষণ বেসিক একটা মেশিন লার্নিং মডেল। সেই মডেল কী করে? মূলত ক্লাসিফিকেশন। কেমন? ট্রেনিং ডেটাসেট থেকে সে শিখেছে: লাল রঙ, আকৃতি প্রায় গোলাকার, এবং চিনির পরিমাণ ধরি এক্স—অর্থাৎ, একটি আপেল। হলুদ রঙ, আকৃতি লম্বাটে এবং চিনির পরিমাণ ধরি ওয়াই—অর্থাৎ, একটি কলা। আপনি যদি একটি পেয়ারার তথ্যের ভিত্তি অনুযায়ী ক্লাসিফাই করতে বলেন, তাহলে সেই মডেল ভুল উত্তর দেবে। যেহেতু ট্রেনিং ডেটাসেটে কোনও পেয়ারার ছবি সে দেখেনি। অর্থাৎ, মডেলের যাবতীয় জ্ঞান একটি ডেটাসেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একমাত্র মানুষ যদি নতুন কোনও তথ্য শেয়ার করে, তবেই সে শিখবে। উন্নত হবে।

যে কোনও মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি হয়ে থাকে সুনির্দিষ্ট ডেটাসেটের ওপর। ওই ‘ট্রেনিং ডেটাসেট’ থেকেই সে ক্রমাগত শিখছে। আরও নিখুঁত হচ্ছে। যেমন, লজিস্টিক রিগ্রেশন—ভীষণ বেসিক একটা মেশিন লার্নিং মডেল। সেই মডেল কী করে? মূলত ক্লাসিফিকেশন।

নইলে? একটি পেয়ারাকে, আপেল বলে গণ্য করবে অনন্তকাল ধরে। স্ল্যাভো জিজেক তাই বলছেন, সেই ভুলের মধ্যে কোনও সৃজনশীলতা নেই। চিন্তার নতুন কোনও ক্ষেত্রের উন্মোচন হয় না। অথচ, মনুষ্যসৃষ্ট ভুলের ভেতরে চিন্তার কণামাত্র খোরাক থাকবেই। ইউনিভার্সাল ট্রুথ! ভুল-সংক্রান্ত আলোচনায় মনে পড়ে যায়, আব্বাস কিয়ারোস্তামির একটি ছবি, হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস। আমরা দেখেছি, কিশোর আহমেদ, তার সহপাঠী মহম্মদ রেজার হোমওয়ার্কের খাতাটা সম্পূর্ণ ভুলবশতই বাড়ি নিয়ে এসেছিল। সামান্য একটা ভুল থেকে ছবির শেষ দৃশ্যে ফুটেছিল, একটা আশ্চর্য বুনোফুল। এআই, সেই ফুলগুলো ফোটাতে পারবে না কখনও।    
আপাতত যেটুকু লিখলাম, তা পুরোটাই অংকের ভাষায়। এ-লেখা আসলে খুঁজতে চাইছে, বাংলা ভাষায় লেখালিখির ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কতখানি ধুরন্ধর হয়ে উঠেছে? বিচ্ছেদের প্রম্পটে, সে কি অনায়াসে লিখে ফেলবে, ‘তোমার কীসের এত তাড়া / রাস্তা পার হবে সাবধানে’?

চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই, ক্লড কিংবা ডিপসিক—বাজারচলতি এআই মডেলগুলো আসলে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। যেগুলো মানুষের সঙ্গে ক্রমাগত ইন্টার‍্যাক্ট করতে করতেই শেখে যা-কিছু। মানুষের মতো লিখতে শেখে। ভাবতে শেখে। বিশ্লেষণ করতে শেখে। অঙ্ক কষে কখনও কখনও ছাপিয়ে যায় মানুষকেই। একদিন আপনার ঘুম থেকে উঠে সাধ জাগল, জীবনানন্দ দাশ হবেন। শঙ্খচিল হয়ে উড়ে যাবেন। বালিহাঁসের মতো এস্থেটিক সাঁতার দেবেন। তারপর ইন্সটাগ্রামে সেই রিল আপলোড করে লিখবেন, হ্যাশট্যাগ ‘বোধ’। তাই আপনি জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্রের পিডিএফ ভার্শান চ্যাটজিপিটির সামনে হাজির করলেন। যা ছিল কবিতা, তৎক্ষণাৎ হয়ে গেল ট্রেনিং ডেটাসেট। এইবার চ্যাটজিপিটি তথ্য বিশ্লেষণ করবে। খোঁজার চেষ্টা করবে একটি প্যাটার্ণ। সেই প্যাটার্ণ লক্ষ্য করেই, অক্ষম অনুকরণ করবে। এবং জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতার সম্ভাব্য রূপ স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। যেখানে ‘নিবিড়’, ‘কিন্তু তবুও’, ‘ঘ্রাণ’—শব্দগুলো গুঁজে দেওয়া। কয়েক মিনিটেই, আপনি একজন জীবনানন্দ দাশ!

অর্থ হয়, চ্যাটজিপিটি প্যাটার্ন তৈরি করেছে দারুণ। কিন্তু সেখানে মৌলিকতা নেই। পাগলামি নেই। র‍্যান্ডমনেস নেই। আপনার কবিতা বা গদ্য তাই অমুকের মতো হয়েছে, কিন্তু দিনশেষে আপনার হয়নি। সাহিত্য তো দেশ-কালের বেড়া মানেনি জন্মাবধি, সেখানে এক বা একাধিক প্রম্পটে বাঁধা পড়ে যাবে? তবে তৈরি হবে একটা ইনফাইনাইট লুপ। দুর্দান্ত একটি উপন্যাস লিখে ফেলবে এআই। সেই উপন্যাস সম্পাদনা করবে এআই। বই আকারে প্রকাশের হওয়ার পরে, উপন্যাসের সমালোচনাও করবে এআই। মানবমস্তিষ্কের প্রয়োজন তবে ফুরোয়। সম্প্রতি কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি পুরষ্কার পেয়েছেন ত্রিনিদাদের লেখক জামির নাজির। তারপর জানা গেল, সেই গল্প লিখেছে এআই। সম্পাদকের মেধার ওপর যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই এও সত্য—গল্পটির অধিকাংশই যে এআই দ্বারা লিখিত, সেটা শনাক্তও করেছে একটি এআই—ক্লড। অতএব, ইনফাইনাইট লুপ।

একদিন আপনার ঘুম থেকে উঠে সাধ জাগল, জীবনানন্দ দাশ হবেন। শঙ্খচিল হয়ে উড়ে যাবেন। বালিহাঁসের মতো এস্থেটিক সাঁতার দেবেন। তারপর ইন্সটাগ্রামে সেই রিল আপলোড করে লিখবেন, হ্যাশট্যাগ ‘বোধ’। তাই আপনি জীবনানন্দ দাশের কবিতা সমগ্রের পিডিএফ ভার্শান চ্যাটজিপিটির সামনে হাজির করলেন। যা ছিল কবিতা, তৎক্ষণাৎ হয়ে গেল ট্রেনিং ডেটাসেট।

বাংলা ভাষায় লেখালিখির ক্ষেত্রে, এআই ব্যবহারে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের ডাক দিচ্ছি তাহলে? নৈব নৈব চ! পন্ডিতেরা বলেছেন, এআই মানুষের বন্ধু। তাকে বন্ধুর মতোই ব্যবহার করো। কেমন?  একটি ফিচার-গদ্যের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো অতি দ্রুত সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থিত করতে সক্ষম এআই মডেলগুলো। সঙ্গে জুড়ে দেবে তথ্যের একাধিক  লিংক। গুগল ঘেঁটে যে-সমস্ত তথ্যের নাগাল পেয়ে কী-বোর্ডস্থ করতে করতেই আপনার ডেডলাইন মিস হয়েছে বহুবার। পাশাপাশি গদ্যের একটা আপাত-কাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং নির্দিষ্ট কোনও দৃষ্টিভঙ্গি বা ফোকাস পয়েন্ট—অনায়াসেই ছকে দিতে পারবে। আবার, একাধিক ওয়েবসাইটের লিংক শেয়ার করে আপনি চাইতে পারেন, তথ্যসমূহের একটি তালিকা। কোনও ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস লিখতে আপনার মন আঁকুপাঁকু। অথবা মনে হল, রেফারেন্স হিসেবে কী কী বই পড়লে, চিন্তার দরজা-জানলা খুলবে, যেগুলো এতকাল অনাবিস্কৃত! বলতে চাইছি, ফিচার-গদ্যের তথ্য-সংক্রান্ত উপাদানের জন্য এআই মোক্ষম। কখনও, বিদেশি কোনও শব্দের সঠিক উচ্চারণে সাহায্য করবে অব্যর্থ! কিন্তু হে পাঠক, কখনোই অন্ধবিশ্বাস নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, এআই মডেলগুলো প্রতিনিয়ত শিখে চলেছে। কোনও মানুষ যদি শিখিয়ে থাকে, ১ যোগ ১—তিন; সেটাই কিন্তু পরম সত্য। ঠিক-বেঠিক বিচারের ক্ষমতা সে পায়নি। তাই মানুষের দ্বারা তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন প্রতিক্ষেত্রেই। নইলে আপনার ফিচার-গদ্যটি ঘেঁটে ঘ। ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাসে তথ্যের ছড়াছড়ি এবং ছড়িয়েলাট।

এইখানে পুঁজিবাদের একটা ফাঁদও পাতা আছে। লিখছিলাম, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রতিবাদী-মূর্তির নেপথ্যের গল্প। চ্যাটজিপিটিকে বললাম, মূর্তিগুলোর একটা লিস্টি বানিয়ে দাও। ঠিক সেই সেই মূর্তিগুলোর নাম সে তালিকায় রেখেছিল, যেগুলো মূলত বাম-আদর্শের নৃশংসতার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর দক্ষিণপন্থা বা অতি-দক্ষিণপন্থার ধ্বংসলীলা সজ্ঞানে চেপে দিয়েছে। আমি বলছি, এআই মডেল পক্ষপাতদুষ্ট। ভাবনা গভীরতাহীন। আগেই বলেছি, একটি প্যাটার্ন ফলো করে চলাই একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু মশাই, আমাদের মোক্ষ তো তেমন ছিল না!

হে পাঠক, কখনোই অন্ধবিশ্বাস নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, এআই মডেলগুলো প্রতিনিয়ত শিখে চলেছে। কোনও মানুষ যদি শিখিয়ে থাকে, ১ যোগ ১—তিন; সেটাই কিন্তু পরম সত্য। ঠিক-বেঠিক বিচারের ক্ষমতা সে পায়নি।

এআই মডেলগুলো বাংলা ভাষার ডায়ালেক্টিক্স আদ্যোপান্ত শিখে উঠতে পারেনি। কিন্তু দু-তিন বছর পরে, সে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে নেবেই। হালফিলে, গুগল জেমিনাই বাংলা ভাষায় পটু হয়েছে। সঠিক বাক্য গঠন করতে পারছে। হঠাৎ? কারণ, বাংলা ভাষায় এআই মডেলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কথা বলছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের তাবড় তাবড় কবি, গদ্যকার, সাহিত্যিকের বই সে পড়ছে। বাংলা ভাষায় খবর লিখছে। তা বেশ। জেমিনাইকে জিজ্ঞেস করলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে দু’কথা বলো। সে বলল, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার।’ চেনা তথ্যেরই আরও চর্বিত-চর্বণ আর যান্ত্রিক বুলি আউড়ে সে জানাল, ‘আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ হাসি পেল। ভেবে দেখলাম, এই ভুলের মধ্যে কোনও সৃজনশীলতা নেই। কিছুক্ষণ পরে, ভুলেই যাব।

একটা লেখা তো প্রথমে তৈরি হয় মস্তিষ্কে। সেখানেই সলতে পাকানো হয়। নুন-মরিচ কিংবা সর্ষের তেল মেশানো হয়। আসলে একটা আইডিয়া। একটা ভাষা। যেটা মৌলিক। জঁ-লুক গোদারের চিত্রনাট্য যেমন! কোনও সংলাপ, কোনও দৃশ্য-বিবরণ, কোনও পূর্ব-প্রস্তুতি নেই। আছে চিন্তার অসংখ্য টুকরো। সেখান থেকেই জন্মেছিল, ব্রেথলেস! পিয়েরো লে ফ্যু!

ইদানীং, একটি এআই—ক্লড, ইংরাজি ভাষায় মারকাটারি লেখালিখি করছে। ভাষায় ওজন আছে। সেই সূত্রেই বিশ্বজুড়ে, অর্থ উপার্জনের একটি সহজ পন্থা তৈরি হয়েছে। এআই-এর মাধ্যমে নিজের বই লেখো। ডিজিটালি প্রকাশ করো। তারপর বেচে দাও। দিনশেষে, টাকা প্রয়োজন। মেধা কিংবা ক্রিয়েটিভিটি আবার কী? অবশ্য বাংলা কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্পের যে ভাইরাল পরোটার মতো দশা, সেখানে এআই ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। যে কোনওদিন। আমি নিশ্চিত। প্রম্পটে কী লিখব তখন? ভাইরাল কবিতা লিখতে চাই। কুড়ি শব্দের মধ্যে…

_______________ 
মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia